02/04/2026
আজ বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস।
আজ ২ এপ্রিল বিশ্বব্যাপী পালিত হবে অটিজম সচেতনতা দিবস। আমাদের দেশে এই দিনটি রাষ্ট্রীয় কিছু আচার অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বেশ কয়েক বছর ধরে পালন করা হচ্ছে। ইদানিং সরকার অটিজমের উপর ব্যাপক গুরুত্ব আরোপ করেছেন যা আমাদের জন্য আশা জাগানিয়া। গরিব দেশে অন্যান্য প্রতিবন্ধীদের পাশাপাশি অটিস্টিক শিশুরাও রাষ্ট্রের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছে, এর জন্য সরকার এবং অন্যান্য অংশীজনরা সাধুবাদ পাবেন।
শারীরিক, মানসিক, বুদ্ধিগত, বিকাশগত এবং ইন্দ্রিয়গত ক্ষতিগ্রস্ততা ও প্রতিকূলতার ভিন্নতা বিবেচনায়, নিউরো ডেভেলপমেন্ট প্রতিবন্ধকতার কয়েকটি ধরন সরকার কর্তৃক নিদৃষ্ট করা হয়েছে। সেইসাথে, নিউরো ডেভেলপমেন্ট প্রতিবন্ধকতায় আক্রান্ত সব ধরনের প্রতিবন্ধী নাগরিকদের পাশাপাশি অটিজমে আক্রান্তদেরও সুরক্ষা ও সমাজের অংশ হিসাবে মর্যাদার সহিত বসবাস করার মত উপযোগী করে তোলার লক্ষ্যে সরকার নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট আইন, ২০১৩ প্রনয়ন করা হয়েছে। এর ফলে রাষ্ট্র কর্তৃক অটিজম আক্রান্তদের অধিকার ও সুরক্ষার আইনি দিকটি নিশ্চিত হয়েছে। দেশে সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীন বর্তমানে ৬৮টি প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এইসব কেন্দ্র থেকে সব বয়সের প্রতিবন্ধীদের পাশাপাশি অটিজমে আক্রান্ত ব্যাক্তিদেরও বিভিন্ন ধরনের সেবা প্রদান করা হচ্ছে। উল্লেখ্য যে, ২০১৪ সাল থেকে এই কেন্দ্রগুলি স্বতন্ত্র নতুন একটি অধিদপ্তরের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। সরকারী এই উদ্যোগ অটিজমে আক্রান্তদের সেবা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ভালো ভূমিকা রাখবে বলে মনে করি।
দেশে অটিস্টিক শিশুদের সঠিক পরিসংখ্যান আমাদের কাছে নেই! উন্নত বিশ্বে প্রতি হাজারে ২০টি শিশু অটিজমের শিকার হয়, সে হিসাবে আমাদের মত জনবহুল দেশে এর সংখ্যা সহজেই অনুমেয়। অটিজম কি তা শহুরে মানুষজন কম-বেশী জানলেও প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষরা এখনও এটিকে ঈশ্বর প্রদত্ত শাস্তি হিসাবেই ধরে নেয়! তাই সচেতনতা তৈরিতে রাষ্ট্রের পাশাপাশি বেসরকারি সব সংস্থাকেও এ বিষয়ে এগিয়ে আসতে হবে।
অটিজমে আক্রান্ত শিশুরা মস্তিষ্কের স্বাভাবিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্থ হওয়ার দরুন সবার সাথে স্বাভাবিক আচরণ বা যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে না, তারা তাদের মত করে চলতে বা মত প্রকাশ করতে চেষ্টা করে। চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা এর জন্য আমাদের ত্রুটিপূর্ণ জিনকেই দায়ী করেছেন, এ ক্ষেত্রে তারা চেষ্টা করে যাচ্ছেন যাতে আরও পরিক্ষা-নিরিক্ষার মাধ্যমে অটিজমকে আরও ভালো ভাবে জানা যায়। শিশুদের মধ্যে অটিজমের লক্ষণ ৬ মাস বয়সেই বোঝা যেতে পারে, তিন বছর বয়সের মধ্যে তা পরিপূর্ণরূপে দেখা যেতে পারে, যা পরবর্তীতে সারাজীবন স্থায়ী হয়!
প্রতিবন্ধিতা ও অটিজমের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য আছে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, প্রতিবন্ধী মানেই অটিস্টিক নয় আবার অটিস্টিক শিশুর মধ্যে অন্য যেকোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা থাকাও অস্বাভাবিক নয়।
অটিজমে আক্রান্ত শিশুরা সমাজিক আচার ব্যবহারে সাবলিল নাও হতে পারে। তারা অনেকটা একা থাকতে ভালবাসে, কিন্তু তারপরও তারা বন্ধুত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়, তবে তা তৈরি হয় তাদের স্বীয় চাহিদা মোতাবেক। তাদের কাছে বন্ধুর সংখ্যার চেয়ে বন্ধুর সাথে নিজেকে খুঁজে ফেরার প্রবনতাই বেশী চোখে পড়ে।
অপরিচিত মানুষের চোখে চোখ না রাখা, ইতস্তত বোধ করা, আমতা আমতা করে কথা বলার চেষ্টা করা তাদের স্বাভাবিক আচরণেরই বহিঃপ্রকাশ। অটিস্টিক শিশুদের মধ্যে অর্ধেকের বেশী শিশু সঠিক ভাবে কথা বলতে পারে না। তারা হয়ত মাথা ঘোরাতে থাকবে, হাত উচু-নিচু করতে থাকবে, উচ্চ স্বরে কথাও বলতে পারে। তারা দৈনন্দিন একটা রুটিনের মধ্যে চলতে পছন্দ করে এর
হের-ফের হলেই রাগ করে থাকে। সময়মত খাবার খাওয়া, গোসল করা, প্রতিদিন একই রকমের কাপড় পরা তাদের রুটিনের মধ্যে পড়ে। অটিস্টিক শিশুরা তাদের পছন্দনীয় ক্ষেত্রে খুবই মেধাবী হয়ে থাকে, কেউ হয়ত খুব ভালো ছবি আঁকতে পারে বা কেউ হয়ত খুব ভালো পিয়ানো বাজাতে পারে। গবেষনায় দেখা গেছে ভালো যত্ন নিলে অটিস্টিক শিশুরা সাবলীলভাবে জীবন যাপন করতে পারে। তাই রাষ্ট্রের পাশাপাশি পরিবার তথা সমাজের সচেতন ভুমিকা অটিস্টিক শিশুদের জীবনে ব্যাপক ভুমিকা রাখতে পারে। তাদেরকে সমাজের বোঝা না ভেবে লুকানো প্রতিভা কাজে লাগিয়ে মানব সম্পদে পরিনত করা যেতে পারে, তারজন্য চাই শুধু একটু ভালবাসা আর তাদেরকে বোঝার সক্ষমতা।
২০২৪ সালের সরকারী তথ্য অনুযায়ী, সুনামগঞ্জ জেলায় নিবন্ধিত প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংখ্যা প্রায় ৩৪,৬৭২ জন। তবে, প্রতিবন্ধী ব্যক্তির প্রকৃত মোট সংখ্যা এর চেয়ে বেশি হতে পারে। কিন্তু, এর মধ্যে কতজন অটিজমে আক্রান্ত এর কোনও সঠিক হিসাব নেই! হাওর অধ্যুষিত সুনামগঞ্জ জেলার অনেক এলাকা দুর্গম হওয়ায় অনেক প্রতিবন্ধী নাগরিক যে এই তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন তা সহজেই বলা যায়।
সুনামগঞ্জের মত প্রান্তিক এলাকায় অটিজমের ব্যাপারে সচেতনতা নেই বললেই চলে। যদিও জেলায় সরকার কর্তৃক একটি প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্র রয়েছে তথাপি, প্রয়োজনের তুলনায় এর আওতা অনেকটা সীমাবদ্ধ। খোদ সুনামগঞ্জ শহরের অনেকেই এই কেন্দ্রের বিভিন্ন সেবার ব্যাপারে ওয়াকিবহাল নন। এই ব্যাপারে বেসরকারি সংস্থাগুলি এগিয়ে আসতে পারে। যেহেতু তারা একটি জেলার প্রায় সব জায়গায় কাজ করে তারা খুব সহজেই অটিস্টিক ব্যাক্তিদের সনাক্তকরনের পাশপাশি প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রে যেতে উৎসাহিত করতে পারে। তারা অটিস্টিক শিশুর পরিবারদের সাথে আন্তঃযোগাযোগ স্থাপনের মাধ্যমে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের ব্যবস্থা করতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে অটিজমে আক্রান্তদের পরিবারকে এই ব্যাপারে আরো সচেতন হতে হবে এবং তাদেরকে যতটুকু সেবা ও ভালবাসা দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। আমাদেরকে জানতে হবে যে, অটিজমে আক্রান্ত প্রায় সব শিশুরা বড় হয়ে উঠার পরও একা একা থাকার যোগ্য হয়ে উঠে না, তাদের অনেককে সারা জীবন অন্যের তত্বাবধায়নেই থাকতে হয়। আর তাই অটিস্টিক শিশু আছে এমন পরিবারকে প্রস্তুত ও সচেতন হতে হবে কেননা, তারাই তাদের শেষ ও একমাত্র আশ্রয়স্থল। ধন্যবাদ।
মোঃ জাকারিয়া জামান তানভীর
সাঃ সম্পাদক, অরফেন ওয়েলফেয়ার নেটওয়ার্ক
প্রেসিডেন্ট, আমরা ফাউন্ডেশন
সুনামগঞ্জ।