08/07/2025
"বুঝলা ভাইগ্না ব্যাটা, সেইটা ছেল চান্নি পসর রাইত। আহারে কি চান্নি। আসমান যেন ফাঁইট্যা টুকরা টুকরা হইয়া গেছে। শইলের লোম দেহা যায় এমুন চান্দের তেজ।‘
আলাউদ্দিন এর বলা এসব কাব্যিক লাইনের চেয়েও বহুগুন সৌন্দর্য যেন আজকের এই চাঁদ।
এমন চান্নি পসর রাইতে আমার ঘুম আসে না।
এই চান্দের আলোতে আমি একলা হাইটা বেরাই।
কাঁকর পথ ধইরা, জমির আইল পার হইয়া কিংবা সরু মেঠোপথ ধইরা, নিঃশব্দে।
বাতাসে হালকা ধানের গন্ধ।দূর থাইকা মাঝে মাঝে এক-দুইটা শিয়াল ডাকে।
আর কোন বাড়ির উঠোন পেরিয়ে গেলে শোনা যায় টিভির আওয়াজ—কার্টুন আর খবরে মিশে যাওয়া এক কোলাহল।
গাছের পাতাগুলা থাইকা আলো টইটই কইরা পড়তেছে।সারা গ্রাম চুপচাপ, যেন সময় থাইমা গেছে।শুধু আমি আর আমার ছায়া, মাটির উপর বয়ে যাই।
হাটতে হাটতে আমি পৌঁছে যাই জোড়া দীঘির পাড়ে।
দীঘি একটাই, তবে নাম "জোড়া দীঘি"।
হয়তো এককালে দুইটা ছিল, তবে ঠিক কোনকাল কেউ কইতে পারে না।
জলের উপর জোৎস্নার ছিটেফোঁটা—মনে হয় কাব্যের নোনা জলরাশি।এর একপাশে ঈদগাহ মাঠ, আর অপর পাশে কালী পূজার মন্দির ও শ্মশান।
বাকিটা নিথুয়া পাথার। এমন পরিবেশে গা ছমছম করে উঠে।শুনছি এককালে দিনের বেলাতেও এ গায়ের লোকজন নাকি এদিকে খুব কম আসত।মায়েরা এই শ্মশান-দীঘির ভুতের ভয় দেখাইয়াই বাচ্চাদের ঘুম পাড়াইত।
এখন আর কেউ ভয় পায় না।শ্মশানের গা ঘেঁষে হিন্দু-মুসলমান মিলায়া নতুন নতুন বাড়ি উঠতেছে। চান্দের আলোয় স্পষ্ট বোঝা যায়।
নিথুয়া পাথারের মাঝখানে একখান স্যালো মেশিন ঘর।
রাতভর সেখানে কিছু লোকের তাসের আড্ডা, গল্পগুজব চলে। আজকেও শব্দ শোনা যাইতেছে।
পুকুরের এক পাড়ের টং-এ ঘুমায় বিজসি পাগলা।
ঠিক পুরোপুরি পাগল সে নয়।আউল-বাউল কিছিমের লোক। বাড়ি আছে, পরিবার আছে,স্ত্রী-লোক আছে কিন্তু সংসারধর্মে তার মন নাই।দুই-এক মাস পরপর নিরুদ্দেশ হইয়া যায়, আবার ফিইরা আসে।এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়ায়, গাজায় দম দেয়।রাত হলে টংপাড়ে এসে ঘুমায়। বিছানা নেই, বালিশ নাই, মশারি নাই—তবু সে ঘুমায়।
তারে মাঝে মধ্যে সংগ দেয়—রাজা মিয়া।
রাজা পাগল নয়।দিনে সে বনে-বাদাড়ে ঘুরে বেড়ায়,মানুষের গাছে উঠে ডাল কেটে দেয়।যে গাছে কেউ উঠতে পারে না, সে অনায়াসে উঠতে পারে। বানরের মত এক গাছ থেকে আারেক গাছে লাফিয়ে বেড়ায়।বিকেলে গরের মাঠে ফুটবল খেলে।শুধু গাজার নেশাটা ছাড়তে পারে না।
এবার দুজন মিলে বেসুরো গলায় গান ধরেছে—
“আমায় ভাসাইলি রে, আমায় ডুবাইলি রে,
অকুল দরিয়ার বুঝি কূল নাই রে।”
সুরটা সুমধুর না হইলেও এতে দরদের কোন অভাব নাই।আমার ভালোই লাগতেছে। মন চাইতেছে আমিও গান ধরি।আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনি।
হঠাৎ কানে আসে এক নারী কণ্ঠের কান্নার আওয়াজ।এ মনে হয় ঘোষালবাবুর বাড়ির বুড়ি চাচীর গলা।ঘোষবাবুর বেশ নামডাক এ গায়ে। দোষের মদ্যে- সামান্য কারণে স্ত্রীকে মারধর করতেন—“তরকারিতে লবণ কম কেন?”
“গরুকে সময়মত পানি খাওয়ানো হয় নাই কেন?”
এমন কত কী তুচ্ছ কারণ ছিল!
লোকে বাবুর নিন্দেও করিত।
আজ কতদিন হইছে ঘোষবাবু গত হইছেন।
হয়তো আজ তার কথা মনে পড়তেই চাচী কাঁদতেছেন। অসাধারান মায়াবতী আার ভালো মানুষ উনি।
একটু পরেই হঠাৎ কোথা হইতে ভেসে আসে এক বাঁশির সুর। শুনছিলাম ওপাড়ার এক লোক ভালো বাঁশি বাজায়।তবে কারও অনুরোধে সে সাধারণত বাজায় না।হয়তো আজকের এই রাতের সৌন্দর্যই তাকে বাধ্য করছে বাশি ধরতে।
বাঁশির সেই করুণ সুর—
জোৎস্না ছুঁয়ে যে হৃদয়ে পৌঁছায়,
সে হৃদয় জানে,এই রাত্রির নিস্তব্ধতায় প্রকৃতির প্রেম কেমন করে স্বর্গলোক ছেড়ে এই মর্ত্যে নামে।
তাই বলি বন্ধু, এমন রাইতে তোমরা বাইরে একটা চক্কর মারো। জীবনরে অনুভব করো... এই রাত্রির নিস্তব্ধতায় জোৎস্নার সাথে গ্রাম বাংলার মানুষ ও প্রকৃতির প্রেম যে কেমন, তা বলা যায় না, শুধু অনুভব করা যায়”