22/03/2026
>
প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
আমাদের ভূঞাপুরের সবার গর্ব, চোঁখের মণি, যাকে না পেলে হয়ত এই ভূঞাপুরকে আমরা পেতাম না সেই শ্রদ্ধেয় স্যার প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁর স্মরণে আমাদের এই গ্রুপের যাত্রা শুরু। আমরা তাঁর আদর্শে ও অনুপ্রেরণায় এই “ ইবরাহীম খাঁ'র আলোকিত ভূঞাপুর " গ্রুপটি পরিচালনা করব। এই গ্রুপের মাধ্যমে আমরা স্যার প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁর বিভিন্ন গুণ, তার সফল কর্ম ও আমাদের ভূঞাপুরের সকল উন্নয়ন এবং ঐতিহ্য তুলে ধরবো সবার মাঝে।
প্রতিভা সবারই থাকে। তবে একই সাথে অনেকগুলো প্রতিভার সমন্বয় খুব কম মানুষের মধ্যে পাওয়া যায়। যাঁদের মধ্যে এতসব প্রতিভা, মেধা ও গুণের সমন্বয় থাকে তাঁরাই আলোকিত মানুষ। এই আলোকিত মানুষদের মধ্যে আবার অনেকেই তাঁর কর্মগুণে, প্রজ্ঞাগুণে হয়ে উঠেন অনন্য আলোকিত; তাঁরাই হন দেশবরেণ্য বা দেশবিখ্যাত। প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ তেমনই একজন। তিনি বিশেষ কোনো ব্যক্তি নন। তিনি যুগসন্ধিক্ষণের এক নতুন পথের দিশারি, এক যুগস্রষ্টা, শতাব্দীর অন্যতম ইতিহাস-মানব। তিনি এমনই একজন মানুষ, যাঁর পরিধি ও ব্যাপ্তি সুবিস্তৃত ও সুবিশাল।
ধর্ম, কর্ম, রাজনীতি, সামাজিকতা-সব কিছুর উর্ধ্বে তিনি স্থান দিয়েছ্নে মানুষকে। তিনি ধর্মপরায়ণ ছিলেন, কিন্তু ধর্মান্ধ ছিলেন না। ফলে মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতেন মানুষের জন্য ধর্ম, ধর্মের জন্য মানুষ নয়। এ জন্যই মানুষকে ভালোবেসে ইবরাহীম খাঁ স্নেহপ্রবণ, বিচক্ষণ, দূরদৃষ্টিসমপন্ন, প্রচারবিমুখ, নিরহংকারী সহজ-সরল মানুষ।
পরিচিতিঃ ইবরাহীম খাঁ৷ বাল্যনাম খাজা বা খাজা মিয়া এবং ইবানী৷ খাজা ছদ্মনামে তাঁর বেশ কিছু রচনা প্রকাশিত হয়েছে৷ প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ নামেই সমাধিক পরিচিতি লাভ করেছেন৷
জন্মঃ ১৮৯৪ সালে ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিকে এক বৃহস্পতিবার বর্তমান টাঙ্গাইল জেলার ভূঞাপুর থানার অন্তর্গত বিরামদি (বর্তমান শাহবাজনগর) গ্রামে ইবরাহীম খাঁ জন্মগ্রহণ করেন৷ পিংনা হাই স্কুলের ভর্তি রেজিস্টারে তাঁর জন্ম তারিখ দেখানো হয়েছে ০১ সেপ্টেম্বর ১৮৯৫৷
বংশঃ ইবরাহীম খাঁ'র পিতা শাবাজ খাঁ ফসলান্দি থেকে বিরামদি গ্রামে স্থায়ী আবাস গড়ে তুলেন৷ তিনি ছিলেন গ্রামীণ মধ্যবিত্ত৷ মাতা রতন খানম৷ ছয় ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন ৬ষ্ঠ৷ তারা হলেনঃ (১) আবদুল করীম খাঁ, (২) শাহে বানু, (৩) আবদুস সোবহান খাঁ, (৪) কাজিম উদ্দিন খাঁ, (৫) এবাদত আলী খাঁ, (৬) ইবরাহীম খাঁ, ও (৭) লুৎফর রহমান খাঁ৷
পরিবারঃ ১৯১৭ সালে জানুয়ারি মাসে টাঙ্গাইলে বড় বাশালিয়া গ্রামের আনজুমনেছার সঙ্গে শুভ পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন৷ তাঁদের সংসারে তিন পুত্র এবং এক কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করেন৷ (১) মৃত. শামসুজ্জামান খাঁ তুলা মিয়া, (২) মৃত. আসাদুজ্জামান খাঁ সুজা মিয়া, (৩) বেগম খালেদা হাবিব, (৪) আমিনুজ্জামান খাঁ আমিন৷ ১৯৭৬ সালের ২১ নভেম্বর ইবরাহীম খাঁ'র স্ত্রী মারা যান৷
শিক্ষাঃ বাড়িতে বড় ভাইয়ের কাছে বাংলা, মুন্সীর কাছে আরবী পড়ায় ইবরাহীম খাঁ'র হাতে খড়ি৷ ফসলান্দির পাঠশালা থেকে নিম্নপ্রাইমারী এবং লোকের পাড়া পাঠশালা থেকে উচ্চ প্রাইমারী পাস৷ ১৯০৬ সালে হেমনগর হাইস্কুল থেকে পঞ্চম শ্রেণী পাসের পর ১৯০৭ সালে পিংনা হাইস্কুলে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হয়ে ঐ স্কুল হতে প্রথম বিভাগে এন্ট্রান্স পাস করেন ১৯১২ সালে৷ তিনি ময়মনসিংহের আনন্দ মোহন কলেজ হতে ১৯১৪ সালে দ্বিতীয় বিভাগে আইএ এবং ১৯১৬ সালে কলকাতার সেন্ট পালস্ কলেজ (বর্তমানে সুরেন্দ্রনাথ কলেজ) হতে ইংরেজী ভাষা ও সাহিত্যে অনার্সসহ বি.এ পাস করেন৷ ১৯১৭ সালে আইনের প্রিলিমিনারী, ১৯১৮ সালে ল-ইন্টার, ১৯১৯ সালে ইংরেজি সাহিত্যের প্রাইভেট এম.এ এবং ১৯২৩ সালে আইন পাস করেন৷
কর্মজীবনঃ ১৯১৯ সালের ২৮ নভেম্বর ইবরাহীম খাঁ করটিয়া হাইস্কুলের প্রধানশিক্ষক পদে যোগ দেন৷ ১৯২৩ সালে মাঝামাঝি সময়ে শিৰকতা ত্যাগ করে তিনি ময়মনসিংহে ওকালতী ব্যবসা শুরু করেন৷ ১৯২৬ সালের ২ জানুয়ারি পুনরায় হাইস্কুলের প্রধানশিক্ষক পদে যোগ দেন এবং আঁটিয়ার জমিদার ওয়াজেদ আলী খান পন্নী ওরফে চাঁদ মিয়ার সৌজন্যে সা'দত কলেজ প্রতিষ্ঠার কাজে হাত দেন৷ ১৯২৬ সালের জুলাই মাসে কলেজ প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি এর প্রিন্সিপাল হন এবং একটানা ২২ বছর ঐ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন৷ ১৯৪৭ সালের ৪ নভেম্বর সরকারের আমন্ত্রনে তিনি পূর্ববাংলা মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের পদ গ্রহণ করেন এবং ১৯৫৩ সালের ১৪ জুলাই অবসর গ্রহণ করেন৷ তিনি ১৯৪৮ সালে ভূঞাপুর কলেজ (বর্তমানে ইবরাহীম খাঁ সরকারি কলেজ) এবং পরবর্তীকালে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুলস্নাহ ও প্রিন্সিপাল আবুল কাসেমের সহযোগীতায় বাংলা কলেজ (বর্তমান মিরপুরস্থ সরকারি বাংলা কলেজ) প্রতিষ্ঠা করেন৷ ১৯৪৬ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত প্রাদেশিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি ছিলেন ইবরাহীম খাঁ৷ ১৯৬২ সালের নির্বাচনে জাতীয় পরিষদে সদস্য নির্বাচিত হন৷ ২৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১ সালে পত্রিকায় বিবৃতি দিয়ে তিনি দলীয় রাজনীতি হতে অবসর গ্রহণ করেন৷ তিনি পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের প্রতিনিধিদলের নেতা হিসেবে মধ্য প্রাচ্যের কয়েকটি দেশ ও চীন সফর করেন৷
পুরস্কার ও সংবর্ধনাঃ ১৯৩৮ সালে ইবরাহীম খাঁ 'খানবাহাদুর' উপাধি পান, পরাধীন দেশে এই খেতাব তিনি গ্রহন করেননি এবং ১৯৪৩ সালে তা বর্জন করেন৷ ১৯৪৪ সালের ১৯ মার্চ পূববঙ্গ সাহিত্য সংসদ তাঁকে বিশেষ সংবর্ধনা প্রদান করেন এবং ১৯৬৩ সালে বাংলা একাডেমী পুরষ্কার পান৷ ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে 'একুশে পদক' প্রদান করেন৷
মৃতু্যঃ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অনন্য সাধক, বিশিষ্ট শিৰাবিদ ও সমাজসেবক-এককথায় বহুমুখী প্রতিভার প্রতিভার সমন্বয়ে গড়া অনন্য অসাধারণ মানুষটি পরিবার পরিজন, অগণিত ছাত্র-ছাত্রী, ভক্ত অনুরাগী, শুভাকাংখীদের শোকসাগরে ভাসিয়ে ১৯৭৮ সালের ২৯ মার্চ ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন৷