22/12/2025
অবৈধ জাল, অনিরাপদ নৌযান আর অনিশ্চিত জীবনের মাঝেই উপকূলের জেলেরা
সন্দ্বীপে নদী ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষায় মানবিক সেমিনার
বাদল রায় স্বাধীন, সন্দ্বীপ (চট্টগ্রাম):
ভোরের আলো ফোটার আগেই সাগরে নামেন উপকূলের জেলেরা। সঙ্গে থাকে জাল, সামান্য খাবার আর পরিবারের জন্য ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি। কিন্তু সেই ফিরে আসা অনেক সময় আর হয় না। উত্তাল সাগর, হঠাৎ ঝড়, দিকভ্রান্ত নৌকা আর নৌ-যানে জীবনরক্ষাকারী সামগ্রীর অভাব—সব মিলিয়ে প্রতিটি যাত্রাই যেন এক অনিশ্চিত লড়াই।
এই বাস্তবতা থেকেই সন্দ্বীপে নদী ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষার পাশাপাশি জেলেদের জীবন ও জীবিকা সুরক্ষার দাবিতে অনুষ্ঠিত হয়েছে এক মানবিক সেমিনার।
২২ ডিসেম্বর ২০২৫ সন্দ্বীপ উপজেলা পরিষদ সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত “অবৈধ জালের ব্যবহার বন্ধ করে নদী ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষা” শীর্ষক সেমিনারে শুধু পরিবেশ নয়, জেলেদের জীবনসংগ্রামের কথাও উঠে আসে গভীরভাবে।
সোসাইটি ফর ডেভেলপমেন্ট ইনিসিয়েটিভস (এসডিআই) ও কোস্ট ফাউন্ডেশনের পার্টনারশীপে পরিচালিত সিসিআর প্রজেক্ট এর উদ্যোগে ও ক্লাইমেট জাস্টিস রেজিলিয়েন্স ফান্ড (সিজেআরএফ)-এর সহায়তায় অনুষ্ঠিত হয় উক্ত সেমিনার।
সভায় প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মং চিং নু মারমা।সভায় সভাপতিত্ব করেন এসডিআই এর সিনিয়র পরিচালক উন্নয়ন মোঃ আশরাফ হোসেন। সভায় বিষয় ভিত্তিক গবেষনাধর্মী মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিসিআর প্রজেক্টের কমিউনিটি মোবিলাইজার বাদল রায় স্বাধীন।
সভায় বিশেষ অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন -উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মারুফ হাসান, উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মোহসিন আলম, কৃষি ব্যাংকের ব্যবস্থাপক আখতারুজ্জামান সুজন,ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সন্দ্বীপ এলএসডি, হোসেন, মৎস্য অফিসের প্রতিনিধি মঈনুল ইসলাম,ইন্সট্রাকটর ইউআরসি অপুর্ব কুমার সরকার,সন্দ্বীপ প্রেসক্লাবের সভাপতি ডাঃ মোজাম্মেল হোসেন, সহ-সভাপতি ইলিয়াস কামাল বাবু,মাষ্টার ফজলুল করিম বাবুল, কবি ও গীতিকার কাজী শামসুল আহাসান খোকন,এসডিআই সন্দ্বীপ অঞ্চলের আরএম মোঃ ফসিউল আলম, জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা সন্দ্বীপ উপজেলা শাখার সভাপতি ইলিয়াছ সুমন,আবুল কাসেম মহিলা কলেজের শিক্ষক ইসমাঈল ফরিদ,নারী প্রগতির ব্যবস্থাপক মোঃ শামসুদ্দীন,কারিতাসের ব্যবস্থাপক গিয়াস উদ্দীন শরিফ, ব্রাক ম্যানেজার মোঃ মনির উদ্দিন, সাংবাদিক সাইফুল ইসলাম ইনসাফ সহ স্থানীয় সাংবাদিক, জনপ্রতিনিধি, জেলে প্রতিনিধি, সরকারি কর্মকর্তা,সিএসও সদস্য ও সুশীল সমাজের সদস্যরা অংশ গ্রহন করেন।
সেমিনারে বক্তারা বলেন, কারেন্ট জাল ও অন্যান্য নিষিদ্ধ সূক্ষ্ম ফাঁসের জাল নদী ও সাগরের জন্য নীরব ঘাতক। এসব জালে রেণু পোনা থেকে শুরু করে মা মাছ পর্যন্ত ধ্বংস হচ্ছে। ফলে মাছের প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে, ধ্বংস হচ্ছে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য।
তবে বক্তারা এটাও স্পষ্ট করে বলেন—
“অবৈধ জাল ব্যবহার জেলেদের প্রথম পছন্দ নয়। দারিদ্র্য, ঋণ আর বিকল্প আয়ের সুযোগ না থাকাই তাদের এই পথে ঠেলে দিচ্ছে।”
একজন জেলে প্রতিনিধি বলেন,
“আজ জাল বন্ধ করলে কাল আমাদের সংসার চলবে কী দিয়ে—এই প্রশ্নের উত্তর না থাকলে শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না।”
সেমিনারে জোর দিয়ে বলা হয়, অবৈধ জাল বন্ধ করতে হলে জেলেদের জন্য সম্মানজনক বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা করতে হবে।
প্রস্তাবগুলোর মধ্যে ছিল— অভিযান চলাকালীন চাউলের পাশাপাশি নগদ ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা বরাদ্ধ করা, সকল জেলেকে তালিকায় অন্তভুক্তি করা, ত্রুটিপুর্ন তালিকা সংশোধন, মাছ ধরার বিকল্প সময়ে আয় নিশ্চিত করতে প্রশিক্ষণ,সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা,মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণ কার্যক্রম,হাঁস-মুরগি ও গবাদি পশু পালন, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও কারিগরি কাজে সম্পৃক্ত করা।
বক্তারা বলেন, জীবিকা নিশ্চিত না করে জেলেদের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করলে তা মানবিক সংকট তৈরি করবে।
সেমিনারের আরো একটি মানবিক বড় অংশজুড়ে ছিল জেলেদের নিরাপত্তা প্রসঙ্গ। বক্তারা জানান, সন্দ্বীপসহ উপকূলীয় অঞ্চলের অধিকাংশ মাছ ধরার নৌকায় এখনও লাইফ জ্যাকেট,লাইফ বয়া,জিপিএস মেশিন,
রেডিও বা যোগাযোগ ব্যবস্থা,প্রাথমিক চিকিৎসা সামগ্রী
নেই বললেই চলে।ফলে ঝড় বা দুর্ঘটনার সময় জেলেরা দিকভ্রান্ত হয়ে পড়ে, অনেক সময় উদ্ধার কার্যক্রমও বিলম্বিত হয় বা চলেইনা । প্রতিবছর শুধুমাত্র নিরাপত্তা সামগ্রীর অভাবে সাগরে প্রাণ হারান বহু জেলে—যার হিসাব কোনো পরিসংখ্যানে ঠিকভাবে উঠে আসে না।
নৌ-ঘাটে সিগন্যাল বাতির দাবিও জোরালো -সেমিনারে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি উঠে আসে—উপকূলীয় নৌ-ঘাটগুলোতে সিগন্যাল বাতি ও দিকনির্দেশক আলোর ব্যবস্থা।
সে বিষয়ে জেলে প্রতিনিধিরা বলেন-ঘন কুয়াশা ও রাতের আঁধারে নৌকা ভিড়তে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটে,
দিক নির্ণয়ের অভাবে নৌকা চরে আটকে যায় বা ডুবে যায়,সিগন্যাল বাতি থাকলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।এছাড়াও খসকি জালের ডুবানো খুটিতে নৌকা ও ট্রলার দুর্ঘটনার শিকার হয়।
সেমিনারের শেষ পর্যায়ে বক্তারা বলেন, নদী ও সাগরের জীববৈচিত্র্য রক্ষা মানে কেবল মাছ রক্ষা নয়—এটি জেলেদের জীবন রক্ষা।অবৈধ জাল বন্ধ, বিকল্প জীবিকায়ন, নৌ-যানে জীবনরক্ষাকারী সামগ্রী নিশ্চিতকরণ এবং নৌ-ঘাটে সিগন্যাল বাতির ব্যবস্থা—এই চারটি বিষয় একসাথে বাস্তবায়ন না হলে উপকূলীয় মানুষের দুর্ভোগ কমবে না।
বক্তারা সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর, উন্নয়ন সংস্থা ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান জানান।
সেমিনার শেষে অংশগ্রহণকারীরা আশাবাদ ব্যক্ত করেন—এই দাবিগুলো বাস্তবায়িত হলে একদিকে যেমন নদী ও সাগরের প্রাণ ফিরে পাবে, অন্যদিকে তেমনি নিরাপদ হবে উপকূলের হাজারো জেলে পরিবারের জীবন।
Abad Hasan Shamsul Haque Sohelia Naznin Haque Ashraf Hossain S M Milon Miah