Chittagong Hill Tracts Writers' Union

Chittagong Hill Tracts Writers' Union Contact information, map and directions, contact form, opening hours, services, ratings, photos, videos and announcements from Chittagong Hill Tracts Writers' Union, Community Organization, Banarupa, Rangamati.

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী বাবু দীপেন দেওয়ান মহোদয়কে চিটাগং হিল ট্রাক্টস রাইটার্স ইউনিয়ন-এর পক...
02/03/2026

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী বাবু দীপেন দেওয়ান মহোদয়কে চিটাগং হিল ট্রাক্টস রাইটার্স ইউনিয়ন-এর পক্ষ থেকে উষ্ণ অভিনন্দন ও ফুলেল শুভেচ্ছা। অশেষ শ্রদ্ধা ও ধন্যবাদ মাননীয় মন্ত্রী আমাদেরকে আপনার মূল্যবান সময় প্রদানের জন্য। শুভকামনা নিরন্তর মাননীয় মন্ত্রী।

পাহাড়ের বরেণ্য লেখক মিজ ইলিরা দেওয়ান জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সদস্য হিসেবে নিয়োগ পাওয়ায় চিটাগং হিল ট্রাক্টস রাইটার্স ইউন...
08/02/2026

পাহাড়ের বরেণ্য লেখক মিজ ইলিরা দেওয়ান জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সদস্য হিসেবে নিয়োগ পাওয়ায় চিটাগং হিল ট্রাক্টস রাইটার্স ইউনিয়ন এর পক্ষ থেকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।

‎বিপম চাকমার গ্রহণ লাগা ভোর উপন্যাসের ইতিহাস চেতনা ও  শিল্পসৌন্দর্য-‎আরফান হাবিব‎---------------------------------------...
03/02/2026

‎বিপম চাকমার গ্রহণ লাগা ভোর উপন্যাসের ইতিহাস চেতনা ও শিল্পসৌন্দর্য
-‎আরফান হাবিব
‎------------------------------------------------
‎বাংলা সাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বহু রচনা আছে, কিন্তু সব রচনাই মূলত সমতলের মানুষের অভিজ্ঞতাকে সামনে আনে। পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ, বিশেষ করে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা প্রভৃতি আদিবাসীর ইতিহাস ও অভিজ্ঞতা খুব কমই মূলধারার সাহিত্যে স্থান পেয়েছে। সেই শূন্যতা পূরণ করার প্রয়াস পাওয়া যায় বিপম চাকমার(জন্ম: ১৯৭৮) লেখা ‘গ্রহণ লাগা ভোর’ উপন্যাসে। এটি কেবল মুক্তিযুদ্ধের গল্প নয়, বরং মুক্তিযুদ্ধের সময় পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের ভেতরকার টানাপোড়েন, দ্বন্দ্ব, আতঙ্ক ও সংগ্রামের কাহিনি। শিরোনামেই আছে এক গভীর প্রতীকী অর্থ-‘ভোর’ মানে স্বাধীনতার সূচনা, আর ‘গ্রহণ’ মানে সেই সূচনার ভেতরে অন্ধকার ও ধ্বংসের ছায়া। ফলে শিরোনাম থেকেই বোঝা যায় উপন্যাসটি কেবল আশার কাহিনি নয়, বরং আশার ভেতরে লুকানো হতাশার গল্পও।
‎উপন্যাসের পটভূমি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়। সমতলে মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে, অন্যদিকে পাহাড়ে সেই যুদ্ধের রূপ ভিন্ন। পাহাড়ি মানুষরা পাকিস্তানি সেনাদের দমননীতি, চাকমা রাজনীতির দ্বন্দ্ব এবং মিজো ও তিব্বতি বাহিনীর উপস্থিতির মধ্যে আটকে পড়ে। মুক্তিযুদ্ধের সময় পার্বত্য চট্টগ্রাম হয়ে ওঠে বহিরাগত শক্তির খেলার মঞ্চ। এই জটিল বাস্তবতা বিপম চাকমা উপন্যাসে তুলে ধরেছেন, যা ইতিহাসের দলিল হয়েও ওঠে।

‎জগদীশ এ উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র। উপন্যাসের পৃষ্ঠাজুড়ে স্থান পেয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের জগদীশদের তথা প্রান্তিক আদিবাসীদের অবস্থা, অবস্থান এবং ইতিহাসের বয়ান। উপন্যাসের প্রথমেই মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই বিভিন্ন প্রান্তিক আদিবাসীদের প্রতি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির বৈরী মনোভাব এবং মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়ার অনুমোদন না দেয়া ; অবশেষে এ আদিবাসীরা স্বাধীন দেশে আবার পরাধীন হয়। নিজদেশে পরবাসীর মতো ভয়াবহ আচরণ পায়। বিজয়ের প্রাক্কালেই পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন আদিবাসীদের উপর নেমে আসে সহিংসতা। ভোরের আলোতেই গ্রহণ লাগে। এ গ্রহণের উদাহরণের মধ্যেই এ উপন্যাসের সমাপ্তি। জগদীশ শিক্ষিত হলেও মাছ ধরা, জুমের অভিজ্ঞতাসহ পাহাড়ের যাপিত জীবনের সব ধরণের কাজেই অভ্যস্ত।

‎চরিত্রগুলো উপন্যাসের প্রাণ। এখানে আছে স্থানীয় কৃষক, জেলে, জুম চাষির মতো সাধারণ মানুষ, যারা ধীরে ধীরে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে দাঁড়ায়। তারা কোনো সংগঠিত বাহিনী নয়, বরং জীবন ও অস্তিত্বের তাগিদে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। তাদের সাহস, ভয় এবং আত্মত্যাগ পাঠককে আন্দোলিত করে। চাকমা রাজ পরিবারের চরিত্রগুলো উপন্যাসে দ্বন্দ্বার্থক অবস্থানের প্রতীক। একদিকে পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে সমঝোতা করতে চাওয়া, অন্যদিকে প্রজাদের রক্ষা করতে চাওয়ার দ্বন্দ্ব-রাজপরিবার হয়ে ওঠে সংকটের প্রতীক। নারী চরিত্রগুলো উপন্যাসে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পাহাড়ি নারীরা শুধু পরিবারের সুরক্ষায় নয়, যুদ্ধের সহায়তাতেও ভূমিকা রাখে। তাদের সহনশীলতা, সাহস এবং নীরব ত্যাগ পাঠককে গভীরভাবে নাড়া দেয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় জগদীশদের বাড়িতে সাময়িকভাবে আশ্রয় নেয়া বাঙালি হিন্দু পরিবারের মেয়ে ‘‘অরুণিমাকে দেখে জগদীশের মনে ফাগুন হাওয়া বয়ে গেল এটাই সত্য।’’ (পৃ. ১৫) কথা কম বলতে অভ্যস্ত জগদীশের প্রেমিকা হয়ে উঠতে পারেনি অরুণিমা। কেন পারেনি? আমরা দেখি-
‎‘‘বৃষ্টি আর কাদাজলের সাথে লড়াই করতে করতে শরণার্থীর দল এগিয়ে চলেছিল মন্থর গতিতে। জগদীশ সবার পেছনে থেকে এগিয়ে যাচ্ছে অরুণিমার সাথে লুকোচুরি খেলতে খেলতে। ভেসে চলা মেঘ যেমন করে তুমি-আমি, আমি-তুমি করতে করতে দিন পার করে দেয়।’’ ( পৃ. ৫১)
‎উপন্যাসে কেন্দ্রীয় চরিত্র জগদীশ মুক্তিযুদ্ধের প্রথম থেকেই নিজের দেশপ্রেম নিয়ে দৃঢ় সিদ্ধান্তে অনড় ছিলেন। তবে পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমাসহ অন্যান্য আদিবাসীদের অনেকের মধ্যেই দোলাচল ছিল। মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে জগদীশ কটাক্ষের শিকার হয়েছে । কিন্তু যুদ্ধে সে সাহসের সাথে অংশগ্রহণ করে। আমরা দেখি-
‎‘‘নভেম্বরের শেষ, ডিসেম্বরের শুরু। তিন দিন আগে পূর্ণিমা চলে গেছে। রাত নয়-দশটার দিকে চাঁদ উঠতে পারে। চাঁদ উঠলে চারদিক মোটামুটি আলোকিত হয়ে যাবে। তার আগেই অপারেশন শেষ করতে হবে। অপারেশনের মেয়াদ ধরা হয়েছে সর্বোচ্চ এক ঘণ্টা। অথবা গ্রেনেড বিস্ফোরণের পর সর্বোচ্চ দশ মিনিটের মধ্যে উইড্র করে চলে আসতে হবে।’’ ( পৃ. ৭২ )
‎পাশাপাশি শরনার্থী হয়ে ভারতে চলে যাওয়া অরুণিমার কথাও জগদীশের খুব মনেপড়ে। আমরা দেখি-
‎‘‘তার মনে পড়ল, অরুণিমাদের কথা। এখন তারা কোথায়? তারা কি দেশে ফিরবে? ফিরলে কবে? আদৌ বেঁচে আছে তো? নাকি শরণার্থী শিবিরে লাগা মড়কের ডায়রিয়া, কলেরার মরণ থাবা তাদেরকেও ছোবল দিয়ে দুনিয়া থেকে ছিনিয়ে নিয়ে গেছে? ’’( পৃ.৭৬ )
‎শেষ পর্যন্ত অরুণিমা পাঠকের কাছে স¥ৃতি হয়ে যায়। পার্শ্বচরিত্রগুলোর মধ্যে মিজো ও তিব্বতি সেনারা রয়েছে, যারা বাইরের শক্তির প্রতীক। কখনো তারা স্থানীয়দের আতঙ্কিত করে, কখনো বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। পাক সেনারা উপন্যাসে ধ্বংস, দমননীতি এবং নির্মম হত্যাযজ্ঞের প্রতীক। অন্যদিকে বৃদ্ধ বৈদ্য, শিকারি, লোকচিকিৎসক ইত্যাদি চরিত্র পাহাড়ি সংস্কৃতির জীবন্ত রূপ তুলে ধরে। এভাবে মূল ও পার্শ্বচরিত্র মিলে এক বহুমাত্রিক চিত্র রচিত হয়েছে, যা পাঠককে একদিকে বাস্তব অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করে, অন্যদিকে প্রতীকী ব্যঞ্জনাও সৃষ্টি করে। যা অনন্য এক শিল্প সৌন্দর্য সৃষ্টি করে।

‎ভাষার দিক থেকে ‘গ্রহণ লাগা ভোর’ অত্যন্ত বৈচিত্রময়। এটি একদিকে সাহিত্যিক বাংলা, অন্যদিকে চাকমা ও পাহাড়ি ও চট্টগ্রমের আঞ্চলিক শব্দের সংমিশ্রণ। উদাহরণস্বরূপ-‘জুম চাষ’, ‘রাজগোখরো’, ‘পানছড়ি’, ‘বৌদ্ধ আচার’ ইত্যাদি শব্দ কেবল আঞ্চলিক বাস্তবতাই প্রকাশ করে না, বরং পাঠককে পাহাড়ি জীবনের ভেতরে নিয়ে যায়। সংলাপগুলোতেও আঞ্চলিক স্বাদ আছে, যা চরিত্রকে বাস্তবসম্মত করে তোলে। লেখক এখানে ভাষাতাত্ত্বিকভাবে দুটি স্তরের ব্যবহার করেছেন-একটি হলো সাহিত্যিক বাংলা, অন্যটি হলো লোকজ ও আঞ্চলিক শব্দের মিশ্রণ। এই দ্বিস্তরীয় ভাষা পাঠককে একদিকে সাহিত্যিক স্বাদ দেয়, অন্যদিকে স্থানিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করে।

‎শব্দচয়নেও লক্ষ্য করা যায় লোকজ ও প্রাকৃতিক উপাদানের আধিক্য। পাহাড়, নদী, জঙ্গল, পশুপাখি সম্পর্কিত শব্দ বারবার এসেছে, যা প্রকৃতির সঙ্গে পাহাড়ি মানুষের গভীর সম্পর্ককে তুলে ধরে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক শব্দ-যেমন মুক্তিযুদ্ধ, পাক সেনা, স্বাধীনতা, রক্তক্ষয়-উপন্যাসকে ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করেছে। বাক্যরীতিতে লেখক সহজ, সরল ও প্রাণবন্ত ভঙ্গি বজায় রেখেছেন। ফলে পাঠক দৃশ্যগুলো চোখের সামনে কল্পনা করতে পারেন।

‎অলংকার ব্যবহারে লেখক দক্ষ। প্রতীকের ব্যবহার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। ‘গ্রহণ’ প্রতীক ধ্বংস ও অন্ধকারের; ‘ভোর’ প্রতীক নতুন সূচনা ও আশার। এই প্রতীকী সংঘাতেই উপন্যাসের মূল বক্তব্য নিহিত। পাশাপাশি প্রকৃতি, নদী, পাহাড়কে নানা রূপকে ব্যবহার করা হয়েছে। কখনো পাহাড়কে মায়ের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে, নদীকে জীবনের স্রোতের প্রতীক হিসেবে দেখানো হয়েছে। চিত্রকল্পও সমৃদ্ধ-আগুনে জ্বলতে থাকা গ্রাম, রক্তে রাঙা নদী, অন্ধকারে দৌড়ানো মানুষ-এসব দৃশ্য পাঠককে তীব্র আবেগে আচ্ছন্ন করে। আদিবাসীরা প্রকৃতিকে লালনপালন করতে জানে। ছোট ও ডিমওয়ালা মাছ জালে ধরা পড়লেও ছেড়ে দেয়।

‎“জু জু মা গঙ্গা দেবী এবার এদের ছেড়ে দিলাম। এরা আমার জন্য বাচ্চা দেবে। বড় হলে এদের আমার জালেই উঠিয়ে দিস।” (পৃ. ১০)।

‎লোকজ চিকিৎসা ব্যবস্থা ও বৈদ্য বা ওঝায় চরম বিশ্বাসের চিত্র লেখক যেন আস্থার সাথে ফুটিয়ে তুলেছেন, যা আদিবাসী জীবন যাপনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। লোকজ জীবন এ উপন্যাসে চমৎকারভাবে প্রকাশিত। যেমন-
‎‘‘বিজুর জন্য মদ, জগরা জগদীশদের বাড়িতে হয় না। একটু-আধটু খেলেও মদ তৈরিতে তার মায়ের প্রবল আপত্তির কারণে জগদীশের বাবা খুব বেশি উচ্চবাচ্য করেন না। ফলে এক শ্রেণির অতিথি তাদের বাড়ির ইজোরের সিড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে যখন শুনে মদ, জগরা কোনোটাই নাই তখন নেমে চলে যায়। কিন্তু খানদানি প্রকাশের জন্য লাল সেমাইটা রান্না হয়। এটি তাদের কাছে স্পেশাল, কারণ তখনো বাজারী খাদ্যের এই পদগুলো তাদের গ্রাম-সমাজে ওভাবে প্রবেশ করেনি। রান্নায়ও থাকে সেই বিশেষত্বের ছোঁয়া। অন্য বাড়িতে যেখানে গুড় আর জলে সিদ্ধ করে ঘুটে পরিবেশন করা হয়, সেখানে তাদের বাড়িতে দুধ, বাদাম, নারকেলের সাথে এলাচ-তেজপাতার সংযোগ থাকে। পাশাপাশি তেলে ভাজাও।’’ ( পৃ.১৮ )
‎সাহিত্যিক মূল্যায়নের দিক থেকে ‘গ্রহণ লাগা ভোর’ অনন্য। প্রথমত, এটি ইতিহাসের সংরক্ষণ করেছে। মুক্তিযুদ্ধের এমন এক অধ্যায়কে উপন্যাসে তুলে ধরা হয়েছে, যা মূলধারার ইতিহাসে প্রায় অনুল্লিখিত। দ্বিতীয়ত, আদিবাসী দৃষ্টিভঙ্গি এখানে স্থান পেয়েছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে বোঝার জন্য শুধু সমতলের অভিজ্ঞতা যথেষ্ট নয়; পার্বত্য চট্টগ্রামের অভিজ্ঞতাও জরুরি। এই বই সেই অভিজ্ঞতাকে সাহিত্যিক রূপ দিয়েছে। তৃতীয়ত, লেখক বাস্তবতা ও কল্পনার মিশ্রণ ঘটিয়েছেন। ফলে এটি শুধু দলিল নয়, বরং সাহিত্যিক রূপকল্প। চতুর্থত, চরিত্রগুলো বাস্তব ও প্রতীকী উভয় দিকেই গভীরতা অর্জন করেছে। পাঠক চরিত্রের সঙ্গে আবেগে মিশে যায়, আবার তাদের প্রতীকী তাৎপর‌্যও অনুধাবন করতে পারে। পঞ্চমত, ভাষার কাব্যিকতা ও প্রতীকি ব্যবহার বইটিকে সাহিত্যিক নান্দনিকতায় সমৃদ্ধ করেছে। এ উপন্যাস রচনার মাধ্যমে চাকমাভাষীদের মধ্যে বাংলা ভাষায় প্রথম সার্থক উপন্যাস লেখার দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হয়েছে। এটি একটি ইতিহাসনির্ভর উপন্যাস। তবে শুধু মাত্র কথাসাহিত্য পাঠক হিসেবে পড়লে এটি মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে লিখিত একটি উপন্যাস। কিন্তু বিশ্লেষণী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে পড়লে দেখা যায়, এ উপন্যাসে ঐতিহাসিক অনেক তথ্যের সাথে সাধারণের জন্য অজানা কিছু তথ্যও সন্নিবেশিত হয়েছে। যেমন: রাঙ্গামাটির তৎকালীন ডেপুটি কমিশনার ও আওয়ামীলীগ নেতা আবদুর রহমান সহ অন্যান্যদের চাকমাদের মুক্তিযুদ্ধে অংশহণ করতে না দেয়া, চাকমা রাজার পাকিস্তানের পক্ষে যোগদান, মুক্তিযুদ্ধের সময় পার্বত্য চট্টগ্রামে পাক বাহিনীর দোসর মিজো বাহিনীর উপদ্রব, স্বাধীনতা উত্তরকালে তিব্বতি বাহিনীর উপস্থিতি। পার্বত্য চট্টগ্রামে মিজো বাহিনী ও তিব্বতি বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে অনেক তথ্য ঐ এলাকার ইতিহাসে অলিখিতই রয়ে গেছে, যাদের কথা এ উপন্যাসে বর্ণিত হয়েছে।

‎অবশ্য কিছু সীমাবদ্ধতাও আছে। পাহাড়ি আঞ্চলিক শব্দের সঙ্গে অপরিচিত পাঠকের কাছে ভাষা জটিল মনে হতে পারে। আবার অনেক চরিত্রের বিস্তার উপন্যাসকে কখনো জটিল করে তুলেছে। তবে এই সীমাবদ্ধতাই বইটির স্বকীয়তা তৈরি করেছে। ফলে উপন্যাসটি অন্য মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস থেকে আলাদা করেছে।

‎সব মিলিয়ে বলা যায়- গ্রহণ লাগা ভোর’ শুধু মুক্তিযুদ্ধের কাহিনি নয়, এটি বাংলাদেশের ইতিহাসের এক উপেক্ষিত অধ্যায়ের সাহিত্যিক দলিল। এখানে পাওয়া যায় সংগ্রামী মুক্তিযোদ্ধা, দ্বিধাগ্রস্ত রাজপরিবার, সহিষ্ণু নারী, শোষক পাক সেনা ও বহিরাগত শক্তি-যারা মিলে এক জটিল বাস্তবতার চিত্র অঙ্কন করেছে। ভাষাতাত্ত্বিক দিক থেকে এটি সমৃদ্ধ-বাংলা ভাষার সঙ্গে আঞ্চলিক শব্দের মেলবন্ধন, প্রতীকি ব্যবহার ও কাব্যিক চিত্রকল্প পাঠককে মুগ্ধ করে। সাহিত্যিক মূল্যায়নে বলা যায়, এটি ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সাহিত্য-তিন ক্ষেত্রের মিলনক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে আছে। উপন্যাসটিতে মোট তেরটি পরিচ্ছেদ এবং প্রত্যেকটির একটি করে নাম রয়েছে। নামগুলো হলো- প্রত্যাখ্যান, ফাগুন হাওয়া, বণিক পরিবার, বিজু এল বিজু গেল, পিনোন-হাদি, পাহাড় মাঝি, মুক্তিপণ, যুদ্ধ যাত্রা, রাজাকারের ঘ্রাণ, শৈশবের আইসক্রিম, যমের সাথে তৃতীয় সাক্ষাৎ, বিজয়-উল্লাস, গ্রহণ লাগা ভোর। শেষ পরিচ্ছেদের নামে বইটির নামকরণ।

‎স্বাধীনতার ভোর যেমন উজ্জ্বল, তেমনি তার ভেতরে থাকে অন্ধকারের ছায়া। গ্রহণ লাগা ভোর সেই আলো-অন্ধকারের দ্বন্দ্বকে সাহিত্যে রূপ দিয়েছে। তাই এটি শুধু পাঠযোগ্য নয়, বরং গবেষণারও উপাদেয় দলিল। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বাংলা সাহিত্যের ভা-ারে এই উপন্যাস বিশেষ স্থান দাবি করে। এ উপন্যাসটি বাংলাদেশের আদিবাসী কথাসাহিত্যের গ-ি অতিক্রম করে বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের মূলস্রোতে বিচরণের দাবি রাখে। চাকমা ভাষা ও সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করতেও এ উপন্যাস চাকমা ভাষায় অনুদিত হওয়া প্রয়োজন। এ দায়বদ্ধতা শুধু উপন্যাসিকের ব্যক্তিগত নয়, বিভিন্ন আদিবাসী সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংগঠনের, সরকারি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের ও পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বায়ত্বশাসিত দপ্তরেরও। বিপম চাকমা তার দ্বিতীয় ভাষা বাংলায় রচিত গ্রহণ লাগা ভোর উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের ভূমিকা চিত্রায়ণের পাশাপাশি এর ভৌগোলিক বলয়ের বাইরে অবস্থিত সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর সামনে নিজস্ব সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন।

লেখক পরিচিতি:
আরফান হাবিব, সহকারী অধ্যাপক, বাংলা, বান্দরবান ক্যান্টনমেন্ট স্কুল এন্ড কলেজ।

‎মহালছড়ি ছিল মাছের রাজ্য-‎ঞ্যোহ্লা মং ---------------------------------------------------‎পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলার মর্য...
02/02/2026

‎মহালছড়ি ছিল মাছের রাজ্য
-‎ঞ্যোহ্লা মং
---------------------------------------------------
‎পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলার মর্যাদা পায় ১৯৬০ সালে। এই জেলার Captain Magrath ছিলেন প্রথম Superintendent of Chittagong Hill Tracts। ১৯৬৭ সালে এসে Superintendent পদটি পরির্বতন করে Deputy Commissioner করা হয়। এই অঞ্চল ছিল গহীন অরণ্যে ভরা। তাই এই এলাকাকে বলা হতো Terra incognita। এই শব্দটির ব্যবহার পাওয়া যায় চট্টগ্রাম গেজেটিয়ারস এ। সুতরাং এই অঞ্চলে অনেক হাতি, বাঘ, ভাল্লুক থাকবে সেটাই ছিল স্বাভাবিক।
‎বেড়ে উঠার গল্পে আমরা বিভিন্ন জায়গায় হাতির বিচরণ দেখেছি, শুনেছি। প্রতিবছর আমাদের মহালছড়িতে বেশ কয়েকটি বন্যহাতির আগমন ঘটতো। আমরা দলবেঁধে দূর থেকে দেখতে যেতাম। স্কুলে পড়ার সময়েও আমাদের উপজেলায় বন্য হাতি দেখতে লোকজন ভিড় করতো। এছাড়াও বাজার দিনগুলোতে পোষা হাতি বাজারে ঢুকে দোকানে দোকানে পয়সা তুলতো। এক সময় এই অঞ্চলে রাঙ্গামাটিতে যে খেদা হতো তাতো আমরা ধৃতিকান্ত লাহিড়ী চৌধুরীর লেখা হাতির বইতে পাই। এবং লেখকের পিতার মাতুল পার্বত্য চট্টগ্রাম রাঙ্গামাটি সরকারি খেদায় ধরা সমস্ত হাতি (প্রায় ৫০ এর অধিক) কিনে নিয়েছিলেন বলে তথ্য পাই (ধৃতিকান্ত লাহিড়ী চৌধুরী, হাতির বই, পৃষ্ঠা ৯, আনন্দ, কলকাতা)।

‎আগেকার দিনে এমন কি আমার বাবাদের ছেলেবলোয়ও এই অঞ্চলের মানুষেরা গরু মহিষগুলোকে ছেড়ে দিয়ে রাখতেন। মহিষের পালগুলোকে বনে ছেড়ে দিয়ে রাখতেন। মহিষগুলোকে বাঘেরা আক্রমণ করতো, গুরুও ছিনিয়ে নিয়ে যেতো। বনে বাঘ, ভাল্লুক থাকলেও মানুষের এত ভয় ছিল না। লোকালয়ে আসতো কমই। যেখানে, খাবারের অভাব নেই, লোকালয়ে আসারই বা কি দরকার!
‎দেশি-বিদেশি সরকারি কর্মকর্তাদের, এমনকি পাহাড়ের প্রথমদিকের শিক্ষিত পরিবারগুলোতে গেলে এখনো বাঘ, চিতাবাঘ শিকারের ছবি পাওয়া যায়। ব্রিটিশদের সময়ে শিক্ষিতদের মাঝে শিকার করা ছিল আভিজাত্যের প্রতীক। তাই শিক্ষিত পড়ালেখা জানা কিংবা অবস্থা সম্পন্ন পরিবারগুলোতে গেলে বন্য জীব-জন্তুর ফসিল, বসার ঘরে পশুর চামড়া শোভা পেতে দেখা পাই। পাকিস্তানের ইন্সপেক্টর জেনারেল অব ফরেস্ট ইউসুফ এস আহমেদ কাসালং সংরক্ষিত বনে ১৯৩০-১৯৫৮ সময়ের মধ্য কাজ করার অভিজ্ঞতা বর্ণনায় বাঘ দেখা পাওয়ার উল্লেখ করেছেন তাঁর উইথ দ্য ওয়াইল্ড অ্যানিমেলস অব বেঙ্গল বইয়ে (প্রথম আলো, সুজন ঘোষ-১১ সেপ্টেম্বর ২৫)। সাম্প্রতিক সময়ে ত্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্স (সিসিএ) পাহাড়ে চিতা বাঘের দেখা মিলেছে বলে দাবি করেছেন [(প্রথম আলো, ২৫ জুন, ২০২৫)যদিও প্রকাশিত ছবি চিতা নয়, লেপার্ড বলে অনেক পাঠককে দাবি করতে দেখা গেছে]।

‎আমার দাদা-দাদীদের যুগে বিয়ে সাদি হতো মা-বাবার পছন্দে। তবে সে সময়েও পাত্র-পাত্রীর পছন্দে বিয়ে হয়নি, তা কিন্তু নয়। অভিভাবকদের মাঝে পাত্র পছন্দের বড় একটি বৈশিষ্ট্য ছিল কর্মদক্ষতা। অভিভাবকরা পাত্রের কর্মদক্ষতা দেখে বিয়ে দিতেন। অবশ্যই অবস্থা সম্পন্ন পরিবার হলে আলাদা কথা। সাধারণ পরিবারের মধ্যে বিয়েতে যোগ্য পাত্র প্রমাণের প্রধান মাপকাঠি ছিল সুস্থতা ও কর্মদক্ষতা।

‎‍আমার দাদু ছিলেন গরীব ঘরের সন্তান, কিন্তু দাদীরা ছিলেন অবস্থা সম্পন্ন পারিবারের, বর্তমান থলিপাড়ায়, মহালছড়িতে। দাদীর পরিবার দাদাকে, পছন্দ করলেন শুধুমাত্র কৃষি কাজের দক্ষতা দেখে। দাদী বিয়েতে রাজী ছিলেন না, কিন্তু সেই সময়ে অভিভাবকদের বিরুদ্ধে যাওয়া ছিল কঠিন। দাদী, দাদাকে নিয়ে এক বাড়িতে সংসার করলেও ৫ সন্তানের জননী হওয়ার পরও দাদী, দাদার সঙ্গে একটি বাক্যও বিনিময় করতেন না। রোদে মেলে দেওয়া, দাদার পরনের কাপড় বৃষ্টিতে ভিজে যেতো, দাদী তুলতেন না।

‎দাদার বাড়ি ছিল বর্তমান চোংড়াছড়ি মৌজায় চোংড়াছড়ি গ্রামে আর দাদীর বাড়ি ছিল বর্তমান থলিপাড়া মৌজায়। তাদের বিয়ের পরে ঘর বাঁধলেন চোংড়াছড়ি মুখ ছড়ার পাড়ে, চেঙ্গী নদীর কুল ঘেষে।
‎মারমা ভাষায় ছেএখ্যং থেকে চোংড়াছড়ি বা চাকমা ভাষায় চংগড়াছড়ি থেকে চোংড়াছড়ি হয়েছিল মূলত একটি মিথ থেকে। এই পার্বত্য অঞ্চলে নাকি এক সময় গুপ্তধন সংগ্রাহকদের বিচরণ ছিল। তারা লুকিয়ে থাকা গুপ্তধনও নাকি সংগ্রহ করতে পারতেন [মারমারা তাদের ‘শঅ-লঅ-সা’ নামে চেনেন এবং আমার মায়ের ধারণা, ‘শঅ-লঅ-সা’রা মূলত বর্মী]। আমাদের চোংড়াছড়ি ছড়াতে নাকি স্বর্ণের শিংওয়ালা বলগা হরিণ ছিল। সংগ্রহের জন্য খুব চেষ্টাও নাকি চলেছিল, সেই থেকেই এলাকাটির নাম হয় ছেএখ্যং বা চংড়াছড়ি, যা শিংওয়ালা বলগা হরিণের কথাই বলে।
‎চংড়াছড়ি বা ছেএখ্যং ছড়ার উপত্তি পশ্চিমের পাহাড় আর শেষ হয়েছে আমাদের পাড়ার সামনে চেঙ্গী নদীতে। আমাদের ছেলেবেলা কেটেছে এই ছড়াতে মাছ ধরে। অল্প কিছু সময় ব্যয় করতে পারলেই সারাদিনের মাছের চাহিদা মিলে যেতো। আমরা ছোট ছিলাম বলে, গ্রামের প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষেরা আমাদের নিয়ে যেতেন মাছ কুড়ানো বা মাছ বহন করানোর বয় হিসেবে। মাছ ধরার বয় হলেও সমান ভাগের এক ভাগ মিলতো। মাছ ধরতে গিয়ে গ্রামের প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষ কিংবা নারীরা জাল দিয়ে ধরতে যেতেন তা কিন্তু নয়। খালি হাতেই মাছ ধরতেন। পাড়াবাসী নারী পুরুষের প্রত্যেকের এক একটি হাতই যেন এক একটি মাছ ধরার জাল। কচুরিপানা টেনে তুলে কিংবা পানির নিচ থেকে খালি হাতেই মাছ তুলতে পারতেন। ছড়ায় কিংবা নদীতে থাকা ঝোপ-ঝাড় আর গাছের সুরঙ্গ, ছড়ার কোনা-কোনি, চিপায়-চাপার সামনে পড়লেতো কথাই নেই। কাদা মাটির ভিতর থেকে খালি হাতেই বড় বড় কুচিয়া মাছ ধরতো। দুলাল চৌধুরী কিংবা রাখাল চৌধুরীর বাঁধ ঘোনার উপরের দিকে গেলেতো মনে হতো যেন কুচিয়া মাছের কূয়া। গ্রামের কংজ, মংহ্লা প্রুদের সঙ্গে কতবার গিয়েছি হিসাব নেই। কোনকোনদিন কুচিয়া মাছের সাইজ দেখে ভয়ও লাগতো। চারিদিকে মাছ ভরে থাকলেও পাড়াবাসিরা প্রয়োজনের মাত্রাতিরিক্ত ধরতেন না। খুব অভাব থাকলে অল্প কিছু পরিমাণ মাছ ধরে বিক্রি করতেন মাত্র।

‎আমি যে ছড়ার কথা বলছি, সেই ছড়াতে দাদা-দাদীরা নাকি বড় বড় মাছের ভয়ে মাছগুলো ধরতেও ভয় পেতেন। অল্প বৃষ্টি নামলে ছড়াতে মাছের ছুটাছুটি আর মাছের ডাকাডাকির শব্দগুলোর কারণেও নাকি ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করতো।

‎দাদা-দাদীরা মাছের ভয়ে মাছ ধরে না খাওয়ার গল্প যে সত্য তা আমি বুঝতে পারি। কেননা আমি নিজেও মাছের ভয়ে নদীতে ডুব দিতাম না। শিং মাছের খেলা দেখলে ভয়ে উঠে পরতাম। আর মা আমাদের স্মান করাতে গিয়ে গলায় ধরে নদীতে ডুব দেওয়াতেন। মহালছড়িতে মাছের গল্প বিশ্বাস করাতে পাঠকদের কতটুকু সক্ষম হবো জানি না, আমরা একই পরিবারের হয়েও আমার ছোট ভাইদেরকে, আমাদের দেখা মাছের গল্প বললে উড়িয়ে দেওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

‎মাছ ধরার প্রযুক্তি ছিল খুবই সাধারণ। গ্রামের বা পাড়ার দুই/এক পরিবারের হাতেই থাকতো ১টি কি দুটি হাত জাল। মাছ ধরার জাল থাকা মানে, আমাদের ছেলেবেলায় একটা কিছু, পরিবারটির সংগৃহিত সম্পদ হিসেবে গণ্য হতো। মহালছড়ি বাজারে পেশাদার জেলে সম্প্রদায় হলো সিলেটিরা। তাদের বসতি থানা ঘাটেই। এখনো সেই জায়গাতেই তাদের অনেকে রয়েছেন। কিছু সংখ্যক মাত্র সেখান থেকে বের হয়ে অন্যান্য জায়গায় ঘর তুলেছেন। সিলেটিরা প্রতিদিন সন্ধ্যায় নদীর মাঝ বরাবর নৌকায় কিংবা নিজেদের বসতভিটায় জড়ো হয়ে গান ধরতেন। তাদের গান অনেক দূর থেকে শুনা যেতো। সন্ধ্যা নামলেই চারিদিকে সুনসান পরিবেশ বিরাজ করতো বলে, অনেক দূর পর্যন্ত গানের সূর পৌছতে পারতো। সেই সময়ে একমাত্র সিলেটিদেরই ছিল মাছ ধরার বড় জাল। তারা নদীতে বড় এলাকা জুড়ে জাল ফেলে মাছ ধরতে পারতেন। তাদেরকে খুব বেশি দূর যেতে হতো না। উপজেলা ঘাটের আশেপাশেই মাছের জাল ফেলে থামতে হতো। দাম কম। লোকজনও কম। এত এত মাছ ধরে কোথায় বিক্রি করবেন তারা? তাই অতিরিক্ত মাছ ধরার প্রশ্নই আসতো না। কাছকি মাছ টাকায়২-৩ কেজি পর্যন্ত মিলতো। কোন কোনদিন ১টায় ১কেজি পর্যন্ত উঠতো মাত্র। আমি ১৯৯২ সালের দিকে কেজিতে ২-৩টাকা পর্যন্ত কিনেছিলাম বলে মনে আছে। সিলেটিরা জাল টানার সময় নিজেদের ভাষায় এক রকম ছন্দের তালে তালে জাল টানতেন। আমার মা’র কাছ থেকে জেনেছি ‘এই সিলেটিদের আগমনের আগে নাকি যোগী নামে হিন্দু জনগোষ্ঠীদের একটি দল কাপ্তাই বাঁধের পানি উঠলে মাছ ধরতে চলে আসতেন। পানি নেমে গেলে তারাও ফিরে যেতেন। পাহাড়ের ধান কাটার জন্যও নাকি ৫জন, ১০জনের দল গঠন করে কিছু বাঙালী মুসলিমরা ধান কাটতে চলে আসতেন। তারা চুক্তিতে পাকা ধানগুলো কেটে, মাড়াই করে দিয়ে যেতেন’।
‎খালি হাতেই যেখানে মাছ ধরতে পারতেন, সেখানে জালের ন্যায় নতুন প্রযুক্তির দরকারও ছিল না। তবে বাঁশের চুঙ্গা, কুচিয়া মাছ ধরার ‘দুক’ [(মারমা শব্দ দুক), মাছ ভেদে দুক কয়েক ধরনের হয়ে থাকে)] ছাড়াও নারীদের উপযোগী লুই (চাকমা), য়্যাকসে (মারমা) বা লুসি (ত্রিপুরা) ব্যবহার হতো আবার নদীতে ডালপালা ফেলে রেখে খাঁড়ি তৈরি করে কয়েকদিন অন্তর মাছ ধরা হতো। নারী-পুরুষেরা দুপুরের কাজের ফাঁকে ১০-২০ মিনিট সময় ব্যয় করতেন, মাছ দিয়ে দুপুরের গরম গরম ভাত খাওয়ার জন্য। কিংবা নারী শ্রমিক বা পরিবারের নারীটি স্মান করার ফাঁকে মাছ ধরার কোনো একটি প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরিবারকে মাছ রান্না করে খাওয়াতেন। বাংবু ব্যবহার হতো বৃষ্টির দিনগুলোতে। ছোট মাছের দল বৃষ্টির দিনগুলোতে উজানে উঠতে গিয়ে বাংবুতে ধরা পড়তে হতো। আর কয়েকদিন ধরে ঝড় বৃষ্টির দিনগুলোতে ধান্যজমিতে পানি উঠলেই ঘোলা পানিতে বড় মাছ ধরা পড়তো। ঘোলা পানিতে কাঁটা ধান ক্ষেতে বড় মাছের ছোটাছুটি বুঝা যেতো বলে অনেকে কুপ দিয়ে ধরতেন। এক একটা মাছের সেই কি সাইজ। ২০ কেজি, ২৫কেজি, ৩০ কেজি। একটা মাছ ধরতে পারলেই, কাটতে পারলেই দুই তিনজনকে বহন করতে হতো। মাছ কাধে বহন করছে বটে, মাছের অনেকটা মাটিতে পড়ে টেনে টেনে চলতে দেখেছি।

‎আমাদের ছেলেবেলা কেটেছে মাছের রাজ্যে। নদীতে নামলে মাছ এসে শরীরে কামড় দিতে চলে আসতো। শরীরে ঘা থাকলে মাছ ঠুকা দিয়ে খেতো। আমার মাও তাই বলতেন, ‘প্রথম প্রথম মহালছড়িতে যখন এসেছিলেন, স্নানের জন্য পানিতে নামলেই নাকি ইচা মাছগুলো ঠুকা মারতো’। মায়ের মতে, ‘কাপ্তাই বাঁধের পানি আসার প্রথম কয়েক বছর কোনো পেশাদার জেলেই ছিলো না, ফলে নৌকাতে গেলে পোনাসহ বড় বড় শোল মাছের কামড় খাওয়ার ভয়ে সাবধানে নৌকা চালাতেন’। তাঁর মতে, ‘কাঁপ্তাই বাঁধের প্রথম কয়েক বছর নদীতে মাছ ভরে গিয়েছিল’। আমাদের সময় পাহাড়ে ইলিশ বলতে ছিল বড় চাপিলা মাছ। দুই আঙ্গুল সাইজের বড় চাপিলা মাছের ভাজি মজাই আলাদা। বেশি মাছ ধরা পড়লে বা সংরক্ষণ করতে হলে শিক করে রান্না ঘরে চুলার ওপরে রেখে দেওয়া হতো। বড় শোল মাছ, শোল মাছের মাথা, ফলি মাছ বেশির ভাগই শিক করে খাওয়া হতো।

‎পাঁচ মিশালি ছোট মাছ পেলে মায়েরা কলা পাতায় রান্না করতেন। ছোট মাছের সাথে জুমের মসলা উপাদান দিয়ে রান্না অন্য রকমের স্বাদ সৃষ্টি করতো। আর বাঁশের চুঙ্গায়ও ছোট মাছের রান্নার দারুণ প্রচলন ছিল। রোগীদের শিং মাছের ঝোল বা শিং মাছের সাথে হলুদ দিয়ে রান্না করে দেওয়া হতো। টাকি মাছ পেলেও হলুদ দিয়ে রান্না করতেন। বড় শোল মাছের সাথে চালের গুড়া দিয়ে রান্নাও ভালো লাগতো।

‎কাপ্তাই বাঁধের পানি স্থির হয়ে উঠলে চারিদিকে সাদা আর লাল রঙের শাপলা ফুলের বাগান হয়ে উঠতো। শাপলা ফুলের পাতায় পাতায় এক ধরনের গোলকৃতির শামুক [মারমা ভাষায় খুদুক-বাঘ] পাওয়া যেতো। আমরা সংগ্রহ করে সিদ্ধ করে খোসা ছাড়িয়ে লবণ দিয়ে পিচ্ছিল কমিয়ে রান্না করতাম। সেই সময়ে কাঁশফুলও ফুটে সারা এলাকা সাদায় ভরে তুলতো। আমাদের অনেকে নৌকাযোগে কাঁশফুল সংগ্রহ করে তোষক তৈরি করতেন। আমাদের বাড়িতে যত তোষক ছিল সবই ছিল কাঁশফুলের তৈরি।

‎কাপ্তাই বাঁধের পানি আমাদের যোগাযোগের সুবিধা তৈরি করে। কৃষকেরা তাদের উৎপাদিত ফলমূল নৌকা যোগে আনা-নেওয়া করতে পারতেন। যারা অবসরে মাছ ধরতেন, তাদের প্রত্যেকের নিকট একটি করে নৌকা থাকতো। নৌকা তৈরি কিংবা মেরামত সকলে করতে পারতেন না। যারা নৌকা বানাতে কিংবা মেরামত করতে পারতেন, এলাকায় তাদের সকলে চিনতেন এবং সময়ে সময়ে তাদের ডাক পরতো। তাদের যত্ন নিয়ে আপ্যায়ন করা হতো।

‎আমাদের বেড়ে উঠার গল্পে যাদের কারিগরি জ্ঞান, দক্ষতা ছিল, তারা প্রত্যেকে তাদের কাজের গুণে পরিচিতি লাভ করেছিলেন। যেমন, বিভিন্ন উৎসব সময়ে ফানুস বানানো, ফার্ম লাইট জ্বালাতে জানা সকলের কাছে ছিলেন পরিচিত মুখ। স্কুলবেলায় দেখেছি আমাদের পাড়ায় বেশি হলে ২-৩টা ফানুস বানানো হতো, আর বড় সিঙ্গিনালা পাড়া থেকে ১০-১২টি অনেক সময় ২০-২৫টি পর্যন্ত উড়ানো হতো। সিঙ্গিনালা বড় গ্রামটি নানা পাড়া বা অংশে ভাগ হলেও উৎসবগুলো মিলেমিশে উদযাপন করতেন। চারিদিকে পানিতে ভরে গেলে সিঙ্গিনালা গ্রামের মানুষেরা মাছ ধরতেন, তাদের অনেকে গাছ-বাঁশ বিক্রি করে জীবন ধারণ করতেন।

‎স্কুলবেলার শেষ সময়েও বাজারের রাস্তায় খোলা লবণ ফেলে, পাতায় মুড়িয়ে বিক্রির চল দেখেছি। লবণ মুড়িয়ে বিক্রি করা লম্বা পাতাগুলো এখন আর দেখা যায়না। শুকর মাংসও বিক্রি চলতো পাতায় মুড়িয়ে। শুকর মাংস আর লবণ একই ধরনের পাতা দিয়ে মোড়ানোর চল ছিল (পাতাটি মারমা নামে অলুই-ফাক)। অলুইফাক পাতার সংকট থাকলে আরেক ধরনের গোলাকৃতির ‘খুওয়েংবাং’ এর পাতার ব্যবহার হতো, এই পাতাটি শুটকি বিক্রেতাগণও ব্যবহার করতেন। মাছ বিক্রেতাগণ বহনের সুবিধাদি দিতে মালা গেঁথে বাজারে তুলতেন। যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম নৌকা বা লঞ্চ বলে মাছগুলো দূরের কোথাও যাওয়ার সুযোগ ছিল না। ফলে পাহাড়ি জেলেরা অতিরিক্ত মাছ শুকিয়ে বাজার দিনে শুটকি হিসেবে বিক্রি করতেন।

‎কাপ্তাই লেকের পানি শুকাতে শুরু করলে চারদিকে মাছের স্তুপের দেখা মিলতো। যেদিকে যাই, মাছের গন্ধ পাওয়া যেতো। মা শোল আর টাকি মাছের দল এখন আর দেখা যায়না বললেই চলে। এক একটি শোল বা টাকি মা মাছের পোনা কয়েক হাজার হবে। আমরা অবুঝ শিশুরাও মাঝে মাঝে মা মাছকেও বড়শি দিয়ে ধরে ফেলতাম। আমাদের ছেলেবেলায় মা শোল বা টাকি পোনাসহ ধরতে পারলে, আলাদা রান্না আইটেম হতো। আমি স্কুলবেলায় অনেকবার মা শোল মাছ ধরেছি, যা এখন আমাকে ব্যথিত করে।

‎পানি শুকিয়ে গেলে লেকের বিভিন্ন ঘোনায় আটকে থাকা পানিতে প্রচুর মাছ পাওয়া যেতো। আটকে থাকা পানি টিন, বালতি কিংবা গামলা দিয়ে পানি সেঁচে বা অপসারণ করে করে হাটু বা কোমর পর্যন্ত কাদায় মাছ ধরার মজাতাই যেন আলাদা। এমন মাছ ধরার পদ্ধতিতে গ্রামের সকলের কাছে মাছের ভাগ পৌছে যেতো। ঘোনার মালিক পক্ষের মাছ ধরা শেষ হলে, গ্রামের সকল ছেলে মেয়ে মাছ ধরতে নেমে পড়তেন। মালিক পক্ষের পক্ষে সব মাছ ধরা সম্ভব হতো না। কাদায় অনেক মাছ ডুব দিয়ে থাকে এবং গ্রামবাসীরা সে মাছগুলো খুঁজে বের করেও বেশ ভালো পরিমাণের পেয়ে থাকেন। কিছু কিছু ঘোনায় অনেক পানি জমা থাকে, সেসব ক্ষেত্রে মেশিন দিয়ে পানি অপসারণ করা হয়ে থাকে। অল্প এবং মানুষের পক্ষে সম্ভব হলে কয়েকজন মিলে সারাদিন পানি সেঁচে মাছ ধরে। বড় ঘোনার পানি সেঁচের ক্ষেত্রে মেশিন দিয়েও কয়েকদিন পর্যন্ত লেগে যেতে দেখা যেতো। পানি সেঁচে মাছ ধরার পদ্ধতিতে মালিক পক্ষ পানি যতদূর শুকাবে ততদূর মাছ ধরে নামতে থাকবে। মালিক পক্ষের পিছনে থাকবে গ্রামবাসীরা। মালিকের পিছনে থাকা মাছগুলো যে পাবেন, মাছ তারই। অনেক সময় মালিকের পিছনে বড় মাছ দেখা দিলে মালিক পক্ষ কাদা ছুড়তে ছুড়তে গ্রামবাসী ছেলেমেয়েদেরকে দূরে ঠেলে দিয়ে মাছগুলো ধরার চেষ্টা করতেন। গ্রামবাসীদের কেউ বড় মাছ ধরে ফেললে মালিক নিয়ে নিতেন। আবার বড় মাছ কোনো ভাবে, পিছনে সাড়িতে উঠে গেলেও কাদা ছুড়ে দিয়ে ধরতে বারণ করতেন। ফলে মাছ ধরতে গিয়ে এমন ‘কাদা ছোড়াছুড়ি’র কারণে সারা শরীর কাদায় ভরে যেতো।

‎সিলেটি জেলে সম্প্রদায়ের সাথে এলাকাবাসীর কোনো বিরোধ হতে কখনো দেখিনি। সিলেটিদের মধ্যে চাওয়া-পাওয়ার সীমাবদ্ধতার কারণে হয়তো এলাকাবাসীর সঙ্গে কোনো বিরোধ বাঁধেনি। সিলেটি জেলে সম্প্রদায়দের যাদের দেখেছি, তাদের কেউ আদি ভিটায় ফিরে গিয়েছেন বলে শুনা যায়নি। তাদের পরর্বতী প্রজম্মরা মহালছড়িতে থেকে যায়। তবে এদের সংখ্যা খুব বেশি নয়। তাদের সংখ্যা কারোর জন্য হুমকিও নয়।

‎সিলেটিদের যুগে পাহাড়ে বড় জাল ছিল, শুধু তাদের হাতেই। পাহাড়িরা মাছ ধরতো বাঁশ বা হাতের তৈরি সহজলভ্য প্রযুক্তি দিয়েই। পরর্বতী সময়ে পাহাড়ে প্রচুর নতুন লোকের বসতি তৈরি হয়। তারা নিত্য নতুন প্রযুক্তি আমদানি করার মাধ্যমে দেখতে দেখতে নদীতে মাছসব মিলিয়ে যেতে থাকে। মাছের অবাধ বিচরণ, মাছের খেলা, মাছের দল, মাছের প্রতিযোগিতা, মাছের লাফালাফি সব থেমে যেতে থাকে। বিশ্বাস করবেন কিনা জানি না, সন্ধ্যার দিকে আমরা ঘরের পিছনে যেতামই না। বড় মাছের লাফালাফি শুনে আমরা ভূত কিংবা প্রেতের উপস্থিতি কল্পনা করে ভয় পেতাম। মা বলতেন, ‘মাছের লাফালাফিতে তাদের রাতের ঘুমও নাকি ভেঙে যেতো’। আমারও খুব মনে আছে, পাড়ার পাশে ক্যাম্প স্থাপনের আগে পর্যন্ত আমাদেরও হরিণদের ডাকে রাতে ঘুম ভাঙ্গতো।

‎আমাদের বেড়ে উঠার গল্পে ঘর থেকে একটু বনের দিকে তাকালেই বন মোরগ, শুকরের দল, হরিণের দলের দেখা মিলতো। আমাদের দেখে ভয়ে পালিয়ে যেতে দেখিনি। আমরা বরং বানরের দল, হনুমানের দলের ভয়ে সাবধানে চলাফেরা করতাম। সেই সাথে বক আর বাদুরের দলতো গাছের ডালপালা দখলে নিয়ে সারাদিন ঝগড়ায় মেতে থাকতো। শীতকালে অতিথি পাখিদের দল আসতো। রঙবেঙের পাখি যা শিশুদের কল্পনা শক্তিকে বাড়িয়ে দিতে সহায়তা করতো।

‎আমরা মানুষরা কোনোকিছুই টিকিকে রাখতে পারলাম না। প্রাকৃতিক বনসব ধরে ধরে ইচ্ছে করে উজাড় করে দিলাম। মাছ ধরে ধরে শেষ না হওয়া পর্যন্ত থামলাম না। লোভীদের লোভ দেখানোর ফলে সব শেষ করে এখন সম্বল হিসেবে চাষের মাছে এসে থামলাম।

‎প্রকৃতি প্রেমী নানান দেশিদের, যখন তাদের দেশে নানান এলাকায় ঘুরতে গিয়ে মাছের দল, মাছের প্রতি যত্ন এবং প্রয়োজনটুকু নিয়ে ছেড়ে দিতে দেখা যায়, তখন আমার ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে। পাহাড় সমাজে, পাহাড়িদের মূল্যবোধ ছিল প্রয়োজনটুকু সংগ্রহ করে, সংরক্ষণ করা।

‎আমি প্রায় প্রতিদিনই মাছ ধরতাম। কোনো কোনদিন বড়দের সঙ্গে মাছ ধরার বয় হিসেবে যেতাম। কোন কোনদিন গ্রামের আশেপাশে মাছ ধরতে দেখলে মাছ কুড়াতেও যেতাম। একটু বড় হয়ে নিজেই বড়শি দিয়ে মাছ ধরতাম। প্রায় প্রতিটি বড়শিতে মাছ ধরা পড়তোই। বড় বড় কুচিয়া মাছ বা বাউন মাছ ধরা পড়লে, বড়শি উদ্ধার করতে গিয়ে ভয়ে ভয়ে ঘোলা পানিতে সাপ ধরা পড়লো কিনা ভেবে ভয় পেতাম। আমি মাছ ধরতাম বলে অনেক সময় বাবাকে মাছ কিনতে হতো না। বাবা তাঁর খাবার প্লেটে প্রতিদিন, প্রতিবেলায় মাছ কিংবা মাংস থাকা চাইতেন।

‎নতুন বসতি দিয়ে মহালছড়ি ভরে গেলো। রাস্তা-ঘাট দ্রুত গতিতে তৈরি হলো। গাড়ি চলতে শুরু করলো। থানায় বরফ কল স্থাপন হলো। আমাদের মাছ দূরে, অনেক দূরে, ছুটতে শুরু করলো। গভীর রাতে মাছের গাড়ি ছুটে চলতো দূর দূরান্তের গন্তব্যে। দেখতে দেখতে আমাদের মাছ অন্যদের দখলে যেতে শুরু করলো। দেখতে দেখতেই যেন চোখের পলকে ভালো মাছ পাওয়া দুস্কর হয়ে উঠলো। বাজারে ভালো মানের মাছ উঠলে, ধরা পড়লে একটি বিশেষ জায়গায় চলে যেতো। এমনি চোখের পলকে ভালো তাজা মাছ, উন্নত প্রজাতির মাছ খাওয়ার বদলে পচা ছোট মাছ খেতে শুরু করলাম ধীরে ধীরে। এখন ব্যাপারটি অস্বাভাবিক মনে হলেও তখন কখন কখন ঘটে গেলো এমন বড় ঘটনা যেন ঢেরও পাওয়া গেলো না।

‎বড় মাছ, তাজা মাছ বাজারে দেখলে দাম জিজ্ঞেস করার বদলে বাবা ছোট প্রজাতির নরম মাছই কিনে খাওয়া শুরু করলেন। বাবা বলতেন, ‘ছোট মাছ বেশি বেশি খাবে, ছোট মাছ চোখের জন্য ভালো। হাড়ের জন্যও ভালো’।

‎এখন পকেটে টাকা থাকলেও মহালছড়িবাসী মহালছড়ির মাছ খেতে পায় না। চলে যায় দূরে অনেক দূরে। মহালছড়িতে সামুদ্রিক মাছে ভরে উঠেছে। পাশাপাশি চাষের মাছে ভরে গেছে। এখন বিক্রেতারা চাষের মাছকে বলছে নদীর মাছ, আর দূরের মানুষজনকে বলছে মহালছড়ির মাছ। বাবাদের যুগে অনুন্নত মহালছড়ি, এখনো অনুন্নতই রয়ে গেছে। মহালছড়ি মাছ বলে সুনাম ছড়ালেও, উপজেলা মহালছড়ি তার সুনাম ধরে রাখতে পারেনি। এখন অনেকে মহালছড়িকে নিয়ে রসালো গল্প বলে।
‎মহালছড়ি থেকে শুধু বড় মাছ, নানান প্রজাতির মাছ হারিয়ে যাইনি, একইসাথে ভালো মানুষগুলোও একে একে হারিয়ে গেলো। জলজ পোকা ও ব্যাঙাচি প্রজাতির বেশ কয়েকটি মাছ এখন নদীতে দেখাই যাই না। মারমা নামের কিস-বক, রুবুসি চোখেই পড়ে না আর। নদীর কুচিয়া কোথায় যেন মিলিয়েই গেলো। নদীর কচ্ছপ, পাহাড়ের কচ্ছপ দেখি না ২০-২৫ বছর ধরে। ছড়ায় পাওয়া নানান প্রজাতির শামুক, ইশা, কাকড়া আজ বিলুপ্তির পথে। ছড়ায় পাওয়া কালো কাকড়ার বদলে নদীতে লাল কাকড়া এক সময় বেড়ে গিয়ে কৃষকদের অতিষ্ঠ করে তুলেছিল, সেই লাল কাকড়াও এখন কমার দিকে। আস্ত দাড়ি (কাজলি মাছ) বলে আট দাড়িওয়ালা মাছ বেশ দাম ছিল। মনে পড়ে সর্বশেষ কেজিতে ৪ টা থেকে ৮ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। আমার বাবা, কিনতে কিনতে এক সময় মাছও ১ পোয়া করে কিনতেন। বাবা কম কেনার কারণে পরিচিতজনরা, বাজারের দেখাপাওয়া লোকজনরা, আড়ালে হাসাহাসি করতেন। আমাদের সুযোগ পেলে কেউ কেউ বলেও ফেলতেন। মা’র থেকে পাওয়া সাহসী গল্পের কারণে, ১ পোয়া কেনার গল্পের কারণে লজ্জা পাওয়ার বদলে সাহসী করে তুলতো, গর্বিত করে তুলতো। কারণ আড়ালে অল্প শিক্ষিতরা মজা করে গল্প বানালেও, শিক্ষিতজনদের মাঝে বাবার গ্রহণযোগ্যতার কারণে অনেকে সম্মান করতেন। বাবা প্রতি সাপ্তাহিক বাজার দিনে শুকরের ১টি পা বা এক পোয়া মাংস কিনবেনই কিনবেন। বাজার দিনে কাচাবাজার কেনার শেষে অনেক মানুষের ভিড় ঠেলে নিচে মাংস বেচাকেনার শেডের দিকে যেতেন, শুধু এক পোয়ো বা ১টি শুকরের পা কিনবেন বলে। ১০-২০ টাকায় ১টি পা মিলতো। মাছের রাজ্যে বেড়ে উঠা বাবাকে একদিন ১ পোয়া মাছও কিনতে হলো। কোন কোনদিন পচা মাছ কিনে আনলে, মা বকা দিতে দিতে পরিষ্কার করে আদা-রসুন দিয়ে রান্না করে দিতেন। মাছের রাজ্যে থাকা পরিবারটিও একদিন ১পোয়া মাছ দিয়ে ১০-১২ জন খেতে শিখলো।

‎লেখক পরিচিতি:
ঞ্যোহ্লা মং, পরিচালক, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট, খাগড়াছড়ি।

মোহের ওপারে অতন্দ্রিলা চাকমা ---------------------------এই সমগ্র জগৎ ক্ষণিক ভ্রমাত্মক, স্বপ্নময় মায়া অস্থির ঢেউয়ে ভাসে ছ...
02/02/2026

মোহের ওপারে
অতন্দ্রিলা চাকমা
---------------------------
এই সমগ্র জগৎ ক্ষণিক
ভ্রমাত্মক, স্বপ্নময় মায়া
অস্থির ঢেউয়ে ভাসে ছায়া
ভ্রম থেকেই জন্মায় অনন্ত ইচ্ছে
ইচ্ছেই হৃদয়কে বাঁধে আনুরক্তির বন্ধনে,
ধাবিত মোহের পথে।

পৃথিবী তো এক মোহ,
ভ্রমাত্মক এই সংসারে সত্য খোঁজ নিজের দ্বারে
যিনি দেখিয়েছেন ত্যাগেরই পথ,
হৃদয়ে খোঁজ আলো
যাঁর আলোয় জেগে ওঠে অন্তর্দীপের সত্য।
ইচ্ছে ত্যাগে আসে অমল প্রশান্তি,
মন উড়ে যায় নীরব মুক্তির নীল আকাশে।

চিটাগং হিল ট্রাক্টস রাইটার্স ইউনিয়ন এর পঞ্চম সম্মেলন পরবর্তী একটি সভা অনুষ্ঠিত হলো রাঙ্গামাটিতে। উপস্থিত ছিলেন রাঙ্গামাট...
01/02/2026

চিটাগং হিল ট্রাক্টস রাইটার্স ইউনিয়ন এর পঞ্চম সম্মেলন পরবর্তী একটি সভা অনুষ্ঠিত হলো রাঙ্গামাটিতে। উপস্থিত ছিলেন রাঙ্গামাটির লেখক ও সাহিত্যিকবৃন্দ। অশেষ ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা অংশগ্রহণকারী সকলকে।

সম্মানিত লেখকবৃন্দ,আন্তরিক শুভেচ্ছা গ্রহণ করুন। বিগত ১৪ ও ১৫ নভেম্বর ২০২৫ রাঙ্গামাটির শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে অনুষ্ঠি...
16/11/2025

সম্মানিত লেখকবৃন্দ,
আন্তরিক শুভেচ্ছা গ্রহণ করুন। বিগত ১৪ ও ১৫ নভেম্বর ২০২৫ রাঙ্গামাটির শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত সংগঠনের 'পঞ্চম পার্বত্য চট্টগ্রাম লেখক সম্মেলন ও সম্মাননা প্রদান ২০২৫' অনুষ্ঠানে আপনাদের প্রাণবন্ত উপস্থিতি অনুষ্ঠানকে সাফল্যমন্ডিত করেছে। আমাদের ভাষা, সাহিত্য ও গবেষণার কাজে যাঁরা কোন না কোন ভাবে সম্পৃক্ত, তাঁদের মাঝে এক মেলবন্ধন তৈরির এই সম্মেলনে আপনাদের পেয়ে আমরা সত্যিই ধন্য। আপনাদের সান্নিধ্য আমাদেরকে অনেক বেশি সমৃদ্ধ করেছে। তাই অশেষ শ্রদ্ধা, ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি আমাদের প্রাণপ্রিয় লেখকবৃন্দের প্রতি। আপনাদের সরব উপস্থিতি, সুপরামর্শ, দিকনির্দেশনা আমাদের জন্য পাথেয় হয়ে থাকবে। আশা করছি আগামীতেও আপনারা সবসময় আমাদের পাশে থাকবেন। আপনাদের হাত ধরেই পাহাড়ের শিল্প- সাহিত্য অনেকদূর এগিয়ে যাবে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।

Address

Banarupa
Rangamati
4500

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Chittagong Hill Tracts Writers' Union posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Share