08/03/2026
জাহাঙ্গীরনগরে শিক্ষার্থী ধর্ষণ ও পাশবিক নির্যাতনের শিকার: বিচার, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা, এবং ধর্ষক সৃষ্টিকারী রাষ্ট্রের মূলোৎপাটনের দাবি
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর ওপর সংঘটিত ভয়াবহ নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও আশঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে।
গত ২৪ ফেব্রুয়ারি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নারী শিক্ষার্থী একই বিশ্ববিদ্যালয়ের আইআইটি বিভাগের ৪৪ ব্যাচের শিক্ষার্থী তরিকুল ইসলামের দ্বারা পাশবিক নির্যাতন ও ধর্ষণের শিকার হন। অভিযোগ অনুযায়ী, ভিক্টিমকে বিভিন্নভাবে হুমকি দিয়ে ইসলামনগরে অভিযুক্তের ভাড়া বাসায় যেতে বাধ্য করা হয়। সেখানে নিয়ে তার হাত-পা-মুখ বেঁধে শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। ভিক্টিমের হাতে ফুটন্ত গরম পানি ঢেলে দেওয়া হয়, যার ফলে তার হাতে থার্ড ডিগ্রি বার্ন হয়। এরপর সেই পোড়া স্থানে সিগারেটের ছ্যাঁকা দেওয়া হয় এবং সেখানে লবণ ও হেক্সিসল ঢালা হয়। ভিক্টিমকে বেল্ট দিয়ে মারধর করা হয়, হাতুড়ি দিয়ে শরীরে আঘাত করা হয়, গলায় ছুরি ধরে হত্যার হুমকি দেওয়া হয় এবং তাকে কিল-ঘুষি ও লাথি মারা হয়। পরবর্তীতে হাত-পা-মুখ বাঁধা অবস্থায় তাকে ধর্ষণ করা হয়।
নির্যাতনের এক পর্যায়ে ভিক্টিমের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে অভিযুক্ত তার ফোন নিয়ে বাইরে থেকে দরজা তালাবদ্ধ করে বাসা থেকে বের হয়ে যায়। এই সুযোগে ভিক্টিম কোনোভাবে নিজেকে মুক্ত করে রুমে থাকা একটি বাটন ফোন দিয়ে ৯৯৯-এ যোগাযোগ করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, ৯৯৯-এ যোগাযোগ করার পর তাকে জানানো হয় যে তৎক্ষণাৎ পাঠানোর মতো কোনো ফোর্স তাদের কাছে নেই। পরে অভিযুক্ত ফিরে এসে দরজা কাটার চেষ্টা করলে ভিক্টিমের চিৎকার শুনে আশেপাশের লোকজন ও ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীরা এগিয়ে এসে তাকে উদ্ধার করে। উদ্ধার হওয়ার প্রায় এক ঘণ্টা পর পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। এ ঘটনায় ভিক্টিম নিজে বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেছেন এবং পুলিশ প্রাথমিক তদন্তে ধর্ষণের আলামত পেয়েছে। তবে ঘটনার ১২ দিন পার হলেও অভিযুক্ত এখনও গ্রেফতার হয়নি।
এই ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভূমিকা গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। প্রথমদিকে প্রশাসন ঘটনাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের এলাকা বলে দায় এড়ানোর চেষ্টা করেছে এবং পরে এটিকে ফৌজদারি মামলা হিসেবে দেখিয়ে প্রশাসনিক পদক্ষেপ বিলম্বিত করে। এমনকি শিক্ষার্থীরা অভিযোগ জানাতে গেলে ‘ওয়ার্কিং আওয়ার’ নয় বলে তাদের ফিরিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
অন্যদিকে, অভিযুক্তের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ভুয়া অনলাইন অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে একটি পিডিএফ প্রচার করা হচ্ছে যেখানে ভিক্টিমের ব্যক্তিগত ছবি ও ঘটনার বিকৃত বর্ণনা ছড়িয়ে তাকে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এর ফলে ভিক্টিমকে স্লাটশেমিং, চরিত্রহনন ও বিভিন্ন ধরনের হুমকির মুখে পড়তে হচ্ছে। ভিক্টিম ও তার পরিবারের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
উল্লেখ্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদ্যমান ‘যৌন নিপীড়ন বিরোধী সেল’ দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর অবস্থায় রয়েছে। বিভিন্ন ধরনের হয়রানি ও নিপীড়নের অভিযোগের দ্রুত ও কার্যকর তদন্ত বা ভিক্টিমকে তাৎক্ষণিক সহায়তা প্রদানের কোনো বাস্তব কাঠামো সেখানে কার্যকর নেই বলে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে অবিলম্বে নিম্নোক্ত দাবি বাস্তবায়নের আহ্বান জানাচ্ছি—
১. অভিযুক্ত তরিকুল ইসলামের দ্রুত গ্রেফতার নিশ্চিত করতে হবে।
২. ভিক্টিমকে পূর্ণাঙ্গ আইনী সহায়তা প্রদান করতে হবে এবং দায়েরকৃত মামলার পরিচালনা ও প্রয়োজনীয় আইনি ব্যয়ের দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে নিতে হবে।
৩. ভিক্টিম ও তার পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং ক্যাম্পাসে ভিক্টিমের নিরাপদ পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।
৪. ভিক্টিমের জন্য অবিলম্বে পেশাদার মানসিক কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।
৫. বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন নিপীড়ন বিরোধী সেলকে অবিলম্বে কার্যকর ও সক্রিয় করতে হবে এবং এ ধরনের ঘটনার দ্রুত তদন্ত ও প্রতিকার নিশ্চিতের ব্যবস্থা নিতে হবে।
৬. ভিক্টিমকে লক্ষ্য করে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া স্লাটশেমিং, চরিত্রহনন, হুমকি এবং ব্যক্তিগত তথ্য ও ছবি প্রচারের মতো সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে অবিলম্বে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে এবং এসব কনটেন্ট অপসারণ নিশ্চিত করতে হবে।
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ধরনের ঘটনার পর প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও অনিরাপদ করে তোলে। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অভিযুক্তের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দায়িত্ব। এই ঘটনায় প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানানো হচ্ছে।
এই ধরনের পাশবিক নির্যাতনকে কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সমাজে ধর্ষণ টিকিয়ে রাখার দায় রাষ্ট্রেরই। যে রাষ্ট্র মানুষের কর্তাসত্ত্বা লঙ্ঘনকারী অপরাধ ধর্ষণের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়, বিচারহীনতার সংস্কৃতি বজায় রাখে এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর নিষ্ক্রিয়তা ও দায়হীনতাকে প্রশ্রয় দেয়—সেই রাষ্ট্র বাস্তবে একটি মারাত্মক নারীবিদ্বেষী, পিতৃৃতান্ত্রিক ও শোষক রাষ্ট্র। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উদাসীনতা, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দায় এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা, এবং দীর্ঘসূত্রিতাপূর্ণ বিচারপ্রক্রিয়া—সব মিলিয়ে এমন একটি কাঠামো তৈরি করে যেখানে ধর্ষকরা নিরাপত্তা পায় এবং ভিক্টিমরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়। এই বাস্তবতায় আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই—যে রাষ্ট্র ধর্ষণ ও নারীর ওপর সহিংসতার এই কাঠামোকে টিকিয়ে রাখে, আমরা সেই নারীবিদ্বেষী ও শোষক রাষ্ট্রব্যবস্থার বিলোপ চাই।