08/08/2025
২০২৫ সালের ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের ধারনাপত্রের বাংলা অনুবাদ-
মূল প্রতিপাদ্য: আদিবাসী জনগণ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI): অধিকার রক্ষা, ভবিষ্যৎ গঠন
(*) ভূমিকা:
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) আমাদের পৃথিবীকে দ্রুত বদলে দিচ্ছে। সেইসাথে আমাদের জীবনযাপন, কাজের ধরন এবং যোগাযোগের ভঙ্গি পাল্টে দিয়েছে। এটি শিক্ষাব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা ও কৃষিক্ষেত্রেও অভূতপূর্ব উন্নতি ঘটিয়েছে।
তবে AI-এর সুবিধার সঙ্গে কিছু বড় ঝুঁকিও রয়েছে, বিশেষ করে আদিবাসী সম্প্রদায়ের জন্য।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ২০২৪ সালের প্রস্তাব A/RES/78/265 এ বলা হয়েছে, AI ব্যবস্থাপনার পুরো চক্রজুড়ে মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতা সম্মান, সুরক্ষা ও প্রচার করতে হবে।
আদিবাসীদের অধিকার রক্ষা ছাড়া AI-র ইতিবাচক সম্ভাবনা বাস্তবায়ন সম্ভব নয় এবং তা পুরনো ক্ষতিকর ধারাগুলো অব্যাহত রাখতে পারে।
যদি সতর্কতামূলক পদক্ষেপ না গ্রহণ করা হয় তবে AI-র সুফল বৈষম্যহীনভাবে বণ্টিত না হয়ে ডিজিটাল বৈষম্য আরও বাড়াতে পারে এবং ঔপনিবেশিক ও সাম্রাজ্যবাদি চরিত্র বজায় রাখতে পারে।
(*) শাসনব্যবস্থা, অধিকার এবং অন্তর্ভুক্তির প্রশ্ন:
আদিবাসী জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণ, ভূমি, অঞ্চল, সম্পদ, ভাষা এবং অবাধ, অগ্রাধিকার ও অবহিত সম্মতির (FPIC- the right to free, prior, and informed consent ) অধিকার আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃত। AI-র উন্নয়ন, বাস্তবায়ন এবং ব্যবস্থাপনা এই অধিকারগুলোর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। এই অধিকারগুলো রক্ষা করা খুবই জরুরি, যাতে AI দ্বারা অতীতে যেসব বৈষম্য, বঞ্চনা ও কুক্ষিগতকরণের যেসব ঘটনা ঘটেছে সেগুলোর যেন আর পুনরাবৃত্তি না ঘটে।
আদিবাসীরা বহুদিন ধরেই তাদের তথ্যের সার্বভৌমত্বের (Data Sovereignty) জন্য লড়াই করছে—অর্থাৎ নিজেদের ডাটা বা তথ্যের ওপর অধিকার, নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যবস্থাপনার দাবী জানিয়ে আসছে।
FPIC দ্বারা নিশ্চিত করতে হবে যাতে আদিবাসী জনগণ তাদের তথ্য কীভাবে ব্যবহৃত ও বিতরণ করা হবে তা সম্পূর্ণরূপে অবগত থেকে স্বজ্ঞানে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে, বিশেষত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবস্থাপনায়।
যেসব প্রতিষ্ঠান বা ডেভেলপার আদিবাসী জনগণের তথ্য, জ্ঞান বা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ব্যবহার করছে, তাদেরকে এই সম্মতি নিশ্চিত করতে হবে।
বর্তমানে AI নির্মাণ ও উন্নয়ন বিষয়ক সিদ্ধান্ত গ্রহণের নেতৃত্ব দিচ্ছে শক্তিধর রাষ্ট্রের সরকারগুলো এবং মাইক্রোসফট, গুগল, অ্যামাজনের মতো বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো। তবে এসমস্ত ক্ষেত্রে আদিবাসী জনগণের প্রতিনিধিত্ব নেই বললেই চলে। ফলে তাদের তথ্য, জ্ঞান, ছবি বা পরিচিতি AI মাধ্যমে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে FPIC মেনে চলা হয় না।
AI নীতিমালা তৈরিতে আদিবাসীদের অর্থবহ অংশগ্রহণ না থাকলে তাদের অধিকার সুরক্ষিত রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে। UNESCO’র AI-এর নৈতিকতা বিষয়ক সুপারিশ (Recommendation on the Ethics of Artificial Intelligence) এবং গ্লোবাল ডিজিটাল কম্প্যাক্ট AI প্লাটফর্মে অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। সেইসাথে জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক স্থায়ী ফোরামের ২৪তম অধিবেশনেও এই অন্তর্ভুক্তির সুপারিশ করা হয়েছে।
এটি অত্যন্ত জরুরি যে, AI আদিবাসীদের প্রয়োজন ও আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী যেন কাজ করতে পারে এবং নতুন কোন ক্ষতির কারণ না হয়ে ওঠে।
(*) কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার শোষণমুখী প্রকৃতি, পরিবেশগত প্রভাব এবং অন্যান্য চ্যালেঞ্জ:
AI প্রযুক্তি গড়ে তোলা হয় বিপুল পরিমাণ অনলাইন ডেটার উপর ভিত্তি করে। যখন আদিবাসী ভাষা, জ্ঞান, এবং সাংস্কৃতিক উপাদান এসব ডেটাসেটে স্বচ্ছতা ছাড়া এবং আদিবাসীদের অবাধ, অগ্রাধিকার, অবহিত সম্মতি (FPIC- the right to free, prior, and informed consent ) ছাড়া অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তখন তা বহু পুরনো শোষণ ও কুক্ষিগতকরণের ধারা বজায় রাখে, যার বিরুদ্ধে আদিবাসীরা বহুদিন ধরে সংগ্রাম করে আসছে।
AI মডেলগুলো যেসব তথ্য দিয়ে প্রশিক্ষিত হয়, তাতে প্রায়শই আদিবাসী জনগণের জ্ঞান ও কণ্ঠ উপেক্ষিত হয় বা ভুলভাবে উপস্থাপিত হয়। এছাড়া, AI অ্যালগরিদম নির্মাণকারীদের দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা প্রভাবিত হয়, যার ফলে সেসব মডেল বিদ্যমান বৈষম্যগুলোকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।
উদাহরণস্বরূপ, বায়োমেট্রিক ও মুখ শনাক্তকরণ (Face Detection) প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান ব্যবহারে আদিবাসীদের ভুল শনাক্তকরণ বা প্রোফাইলিংয়ের সম্ভাবনা বাড়ছে।
এছাড়াও AI ব্যবস্থাগুলোর জন্য বিশাল তথ্যকেন্দ্র প্রয়োজন, যেখানে বিপুল পরিমাণে বিদ্যুতের ব্যবহার করা হয়, কুলিংয়ের জন্য প্রচুর পানি প্রয়োজন হয় এবং যন্ত্রপাতি তৈরিতে দুষ্প্রাপ্য খনিজ প্রয়োজন। এই তথ্যকেন্দ্র যদি আদিবাসীদের ভূখণ্ডের কাছাকাছি নির্মিত হয়, তবে তা পানি সংকট, পরিবেশ দূষণ ও জীববৈচিত্র্যের অপূরণীয় ক্ষতিসাধন করে আদিবাসীদের জীবনধারায় প্রভাব ফেলবে।
তথ্যকেন্দ্র ও প্রয়োজনীয় ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ তৈরিতে যে কাঁচামাল ও বিরল খনিজ লাগে, তা উত্তোলন করতে গিয়ে অনেক সময় আদিবাসীদের জমি বেদখল হয়, পরিবেশ নষ্ট ও জীবিকা হারানোর মতো ঘটনা ঘটে এবং তাদের স্বাস্থ্য ও সাংস্কৃতিক-আধ্যাত্মিক বন্ধন বিপন্ন হয়ে পড়ে।
উদাহরণস্বরূপ, চিলির উত্তরে আদিবাসী আতাকামেনো জনগণ AI-চালিত খনিজ খনন প্রকল্পের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছে। সেখানে লিথিয়াম ও কপার উত্তোলনের মাধ্যমে তাদের ঐতিহ্যগত ভূমি ও জলাধারগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এসব খননকার্য AI ব্যবহার করে আরও দক্ষভাবে পরিচালিত হচ্ছে কিন্তু এতে আদিবাসীদের অধিকারও লঙ্ঘন হচ্ছে ।
AI তথ্যকেন্দ্র থেকে যে ইলেকট্রনিক বর্জ্য (e-waste) তৈরি হয়, তাতে পারদ ও সীসার মতো বিষাক্ত পদার্থ থাকে। পরিত্যক্ত ই-বর্জ্যের কারণে এইসব বিষাক্ত পদার্থ আদিবাসীদের জমিতে ছড়িয়ে পড়লে তারা স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে পড়ে, বিশেষ করে আদিবাসী নারীরা এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
(*) অধিকারভিত্তিক উদ্ভাবন ও আদিবাসী নেতৃত্বের মাধ্যমে সম্ভাবনা:
এতোসব চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও, আদিবাসীদের নেতৃত্ব ও সৃজনশীলতা AI-তে নতুন সম্ভাবনার পথ দেখাচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় অনেক আদিবাসী গোষ্ঠী ইতিমধ্যে নিজেদের সংস্কৃতি, ভাষা ও জীবনধারার সঙ্গে মানানসইভাবে AI ব্যবহার শুরু করেছে।
AI হতে পারে প্রজন্মান্তরের জ্ঞান আদান-প্রদানের মাধ্যম এবং আদিবাসী তরুণদের ক্ষমতায়নের শক্তিশালী উপায়। এর সাহায্যে নিজেদের সংস্কৃতি, ভাষা ও পরিচয় সংরক্ষণ এবং পুনরুজ্জীবনের নতুন নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
তবে এখনো এমন কোনো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি, যা প্রযুক্তিগত উদ্যোগকে আদিবাসীদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে মিলিয়ে সহায়তা দিতে পারে। তাই Green Climate Fund-এর মতো আন্তর্জাতিক তহবিলগুলোতে AI ও আদিবাসীদের জন্য আলাদা সহায়তা বরাদ্দ রাখা খুবই দরকার।
AI আদিবাসী ভাষাগুলোর পুনরুজ্জীবনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা—বিশেষত যেসব ভাষা বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। AI ব্যবহার করে এসব ভাষার ডকুমেন্টেশন করা, নতুন কনটেন্ট তৈরি এবং ব্যবহারিক তথ্য সহজলভ্য করে ভাষা রক্ষা করা সম্ভব।
একইভাবে, আদিবাসী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও AI গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে—যদি তা সংশ্লিষ্ট জনগণের সম্মতি নিয়ে হয়।
(*) বিশ্বজুড়ে এ ধরণের বিভিন্ন উদাহরণ রয়েছে, যেমন:
- পলিনেশিয়ায়, আদিবাসী নেতৃত্বাধীন প্রবালপ্রাচীর সংরক্ষণ প্রকল্পে সমুদ্রজ জীববৈচিত্র্য পর্যবেক্ষণে AI ব্যবহৃত হচ্ছে ।
- ইনুইট অঞ্চলে, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে আদিবাসী জ্ঞানের সঙ্গে AI-র সমন্বয়ে মডেল তৈরি হচ্ছে ।
- Natives Rising-এর মতো প্রকল্পে AI ব্যবহার হচ্ছে মানসিক সুস্থতা, ভাষা পুনরুজ্জীবন ও ডিজিটাল সার্বভৌমত্বে;
- নিউজিল্যান্ডে, Te Hiku Media AI এবং প্রাকৃতিক ভাষা প্রক্রিয়াকরণ টুল ব্যবহার করে মাওরি ভাষা পুনরুজ্জীবনে কাজ করছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) ইতিবাচক সম্ভাবনাগুলোকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে হলে, আদিবাসী জনগণের নেতৃত্বে সাংস্কৃতিকভিত্তিক ডিজিটাল টুল ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনে বিনিয়োগ করা জরুরি। তবে শুধু প্রযুক্তিকে উন্নত করলেই হবে না, তা যেন আদিবাসীদের ভাষা, সংস্কৃতি ও জীবনবোধের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হয়, সেটাও নিশ্চিত করতে হবে।
আদিবাসীরা শুধু AI-র ব্যবহারকারী নয়, তারা সহ-স্রষ্টা, সিদ্ধান্তগ্রাহী এবং অধিকারভোগী। তাই AI-র উন্নয়ন, বাস্তবায়ন ও ব্যবস্থাপনায় তাদের অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতেই হবে।
কন্সেপ্ট নোট অনুবাদে,
সমর এম সরেন
আদিবাসী ভাষা প্রযুক্তিবিদ, Friends of Endangered Ethnic Languages (FEEL), এবং
গ্লোবাল টাস্কফোর্স প্রতিনিধি, ডিজিটাল ইকুয়ালিটি অ্যান্ড ডোমেইনস, আইডিআইএল, ইউনেস্কো
জাতিসংঘের ধারণাপত্রটি ডাউনলোড করুন এখান থেকে-https://social.desa.un.org/sites/default/files/IDWIP%202025%20Concept%20Note%20FINAL.pdf