06/08/2026
আগাছা রেখে ভালো ফলনের আশা: শিক্ষকের শাসন বনাম নির্যাতন এবং আমাদের দ্বিমুখী নীতির বেড়াজাল
আমাদের সমাজব্যবস্থায় আজকাল এক অদ্ভুত ও আত্মঘাতী দ্বিমুখী নীতি দেখতে পাওয়া যায়। বিষয়টি দেখলে হাসি পায়, আবার কান্নাও পায়। ঘরের ভেতরে অভিভাবকরা নিজেদের সন্তান একটু এদিক-এদিক কিছু করলেই তো তাদের ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা! তখন হাতের কাছে রুল, লাঠি, বেল্ট কিংবা যা পায় তা দিয়েই সন্তানকে পেটাতে পেটাতে পিঠের চামড়া তুলে ফেলা হয়। তখন সন্তানের প্রতি সেই তথাকথিত মমতা, মানবাধিকার বা মৃদু আচরণের বাতি কোথায় নিভে যায়, তা এক বিশাল রহস্য! ঘরের কোণে বেধড়ক পিটিয়ে যখন সন্তানকে সোজা করা হয়, তখন সমাজ বা মানবাধিকারকর্মীদের টুঁ শব্দটি পর্যন্ত শোনা যায় না।
কিন্তু ঠিক সেই একই সন্তান যখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে কোনো অন্যায় করে, শিক্ষকদের সাথে চরম বেয়াদবি করে, আর শিক্ষক তাকে একটু শাসন বা মৃদু ধমক দেন অমনি তথাকথিত সুশীল সমাজের ঘুম ভেঙে যায়! শুরু হয়ে যায় ফেসবুক লাইভ, মানববন্ধন, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় তুলকালাম কাণ্ড এবং শিক্ষকদের বিরুদ্ধে বহিষ্কারের দাবি। শিক্ষকের শাসনের অধিকার চিরতরে কেড়ে নিয়ে আশা করা হয় যে ছাত্রটি একদম ফেরেশতা হয়ে উঠবে, এসএসসিতে গোল্ডেন জিপিএ-ফাইভ নিয়ে আসবে এবং জাতির এক বিশাল রত্ন হয়ে উঠবে! ভাইরে, জমিতে আগাছা পরিষ্কার না করে, সারাদিন জমি খালের পানিতে ডুবিয়ে রেখে যদি বাম্পার ফলন পাওয়ার আশা করেন, তবে সেই আশাকে বোকামি ছাড়া আর কী বলা চলে?
তবে এখানেই মুদ্রার উল্টো পিঠটাও আমাদের অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দেখতে হবে। শাসনের নামে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয় এবং এটি প্রতিরোধ করাও সময়ের কঠোর দাবি।
শাসন আর নির্যাতন এই দুটির মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত রয়েছে। শাসন হলো একটি সংশোধনী প্রক্রিয়া, যা মালি যেমন গাছের মরা ডাল ছেঁটে দিয়ে তাকে সোজা করে বড় হতে সাহায্য করে, শিক্ষকও ঠিক তেমনি ছাত্রের ভেতরের ভুলত্রুটি ও অহংকার দূর করার জন্য অভিভাবকসুলভ মায়া নিয়ে শাসন করেন। কিন্তু যখন সেই শাসন চরম মাত্রা ছাড়িয়ে পাশবিক নির্যাতনে রূপ নেয়, যখন ক্রোধের বশে একজন ছাত্রের ওপর অমানবিক শারীরিক নির্যাতন চালানো হয় তা কোনোভাবেই শিক্ষকসুলভ আচরণ হতে পারে না।
আজকের যুগে কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, শিক্ষকের নামের কলঙ্ক গায়ে লাগিয়ে কেউ কেউ শিক্ষার্থীদের ওপর মাত্রাতিরিক্ত ও নিষ্ঠুর নির্যাতন চালান। রড দিয়ে পেটানো, অমানবিক উপায়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোদে দাঁড় করিয়ে রাখা বা মানসিকভাবে এমন সব অপমানজনক কথা বলা, যা একটি কোমলমতি শিশুর বা কিশোরের মানসিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেয় এটি কোনোভাবেই শাসন হতে পারে না। এটি সরাসরি অপরাধ এবং ক্ষমতার অপব্যবহার। এই ধরনের নৃশংসতা ও নির্যাতন রোধ করাও আজকের দিনে সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো যদি ভীতি ও ত্রাসের রাজত্বে পরিণত হয়, তবে সেখান থেকে কখনো সুস্থ মনের মানুষ তৈরি হতে পারে না।
সমস্যার মূল শেকড়টি লুকিয়ে আছে আমাদের সামাজিক হিপোক্রেসি বা দ্বিমুখী নীতির মধ্যে। ঘরে বসে অভিভাবকরা নিজেদেরা যখন সন্তানের ওপর নিয়মিত মেজাজ হারান এবং মাত্রাতিরিক্ত মারধর করেন, তখন তাদের কাছে সেটি শাসন বলে মনে হয়। অথচ শিক্ষক যখন ক্লাসের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে বা কোনো গুরুতর অপরাধের কারণে ছাত্রকে একটু কড়া ভাষায় ধমকান বা মৃদু শাসন করেন, তখন অভিভাবক সরাসরি স্কুল চত্বরে গিয়ে লাঠিসোঁটা নিয়ে হাজির হন! এই যে ঘরের শাসনকে বৈধ আর স্কুলের শাসনকে অপরাধ বলে গণ্য করার মানসিকতা, এটি আমাদের পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে পঙ্গু করে দিচ্ছে।
শিক্ষক কি কেবলই সিলেবাস শেষ করার একটা রোবট বা কোডিং করা মেশিন? শিক্ষক মানেই তো অভিভাবক, গাইড এবং গুরুর সর্বোচ্চ আসন। তিনি যেমন পরম যত্নে পিঠে হাত বুলিয়ে আদর করবেন, মায়মতার ছায়ায় ভালোমন্দ শেখাবেন, সহানুভূতি আর শিষ্টাচার পড়াবেন তেমনই বিপথগামী হওয়া থেকে বাঁচাতে প্রয়োজনে কড়া শাসনও করবেন। শাসন ছাড়া তো কচি মনের ভেতরের অহংকার, জেদ আর ময়লা দূর হয় না। মানুষ গড়ার কারিগরদের হাত যদি আজ ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করে বারবার বেড়ি দিয়ে বেঁধে দেওয়া হয়, তবে শিক্ষালয়গুলো এক একটা বিশৃঙ্খল ও বখাটে তৈরির কারখানায় পরিণত হতে বাধ্য।
আমাদের বুঝতে হবে যে, শিক্ষকের ভালোবাসা এবং শাসন উভয়টিরই একটি সুনির্দিষ্ট পরিধি রয়েছে। শাসন প্রয়োজন শিক্ষার্থীর চরিত্র গঠনে, তাকে নিয়মানুবর্তিতা শেখাতে এবং সমাজের একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে। কিন্তু সেই শাসন যেন কোনোভাবেই শিক্ষার্থীর শারীরিক বা মানসিক ক্ষতি না করে।
আজকের দিনে শিক্ষকদের যেমন সচেতন হতে হবে, তেমনি অভিভাবকদেরও বুঝতে হবে যে শিক্ষকের শাসনের উদ্দেশ্য কখনোই ছাত্রকে কষ্ট দেওয়া নয়, বরং তাকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনা। অন্যদিকে, যারা শাসনের আড়ালে নির্যাতন চালায়, তাদের আইনগত ও সামাজিকভাবে প্রতিহত করতে হবে। কিন্তু এর মানে এই নয় যে, ঢালাওভাবে সকল শিক্ষকের শাসনের অধিকার কেড়ে নেওয়া হবে। শিক্ষকদের হাত থেকে যদি শাসনের অধিকার পুরোপুরি কেড়ে নেওয়া হয়, তবে ছাত্ররা হয়ে উঠবে লাগামছাড়া। আর আগাছা যেমন ফসলের ক্ষেত গ্রাস করে ফেলে, তেমনি শাসনহীন ও অনুশাসনহীন প্রজন্ম সমাজকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেবে।
ঘর থেকে শুরু করে শিক্ষাঙ্গন সব জায়গায় এই দ্বিমুখী ও হিপোক্রিট নীতি চলতে থাকলে জাতি হিসেবে আমাদের ধ্বংস হতে বেশি সময় লাগবে না। একদিকে যেমন শিক্ষকদের গায়ে হাত তোলার বা তাদের পবিত্র শাসনের অধিকার কেড়ে নেওয়ার আত্মঘাতী সংস্কৃতির অবসান ঘটাতে হবে, ঠিক তেমনি অন্যদিকে শিক্ষকদের মধ্য থেকেও যেকোনো ধরনের নির্যাতনমূলক ও ক্রূর মানসিকতাকে চিরতরে দূর করতে হবে।
শাসন এবং মায়ার সুষম সমন্বয়েই কেবল একটি আদর্শ প্রজন্ম গড়ে উঠতে পারে। আগাছা বাঁচিয়ে রেখে যেমন ভালো ফসলের আশা করা যায় না, তেমনি অন্ধ অনুশাসনহীনতা বা নির্যাতন কোনোটিই শিক্ষার বা জাতির জন্য মঙ্গল বয়ে আনতে পারে না। আসুন, আমরা একটি ভারসাম্যপূর্ণ, কল্যাণমুখী ও সুন্দর শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলি, যেখানে শিক্ষক হবেন প্রকৃত মূর্তমান অভিভাবক এবং শিক্ষার্থীরা হবে দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ।
— আব্দুর রহিম আহমাদ
পরিচালক ও প্রধান শিক্ষক, মারকাযুল ইসলাহ্ ইন্টারন্যাশনাল ক্যাডেট মাদরাসা, গংগাচড়া, রংপুর।
#শিক্ষক_ও_শাসন #নির_প্রতিরোধ #নৈতিক_শিক্ষা #শিক্ষাব্যবস্থা #দ্বিমুখী_নীতি #বাস্তবতা