23/10/2025
১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধকে এক পক্ষ ❛ইসলামের বিরুদ্ধে❜ যুদ্ধ বলে চালিয়ে আসছে, জনযুদ্ধকে এরা ধর্মের খোলস পরিয়ে মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলকে ইসলামের বিপক্ষে দাঁড় করিয়ে দেওয়ার ফন্দি করেছিলো, সেটা মোটাদাগে সফলও বলতে হবে। রাষ্ট্রযন্ত্র, গণমাধ্যম, সাংস্কৃতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ইত্যাদির মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধকে ❛ইসলাম বনাম সেক্যুলার❜ লড়াইয়ের বয়ান প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিলো।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে বড়ো বড়ো গপ্পোবাজ ময়দানে ❛আইকন❜ হিসাবে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন। শিল্প-সাহিত্যাঙ্গনে তারা প্রতিষ্ঠিত এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ছিলেন। অবাক করা বিষয় হচ্ছে এই গপ্পোবাজদের কেউই সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করেননি!
কেউ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তান সরকারের চাকরি করেছেন, কেউ কেউ ছিলেন আড়ালে। কলকাতা থেকে শুরু করে ইউরোপেও যুদ্ধকালীন সময়ে নিরাপদে অবস্থান করেছেন অনেকে।
মুক্তিযুদ্ধের পরে, এরাই হাতে তুলে নিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের ঠিকাদারি!
তারাই হয়ে উঠেছেন হর্তাকর্তা, এমনকি কে মুক্তিযোদ্ধা কে নয়, সেটাও তারা অনুমোদন দেওয়া শুরু করেন, আনুষ্ঠানিকভাবে না হলেও প্রচারমাধ্যমে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে বিদ্রুপাত্মক আলাপ করতেও দ্বিধা করেননি! এমনকি খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়েও কুৎসা রটাতে পিছপা হননি!
স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে এই বিশেষ বর্গ রণাঙ্গনের মুক্তিসেনাদের কোণঠাসা করে রাখতে নানান ফন্দিফিকির করেছেন, সরকারি দলের সহায়তায় সেসব দূরভিসন্ধি কার্যকর হয়েছে। নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের দল, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দল বলে জোর দাবি করলেও, আ. লীগই মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের অসম্মান করেছে সবচেয়ে বেশি।
ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকাভূক্ত করা থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় নানা সুবিধা দিয়ে দেশের মধ্যে চরম বৈষম্যমূলক এক ব্যবস্থার সূচনা করে। তাদের অনুসারী বলে পরিচিত ❛বুদ্ধিজীবীরা’ মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমাজে বিভক্তির সূচক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, যা সরকারি পৃষ্ঠপোষণে মানবাধিকার হরণের পর্যায়ে অবনত হয়েছে শেষ পর্যন্ত।
৯ মাসের গণযুদ্ধ গত দেড় দশকে একটা দলের ❛যুদ্ধ❜ হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার আপ্রাণ চেষ্টা বিফলে গেছে, বলাই বাহুল্য।
জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ২০২৪-এ বাংলাদেশ স্বৈরশাহির তাসের ঘর তছনছ করে দিয়েছে। মানুষের অধিকার ফিরিয়ে আনার সংগ্রাম সফল হয়েছে।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পর যেমন সুরক্ষাবলয়ে থাকা লোকজনেরা এসে দেশের ❛কাণ্ডারি❜ হয়ে উঠেছিলেন, ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছিলেন, জুলাই আন্দোলনের পরেও সেই একই চিত্র দেখা যাচ্ছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের মধ্যে হাতেগোণা কয়েকজন ছাড়া কেউই গত ১৫-১৬ বছরের দুঃশাসন নিয়ে মুখ খোলেননি! সচিবালয়, প্রশাসন থেকে সরকারি, বেসরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানে ইতিমধ্যে সুযোগসন্ধানীরা চেয়ার দখল করে রেখেছেন বা নিয়েছেন। শুধু কি তাই? রাজনৈতিক দলগুলোতেও দেখা যাচ্ছে ❛বসন্তের কোকিলদের❜ ব্যাপক কদর হচ্ছে!
১০-১৫ বছর দেশেই ছিলেন না, রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ছিলেন না, কিন্তু, জুলাই অভ্যুত্থানের পর দেশে ফিরেছেন বহর নিয়ে, মহড়া দিয়ে। দলও তাদের টেনে নিয়েছে বুকে, পদ-পদবী দিয়ে বাকবাকুম করছে! আসছে জাতীয় নির্বাচনে মনোনয়ন পাবেন এমনটাও কারো কারো ভক্ত-সমর্থকেরা প্রচার করছেন। উড়ে এসে জুড়ে বসার কী চমৎকার নমুনা!
জুলাই আন্দোলনে যারা সম্মুখসারীতে ছিলেন, যেসব পরিবারের সন্তান, পিতা-মাতা দানবের গোলার সামনে বুক পেতে দিয়েছেন, তাদের খোঁজখবর নেওয়ার গুরুত্ব এখন কমে গেছে!
সবাই এখনো চিকিৎসা পাচ্ছে না ঠিকমতো, কেউ কেউ বিনা চিকিৎসায় ওপারে পাড়ি জমিয়েছে৷ পরিবারের উপার্জনক্ষম লোকটাকে হারিয়ে অনেকেই মানবেতর জীবনযাপন করছে৷ সেসব নিয়ে ক্ষমতাবানদের তেমন কোনো আগ্রহ নাই!
কতজন মানুষ জুলাইয়ে প্রাণোৎসর্গ করেছেন, আহত হয়েছেন — সেই তালিকাটা আজ পর্যন্ত যথাযথভাবে প্রকাশ করা হয়নি! এমনকি যেসব রাজনৈতিক দল আন্দোলনে সক্রিয় ছিলো, নিজেদের দলের সর্বাধিক কর্মি ❛শহিদ❜ হয়েছে বলে দাবি করেন, তারাও এখনো কোনো পূর্ণাঙ্গ তালিকা সবার সামনে তুলে ধরতে পারেননি!
জুলাইয়ের আন্দোলন শুধু স্বৈরশাহি পতনের আন্দোলন ছিলো না, আ. লীগকে নামানোর বিক্ষোভ ছিলো না, দানবের হাত থেকে মুক্তির আন্দোলন ছিলো না৷ দেশের মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার আন্দোলন ছিলো, সার্বভৌম ফিরে পাওয়ার সংগ্রাম ছিলো, অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই ছিলো৷
সুযোগসন্ধানীদের দৌরাত্ম্যে আজ সব ভূলুণ্ঠিত হতে চলেছে! সরকার থেকে শুরু করে রাজনৈতিক দল — লক্ষ্য যেন নিজেদের আখের গোছানো!
একাত্তরে জীবন উৎসর্গ করা বীরদের পরিবার যেমন ডুকরে কেঁদেছে বছরের পর বছর। জুলাই অভ্যুত্থানে স্বজন হারানো পরিবারগুলোও গুমরে কাঁদবে অনন্তকাল!
একাত্তরে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম বেহাত হয়েছিলো। চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থান চলে গেছে ধান্দাবাজদের কব্জায়!
আমাদের মুক্তির সূর্যালোকে অশুভ আত্মার নিকষ ছায়া!
আমাদের জুলাই ❛ছিনতাই❜ হয়ে গেছে!
| আজকের আলাপন
~ তানজীল শাহরিয়ার
-- অক্টোবর ২৩, ২০২৫