19/10/2024
বলছি একজন চিত্রনাট্যাকার, সাংবাদিক এবং একজন আদর্শবান পিতা আমার বাবা মোঃ জাহাঙ্গীর হোসেন মুক্তা(যোসেফ শতাব্দী)সাহেবের কথা-----
বাবার ছেলে বেলা কেটেছে যমুনার ঐতিহাসিক কাওয়াখোলার চর এর পাশে ছোট পিয়ারীর চরে। মাছরাঙ্গা টিভির এক ইন্টারভিউ এ বাবা বলেছিলেন-চরটি ছিলো লম্বা আকৃতির, প্রকৃতির সব ধরনের সৌন্দর্য্যই গ্রামটিতে ছিলো, একেবারে ছবির মত গ্রাম। চর জীবনে অনেক অভাব অনটনের মধ্যে একটি পাঠশালায় প্রথম তাঁর পড়াশোনা শুরু হয়। পরবর্তীতে চোখের সামনে একদিন সেই ছবির মত গ্রামটি যমুনার ভাঙ্গনে বিলিন হয়ে যায়। তারপর দাদা পরিবারের সকলকে নিয়ে সিরাজগঞ্জ সদরে বসবাস শুরু করেন।
বাবা ছাত্র বসে থেকেই সংগঠন, অভিনয় আবার টুকিটাকি লেখা লেখি করতেন। ছাত্র হিসাবে তিনি ভালো ছিলেন, যদিও তার বই পুস্তকের বড় অভাব ছিলো। বাবা একদিন বলেছিলেন-এসএসসি পরিক্ষার আগের রাত ২টা পর্যন্ত নিজের লেখা নাটক মঞ্চস্থ করে বাসায় ফেরেন, এমন নাটক পাগল ছিলেন তিনি। 1969 সালে গণ আন্দোলনের সময় গণতান্ত্রিক স্বাধীন বাংলা কায়েমের শ্লোগান সম্বলিত নাটক পল্টনের ঐতিহাসিক ময়দানে প্রথম মুক্ত মঞ্চে মঞ্চস্থ হয় “মহাবিপ্লবের পদধ্বনি” অন্যটি ”ভোরের অভিযাত্রিরা চলছে” যার রচনা, পরিচালনা ও মুখ্য ভুমিকায় অভিনয় করেছিলেন আমার বাবা যোসেফ শতাব্দী। এছাড়াও বাবার লেখা মেঘা সিরিয়াল “ও আমার চক্ষু নাই” এটিএন বাংলায় 500 এর ও বেশি পর্ব প্রাচারিত হয়েছে, যার নির্দেশনায় ছিলেন প্রয়াত পরিচালক মোহাম্মদ হান্নান। বাবা স্বাধীনতার পর কিছুদিন দৈনিক স্বদেশ পত্রিকায় সাহিত্য সম্পাদক এবং দৈনিক স্বাস্থ্য বার্তার বার্তা সম্পাদকের কাজ করেছেন। পববর্তীতে সাপ্তাহিক ইত্তেফাক পত্রিকার রিপোর্টার ও ডিইলি নিউজের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন। সাংবাদিকতা করাকালীন 1982-83 সালে বাবা সিরাজগঞ্জ জেলা প্রেসক্লাবের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।
বাবা তার নাতি নাতিনদের উদ্দেশ্য করে অনেক ছড়াই বলতেন কিন্ত সেগুলোর বেশিরভাগই সংরক্ষিত নাই, তবে সেগুলোর মধ্যে দুইটি ছড়া আমার মনে পরছে-
“জোনাকী পোঁকা”
জোনাকী পোঁকা জোনাকী পোঁকা
তুমি দেখি বড্ড বোঁকা
রাতের বেলা জ্বলতে নেই
ধরে ফেলবে অনেকেই
যাও পোঁকা উড়ে যাও
বাড়ী গিয়ে দুধু খাও।
“চড়ুই পাখি “
একটা ছিলো চড়ুই পাখি
বসতো ঘরের চালে,
একদিন সে বসলো গিয়ে
নীম গাছের ডালে।
নীম দেখে ভাবলো চড়ুই
কি মিষ্টি ফল,
খেলেই হবে চিলের মত
দুইটি ডানায় বল।
যেমন ভাবা তেমনি খাওয়া
খেয়েই চড়ুই কয়,
আঙ্গুর ভেবে খেলাম যে ফল,
তেতো কেমনে হয়?
শেয়াল বলতো ব্যর্থ হয়ে
আঙ্গুর ফল টক্,
চড়ুই বলে নীমটি খেয়ে
শিয়াল ছিলো ঠগ্।
1976 সালে যোসেফ শতাব্দীর চলচ্চিত্রাঙ্গনে অভিষেক ঘটে “আসমী হাজির” ছবির মাধ্যমে, যার পরিচালক ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা দেওয়ান নজরুল। এরপর ধর্ম আমার মা, আসমান জমিন, ডাকু মনসুর, সুখের সংসার, অবরোধ, কুরবানী, মাটির দূর্গ, সুজন বন্ধু, প্রেম যমুনা, অন্ধ প্রেম, বন্ধু আমার, বিক্ষোভ, মহামিলন, ভালোবাসি তোমাকে, কোটি টাকার কাবিন, চাচ্চু, দাদীমা, মায়ের হাতে বেহেস্তের চাবী, সুখের সংসার, আলাল দুলাল, নয়ন ভরা জল, অগ্নী বৃষ্টি, আকাশের চাঁদ, আমার স্বপ্ন তুমি, তুমি কি সেই, এলাকার বাদশা, বিয়ান সাব, স্বপ্ন পূরণ, দেশ দেশান্তরসহ চারশত এর বেশি সিনেমার চিত্রনাট্য রচনা করেছেন তিনি।
বাবার লখা একটি অসমাপ্ত প্রজেক্ট আছে “ক্ষুব্ধ স্বদেশ ভুমি” যার গল্প ধারণাটি তিনি লিখে গেছেন। চলচ্চিত্রটি সরকারীভাবে নির্মানের কথা ছিলো কিন্ত সাম হাও তা পরবর্তীতে সম্পন্ন হয়নি। গল্পটি ছিলো 1971 সালের এপ্রিল মাসের শেষ সপ্তাহের নিশ্চিন্তপুর রেল স্টেশন এর উপর লেখা। গল্পটির শেষ অংশের কিছু কথা তুলে ধরা হলোঃ
হাপাচ্ছে বজলু। খুড়িয়ে দ্রুত হেটে এসে বজলু একটা গণ কবরের সামনে দাঁড়ালো
ওখানে ঘুমিয়ে আছে অজ্ঞাত পরিচয়ে বীরশ্রেষ্ঠরা
একটা ফলকে লেখা রয়েছে-
দাঁড়াও পথিক
গণ কবরে শোয়া ওরা
গণদেবতা
নির্যাতিত, নিষ্পেষিত, ক্ষুব্ধ স্বদেশ ভুমিকে শত্রু মুক্ত করে
বাঁচার জন্য ওরা যুদ্ধ শুরু করেছিলো
যে যু্দ্ধের শেষ নেই-
একটা সঙ্গীতের ধুন উঠলো
ফিরে হাটতে শুরু করলো বজলু
অফ ভয়েজ হচ্ছে-
খন্ড খন্ড যুদ্ধের পংতিমালায়
গাঁথা মহাকাব্যের মত যে মুক্তি যুদ্ধের
ইতিহাস, সেখানে ওদের নাম খুঁজতে
যেওনা। ওরা এখন শহিদ আল্লাহু চাচার
মতই অলৌকিক কল্পকাহিনী।
বাবার সাথে আমাদের স্মৃতি কথাঃ
বাবার সাথে আমাদের স্মৃতি অনেক, বলে শেষ করা যাবে না। প্রতিটা মুহুর্তে বাবাকে আমরা মিস করি। বাবা কাজে কর্মে অনেক ব্যস্ত সময় পার করতেন। পরিবারের সবাইকে নিয়ে ঘুরে বেড়ানো সময় তার হয়ে উঠতো না। বাবার সাথে ছেলে বেলায় শিশু পার্কে ঘুরেছি। 1993 সাল একবার হঠাৎ সিদ্ধান্ত হলো আমাদের সবাইকে নিয়ে কক্সবাজার যাবে-আমি বাবার ছোট ছেলে, তখন আমি ৮ম শ্রেণীতে পড়ি। বাবা আগেই ফিল্ম প্রোডাকশন ইউনিটের সাথে কক্সবাজার অবস্থান করছিলেন। পড়ে আমাদের খবর দিলো-আমরা পরিচালক আওকাত হোসেন এর পরিবাবর এবং আরো একজন প্রযোজকের পরিবার একটি রিজার্ভ বাসে কক্সবাজার গেলাম। ট্যুরের বৈশিষ্ঠ্য ছিলো কাকতালিও ভাবে আমরা তিন ভাইবোনই একের অধিক সমবয়সী বন্ধু পেয়ে গেলাম। আলটিমেন্টলি ট্যুরটা খুব মজায় পার হয়েছিলো। সেই দিন গুলো ছিলো অনেক মজার এবং মনে রাখার মত। এছাড়া বাবা আমাদের সকলকে নিয়ে পারিবারিক আড্ডা দিতেন। যা আমাদের পরিবারের সকলকে আর্কষন করতো। বাবা শুক্রবার ব্যতিত প্রায় প্রতিদিনই ব্যস্ততার জন্য রাত করে বাসায় ফিরতেন। আমরা পড়[শোনা শেষ করে বাবার জন্য অপেক্ষায় থাকতাম রাতের খাবার এক সঙ্গে খাব আর ঘন্টাখানেক আড্ডা দেবো। পরবর্তীতে আমার কর্মস্থল খুলনায় হওয়ায় এধরনের পারিবারিক আড্ডাটা আমি অনেকদিন পর পর পেতাম। বাবা চলে গেলেন আমাদের ছেড়ে, এই আড্ডাটা আর কোনদিন জমবে না। আর কোনদিন বাবার কাছে কোন পরামর্শ পাবনা। তারপরও নিজের মনকে শান্তনা দিতেই হয়। আল্লাহর বিধান একদিন আমাদের সকলকেই এই পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে যেতে হবে।
বাবা আজ তুমি চিরনীদ্রায় সায়িত আছো-নিশ্চয়ই তুমি তোমার আদর্শ, সৎ কর্মের ফল পাবে। আল্লাহ তোমাকে জান্নাতবাসি করুন। আর তুমি যেনে রাখো তুমি আমাদের যে আদর্শে লালন করেছো তা আমরা তোমার সন্তানেরা অক্ষরে অক্ষরে পালন করবো ইনসাহ্আল্লাহ।