30/03/2026
বাংলাদেশের ইতিহাসে যে কয়টি নাম চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে, তার মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমানের নামটি সবার আগে আসে। কারণটা সহজ। হাজার বছর ধরে বাঙালি জাতি এই ভূখণ্ডে বাস করেছে, কিন্তু কোনো স্বাধীন রাষ্ট্র তাদের ছিল না। সেই অসম্ভব কাজটি একজন মানুষ করেছিলেন, মাত্র বাইশ বছরের কম সময়ের মধ্যে, একক নেতৃত্বে। বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে এর দ্বিতীয় কোনো নজির নেই। শেখ মুজিব শুধু একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন না, তিনি ছিলেন একটি জাতির স্বপ্নের রূপকার। আওয়ামী লীগ সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার দল।
বাবার অসমাপ্ত কাজ মেয়ে শেষ করবেন, এটা যেন ভাগ্যেই লেখা ছিল। শেখ হাসিনা যখন বারবার ক্ষমতায় এসেছেন, প্রতিবারই বাংলাদেশ একটু একটু করে সামনে এগিয়েছে। যে দেশকে একসময় তলাবিহীন ঝুড়ি বলে তুচ্ছ করা হতো, সেই দেশ একদিন উন্নয়নের রোল মডেল হয়ে উঠেছিল। কথাটা বাংলাদেশের মানুষ বলেনি, বলেছে বিশ্বের সেই মহল, যারা একদিন ঠিক এই কথাটাই বলেছিল। করোনা মহামারির সময় গোটা পৃথিবী যখন হাঁটু মুড়ে বসে পড়েছিল, শেখ হাসিনার সিদ্ধান্ত আর সাহসী পদক্ষেপ বাংলাদেশকে সেই ভয়াবহ পরিস্থিতিতেও টিকিয়ে রেখেছিল। এটা নেতৃত্বের কথা, শুধু রাজনীতির কথা না। পদ্মা সেতু নিজের টাকায় বানানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় যারা হাসাহাসি করেছিল, তারা পরে কী বলেছিল, সেটা দেশের মানুষ ভোলেনি।
এরপর এলো সেই কালো অধ্যায়। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে যা ঘটেছে, সেটাকে যারা আন্দোলন বলে চালাতে চেয়েছে, তারা সত্যিটা আড়াল করেছে। বিদেশি অর্থ, ইসলামপন্থী জঙ্গি সংগঠনের সক্রিয় ভূমিকা আর সামরিক বাহিনীর নীরব সম্মতিতে একটি নির্বাচিত সরকারকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সুদী মহাজন ইউনুস ক্ষমতায় বসেছিলেন জনগণের কোনো রায় ছাড়াই। তার তথাকথিত সরকার যা করেছে, তা হলো শেখ হাসিনার আমলে তিল তিল করে গড়ে ওঠা অর্জনগুলো একে একে মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া।
এখন মার্চ ২০২৬। ইউনুস বিদায় নিয়েছেন। কিন্তু যারা ভেবেছিলেন এরপর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে, তারা ভুল ভেবেছিলেন। ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখে যে নির্বাচন হয়েছে, সেটা নিয়ে দেশের মানুষের মনে প্রশ্ন থাকাটাই স্বাভাবিক। প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলকে বাইরে রেখে, জনগণের বয়কটের মুখে, নিজেরা নিজেদের জন্য একটা ভোটের মঞ্চ সাজানো হয়েছে। এটাকে গণতন্ত্র বলে মানতে রাজি নয় অনেকেই। আর ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে যে বিএনপি ক্ষমতায় বসেছে, তাদের ইতিহাসটা নতুন করে বলার দরকার নেই।
জিয়াউর রহমান যে দলটি তৈরি করেছিলেন সেনানিবাসে বসে, সেই দলের জন্মের গল্পটাই বলে দেয় দলটির চরিত্র কেমন। ক্যান্টনমেন্টের ছায়ায় জন্ম নেওয়া দল কখনো মাটির কাছের রাজনীতি করতে পারে না। আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিএনপির পার্থক্য এখানেই। একটি দলের জন্ম হয়েছে মানুষের লড়াই থেকে, অন্যটির জন্ম হয়েছে ক্ষমতার অলিন্দে। বিএনপির শাসনের ইতিহাস ঘাঁটলে দুর্নীতি আর সন্ত্রাসের যে চিত্র পাওয়া যায়, সেটা কোনো বিরোধী দলের প্রচারণা না, সেটা রেকর্ডেড ইতিহাস।
এখন ক্ষমতায় বসেই এই সরকার যা করছে, তাতে স্পষ্ট যে শেখ হাসিনার আমলে যা হয়েছে, তার সবকিছুকেই ভুল প্রমাণ করাটাই যেন এদের একমাত্র লক্ষ্য। উন্নয়নের ধারাকে থামিয়ে দেওয়া, যে প্রকল্পগুলো চলছিল সেগুলো বাদ দেওয়া, আর জনগণের জীবনকে আরেকটু কঠিন করে তোলা। একটা দেশের সাধারণ মানুষ রোজ যখন জীবন চালাতে গিয়ে কষ্ট পায়, তখন কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য তাদের পেট ভরায় না। কিন্তু যারা ক্ষমতায় বসেছে, তাদের সেই চিন্তাটা কখনো ছিল বলে মনে হয় না।
বাংলাদেশ আর আওয়ামী লীগকে আলাদা করা সত্যিই কঠিন। এই দেশটার জন্মই হয়েছে আওয়ামী লীগের হাত ধরে। যে দল একটা জাতিকে স্বাধীনতা দিতে পারে, সেই দলের বিরুদ্ধে যারা ক্ষমতা নিয়েছে, তাদের কাছ থেকে দেশের মানুষ কী পাবে, সেটা বুঝতে রাজনীতির গভীর জ্ঞান লাগে না। সেনানিবাসে সেনাবাহিনীর কোলে জন্ম নেয়া সেই দলের কাছে সাধারণ মানুষের কষ্ট কখনো বোধগম্য হওয়ার কথা না। এটা তাদের রাজনীতির ভাষায় নেই। দুর্নীতি আর সন্ত্রাস এই দলের শিরায় শিরায়। ক্ষমতায় এলে এরা কী করে সেটা বাংলাদেশের মানুষ আগেও দেখেছে। এখনো দেখছে। এই পাতানো নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা সরকারের তথাকথিত মন্ত্রী পরিষদ মূলত একটা নামসর্বস্ব কাঠামো, যাদের না আছে জনগণের কাছে জবাবদিহি, না আছে বৈধতা।