02/02/2026
মহালছড়ি ছিল মাছের রাজ্য
-ঞ্যোহ্লা মং
---------------------------------------------------
পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলার মর্যাদা পায় ১৯৬০ সালে। এই জেলার Captain Magrath ছিলেন প্রথম Superintendent of Chittagong Hill Tracts। ১৯৬৭ সালে এসে Superintendent পদটি পরির্বতন করে Deputy Commissioner করা হয়। এই অঞ্চল ছিল গহীন অরণ্যে ভরা। তাই এই এলাকাকে বলা হতো Terra incognita। এই শব্দটির ব্যবহার পাওয়া যায় চট্টগ্রাম গেজেটিয়ারস এ। সুতরাং এই অঞ্চলে অনেক হাতি, বাঘ, ভাল্লুক থাকবে সেটাই ছিল স্বাভাবিক।
বেড়ে উঠার গল্পে আমরা বিভিন্ন জায়গায় হাতির বিচরণ দেখেছি, শুনেছি। প্রতিবছর আমাদের মহালছড়িতে বেশ কয়েকটি বন্যহাতির আগমন ঘটতো। আমরা দলবেঁধে দূর থেকে দেখতে যেতাম। স্কুলে পড়ার সময়েও আমাদের উপজেলায় বন্য হাতি দেখতে লোকজন ভিড় করতো। এছাড়াও বাজার দিনগুলোতে পোষা হাতি বাজারে ঢুকে দোকানে দোকানে পয়সা তুলতো। এক সময় এই অঞ্চলে রাঙ্গামাটিতে যে খেদা হতো তাতো আমরা ধৃতিকান্ত লাহিড়ী চৌধুরীর লেখা হাতির বইতে পাই। এবং লেখকের পিতার মাতুল পার্বত্য চট্টগ্রাম রাঙ্গামাটি সরকারি খেদায় ধরা সমস্ত হাতি (প্রায় ৫০ এর অধিক) কিনে নিয়েছিলেন বলে তথ্য পাই (ধৃতিকান্ত লাহিড়ী চৌধুরী, হাতির বই, পৃষ্ঠা ৯, আনন্দ, কলকাতা)।
আগেকার দিনে এমন কি আমার বাবাদের ছেলেবলোয়ও এই অঞ্চলের মানুষেরা গরু মহিষগুলোকে ছেড়ে দিয়ে রাখতেন। মহিষের পালগুলোকে বনে ছেড়ে দিয়ে রাখতেন। মহিষগুলোকে বাঘেরা আক্রমণ করতো, গুরুও ছিনিয়ে নিয়ে যেতো। বনে বাঘ, ভাল্লুক থাকলেও মানুষের এত ভয় ছিল না। লোকালয়ে আসতো কমই। যেখানে, খাবারের অভাব নেই, লোকালয়ে আসারই বা কি দরকার!
দেশি-বিদেশি সরকারি কর্মকর্তাদের, এমনকি পাহাড়ের প্রথমদিকের শিক্ষিত পরিবারগুলোতে গেলে এখনো বাঘ, চিতাবাঘ শিকারের ছবি পাওয়া যায়। ব্রিটিশদের সময়ে শিক্ষিতদের মাঝে শিকার করা ছিল আভিজাত্যের প্রতীক। তাই শিক্ষিত পড়ালেখা জানা কিংবা অবস্থা সম্পন্ন পরিবারগুলোতে গেলে বন্য জীব-জন্তুর ফসিল, বসার ঘরে পশুর চামড়া শোভা পেতে দেখা পাই। পাকিস্তানের ইন্সপেক্টর জেনারেল অব ফরেস্ট ইউসুফ এস আহমেদ কাসালং সংরক্ষিত বনে ১৯৩০-১৯৫৮ সময়ের মধ্য কাজ করার অভিজ্ঞতা বর্ণনায় বাঘ দেখা পাওয়ার উল্লেখ করেছেন তাঁর উইথ দ্য ওয়াইল্ড অ্যানিমেলস অব বেঙ্গল বইয়ে (প্রথম আলো, সুজন ঘোষ-১১ সেপ্টেম্বর ২৫)। সাম্প্রতিক সময়ে ত্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্স (সিসিএ) পাহাড়ে চিতা বাঘের দেখা মিলেছে বলে দাবি করেছেন [(প্রথম আলো, ২৫ জুন, ২০২৫)যদিও প্রকাশিত ছবি চিতা নয়, লেপার্ড বলে অনেক পাঠককে দাবি করতে দেখা গেছে]।
আমার দাদা-দাদীদের যুগে বিয়ে সাদি হতো মা-বাবার পছন্দে। তবে সে সময়েও পাত্র-পাত্রীর পছন্দে বিয়ে হয়নি, তা কিন্তু নয়। অভিভাবকদের মাঝে পাত্র পছন্দের বড় একটি বৈশিষ্ট্য ছিল কর্মদক্ষতা। অভিভাবকরা পাত্রের কর্মদক্ষতা দেখে বিয়ে দিতেন। অবশ্যই অবস্থা সম্পন্ন পরিবার হলে আলাদা কথা। সাধারণ পরিবারের মধ্যে বিয়েতে যোগ্য পাত্র প্রমাণের প্রধান মাপকাঠি ছিল সুস্থতা ও কর্মদক্ষতা।
আমার দাদু ছিলেন গরীব ঘরের সন্তান, কিন্তু দাদীরা ছিলেন অবস্থা সম্পন্ন পারিবারের, বর্তমান থলিপাড়ায়, মহালছড়িতে। দাদীর পরিবার দাদাকে, পছন্দ করলেন শুধুমাত্র কৃষি কাজের দক্ষতা দেখে। দাদী বিয়েতে রাজী ছিলেন না, কিন্তু সেই সময়ে অভিভাবকদের বিরুদ্ধে যাওয়া ছিল কঠিন। দাদী, দাদাকে নিয়ে এক বাড়িতে সংসার করলেও ৫ সন্তানের জননী হওয়ার পরও দাদী, দাদার সঙ্গে একটি বাক্যও বিনিময় করতেন না। রোদে মেলে দেওয়া, দাদার পরনের কাপড় বৃষ্টিতে ভিজে যেতো, দাদী তুলতেন না।
দাদার বাড়ি ছিল বর্তমান চোংড়াছড়ি মৌজায় চোংড়াছড়ি গ্রামে আর দাদীর বাড়ি ছিল বর্তমান থলিপাড়া মৌজায়। তাদের বিয়ের পরে ঘর বাঁধলেন চোংড়াছড়ি মুখ ছড়ার পাড়ে, চেঙ্গী নদীর কুল ঘেষে।
মারমা ভাষায় ছেএখ্যং থেকে চোংড়াছড়ি বা চাকমা ভাষায় চংগড়াছড়ি থেকে চোংড়াছড়ি হয়েছিল মূলত একটি মিথ থেকে। এই পার্বত্য অঞ্চলে নাকি এক সময় গুপ্তধন সংগ্রাহকদের বিচরণ ছিল। তারা লুকিয়ে থাকা গুপ্তধনও নাকি সংগ্রহ করতে পারতেন [মারমারা তাদের ‘শঅ-লঅ-সা’ নামে চেনেন এবং আমার মায়ের ধারণা, ‘শঅ-লঅ-সা’রা মূলত বর্মী]। আমাদের চোংড়াছড়ি ছড়াতে নাকি স্বর্ণের শিংওয়ালা বলগা হরিণ ছিল। সংগ্রহের জন্য খুব চেষ্টাও নাকি চলেছিল, সেই থেকেই এলাকাটির নাম হয় ছেএখ্যং বা চংড়াছড়ি, যা শিংওয়ালা বলগা হরিণের কথাই বলে।
চংড়াছড়ি বা ছেএখ্যং ছড়ার উপত্তি পশ্চিমের পাহাড় আর শেষ হয়েছে আমাদের পাড়ার সামনে চেঙ্গী নদীতে। আমাদের ছেলেবেলা কেটেছে এই ছড়াতে মাছ ধরে। অল্প কিছু সময় ব্যয় করতে পারলেই সারাদিনের মাছের চাহিদা মিলে যেতো। আমরা ছোট ছিলাম বলে, গ্রামের প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষেরা আমাদের নিয়ে যেতেন মাছ কুড়ানো বা মাছ বহন করানোর বয় হিসেবে। মাছ ধরার বয় হলেও সমান ভাগের এক ভাগ মিলতো। মাছ ধরতে গিয়ে গ্রামের প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষ কিংবা নারীরা জাল দিয়ে ধরতে যেতেন তা কিন্তু নয়। খালি হাতেই মাছ ধরতেন। পাড়াবাসী নারী পুরুষের প্রত্যেকের এক একটি হাতই যেন এক একটি মাছ ধরার জাল। কচুরিপানা টেনে তুলে কিংবা পানির নিচ থেকে খালি হাতেই মাছ তুলতে পারতেন। ছড়ায় কিংবা নদীতে থাকা ঝোপ-ঝাড় আর গাছের সুরঙ্গ, ছড়ার কোনা-কোনি, চিপায়-চাপার সামনে পড়লেতো কথাই নেই। কাদা মাটির ভিতর থেকে খালি হাতেই বড় বড় কুচিয়া মাছ ধরতো। দুলাল চৌধুরী কিংবা রাখাল চৌধুরীর বাঁধ ঘোনার উপরের দিকে গেলেতো মনে হতো যেন কুচিয়া মাছের কূয়া। গ্রামের কংজ, মংহ্লা প্রুদের সঙ্গে কতবার গিয়েছি হিসাব নেই। কোনকোনদিন কুচিয়া মাছের সাইজ দেখে ভয়ও লাগতো। চারিদিকে মাছ ভরে থাকলেও পাড়াবাসিরা প্রয়োজনের মাত্রাতিরিক্ত ধরতেন না। খুব অভাব থাকলে অল্প কিছু পরিমাণ মাছ ধরে বিক্রি করতেন মাত্র।
আমি যে ছড়ার কথা বলছি, সেই ছড়াতে দাদা-দাদীরা নাকি বড় বড় মাছের ভয়ে মাছগুলো ধরতেও ভয় পেতেন। অল্প বৃষ্টি নামলে ছড়াতে মাছের ছুটাছুটি আর মাছের ডাকাডাকির শব্দগুলোর কারণেও নাকি ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করতো।
দাদা-দাদীরা মাছের ভয়ে মাছ ধরে না খাওয়ার গল্প যে সত্য তা আমি বুঝতে পারি। কেননা আমি নিজেও মাছের ভয়ে নদীতে ডুব দিতাম না। শিং মাছের খেলা দেখলে ভয়ে উঠে পরতাম। আর মা আমাদের স্মান করাতে গিয়ে গলায় ধরে নদীতে ডুব দেওয়াতেন। মহালছড়িতে মাছের গল্প বিশ্বাস করাতে পাঠকদের কতটুকু সক্ষম হবো জানি না, আমরা একই পরিবারের হয়েও আমার ছোট ভাইদেরকে, আমাদের দেখা মাছের গল্প বললে উড়িয়ে দেওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
মাছ ধরার প্রযুক্তি ছিল খুবই সাধারণ। গ্রামের বা পাড়ার দুই/এক পরিবারের হাতেই থাকতো ১টি কি দুটি হাত জাল। মাছ ধরার জাল থাকা মানে, আমাদের ছেলেবেলায় একটা কিছু, পরিবারটির সংগৃহিত সম্পদ হিসেবে গণ্য হতো। মহালছড়ি বাজারে পেশাদার জেলে সম্প্রদায় হলো সিলেটিরা। তাদের বসতি থানা ঘাটেই। এখনো সেই জায়গাতেই তাদের অনেকে রয়েছেন। কিছু সংখ্যক মাত্র সেখান থেকে বের হয়ে অন্যান্য জায়গায় ঘর তুলেছেন। সিলেটিরা প্রতিদিন সন্ধ্যায় নদীর মাঝ বরাবর নৌকায় কিংবা নিজেদের বসতভিটায় জড়ো হয়ে গান ধরতেন। তাদের গান অনেক দূর থেকে শুনা যেতো। সন্ধ্যা নামলেই চারিদিকে সুনসান পরিবেশ বিরাজ করতো বলে, অনেক দূর পর্যন্ত গানের সূর পৌছতে পারতো। সেই সময়ে একমাত্র সিলেটিদেরই ছিল মাছ ধরার বড় জাল। তারা নদীতে বড় এলাকা জুড়ে জাল ফেলে মাছ ধরতে পারতেন। তাদেরকে খুব বেশি দূর যেতে হতো না। উপজেলা ঘাটের আশেপাশেই মাছের জাল ফেলে থামতে হতো। দাম কম। লোকজনও কম। এত এত মাছ ধরে কোথায় বিক্রি করবেন তারা? তাই অতিরিক্ত মাছ ধরার প্রশ্নই আসতো না। কাছকি মাছ টাকায়২-৩ কেজি পর্যন্ত মিলতো। কোন কোনদিন ১টায় ১কেজি পর্যন্ত উঠতো মাত্র। আমি ১৯৯২ সালের দিকে কেজিতে ২-৩টাকা পর্যন্ত কিনেছিলাম বলে মনে আছে। সিলেটিরা জাল টানার সময় নিজেদের ভাষায় এক রকম ছন্দের তালে তালে জাল টানতেন। আমার মা’র কাছ থেকে জেনেছি ‘এই সিলেটিদের আগমনের আগে নাকি যোগী নামে হিন্দু জনগোষ্ঠীদের একটি দল কাপ্তাই বাঁধের পানি উঠলে মাছ ধরতে চলে আসতেন। পানি নেমে গেলে তারাও ফিরে যেতেন। পাহাড়ের ধান কাটার জন্যও নাকি ৫জন, ১০জনের দল গঠন করে কিছু বাঙালী মুসলিমরা ধান কাটতে চলে আসতেন। তারা চুক্তিতে পাকা ধানগুলো কেটে, মাড়াই করে দিয়ে যেতেন’।
খালি হাতেই যেখানে মাছ ধরতে পারতেন, সেখানে জালের ন্যায় নতুন প্রযুক্তির দরকারও ছিল না। তবে বাঁশের চুঙ্গা, কুচিয়া মাছ ধরার ‘দুক’ [(মারমা শব্দ দুক), মাছ ভেদে দুক কয়েক ধরনের হয়ে থাকে)] ছাড়াও নারীদের উপযোগী লুই (চাকমা), য়্যাকসে (মারমা) বা লুসি (ত্রিপুরা) ব্যবহার হতো আবার নদীতে ডালপালা ফেলে রেখে খাঁড়ি তৈরি করে কয়েকদিন অন্তর মাছ ধরা হতো। নারী-পুরুষেরা দুপুরের কাজের ফাঁকে ১০-২০ মিনিট সময় ব্যয় করতেন, মাছ দিয়ে দুপুরের গরম গরম ভাত খাওয়ার জন্য। কিংবা নারী শ্রমিক বা পরিবারের নারীটি স্মান করার ফাঁকে মাছ ধরার কোনো একটি প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরিবারকে মাছ রান্না করে খাওয়াতেন। বাংবু ব্যবহার হতো বৃষ্টির দিনগুলোতে। ছোট মাছের দল বৃষ্টির দিনগুলোতে উজানে উঠতে গিয়ে বাংবুতে ধরা পড়তে হতো। আর কয়েকদিন ধরে ঝড় বৃষ্টির দিনগুলোতে ধান্যজমিতে পানি উঠলেই ঘোলা পানিতে বড় মাছ ধরা পড়তো। ঘোলা পানিতে কাঁটা ধান ক্ষেতে বড় মাছের ছোটাছুটি বুঝা যেতো বলে অনেকে কুপ দিয়ে ধরতেন। এক একটা মাছের সেই কি সাইজ। ২০ কেজি, ২৫কেজি, ৩০ কেজি। একটা মাছ ধরতে পারলেই, কাটতে পারলেই দুই তিনজনকে বহন করতে হতো। মাছ কাধে বহন করছে বটে, মাছের অনেকটা মাটিতে পড়ে টেনে টেনে চলতে দেখেছি।
আমাদের ছেলেবেলা কেটেছে মাছের রাজ্যে। নদীতে নামলে মাছ এসে শরীরে কামড় দিতে চলে আসতো। শরীরে ঘা থাকলে মাছ ঠুকা দিয়ে খেতো। আমার মাও তাই বলতেন, ‘প্রথম প্রথম মহালছড়িতে যখন এসেছিলেন, স্নানের জন্য পানিতে নামলেই নাকি ইচা মাছগুলো ঠুকা মারতো’। মায়ের মতে, ‘কাপ্তাই বাঁধের পানি আসার প্রথম কয়েক বছর কোনো পেশাদার জেলেই ছিলো না, ফলে নৌকাতে গেলে পোনাসহ বড় বড় শোল মাছের কামড় খাওয়ার ভয়ে সাবধানে নৌকা চালাতেন’। তাঁর মতে, ‘কাঁপ্তাই বাঁধের প্রথম কয়েক বছর নদীতে মাছ ভরে গিয়েছিল’। আমাদের সময় পাহাড়ে ইলিশ বলতে ছিল বড় চাপিলা মাছ। দুই আঙ্গুল সাইজের বড় চাপিলা মাছের ভাজি মজাই আলাদা। বেশি মাছ ধরা পড়লে বা সংরক্ষণ করতে হলে শিক করে রান্না ঘরে চুলার ওপরে রেখে দেওয়া হতো। বড় শোল মাছ, শোল মাছের মাথা, ফলি মাছ বেশির ভাগই শিক করে খাওয়া হতো।
পাঁচ মিশালি ছোট মাছ পেলে মায়েরা কলা পাতায় রান্না করতেন। ছোট মাছের সাথে জুমের মসলা উপাদান দিয়ে রান্না অন্য রকমের স্বাদ সৃষ্টি করতো। আর বাঁশের চুঙ্গায়ও ছোট মাছের রান্নার দারুণ প্রচলন ছিল। রোগীদের শিং মাছের ঝোল বা শিং মাছের সাথে হলুদ দিয়ে রান্না করে দেওয়া হতো। টাকি মাছ পেলেও হলুদ দিয়ে রান্না করতেন। বড় শোল মাছের সাথে চালের গুড়া দিয়ে রান্নাও ভালো লাগতো।
কাপ্তাই বাঁধের পানি স্থির হয়ে উঠলে চারিদিকে সাদা আর লাল রঙের শাপলা ফুলের বাগান হয়ে উঠতো। শাপলা ফুলের পাতায় পাতায় এক ধরনের গোলকৃতির শামুক [মারমা ভাষায় খুদুক-বাঘ] পাওয়া যেতো। আমরা সংগ্রহ করে সিদ্ধ করে খোসা ছাড়িয়ে লবণ দিয়ে পিচ্ছিল কমিয়ে রান্না করতাম। সেই সময়ে কাঁশফুলও ফুটে সারা এলাকা সাদায় ভরে তুলতো। আমাদের অনেকে নৌকাযোগে কাঁশফুল সংগ্রহ করে তোষক তৈরি করতেন। আমাদের বাড়িতে যত তোষক ছিল সবই ছিল কাঁশফুলের তৈরি।
কাপ্তাই বাঁধের পানি আমাদের যোগাযোগের সুবিধা তৈরি করে। কৃষকেরা তাদের উৎপাদিত ফলমূল নৌকা যোগে আনা-নেওয়া করতে পারতেন। যারা অবসরে মাছ ধরতেন, তাদের প্রত্যেকের নিকট একটি করে নৌকা থাকতো। নৌকা তৈরি কিংবা মেরামত সকলে করতে পারতেন না। যারা নৌকা বানাতে কিংবা মেরামত করতে পারতেন, এলাকায় তাদের সকলে চিনতেন এবং সময়ে সময়ে তাদের ডাক পরতো। তাদের যত্ন নিয়ে আপ্যায়ন করা হতো।
আমাদের বেড়ে উঠার গল্পে যাদের কারিগরি জ্ঞান, দক্ষতা ছিল, তারা প্রত্যেকে তাদের কাজের গুণে পরিচিতি লাভ করেছিলেন। যেমন, বিভিন্ন উৎসব সময়ে ফানুস বানানো, ফার্ম লাইট জ্বালাতে জানা সকলের কাছে ছিলেন পরিচিত মুখ। স্কুলবেলায় দেখেছি আমাদের পাড়ায় বেশি হলে ২-৩টা ফানুস বানানো হতো, আর বড় সিঙ্গিনালা পাড়া থেকে ১০-১২টি অনেক সময় ২০-২৫টি পর্যন্ত উড়ানো হতো। সিঙ্গিনালা বড় গ্রামটি নানা পাড়া বা অংশে ভাগ হলেও উৎসবগুলো মিলেমিশে উদযাপন করতেন। চারিদিকে পানিতে ভরে গেলে সিঙ্গিনালা গ্রামের মানুষেরা মাছ ধরতেন, তাদের অনেকে গাছ-বাঁশ বিক্রি করে জীবন ধারণ করতেন।
স্কুলবেলার শেষ সময়েও বাজারের রাস্তায় খোলা লবণ ফেলে, পাতায় মুড়িয়ে বিক্রির চল দেখেছি। লবণ মুড়িয়ে বিক্রি করা লম্বা পাতাগুলো এখন আর দেখা যায়না। শুকর মাংসও বিক্রি চলতো পাতায় মুড়িয়ে। শুকর মাংস আর লবণ একই ধরনের পাতা দিয়ে মোড়ানোর চল ছিল (পাতাটি মারমা নামে অলুই-ফাক)। অলুইফাক পাতার সংকট থাকলে আরেক ধরনের গোলাকৃতির ‘খুওয়েংবাং’ এর পাতার ব্যবহার হতো, এই পাতাটি শুটকি বিক্রেতাগণও ব্যবহার করতেন। মাছ বিক্রেতাগণ বহনের সুবিধাদি দিতে মালা গেঁথে বাজারে তুলতেন। যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম নৌকা বা লঞ্চ বলে মাছগুলো দূরের কোথাও যাওয়ার সুযোগ ছিল না। ফলে পাহাড়ি জেলেরা অতিরিক্ত মাছ শুকিয়ে বাজার দিনে শুটকি হিসেবে বিক্রি করতেন।
কাপ্তাই লেকের পানি শুকাতে শুরু করলে চারদিকে মাছের স্তুপের দেখা মিলতো। যেদিকে যাই, মাছের গন্ধ পাওয়া যেতো। মা শোল আর টাকি মাছের দল এখন আর দেখা যায়না বললেই চলে। এক একটি শোল বা টাকি মা মাছের পোনা কয়েক হাজার হবে। আমরা অবুঝ শিশুরাও মাঝে মাঝে মা মাছকেও বড়শি দিয়ে ধরে ফেলতাম। আমাদের ছেলেবেলায় মা শোল বা টাকি পোনাসহ ধরতে পারলে, আলাদা রান্না আইটেম হতো। আমি স্কুলবেলায় অনেকবার মা শোল মাছ ধরেছি, যা এখন আমাকে ব্যথিত করে।
পানি শুকিয়ে গেলে লেকের বিভিন্ন ঘোনায় আটকে থাকা পানিতে প্রচুর মাছ পাওয়া যেতো। আটকে থাকা পানি টিন, বালতি কিংবা গামলা দিয়ে পানি সেঁচে বা অপসারণ করে করে হাটু বা কোমর পর্যন্ত কাদায় মাছ ধরার মজাতাই যেন আলাদা। এমন মাছ ধরার পদ্ধতিতে গ্রামের সকলের কাছে মাছের ভাগ পৌছে যেতো। ঘোনার মালিক পক্ষের মাছ ধরা শেষ হলে, গ্রামের সকল ছেলে মেয়ে মাছ ধরতে নেমে পড়তেন। মালিক পক্ষের পক্ষে সব মাছ ধরা সম্ভব হতো না। কাদায় অনেক মাছ ডুব দিয়ে থাকে এবং গ্রামবাসীরা সে মাছগুলো খুঁজে বের করেও বেশ ভালো পরিমাণের পেয়ে থাকেন। কিছু কিছু ঘোনায় অনেক পানি জমা থাকে, সেসব ক্ষেত্রে মেশিন দিয়ে পানি অপসারণ করা হয়ে থাকে। অল্প এবং মানুষের পক্ষে সম্ভব হলে কয়েকজন মিলে সারাদিন পানি সেঁচে মাছ ধরে। বড় ঘোনার পানি সেঁচের ক্ষেত্রে মেশিন দিয়েও কয়েকদিন পর্যন্ত লেগে যেতে দেখা যেতো। পানি সেঁচে মাছ ধরার পদ্ধতিতে মালিক পক্ষ পানি যতদূর শুকাবে ততদূর মাছ ধরে নামতে থাকবে। মালিক পক্ষের পিছনে থাকবে গ্রামবাসীরা। মালিকের পিছনে থাকা মাছগুলো যে পাবেন, মাছ তারই। অনেক সময় মালিকের পিছনে বড় মাছ দেখা দিলে মালিক পক্ষ কাদা ছুড়তে ছুড়তে গ্রামবাসী ছেলেমেয়েদেরকে দূরে ঠেলে দিয়ে মাছগুলো ধরার চেষ্টা করতেন। গ্রামবাসীদের কেউ বড় মাছ ধরে ফেললে মালিক নিয়ে নিতেন। আবার বড় মাছ কোনো ভাবে, পিছনে সাড়িতে উঠে গেলেও কাদা ছুড়ে দিয়ে ধরতে বারণ করতেন। ফলে মাছ ধরতে গিয়ে এমন ‘কাদা ছোড়াছুড়ি’র কারণে সারা শরীর কাদায় ভরে যেতো।
সিলেটি জেলে সম্প্রদায়ের সাথে এলাকাবাসীর কোনো বিরোধ হতে কখনো দেখিনি। সিলেটিদের মধ্যে চাওয়া-পাওয়ার সীমাবদ্ধতার কারণে হয়তো এলাকাবাসীর সঙ্গে কোনো বিরোধ বাঁধেনি। সিলেটি জেলে সম্প্রদায়দের যাদের দেখেছি, তাদের কেউ আদি ভিটায় ফিরে গিয়েছেন বলে শুনা যায়নি। তাদের পরর্বতী প্রজম্মরা মহালছড়িতে থেকে যায়। তবে এদের সংখ্যা খুব বেশি নয়। তাদের সংখ্যা কারোর জন্য হুমকিও নয়।
সিলেটিদের যুগে পাহাড়ে বড় জাল ছিল, শুধু তাদের হাতেই। পাহাড়িরা মাছ ধরতো বাঁশ বা হাতের তৈরি সহজলভ্য প্রযুক্তি দিয়েই। পরর্বতী সময়ে পাহাড়ে প্রচুর নতুন লোকের বসতি তৈরি হয়। তারা নিত্য নতুন প্রযুক্তি আমদানি করার মাধ্যমে দেখতে দেখতে নদীতে মাছসব মিলিয়ে যেতে থাকে। মাছের অবাধ বিচরণ, মাছের খেলা, মাছের দল, মাছের প্রতিযোগিতা, মাছের লাফালাফি সব থেমে যেতে থাকে। বিশ্বাস করবেন কিনা জানি না, সন্ধ্যার দিকে আমরা ঘরের পিছনে যেতামই না। বড় মাছের লাফালাফি শুনে আমরা ভূত কিংবা প্রেতের উপস্থিতি কল্পনা করে ভয় পেতাম। মা বলতেন, ‘মাছের লাফালাফিতে তাদের রাতের ঘুমও নাকি ভেঙে যেতো’। আমারও খুব মনে আছে, পাড়ার পাশে ক্যাম্প স্থাপনের আগে পর্যন্ত আমাদেরও হরিণদের ডাকে রাতে ঘুম ভাঙ্গতো।
আমাদের বেড়ে উঠার গল্পে ঘর থেকে একটু বনের দিকে তাকালেই বন মোরগ, শুকরের দল, হরিণের দলের দেখা মিলতো। আমাদের দেখে ভয়ে পালিয়ে যেতে দেখিনি। আমরা বরং বানরের দল, হনুমানের দলের ভয়ে সাবধানে চলাফেরা করতাম। সেই সাথে বক আর বাদুরের দলতো গাছের ডালপালা দখলে নিয়ে সারাদিন ঝগড়ায় মেতে থাকতো। শীতকালে অতিথি পাখিদের দল আসতো। রঙবেঙের পাখি যা শিশুদের কল্পনা শক্তিকে বাড়িয়ে দিতে সহায়তা করতো।
আমরা মানুষরা কোনোকিছুই টিকিকে রাখতে পারলাম না। প্রাকৃতিক বনসব ধরে ধরে ইচ্ছে করে উজাড় করে দিলাম। মাছ ধরে ধরে শেষ না হওয়া পর্যন্ত থামলাম না। লোভীদের লোভ দেখানোর ফলে সব শেষ করে এখন সম্বল হিসেবে চাষের মাছে এসে থামলাম।
প্রকৃতি প্রেমী নানান দেশিদের, যখন তাদের দেশে নানান এলাকায় ঘুরতে গিয়ে মাছের দল, মাছের প্রতি যত্ন এবং প্রয়োজনটুকু নিয়ে ছেড়ে দিতে দেখা যায়, তখন আমার ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে। পাহাড় সমাজে, পাহাড়িদের মূল্যবোধ ছিল প্রয়োজনটুকু সংগ্রহ করে, সংরক্ষণ করা।
আমি প্রায় প্রতিদিনই মাছ ধরতাম। কোনো কোনদিন বড়দের সঙ্গে মাছ ধরার বয় হিসেবে যেতাম। কোন কোনদিন গ্রামের আশেপাশে মাছ ধরতে দেখলে মাছ কুড়াতেও যেতাম। একটু বড় হয়ে নিজেই বড়শি দিয়ে মাছ ধরতাম। প্রায় প্রতিটি বড়শিতে মাছ ধরা পড়তোই। বড় বড় কুচিয়া মাছ বা বাউন মাছ ধরা পড়লে, বড়শি উদ্ধার করতে গিয়ে ভয়ে ভয়ে ঘোলা পানিতে সাপ ধরা পড়লো কিনা ভেবে ভয় পেতাম। আমি মাছ ধরতাম বলে অনেক সময় বাবাকে মাছ কিনতে হতো না। বাবা তাঁর খাবার প্লেটে প্রতিদিন, প্রতিবেলায় মাছ কিংবা মাংস থাকা চাইতেন।
নতুন বসতি দিয়ে মহালছড়ি ভরে গেলো। রাস্তা-ঘাট দ্রুত গতিতে তৈরি হলো। গাড়ি চলতে শুরু করলো। থানায় বরফ কল স্থাপন হলো। আমাদের মাছ দূরে, অনেক দূরে, ছুটতে শুরু করলো। গভীর রাতে মাছের গাড়ি ছুটে চলতো দূর দূরান্তের গন্তব্যে। দেখতে দেখতে আমাদের মাছ অন্যদের দখলে যেতে শুরু করলো। দেখতে দেখতেই যেন চোখের পলকে ভালো মাছ পাওয়া দুস্কর হয়ে উঠলো। বাজারে ভালো মানের মাছ উঠলে, ধরা পড়লে একটি বিশেষ জায়গায় চলে যেতো। এমনি চোখের পলকে ভালো তাজা মাছ, উন্নত প্রজাতির মাছ খাওয়ার বদলে পচা ছোট মাছ খেতে শুরু করলাম ধীরে ধীরে। এখন ব্যাপারটি অস্বাভাবিক মনে হলেও তখন কখন কখন ঘটে গেলো এমন বড় ঘটনা যেন ঢেরও পাওয়া গেলো না।
বড় মাছ, তাজা মাছ বাজারে দেখলে দাম জিজ্ঞেস করার বদলে বাবা ছোট প্রজাতির নরম মাছই কিনে খাওয়া শুরু করলেন। বাবা বলতেন, ‘ছোট মাছ বেশি বেশি খাবে, ছোট মাছ চোখের জন্য ভালো। হাড়ের জন্যও ভালো’।
এখন পকেটে টাকা থাকলেও মহালছড়িবাসী মহালছড়ির মাছ খেতে পায় না। চলে যায় দূরে অনেক দূরে। মহালছড়িতে সামুদ্রিক মাছে ভরে উঠেছে। পাশাপাশি চাষের মাছে ভরে গেছে। এখন বিক্রেতারা চাষের মাছকে বলছে নদীর মাছ, আর দূরের মানুষজনকে বলছে মহালছড়ির মাছ। বাবাদের যুগে অনুন্নত মহালছড়ি, এখনো অনুন্নতই রয়ে গেছে। মহালছড়ি মাছ বলে সুনাম ছড়ালেও, উপজেলা মহালছড়ি তার সুনাম ধরে রাখতে পারেনি। এখন অনেকে মহালছড়িকে নিয়ে রসালো গল্প বলে।
মহালছড়ি থেকে শুধু বড় মাছ, নানান প্রজাতির মাছ হারিয়ে যাইনি, একইসাথে ভালো মানুষগুলোও একে একে হারিয়ে গেলো। জলজ পোকা ও ব্যাঙাচি প্রজাতির বেশ কয়েকটি মাছ এখন নদীতে দেখাই যাই না। মারমা নামের কিস-বক, রুবুসি চোখেই পড়ে না আর। নদীর কুচিয়া কোথায় যেন মিলিয়েই গেলো। নদীর কচ্ছপ, পাহাড়ের কচ্ছপ দেখি না ২০-২৫ বছর ধরে। ছড়ায় পাওয়া নানান প্রজাতির শামুক, ইশা, কাকড়া আজ বিলুপ্তির পথে। ছড়ায় পাওয়া কালো কাকড়ার বদলে নদীতে লাল কাকড়া এক সময় বেড়ে গিয়ে কৃষকদের অতিষ্ঠ করে তুলেছিল, সেই লাল কাকড়াও এখন কমার দিকে। আস্ত দাড়ি (কাজলি মাছ) বলে আট দাড়িওয়ালা মাছ বেশ দাম ছিল। মনে পড়ে সর্বশেষ কেজিতে ৪ টা থেকে ৮ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। আমার বাবা, কিনতে কিনতে এক সময় মাছও ১ পোয়া করে কিনতেন। বাবা কম কেনার কারণে পরিচিতজনরা, বাজারের দেখাপাওয়া লোকজনরা, আড়ালে হাসাহাসি করতেন। আমাদের সুযোগ পেলে কেউ কেউ বলেও ফেলতেন। মা’র থেকে পাওয়া সাহসী গল্পের কারণে, ১ পোয়া কেনার গল্পের কারণে লজ্জা পাওয়ার বদলে সাহসী করে তুলতো, গর্বিত করে তুলতো। কারণ আড়ালে অল্প শিক্ষিতরা মজা করে গল্প বানালেও, শিক্ষিতজনদের মাঝে বাবার গ্রহণযোগ্যতার কারণে অনেকে সম্মান করতেন। বাবা প্রতি সাপ্তাহিক বাজার দিনে শুকরের ১টি পা বা এক পোয়া মাংস কিনবেনই কিনবেন। বাজার দিনে কাচাবাজার কেনার শেষে অনেক মানুষের ভিড় ঠেলে নিচে মাংস বেচাকেনার শেডের দিকে যেতেন, শুধু এক পোয়ো বা ১টি শুকরের পা কিনবেন বলে। ১০-২০ টাকায় ১টি পা মিলতো। মাছের রাজ্যে বেড়ে উঠা বাবাকে একদিন ১ পোয়া মাছও কিনতে হলো। কোন কোনদিন পচা মাছ কিনে আনলে, মা বকা দিতে দিতে পরিষ্কার করে আদা-রসুন দিয়ে রান্না করে দিতেন। মাছের রাজ্যে থাকা পরিবারটিও একদিন ১পোয়া মাছ দিয়ে ১০-১২ জন খেতে শিখলো।
লেখক পরিচিতি:
ঞ্যোহ্লা মং, পরিচালক, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট, খাগড়াছড়ি।