তারুণ্য, রাজশাহী

তারুণ্য, রাজশাহী আমরা রাজশাহীর সাধারণ ও সচেতন তরুণ সমা?

24/05/2024

টিফু (২)
প্রদীপ মাহবুব .......................

এবার কুকুর ছানাটি আনার পর বাড়ির সবাইকে দেখানো হলো। এতো সুন্দর ছানা দেখে সবাই আহ্লাদে আটখানা। ছোট বড় সবাই কুকুরের ছানার ব্যাপারে সিরিয়াস হয়ে গেলো। কোথায় রাখবে, কী খাওয়াবে, শীতে কী পোষাক পরাবে- সব মিলে এক এক হুলুস্থুল কাণ্ড। এর পাশাপাশি কুকুরের ছানাটির নাম ঠিক করা হলো। নাম দেয়া হলো টিপু। আমাদের আঞ্চলিক ভাষায় যার নাম হয় 'টিফু।' এই টিফুর জন্য দাদার (নানাকে দাদা ডাকতাম) পশ্চিমের ভিটে একটা গর্ত করা হলো। আমরা পাঁচজনে মিলে গর্তটা করলাম। সেখানে খড় আর পাটের তৈরী বস্তা দিয়ে ঠাণ্ডা মাটি ঢেকে দেয়া হলো। তারপর টিফুকে ওখানে রাখা হলো। সারাদিন টিফুকে খাওয়ানোর কতো চেষ্টা। চার পাঁচ দিন বয়সের টিফুকে বোতলে দুধ ভরে খাওয়ানোর চেষ্টা করা হলো। পরে স্বপন মামা নিজ হাত টিফুর মুখে হাত ঢুকিয়ে দুধ ঢেলে দিয়েছিলো। এভাবে সারাদিন পার করার পর সন্ধ্যা বেলায় যখন টিফুকে গর্তে রাখা হলো তখনই সে কান্নাকাটি শুরু করলো। তারপর সে সময়ে চারপাশে শেয়ালের উৎপাত। আমরা সারারাত জেগে জেগে টিফুকে পাহারা দিলাম। এরপরের দিন দাদার উত্তরের ঘরের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে আর একটা গর্ত করে গর্তের মুখ কাঠ দিয়ে বন্ধ করার ব্যবস্থা করে টিফুকে সেখানে রাখা হলো। সেখানে টিফু খুব একটা কান্নাকাটি করতো না। সেই সাথে ছোটন ভাই নিজের শার্ট কেটে টিফুর গায়ের জামা বানিয়ে দিলো। টিফুর জন্য একটা ফিডারের ব্যবস্থা করা হলো। সেই ফিডারেই টিফুকে ভাতের মাড়, দুধ আর পানি খাওয়ানো হতো। সবাই মনের খুশিতে টিফুকে খাবার দিতো।

এদিকে রাতে টিফু কান্নাকাটি না করলেও শেয়ালের ভয়ে আমরা রাতে জেগে থাকতাম। তবে আমাদের রাত জেগে থাকা ছিলো খুবই আনন্দের। শীতের সময় ধান কাটা হলে ধান মাড়াই করে সেই নাড়া দিয়ে পালা দেয়া হতো। পালা দুই ধরণের ছিলো। একটা হচ্ছে ধান মাড়াইয়ের পর ধানের কাঁচা খড় দিয়ে এক ধরণের পালা দেয়া হতো। যেটাতে কিছু ধান থেকে যেতো। আরেকটা বেশ কিছুদিন পর এই ধানের নাড়ার মুঠি খুলে দিয়ে উঠোনে ছিটিয়ে দেয়া হতো। সেখানে চার পাঁচটা গরুকে জোয়াল দিয়ে বেধে চারদিকে হাঁটানো হতো। এতে করে ধানের নাড়ায় থেকে যাওয়া ধান মাটিতে পড়তো। সেই মাড়াই করা খড় রোদে শুকিয়ে পরে পালা দেয়া হতো। এই পালার খড় সারা বছর গরুকে খাওয়ানো হতো। আবার সেই খড় জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ধানযুক্ত কাঁচা খড়ের এই পালা এক বিশেষ প্রক্রিয়াই বানানো হতো। ধানের নাড়া একটার উপর আর একটা রেখে গোলাকার আকৃতিতে বিশাল আকারের পালা বানানো হতো। এই পালার উচ্চতা মাটি থেকে পনেরো বিশ ফুটের মতো হতো। একজন পালার মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতো আর অন্যরা একটা একটা করে ধানের নাড়া ছুড়ে মারতো। এভাবে একটা বিশাল পালা বানানো হয়ে যেতো। সেই পালার ভেতরে বাসা বানিয়ে আমরা টিফুকে পাহারা দিতাম।

সেই বাসা বানানোর জন্য আমরা একসাথে কাজ করতাম। পালা থেকে একটা নাড়া টেনে খুলে একটু জায়গা বানাতাম। তারপর সেখান থেকে আরও কয়েকটা নাড়া সরিয়ে সুড়ঙ্গ এর মতো করে ভেতরের ঢুকতাম। ভেতরে ঢুকে সেখানে সাত আটজন বসা যায় এমন একটা ফাঁকা জায়গা বানাতাম। এই পালার একেবারে উপরের দিকে বিছানার চাদর দিয়ে ঢেকে রাখতাম যাতে কুয়াশা না পড়তে পারে। একে একে সবাই কাঁথা বালিশ নিয়ে পালার ভেতর ঢুকে সুড়ঙ্গ বন্ধ করে দিতাম। সারারাত বৃষ্টির মতো কুয়াশা পড়লেও নাড়ার কারণে খুব একটা শীত অনুভত হতো না। একটু পর পর আমরা টিফু বলে ডাক দিতাম। আর কুকুর ছানা শব্দ করতো। এরমধ্যে আবার আমরা কিচ্ছা শুনতাম। কিচ্ছা বলার জন্য সোহেল মামা ছিলো এক প্রকার ওস্তাদ। তিনি ছিলেন আরমান মামার ফুফাতো ভাই। তিনি নানানরকম কিচ্ছা শোনাতেন। টোনাটুনির কথা, রাক্ষসের কথা, ঝুলাঝুলির কথা, শাকছুন্নীর কথা- আরও কথা কী! এভাবেই রাত পেরিয়ে সকাল হয়ে যেতো। মাঝেমধ্যে কেউ কেউ আবার টিফুর গর্তের মুখ দেখে নিশ্চিত হতাম যে তার কোনও ক্ষতি হয়নি। এভাবেই কষ্ট করে টিফুর প্রতি যত্ন নিতাম। আমরা টিফুকে পেয়ে খুশি হলেও বন্ধুদের কাছে শুনেছি যে বাবলু ভাই আর তার ভাই শিবলু টিফুকে ফিরিয়ে নেয়ার জন্য পরিকল্পনা করেছে। এমনকি লোক মারফতে ভয়ও দেখানো শুরু করেছিলো।

২৪ মে ২০২৪ ইং
গ্লেনফিল্ড, অস্ট্রেলিয়া।

23/05/2024

টিফু (১)
প্রদীপ মাহবুব..........................

১৯৯৪ সালের শেষের দিকের ঘটনা হবে। সেই সময়ে দুটো প্রাণীর ব্যাপারে আমাদের খুব আগ্রহ ছিলো। প্রথমটি কুকুর আর দ্বিতীয়টি ছিলো পাখি। ছোটন ভাই, আরমান মামা, আজহার ভাই, আমি আর ইকবাল - এই পাঁচজন সারাদিন কুকুরের বাচ্চা আর পাখির বাচ্চার সন্ধানে ঘুরতাম। পাখির বাচ্চার গল্প অন্য একদিন করবো। কুকুরের বাচ্চা যত্রতত্র পাওয়া গেলেও পুরুষ কুকুর আর তার সাথে সুন্দর চেহারার কুকুর পাওয়া কঠিন ছিলো। প্রজননের সময় একটা কুকুর চার পাঁচটা বাচ্চা দিলেও পুরুষ কুকুর পাওয়া যেতো না। যদি পাওয়াও যেতো তবে সেটা দেখতে খুব একটা আদুরে আদুরে ছিলো না। কুকুরের বাচ্চার সন্ধানে ঘুরতে ঘুরতে একদিন বাবলু ভাইদের বাড়িতে একটা কুকুরের খোঁজ পাওয়া গেলো যেখানে সেই কুকুরের পাঁচটা নবজাতক বাচ্চার জন্ম হয়েছে। খবরটা বের করেছিলেন আরমান মামা। বাচ্চা জন্মানোর মাত্র দুই একদিন পরে ছোটন ভাই, আরমান মামা আর আজহার ভাই একটা কুকুরের বাচ্চা চুরি করে নিয়ে আসলো। সেই বাচ্চার ভালো করে চোখও ফোটেনি। দেশী কুকুরের বাচ্চা এতো সুন্দর, ফুটফুটে আর আদুরে হতে পারে এটা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না!

কুকুরটির রং ছিলো সাদা-কালো আর ডোরাকাটা। সাদা রঙের মাঝে হালকা একটা হলুদাভ। গলার নিচে আর কানের কাছে হালকা সাদা আর হলুদ রঙের মিশ্রণ কুকুরটিকে যেন বাঘের রূপে সাজিয়েছিলো। বাড়িতে নিয়ে এসে কুকুরটিকে ছোটন ভাইদের ঘরে রাখা হলো। পুবের দিকে মাটির ভিটা আর টিনের তৈরী ঘরটিতে তিনটা কক্ষ ছিলো। ঘরের মাঝের কক্ষের দক্ষিণের দিকে পশ্চিম কোণে একটা গাইলের ভেতরে কুকুরের বাচ্চাটিকে রেখে পাটের বস্তা দিয়ে ঢেকে রাখা হলো। এরমধ্যে কুকুরের বাচ্চাটিকে দুধ পান করানো হলো। গাইল হচ্ছে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী ধান ভান কিংবা শস্য কোটার কাঠের তৈরি বিশেষ এক জিনিস। বড় গাছের গোড়াতে গর্ত করে বিশেষ ডিজাইন করে এটা বানানো হয়। গাইলে ধান, চাল, ডাল বা অন্য কোনও শস্য রেখে ছেহাইট দিয়ে হাতে এগুলো ভানানো হয়। ছেহাইটও একটা লম্বা কাঠের টুকরা দিয়ে বানানো হয়। এই কাঠের টুকরাটি লম্বা হলেও এর ব্যাস গোলাকার আকারে বানানো হয় যাতে দুই হাতের মাঝে রেখে এটাকে সহজেই চারপাশে ঘুরানো যায়। ছেহাইটের এক পাশে লোহার গোলাকার পাত লাগানো হয় আর অন্যদিকের পাশে একটু সাপের লেজের মতো রাখা হয়। এখন আর গ্রাম বাংলায় গাইল আর ছেহাইট খুব একটা দেখা যায় না।

পরেরদিন সকালে আমরা সবাই স্কুলে চলে গেলাম। এদিকে গতকাল থেকেই বাবলু ভাই কুকুরের বাচ্চার খোঁজে এদিকে সেদিক দৌড়াদৌড়ি করছে। আমাদের জিজ্ঞেস করলেও আমরা না করে দিয়েছিলাম। সেদিন স্কুল থেকে ফিরে এসে দেখি কুকুরের বাচ্চাটি নেই। ছোটন ভাই ইকবালকে জিজ্ঞেস করলেন, কীরে ইকবাল, কুত্তার বাচ্চা কই? ইকবাল ভয়ে কোনও কথা বলে না। ছোটন ভাইয়ের রাগারাগি দেখে ইকবাল বললো, বাবলু ভাই আইছিলো। আমি গাইলের ভিতরেত্তে কুত্তার বাচ্চাডা দিয়া দিছি। ছোটন ভাই আর কিছু বললো না। অন্যদিকে বাবলু ভাই তো কুকুর ছানা ফেরত পেয়ে খুব খুশি।

তবে এই কুকুরের বাচ্চাটি আবারও আনার জন্য পরিকল্পনা শুরু হয়েছে। এরমধ্যে আমি বানিয়াগ্রামে আমার খালার বাড়িতে বেড়াতে চলে গেলাম। চার পাঁচদিন পরে এসে দেখি কুকুরের বাচ্চাটি আবার নিয়ে আসা হয়েছে। দেখেই খুশিতে মনটা ভরে গেলো। আরমান মামাকে জিজ্ঞেস করলাম, কেমনে আনছুইন মামা? ছোটবেলায় সমবয়সী হওয়ার জন্য মামাকে তুমি বলতাম। এখন অবশ্য আপনি বলে সম্বোধন করি। উত্তরে মামা বললো, সহালে আমি, ছোটন আর আজহার গেছি বাবলুরার বাইত। বাবলুর গোয়াল গরে কুত্তা ছাও লইয়্যা বয়্যা রইছে। কুত্তা ছাও ফুডাইলে ফাগলের মতো অয়্যা যায়। কেমনে কী করবাম কিছু বুঝতাছিলাম না। ছোটন গেছে গরের এক কুনাত আর আজার গেছে আরেক কুনাত। এরফরে বেড়াত একটা ইডা দিছি। কুত্তা লগে লগে গেউ গেউ কইর‍্যা বাইর অয়্যা আইছে। এরফরে আর একটা ইডা গরের উত্তরে দিছি। কুত্তা ইডার পিছে দৌড় দিছে। এইবা তিন চাইরডা ইডা দিছি আর কুত্তা ইডার পিছে দৌড় দিছে। এই ফাঁহে ছোটন কুত্তার ছাও লয়্যা দিছে দৌড়। এরফরে আমি আর আজার যহন দৌড় দ্যাম তহন কুত্তা কেমনে জানি বুইঝালাইছে যে আমরা ছাও লইয়্যা গেছিগা। কুত্তা আমরার দিগে দৌড় শুরু হরলে আমি আর আজার কুইট্টেয়া দৌড় দিছি। আমরা দৌড়াই আর কুত্তা দৌড়ায়। কুত্তা দৌড়ায় আর আমরা দৌড়াই। এমনে এক বোমা দৌড়ে কুত্তার ছাও লইয়্যা বাইত আইছি। আমি বললাম, বালা করছুইন মামা। কী সুন্দর কুত্তার ছাওডা!

২৩ মে ২০২৪ ইং
গ্লেনফিল্ড, অস্ট্রেলিয়া

16/05/2024

মেয়ে (শেষ পর্ব)
প্রদীপ মাহবুব ..........................

বাবার বাড়িতে কলির লাশ আনা হলো। কলির মৃত্যুর সংবাদে চারদিকে শুধু মানুষ আর মানুষ। গোসল করানোর পর কাফনের কাপড় পরিয়ে কলিকে যখন খাটিয়াতে রাখা হলো তখন স্বামী তার মত পাল্টে ফেললো। জজ মিয়ার এক কথা যে কলির লাশ স্বামীর বাড়িতেই দাফন করতে হবে। মেয়ে মানুষের মৃত্যুর পর তাদের লাশ স্বামীর বাড়ি দাফন হওয়া ফরয! এই ব্যাপারে আমাদের গ্রামের সকল মাতব্বর আর কলির শ্বশুর বাড়ির সবাই একমত। কিন্তু কলির মা-বাবা কিছুতেই একমত নন। কলির মা চিৎকার করে কাঁদলেও বাবা চাঁদরে মুখ লুকিয়ে চোখের পানি ফেলছেন। কাউকে বুঝতে দিচ্ছেন না যে উনার ভেতরে কী চলছে!

আমি তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হলেও বয়সে অন্যদের চেয়ে ছোট। চাইলেও কিছু বলতে পারছিলাম না। বাড়িতে আমার সমবয়সী যারা ছিলো তারাও ব্যাপারটার সাথে একমত ছিলো না। কিন্তু বড়দের মুখের ওপর কথা বলা অন্যায় ও বেয়াদবির শামিল তাই কেউ কিছু বলতে পারছিলো না। আমরা শুধু সবার কথা শুনছি আর মামা মামীর জন্য সমবেদনা অনুভব করছি।

কলির লাশ ফিরোজ ভাইজানের উঠোনে রেখে দুই গ্রাম আর পরিবারের মধ্যে তুমুল ঝগড়া চলছে। জজ মিয়ার বোন গলা ফাটিয়ে বলছিলো যে, দরকার হলে আরও একটা লাশ ফেলে হলেও লাশ স্বামীর বাড়ি নিয়ে যাবে। এরমধ্যে কলির এক চাচাতো চাচা বলে উঠলেন, মেয়েরা একবার বাবার বাড়ি ছেড়ে গেলে স্বামীর বাড়িতেই লাশ দাফন বাঞ্ছনীয়। পুরুষশাসিত সমাজের এক অপূর্ব দৃশ্য! লাশ ঘিরে প্রায় শত শত মানুষ। কারও কাছে কোনও সমাধান্ নেই। এছাড়া এলাকার নেতৃস্থানীয় লোকজনও সমধান দিতে ব্যর্থ। অন্যদিক বাড়ি থেকে ভেসে আসছে কলির মা আর ভাই-বোনের বুকফাটা আর্তনাদ। এইদিকে যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে। এরমধ্যে গ্রামের এক মুরুব্বি মানুষজনকে নিয়ে জানিয়ে দিলো যে, কলি যেহেতু মেয়ে এবং বিবাহিত সেহেতু তার দাফন বাবার বাড়িতে সম্ভব নয়। সমাজ ও ধর্ম রক্ষার জন্য কলির লাশের দাফন স্বামীর বাড়িতেই অপরিহার্য।

এরমধ্যে আমার বড় ভাই আজহার আর মামাতো ভাই ইকবালকে সাথে নিয়ে ঢাকায় আমাদের আত্মীয় মাওলানা মাহফুজুর রহমান মুক্তা ভাইয়ের কাছে ফোন দিয়ে জানতে চাইলাম, ইসলাম ধর্মে এমন কোনও আইন আছে কি না যে মেয়ে মানুষ মারা গেলে তাকে স্বামীর বাড়িতেই দাফন করতে হবে? উনি বললেন, এটা যারা বলছে তারা অন্যায় কাজ করছে। ইসলাম ধর্মে এমন কোনও আইন নেই। তিনি আরও যোগ করলেন, যারা বন্যার সময় মারা যান এবং কবর দেয়ার পরিস্থিতি থাকে না তখন তো আমরা তাদের লাশ পানিতে ভাসিয়ে দেই। এতে যদি ধর্মের ক্ষতি না হয় তাহলে মেয়ের লাশ বাবার বাড়িতে কবর দিলে ধর্মের কী ক্ষতি? এই ব্যাপারটি নিয়ে আমরা কয়েকজন কথা বলতে চাইলে বাড়ির মুরুব্বিরা থামিয়ে দিলো। আমরা রাগে যে যার মতো ঘরে চলে আসলাম। একটু পর আবার বের হয়ে যখন লাশের কাছে যাচ্ছি তখন দেখলাম জজ মিয়া আমাদের গ্রামে নির্বাচিত চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম শফিক (ভিপি শফিক) মামাকে কলির দাদার কবরের কাছে গাছের নিচে ডেকে নিয়ে বলছে, “যদি কলির লাশ আমাদেরকে দেন তাহলে আমার অলংকারের দরকার নেই। আর যদি লাশ না দেন তাহলে আমাকে আমার অলংকার দিয়ে দিতে হবে।” অলংকারের বদলে বউয়ের লাশের হিসাব নিকাশ! এ যেনো এক নষ্ট পুরুষ!

জজ মিয়ার এমন কথা শুনে আমার মেজাজ গরম হয়ে গেলো। আমি ইকবালকে ডেকে বললাম, আমার সাথে আয়। তাকে বললাম, আমি যা-ই বলি তুই শুধু হ আর হাত ঘুরাবি। কেননা ইকবালের গলা বেশ ভারি ও সুঠাম দেহের অধিকারী। শতশত মানুষের ভিড়ে উচ্চস্বরে বললাম, কার সাহস আছে? আসেন, সামনে আসেন? কলির লাশ স্বামীর বাড়ি যাবে না। ওর দাফন এখানেই হবে। কারো বুকে সাহস থাকলে থামাতে আসেন। সাথে সাথে বাড়ির কয়েকজন মুরুব্বি বললো, দেখ বাবারা, সমাজ ধর্ম কিছুই থাকবে না। আমি বললাম, সমাজ ধর্ম ছিলো কোথায়? টাকার অভাবে যখন কলির চিকিৎসা হচ্ছিলো না তখন তো কেউ তার খবর নেননি। টাকা দেয়া তো দূরের থাক, একবার দেখতেও যাননি। তখন ধর্ম যায়নি? তখন জাত যায়নি? তখন সমাজ যায়নি? আর এখন সমাজ নিয়ে এসেছেন? ধর্ম নিয়ে এসেছেন? কলির স্বামীকে বললাম, এই বেয়াদব, আপনার মা-বাবা যখন ওকে অত্যাচার করতো তখনতো কিছু বলেননি? ধর্মের কোথায় ছিলো যে, কলিকে অত্যাচার করতে হবে? হাসপাতালে প্রায় আড়াই লাখের মতো টাকা খরচ হয়েছে, দিলেন তো মাত্র পনেরো হাজার টাকা। তখন সমাজ-ধর্ম যায়নি? এই যদি হয় আপনাদের ধর্ম আর সমাজ তাহলে আমরা মানি না। যদি কারো বুকের সাহস থাকে ফেরান আমাদের। কলির লাশ এখানেই দাফন হবে। কেউ কথা বলবেন না। আমার সাথে সাথে ইকবালও গলা মেলালো। আমাদের রুদ্রমূর্তি দেখে সবাই লেজ গুটিয়ে চলে গেলো। ইমাম সাহেব জানাযা পড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। জজ মিয়া অযু করে জানাজার নামাজে আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু পাশ থেকে তার বোন তাকে টেনে হেঁচড়ে নিয়ে চলে গেলো। আর বলতে লাগলো, বৌয়ের জানাজা পড়তে হবে না! হতভাগা স্বামী! মরণকালে স্ত্রীর জানাজা পড়ার সৌভাগ্য তার হয়নি। কলির শ্বশুর বাড়ির লোকজন প্রতিশোধ নেয়ার প্রতিজ্ঞা ব্যক্ত করে সাপের মতো ফণা তুলে চলে গেলো। জানাজা শেষে কলিকে তার দাদা-দাদীর কবরের পাশে দাফন করা হলো।

অনেকদিন পরে জানলাম কলি মৃত্যুর কয়েকদিন পূর্বে বাবার বাড়ি এসেই মাকে বলেছিলো, "আম্মা এবার সংসার শেষ কইর‍্যা আইছি। এই দোযখে যাইবার লাইগ্যা আমারে আর কইবা না।" কলি তার মায়ের কাছে বলেছিলো, “আম্মা প্রথমের বাফরে কইছি, আমি মইর‍্যা গেলে তুমি যাতে আমার জানাযায় শরিক অইতারো। আমার উফরে যে অত্যাচার করছে তার শাস্তি যাতে এইডার অয়।” জীবিত থাকলে সৃষ্টিকর্তা কলির কথা না শুনলেও মরণের পর তার কথা শুনেছিলো। ধারণা করা হয় যে কলির ওপর শারীরিক অত্যাচারের কারণে তার মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়েছিলো। সেই রক্তক্ষরণের প্রবাহ তার বাবা-মা আর ভাই-বোনের রক্তেও প্রবাহিত হয়েছিলো। মা-বাবার শুকনো বাগানে কলি গোলাপের কলি হয়ে জন্মালেও ফুটন্ত গোলাপ হওয়ার আগেই অকালে ঝরে গেলো। রেখে গেলো দুটো পাপড়ি। প্রথম আর শাওন। আর জানিয়ে দিয়ে গেলো, মেয়েরা সর্বত্রই শৃঙ্খলিত।

(পরিমার্জিত)
১৬ মে ২০২৪ ইং
গ্লেনফিল্ড, অস্ট্রেলিয়া

15/05/2024

মেয়ে (২)
প্রদীপ মাহবুব..........................

প্রথমের জন্মের পর থেকে আমরা শুনেছি যে কলির শ্বশুর-শ্বাশুড়ি আর ননদ মিলে মাঝে মধ্যে তাকে মানসিক অত্যাচার করতো। সেই মানসিক অত্যাচারের ব্যাপারট তার সৌদি প্রবাসী জামাইকে জানালেও সে এ ব্যাপারে কোনও পদক্ষেপ নেয়নি। বিষয়টি কতোটুকু সত্য তা যাচাইয়ের সুযোগ ছিলো না। তবে জজ মিয়া যে খুব ভালো মানুষ ছিলেন না তা একটি ঘটনা থেকে প্রতিয়মান হয়েছিলো।

কলির ছোট দাদা (আমার নানা) ইউনূস আলী মারা যাওয়ার পর সে দেখতে আসলো। দাদার জানাযার পর সে লাশ দেখে বাড়িতে যাওয়ার সাহস পায়নি। যেখানে কলির ছোট দাদার জানাজা হয়েছে সেখান থেকে কলির বাবা-মায়ের ঘরের দুরুত্ব পঞ্চাশ মিটার। তার স্বামী বলেছিলো, তুমি যদি আজ্জয়া বাপের বাইত যাও তাইলে তোমারে তালাক দিয়া দিমু। কেউ কোনও প্রতিবাদ করেনি। প্রইবাদ করার সাহসও করেনি। তবে আমি রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে প্রতিবাদ করে বলেছিলাম, ঐ মিয়া, আফনে কিমুন বেয়াদ্দব যে কলিকে তার বাইত যাওয়ার লাইগ্যা দিতাছুইন না? কলি কী মানুষ না? একথা বলার সাথে সাথে কলির বড় চাচা আমার হাতটা চেপে ধরে বলেছিলো, বাবা নিজের মাইয়্যা অইলে বুঝবি। ছাইড়্যা দেও। হে হের বউ লয়্যা যাউগগ্যা। কলি অহন আমরার কেউ না। এরপর কলি প্রথমকে কোলে নিয়ে মা-বাবা আর ভাই-বোনের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতে থাকতে রিক্সায় করে চলে গেলো। মনে মনে ভাবলাম, আহারে জীবন! মেয়েদের এ কেমন জীবন! সাথে সাথে এও ভাবছিলাম, যে মল্লিক মিয়ার কণ্ঠ আর শারীরিক অবয়ব দেখে বাড়ির সবাই বাঘের মতো ভয় পায় সেই লোকও কিনা এতো অসহায়!

কলির সংসার সম্পর্কে আমার এর চেয়ে বেশী ধারণা ছিলো না। এরপর আরো বেশ কিছুদিন অতিবাহিত হয়। শুনলাম কলির আরো একটা ছেলে হয়েছে। এই ছেলের নাম রেখেছিলো শাওন। ছোট ছেলের বয়স যখন ছয় মাস তখন কলি খুব অসুস্থ হয়ে পড়ে। বাড়িতে আম্মার কাছে শুনলাম কলি স্ট্রোক করেছে। সম্ভবত ব্রেইন স্ট্রোক। কলিকে ভাগলপুরের স্থানীয় একটা হাসপাতালে নেয়া হলো। কলির অবস্থা আশংখাজনক দেখে দুইদিন পর ঢাকাতে রেফার করে দিলো। ধানমন্ডির কাছে একটি বেসরকারী হাসপাতালে নেয়া হলো। ভালো হাসপাতালে নেয়া হলেও এরমধ্যে কলি কোমায় চলে গিয়েছিলো। ছোট ছোট দুটো বাচ্চা রেখে মৃত্যর সাথে প্রাণপণ লড়াই।

একদিকে বাবা মায়ের অর্থের সাথে যুদ্ধ আর অন্যদিকে মেয়ের জীবন নিয়ে যুদ্ধ। ছয় থেকে সাত দিন হয়ে গেলো। বেঁচে থাকার কোনও সম্ভাবনা নেই। কলির মা-বাবা, ভাই-বোন আর মতি চাচা হাসপাতালে পড়ে রইলেন। কলিকে আইসিইউতে দেখতে গেলাম। সতেজ কিন্তু নিথর দেহ। অসুস্থতার কথা স্বামী জজ মিয়াকে বিদেশে জানানো হলো। সে স্পষ্ট করে বলে দিলো চিকিৎসার জন্য সে পনেরো হাজার টাকার বেশী দিতে পারবে না। এতো আদরের সন্তান কিনা অর্থের অভাবে দুনিয়া থেকে চলে যাচ্ছে! কলির বাবার যে সহায় সম্পত্তি ছিলো না তা কিন্তু নয়। কিন্তু চিকিৎসার জন্য নগদ অর্থের যোগান দেয়াও খুব কঠিন হয়ে পড়েছিলো। আত্মীয়স্বজন যার যতোটুকু সাধ্য আছে পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছিলো। তবে যাদের খুব ভালো সামর্থ্য ছিলো তারা সেসময় পাশে দাঁড়ায়নি। এমন অভিজ্ঞতা আমার আব্বার ক্যান্সারের সময়ও হয়েছিলো। বিপদে কে পর কে আপন চেনা যায়।

ইতিমধ্যে ডাক্তার জানিয়ে দিয়েছেন যে, আইসিউতে কলিকে রাখা মানে শুধু শুধু অর্থের অপচয়। জীবিত হয়ে ফেরার কোনও সম্ভাবনা নেই। ব্যাপারটি স্বামীকে জানানো হলে সে বিদেশ থেকে কলিকে দেখতে আসে। স্বামী এসে দেখে যে কলিকে লাইফ সাপোর্ট দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে। ডাক্তার বলেছেন, এভাবে রাখার চেয়ে লাইফ সাপোর্ট খুলে ফেলাই ভালো। মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও কলির মা চায়নি তার লাইফ সাপোর্ট খুলে ফেলা হোক। কিন্তু যে খরচ তা বহন করার ক্ষমতাও যে নেই! কলির রক্তের সম্পর্কের অনেকেরই অনেক অর্থকড়ি ছিলো। তারা টাকা দিয়ে সাহায্য করবে তো দূরের থাক অনেকে দেখতেই যায়নি। নিজেরও তেমন স্বামর্থ্য ছিলো না কলির জন্য কিছু করার।

কলির স্বামী আসার পর সিদ্ধান্ত সিদ্ধান্ত আসলো যে তার লাইফ সাপোর্ট খুলে ফেলা হবে। কিন্তু কলির মা রাজি নন। তবে উনাকে বুঝানো হলো যে, কিছু হবে না। এখন বাড়িতে নিয়ে গিয়ে আবার কয়েকদিন পর নিয়ে আসলে সে সুস্থ হয়ে যাবে। তবে এরমধ্যে একটি বিষয়ে নিষ্পত্তি হলো যে, যদি কলির মৃত্যু হয় তবে তার লাশ বাবার বাড়িতে দাফন করা হবে। যেহেতু কলি খুব আদরের এবং প্রথম সন্তান, তাই তাকে বাবার বাড়িতেই দাফন করা হবে। জজ মিয়া এই শর্তে রাজি হওয়ার পর কলির লাইফ সাপোর্ট খুলে ফেলা হলো। বাড়িতে ফেরার মাঝ পথেই অনুমিতভাবে কলির মৃত্যু হলো। মাত্র ২৪ বছর বয়সেই দুটো নিষ্পাপ প্রাণের জন্ম দিয়ে ঝরে গেলো একটা তরতাজা ও প্রাণবন্ত প্রাণ!

(পরিমার্জিত), চলবে...
১৫ মে ২০২৪ ইং
গ্লেনফিল্ড, অস্ট্রেলিয়া

14/05/2024

মেয়ে (১)
প্রদীপ মাহবুব .......................

কলি, সম্পর্কে আমার মামাতো বোন। সে আমার চেয়ে বছর তিনেক ছোট। সে খুবই শান্ত স্বভাবের ও অসম্ভব রকমের কর্মঠ ছিলো। সে বাবা মায়ের অনেক আদরের সন্তান ছিলো। পাঁচ বোন আর এক ভাইয়ের মধ্যে সে ছিলো সবার বড়। শুধুমাত্র সংসারেরে বড় সন্তান হওয়ার জন্যই সে আদরের ছিলো ব্যাপারটি কিন্তু সেরকম নয়। কলির জন্মের আগেও তার বাবা মায়ের কোল জুড়ে এক পুত্র ও এক কন্যা সন্তান পৃথিবীতে এসেছিলো। কিন্তু অকালেই দুটি সন্তানই মৃত্যুবরণ করে। পরপর দুটি সন্তানের মৃত্যুর পর কলির জন্ম। আর এজন্য বাবা মায়ের কাছে কলি ছিলো আরাধ্য। কলির জন্মের পরে তার বাবা মায়ের কোল জুড়ে সানি নামের এক পুত্র সন্তানের জন্ম হয়েছিলো। সানির বয়স যখন তিন বা চার তখন তার ব্রেন টিউমার ধরা পড়ে এবং সে অকালে মৃত্যুরবণ করে। সানির মৃত্যুর পর পপি নামের আরও একটি কন্যা সন্তান মৃত্যুবরণ করে। কলিসহ পাঁচ সন্তান জন্ম লাভ করলেও অন্য চারজনের মৃত্যু কলির বেঁচে থাকাটা তার মা-বাবার কাছে গুপ্তধন পাওয়ার মতো ছিলো। এরপর আরও পাঁচটি মেয়ে ও একটি ছেলে পৃথিবীর আলো বাতাসে বেড়ে ওঠলেও কেউ-ই কলির জায়গাটা দখল করতে পারেনি। এভাবেই কলি হয়ে উঠেছিলো মা-বাবার সাত রাজার ধন।

কলির বেড়ে ওঠা আমাদের চোখের সামনেই। বাড়ির অন্যসব বাচ্চাদের চেয়ে কলির হাঁটাচলা শেখা ছিলো ভিন্ন ধরণের। সে দুই হাঁটুতে হাতে ভর দিয়ে দিয়ে হাঁটতো। এটা নিয়ে বাড়ির অনেকে মজা করতো। শান্তশিষ্ট আর নরম স্বভাবের জন্য বাড়ির সবার কাছে কলি ভালো মেয়ে হিসেবেই পরিচত ছিলো। কলির জীবদ্দশায় তার গায়ে কেউ কখনওই হাত তুলেনি। তবে তার বাবা একবার রাগ করে তার গায়ে হাত তুলেছিলো। সেটাও সে যখন পাঁচ বা ছয় বছর বয়সে ছিলো। তাতে সে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলো! এতে তার মায়ের আর নানির কী কান্না!

কলির শিশুকাল কেটেছে কিশোরগঞ্জ সদরে। সেই ৮০’র দশকে তার বাবার কিশোরগঞ্জ শহরে সাইকেল ও রিক্সার দোকান ছিলো। কলির নানির বেশ জায়গা জমি ছিলো। বাড়িতে অনেক ফলমূলের গাছ ছিলো। বিশেষ করে জাম্বুরা, তেঁতুল, নারকেল, পেয়ারা, আম আর কাঁঠাল গাছ। তার নানি তাকে এতো আদর করতো যে, গাছের সকল ফলমূল কলির জন্য রেখে দিতো। ফলমূল নষ্ট হয়ে গেলেও কাউকে না দিয়ে ঘরে রেখে দিতো। নানি গাছ থেকে এসব ফল সংগ্রহ করার জন্য আমার আর ইকবালের সাহায্য নিতেন। আমরা দুইজন গাছে গাছে চড়ে ফল সংগ্রহ করতাম। এসব সংগৃহীত ফল বিশেষ করে আম নানি কলির জন্য রেখে দিতাম। আমরা এতো পরিশ্রম করে আম সংগ্রহ করার পরেও তিনি আমাদেরকে সবচেয়ে ছোট ও পোকায় খাওয়া আমটি দিতেন। এই একটা আম দেয়ার জন্য তিনি পাত্রের সবগুলা আম ভালো করে চেক করে সবচেয়ে ছোট আর পোকায় খাওয়া আমটি দিতেন। এতে করে আমাদের মন খারাপ হতো।

এরপর থেকে আমি আর ইকবাল যুক্তি করে গাছে উঠতাম। নানি যেহেতু আমাদেরকে আম দিবেনই না সেহেতু আমরা গাছেই যা খাওয়ার খেয়ে নিবো। নানি বয়সের ভারে ন্যুব্জ ছিলেন। তিনি চাইলেও ওপরের দিকে দেখতে পারতেন না। তাই গাছের ওপরে কি করছি তা তিনি দেখতে ও বুঝতে পেতেন না। আমরা গাছে উঠার পর ইচ্ছা মতো পেট ভরে আম খেতাম। শুধু তাই নয়, বড় বড় ও ভালো আম ঢিল দিয়ে দক্ষিণের ক্ষেতে ফেলে দিতাম যাতে পরে খেতে পারি। ঢিলের শব্দ শোনে নানি বলতেন, কীরে পজিব, কীরে ইব্বল, শব্দ ক্যার? আমরা বলতাম, নানি ফক্ষি আম খায়ালাইছে। তাই আমের বড়া ক্ষেতে ফালায়া দিছি! আমরা মনের সুখে বড় বড় পাকা আম খেতাম আর বাকিগুলো মাটিতে ফেলতাম। ছোট ছোট আম দেখে নানি বলতেন, হারামজাদা ফক্ষি, আমার সব বালা আম খায়ালাইছে, আমার কলু কি খাইবো? নানির আম পাড়ার জন্য পারিশ্রমিক নিলেও একটা কাজের জন্য আমরা পারিশ্রমিক নিতাম না। নানির ঘরে ছিলো চামচিকার বসবাস। শত শত চামচিকা সিলিং এর ওপর থাকতো। হাতে দুজনে দুটা ঝাড়ু নিয়ে সিলিং এর ওপরে উঠতাম আর মনের সুখে চামচিকা মারতাম! কলি বড় হওয়ার সাথে সাথে তার বাবা মায়ের কোল জুড়ে আরো বেশ কয়েক সন্তান পৃথিবীতে এসেছে। কিন্তু তার নানি কলি বলতেই পাগল ছিলেন।

কলির বাবা ব্যবসায় লস করায় কিশোরগঞ্জ থেকে গ্রামে চলে আসেন। কথিত আছে যে তিনি সংবাদপত্রের প্রতি এতো মনযোগী ছিলেন যে তিনি কাস্টমারের প্রতি খেয়াল রাখতেন না। এটা ছোটবেলায় আমরাও দেখেছি। কিশোরগঞ্জ থেকে চলে আসার পর গ্রামেই কলির বেড়ে ওঠা। দেখতে দেখতে কলি বড় হয়ে ওঠলো। এর মধ্যে কলির নানিও মারা গেলেন। স্কুলে যাওয়ার পাশাপাশি সংসারের সকল কাজে সে সহায়তো করতো। দশম শ্রেণীতে পড়ার সময় কলির বিয়ে হয়ে গেলো। তার বড় চাচা একটা ভালো ঘরের ছেলে দেখে তাকে বিয়ে দিয়েছেন। তবে এই বিয়েতে কলির ফুফুর মত ছিলো না। কেননা তার ফুফু চেয়েছিলেন কলিকে ছেলের বউ হিসেবে নিতে। কিন্তু কেন জানি কলির বাপ-চাচা মেয়েকে বিয়ে দিতে রাজি হননি।

কলির বর ছিলেন প্রবাসী। নাম ছিলো তার জজ মিয়া। জজ মিয়া আর আট দশটা প্রথাগত জামাইয়ের মতো ছিলো না। সে শ্বশুর বাড়ি এসে সবার সাথে হাসি ঠাট্টা করতো। গ্রামের অন্য জামাইয়েরা যেভাবে ভাব গাম্ভীর্য বজায় রেখে চলতেন তিনি ঠিক তার উল্টোটা ছিলেন। তিনি শ্বশুর বাড়িতে এসে নানারকমের বায়না ধরতেন। তার বায়না পূরণ করার জন্য কলির মা উঠেপড়ে লাগতেন। তবে এ নিয়ে কলির বাবা মাঝে মাঝে বিরক্ত হতেন। এভাবতেই চলতে থাকলো কলির সংসার। দেখতে দেখতে কলির এক পুত্র সন্তানের জন্ম হলো। কলি তার ছেলের নাম রেখেছিলো প্রথম। বিয়ের পর প্রায়ই কলি বাবার বাড়ি আসতো। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে বলতো, বালাই আছি, আলহামদুলিল্লাহ্‌। সে বাবার বাড়ি এসে সবার সাথে এমনভাবে মিশতো যে মনে হতো তার মতো সুখী এই দুনিয়ায় আর কেউ নাই! স্বামী-সন্তান নিয়ে তার স্বর্গের সুখ।

(পরিমার্জিত), চলবে...

১৪ মে ২০২৪ ইং
গ্লেনফিল্ড, অস্ট্রেলিয়া

ছোটন ভাইকে নিয়ে লেখাটা জাগো নিউজ পত্রিকা প্রকাশ করেছে। ধন্যবাদ জাগো নিউজ এবং Muklesur Rahman
11/05/2024

ছোটন ভাইকে নিয়ে লেখাটা জাগো নিউজ পত্রিকা প্রকাশ করেছে। ধন্যবাদ জাগো নিউজ এবং Muklesur Rahman

‘দোস্ত, তোর জুতা কই’ নামে শৈশবের স্মৃতিকথা লিখতে গিয়ে ছোটন ভাইয়ের কথা আসছিল। বলেছিলাম যে, ছোটন ভাই সম্পর্কে অন্য...

10/05/2024

ছোটন ভাই (২)
আপনি কী পিল খাওয়া নিয়ে ভাবছেন?
প্রদীপ মাহবুব .........................

আমাদের বেড়ে ওঠা নানার বাড়িতে। সেই সূত্রে নানা বাড়ির লোকজনই আত্মার আত্মীয়। নানা বাড়ির প্রতিটি মানুষের জন্য কলিজার টান অনুভব করি। নানা বাড়ির মানুষজন মনে করেন কিনা তা জানি না। আমরা চার ভাইবোন নানাকে দাদা বলে ডাকতাম। দাদা আমাদের এতো আদর করতেন বিশেষ করে আমাকে যা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। আমার জীবনে দাদার প্রভাব অনেক। দাদার গল্প অন্য একদিন করবো।

আমার নানা আর মামারা ভিন্ন ভিন্ন পেশায় যুক্তি ছিলেন। তার মধ্যে ফিরোজ আর কাজল ভাইজান (সম্পর্কে নানা হলেও বয়সের জন্য আমরা ভাইজান ডাকি) ব্যবসায়ী ছিলেন। ১৯৯০ সালের দিক থেকে উনারা পাকুন্দিয়া বাজারে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত। যতোটুকু বুঝতাম কাজল ভাইজান খুব সৌখিন মানুষ ছিলেন। খুব সম্ভবত ১৯৯০ সালের দিকে ভাইজানেরা একটা টিভি কিনেছিলেন। বিশ্বকাপ ফুটবল খেলার আগে। টিভিটি কাজল ভাইজানের ঘরেই রাখা হয়েছিলো। টিভি রাখার জন্য একটা বিশেষ বাক্সের ব্যবস্থা করা হয়েছিলো। টিভির বাক্সে কেচিগেটের মতো দুটো ছোট দরজা ছিলো। কাজল ভাইজান বাড়িতে এসে বাক্স খুলে টিভি চালাতেন। আর এলাকার মানুষসহ আমরা একসাথে টিভি দেখতাম। সতেরো ইঞ্চি সাদাকালো টিভি। টিভির নাম ছিলো নিক্কন টিভি। কয়েকদিন আগে জানতে পারলাম ভাইজান টিভিটা বাইরে ফেলে রেখেছেন। কথাটি শুনে খুব খারাপ লাগলো। প্রায় ৩৫ বছরের একটা টিভি। কতো স্মৃতি, কতো মায়া! টিভির পেছনে কতো যে সময় ব্যয় করেছি তার ইয়াত্তা নেই।

সেই সময়ে আমাদের গ্রামে বিদ্যুৎ ছিলো না। টিভি চালানোর জন্য বারো বোল্টের একটা ব্যাটারি ছিলো। সেই ব্যাটারি চার্জ দিতে বেশ কিছুদিন সময় লাগতো। প্রতি সপ্তাহে রিক্সা করে এই ব্যাটারি পাকুন্দিয়াতে আনা নেওয়া করা হতো। একবার চার্জ দিয়ে আনলে ব্যাটারিটি দিয়ে এক সপ্তাহ টিভি দেখা যেতো। টিভি কী আর দেখতাম! এন্টেনা ঘুরাতে ঘুরাতে তিন ঘন্টার ছবি শেষ হয়ে যেতো। শুধু ঝিরঝির করতো। আর আমরা শুধু এন্টেনা ঘুরাতাম। যেদিন আবহাওয়া খারাপ থাকতো সেদিন টিভি দেখা খুব কষ্টকর হতো। সেইসাথে যুক্ত হতো দিন দিন ব্যাটারির চার্জ কমে আসার যন্ত্রণা। ব্যাটারির চার্জ যেতে যেতে এমন অবস্থা হতো যে সতেরো ইঞ্চির টিভি ছয় ইঞ্চি হয়ে যেতো। তারপরেও যতোক্ষণ টিভিতে আলো আসতো ততোক্ষণ টিভি দেখতাম। শনিবার, মঙ্গলবার আর শুক্রবার টিভি দেখার জন্য সেরা দিন ছিলো। শনিবার রাতে ছায়াছন্দ প্রচারিত হতো। বাংলা সিনেমার গান দেখার সে এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা। মঙ্গলবার আর শুক্রবারে ধারাবাহিক নাটক, আরব্য রজনীর সিরিয়াল, আর মাঝে মধ্যে সিনেমা প্রচারিত হতো। সে সময়ে এক মাস অন্তর অন্তর বিটিভিতে সিনেমা প্রচারিত হতো। তবে মাঝে মধ্যে সিনেমা প্রচারিত হতো না। সেদিন সবার মন খারাপ হতো।

যে শুক্রবার বিটিতে সিনেমা প্রচার করতো সেইদিন আশেপাশের গ্রাম থেকে অনেক মানুষ আসতো। একবার এই টিভি আউলিয়া পাড়ার সুন্দর মিস্ত্রির বাড়িতে নেওয়া হলো। ভাইজানদের ঘরে করে দেয়ার সুবাধে এই মিস্ত্রির সাথে উনাদের একটা সখ্যতা গড়ে উঠেছিলো। যেদিন রিক্সায় করে টিভি আর ব্যাটারি সুন্দর মিস্ত্রির বাড়িতে নেয়া হলো সেদিন ছিলো শুক্রবার। আমার এখনও মনে আছে, এই রিক্সার পেছনে মৌমাছির মতো মানুষ ছুটতে লাগলো। আমিও এর ব্যতিক্রম ছিলাম না। সেদিন আউলিয়া পাড়ার অনেক মানুষ সুন্দর মিস্ত্রির বাড়িতে সিনেমা দেখতে গিয়েছিলেন।

শুক্রবারে বিটিভিতে সিনেমা প্রচারিত হলে ভাইজান টিভিটা ঘরের দরজার কাছে এনে মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে দিতেন। উঠোন ভর্তি শুধু মানুষ আর মানুষ। বাড়ির মুরুব্বিরা সবাই চেয়ারে বসতেন। আমাদেরকে সবসময় একটা বিশেষ কাটের টুকরা দেয়া হতো বসার জন্য। এর প্রকৃত নাম জানা নেই। তবে আমাদের আঞ্চলিক ভাষায় এটাকে বেন্দা বলে। এটা আসলে দরজায় ব্যবহৃত এক ধরণের খিল। গ্রামের সব দরজায় ছোট একটা খিল থাকতো। এর পাশাপাশি আর একটা লম্বা কাঠের গোড়া দরজার এ মাথা থেকে অন্য মাথা পর্যন্ত ব্যবহার করা হতো। মূলত চোর থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এই বেন্দার ব্যবহার ছিলো। সেই বেন্দায় আমি, ভাই, ইকবাল আর ছোটন ভাই বসতাম। মাঝে মাঝে আরমান মামাও বসতেন। এই বেন্দা ব্যবহারের অন্যতম একটা কারণ ছিলো মোটর সাইকেলকে রক্ষা করা। তখনকার সময়ে আশেপাশের দুই চার গ্রামে এই একটাই মোটর সাইকেল ছিলো। ইয়ামাহা (Yamaha) মোটর সাইকেল। কাজল ভাইজান খুব শখ করে মোটর সাইকেলটি কিনেছিলেন। মোটর সাইকেলের শব্দ এক কিলোমিটার দূর থেকে পাওয়া যেতো। ভাইজান যদিও চাবি লুকিয়ে রাখতেন তারপরেও কীভাবে যেন আরমান মামা টিভি দেখানোর ব্যবস্থা করতেন। যেই দূর থেকে মোটর সাইকেলের শব্দ শোনা যেতো আমরা দৌড়ে পালাতাম। টিভি বাক্স বন্দি করে যে যার মতো পড়ার টেবিলে বসে পড়তাম।

টিভি কেনার বেশ কয়েক বছর পর বিটিভিতে প্রচারিত আলিফ লায়লা আমাদের পাগল করে তুলেছিলো। তখন সেই সিরিয়াল অনেক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলো। শুক্রবারে সিরিয়াল প্রচারের সময় ছিলো রাত সাড়ে আটটা। রাত আটটার সংবাদের পর আলিফ লায়লার জন্য আমরা চাতক পাখির মতো অপেক্ষা করতাম। সিরিয়ালের আগে শুধু বিজ্ঞাপন আর বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপনগুলো অনেক মজার ছিলো। 'ও ফরিদ ভাই, তোমার দোকানে কী খাবার স্যালাইন আছে?' নামের একটা জনপ্রিয় খাবার স্যালাইলেনর বিজ্ঞাপন প্রচারিত হতো। প্রচারিত হতো বউ রাণী প্রিন্ট শাড়ি এবং ফিলিপস বাতির জনপ্রিয় বিজ্ঞাপন। সিরিয়াল শুরুর আগে ইকোনো কলমের একটা বিজ্ঞাপন প্রচারিত হতো। বিজ্ঞাপনটি মূলত কার্টুন ধরণের। এই বিজ্ঞাপন দেয়ার মানেই হচ্ছে বিটিতে এখন একজন আলিফ লায়লার ঘোষণা দিবেন। ঠিক এই বিজ্ঞাপনটি প্রচারের আগে কয়েকটা জন্ম নিয়ন্ত্রণকারী বড়ির বিজ্ঞাপন প্রচারিত হতো। মাঝে মাঝে কনডমের বিজ্ঞাপনও দেখাতো। সে সময়ে এমন এডাল্ট কনন্টের বিজ্ঞাপন আমরা খুব একটা না বুঝলেও ছোটন ভাই বুঝতো। এসব বিজ্ঞাপন প্রচার হলে বাড়ির মহিলারা একজন আর একজনের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসতেন। জন্ম নিরোধক বড়ির বিজ্ঞাপনের মধ্যে মায়া বড়ি (Maya Bori) আর নরডেট ২৮ (Nordette 28) বিজ্ঞাপন দুটি খুব ঘন ঘন প্রচারিত হতো। এর মধ্যে নরডেট ২৮ বিজ্ঞাপনের শুরুতেই একজন নারী বলতেন, আপনি কী পিল খাওয়া নিয়ে ভাবছেন?

আমরা সবসময়ই বিজ্ঞাপনটি দেখি। কেউ কখনও কোনও কথা বলেনি। একদিন আলিফ লায়লা শুরুর আগে বিজ্ঞাপনটি প্রচারের শুরুতেই একজন নারী যখন বললেন, আপনি কী পিল খাওয়া নিয়ে ভাবছেন? সাথে সাথে ছোটন ভাই উত্তর দিলো, 'না, আমি পিল খাওয়া নিয়ে ভাবছি না।'
১০ মে ২০২৪
গ্লেনফিল্ড, অস্ট্রেলিয়া

08/05/2024

ছোটন ভাই
পর্ব ১
সিনেমা হলে টিভি কয়টা?
প্রদীপ মাহবুব .........................

'দোস্ত, তোর জুতা কই' নামে শৈশবের স্মৃতিকথা লিখতে গিয়ে ছোটন ভাইয়ের কথা আসছিলো। বলেছিলাম যে, ছোটন ভাই সম্পর্কে অন্য একদিন লিখবো। এরমধ্যেই আজকে লেলিন আমাকে ফোন দিলো। দিয়ে বললো, তুই ছোটন ভাইকে নিয়ে কিছু একটা লেখ্। ছোটন ভাইকে নিয়ে আমাদের অনেক মজার মজার স্মৃতি আছে। আমাদের শৈশবের নায়ক ছোটন ভাই। আমার কাছে এখনও তাই। উনার পুরো নাম জাকির হোসেন ছোটন। উনারা দুই ভাই। আর একজনের নাম ইকবাল হোসেন। তাদের বাবা দুলাল হোসেন সবার কাছে খুব পরিচিত ব্যক্তি ছিলেন। বলে রাখা ভালো যে, এরা দু'জনেই সম্পর্কে আমার মামাতো ভাই। আমার নানার আপন বড় ভাইয়ের নাতি। যতটুকু মনে পড়ে, মামা মারা যাওয়ার আগে দুই ছেলেকে আদর করে ডাকতেন, বাবা, জাকির হোসেন ছোটন আর ইকবাল হোসেন নোটন, এদিকে আসো। মামা ১৯৮৯-৯০ সালের দিকে মারা যান। মামা মারা যাওয়ার পর ইকবালের নোটন নামটি হারিয়ে যায়। তবে আমি মাঝে মাঝে মজা করে ইকবাল হোসেন নোটন বলে ডাকি। ইকবাল আমার সমবয়সী, ভাই ও বন্ধু।

মামার মৃত্যুর পর ছোটন ভাইকে উনার বড় চাচা মল্লিক মামা লেখাপড়া করানোর জন্য কিশোরগঞ্জ নিয়ে গেলেন। সেখানে ছোটন ভাই বেশ কয়েক বছর থাকার পর উনার দাদার সাথে একদিন গ্রামের বাড়ি ফিরে এলেন। সময়টা তখন খুব সম্ভবত ১৯৯৩ সাল। ছোটন ভাই বাড়িতে এসেই খুব সহজেই সবার মধ্যমণি হয়ে গেলেন। এই বেশ কয়েক বছর শহরে থাকার কারণে তিনি সবার চেয়ে একদম আলাদা ছিলেন। পোষাকের ব্যাপারে খুব যত্নশীল ছিলেন। উনার মাধ্যমেই ব্যান্ড সংগীতের সাথে আমাদের পরিচয় ঘটেছিলো। তিনি তখন আজম খান, আইয়ুব বাচ্চু, পার্থ বড়ুয়া, নকীব খান আর খালিদের গান গাইতেন। সেসময় স্টেরিও টেপের যুগ ছিলো। ক্যাসেটে এসব ব্যান্ডের গান শুনতাম। ছোটন ভাইয়ের নেতৃত্বে আমাদের পাঁচ জনের একটা দল হয়ে গেলো। আমি, আমার ভাই আজহার, আরমান মামা, ছোটন ভাই আর ইকবাল। তবে আমি আর ইকবাল একটু ছোট হওয়ায় সবকিছুতে আমাদেরকে সাথে নিতে চাইতো না। তবে সারাদিন আটার মতো লেগে থাকতাম। সারাদিন টই টই করে ঘুরে বেড়াতাম আর সন্ধ্যার সময় বাড়ি ফেরার সময় পিঠে ছালা বেঁধে বাড়ি ফিরতাম। কেননা বাড়িতে আসার আগেই এক ডজন বিচার এসে বাবা-মায়ের কাছে জমা হতো। তবে বিচার এড়াতে আমি হাত-পা ধুয়েই দ্রুত বই নিয়ে টেবিলে বসে পড়তাম আর জোরে জোরে পড়তাম। তারপরেও নানা রকমের শাস্তি বরাদ্ধ ছিলো।

একথা সত্য যে, ছোটন ভাই বারবার আমাকে ঝামেলায় ফেলাতো তারপরেও ভাইয়ের সাথে ঘুরতাম। বড় পর্দায় সিনেমা দেখার হাতেখড়ি ছোটন ভাইয়ের মাধ্যমে। আজ বলতে দ্বিধা নেই তৃতীয় শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় বিড়ি-সিগারেটের প্রথম হাতেখড়িও ছোটন ভাইয়ের হাতে। তবে সেসব ছিলো স্রেফ মজা করার জন্য। সেই সময়েই গোল্ড লিফ আর বেনসন সিগারেটের গল্প শুনতাম। তিনি বলতেন আর আমরা মন্ত্রমুগ্ধের চেয়ে থাকতাম। মনে মনে ভাবতাম, আমার যখন অনেক টাকা হবে তখন শুধু বেনসন সিগারেটই খাবো। কেননা বেনসন সিগারেট বড়লোকদের খাবার! সময়ের ফেরে চা-পান-বিড়ি-সিগারেট কোনওটাই খাওয়া হয় না।

ছোটন ভাইয়ের কাছে কিশোরগঞ্জ শহরের মানসী সিনেমা হলের গল্প শুনতামচ। একদিন বায়না ধরে বললাম, ভাই, আমারে একটু সিনেমা হলে লইয়্যা যাইবা? ছোটন ভাই বলতো, তুই ছোডু মানুষ। হলে গিয়া কী করবি? তারপরেও বলতাম, না ভাই, একটা ছবি দেহাও না! আমার পিড়াপীড়িতে তিনি একদিন রাজি হলেন। সময়টা তখন ১৯৯৪-১৯৯৫ সাল। পাকুন্দিয়ায় মৌসুমি হলে সোহেল রানা, রুবেল, শাবানা, রিমা আর হুমায়ূন ফরিদী অভিনীত "চোখের পানি" নামে একটি সিনেমা চলছে। সিনেমা আসার আগে রিক্সা করে মাইকিং করা হতো। রিক্সার পেছনে পেছনে দৌড়াতাম আর ভাবতাম কবে হলে গিয়ে সিনেমা দেখবো!

সিনেমার বিজ্ঞাপনের পর ছোটন ভাই বললেন, ল যাই, সিনেমা দেহি। কিন্তু কাওরে কইতারবিনা কিন্তু! আমি কইলাম আচ্ছা। এরপর টিকেট কেনার টাকা যোগাড়ের পালা। ২৫০ গ্রাম মুক্তা ধানের চাল আর গাছ থেকে সুপারি বিক্রি করে ছোটন ভাইকে সাড়ে তিন টাকা দিলাম। চাল তখন ৬ টাকা কেজি ছিলো। দেড় টাকার চাল আর দুই টাকার সুপারি- সব মিলে সাড়ে তিন টাকা। ছোটন ভাইও সুপারি বিক্রি করে বাকি টাকা যোগাড় করলেন। সিনেমার থার্ড ক্লাস টিকিট ছিলো মাত্র সাড়ে পাঁচ টাকা। টাকা যোগাড়ের পর দু'জনে হেঁটে রওনা দিলাম। বাড়ি থেকে সিনেমা হলের দুরুত্ব প্রায় ৬ কিলোমিটার। মৌসুমি হলে যেতে যেতে জিজ্ঞেস করলাম, ভাই, হলে টিভি কয়ডা? ছোটন ভাই মুচকি হাসে আর বলে, আগে ল যাই, এরফরে দেহিছ টিভি কয়ডা! সিনেমা হলে দিয়ে দেখি মানুষ আর মানুষ! টিকেট কাটার কোনও সুযোগ নাই। তারপরেও ছোটন ভাই প্রচণ্ড ভীড় ঠেলে অরাধ্য দুটো টিকেট কাটলেন। তখন এমনও সময় ছিলো মানুষ হাতে ব্লেড নিয়ে যেতো টিকেট কাটার জন্য। বেশী ঝামেলা হলে সামনের সারিতে টিকেটের জন্য দাড়িয়ে থাকা দর্শকের হাতে ব্লেড দিয়ে ছোট্ট একটা টান দেয়া হতো যেনও সে তার জায়গা ছেড়ে দেয়। আর বলে রাখা ভালো, আমাদের আশে পাশের বেশ কয়েক থানায় পাকুন্দিয়ার মৌসুমি সিনেমা হলের প্রচণ্ড নামডাক ছিলো।

টিকেট কেটে দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করার পর সবার সামনের দিকের সিটে গিয়ে বসতে পারলাম। চোখের সামনে বিশাল আকারের একটা কালো পর্দা। ঠিক সাড়ে বারোটায় পর্দাটা দু'ভাগ হয়ে দু'দিকে সরে যাচ্ছে। আমার চোখে সে কী বিস্ময়! কীভাবে সম্ভব? এরপর দেখা গেলো বিশাল এক সাদা টিভি! সেই টিভিতে রঙিন লাইটের মাধ্যমে ছবি ভেসে উঠতে থাকলো! আমি অবাক বিস্ময়ে একবার লাইট আর একবার পর্দার দিকে তাকাই! আমার আর ঘোর কাটে না! এরপর ছোটন ভাই সব বুঝিয়ে বললো কীভাবে সিনেমা হলে টিকেট কাটতে হয়, কীভাবে হলে সিনেমা দেখায়, কীভাবে সিটে বসতে হয়, আরও কতো কী! তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই সিটে কীভাবে বসতে হয় জ্ঞান দেয়া মানুষটিই পরে একদিন সিনেমা দেখতে গিয়ে সিট ভেবে এক মেয়ের কোলের ওপর বসে পড়েছিলেন!

চোখ না সরিয়ে অবাক বিস্ময়ে তিন ঘন্টার ছবি দেখলাম। সেই থেকে ছবির প্রতি এতো প্রেম, এতো ভালোবাসা। যখন কেউ বাংলা ছবিকে খারাপ বলে আমার খুব কষ্ট অনুভূত হয়। ছবি দেখে বাড়ি ফিরলাম। ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে গেলো। বাড়িতে আসতেই তো আব্বার রুদ্রমূর্তি! রেগেমেগে একেবারে আগুন হয়ে গেছে। আব্বা জিজ্ঞেস করলো, কই গেছিলি? আমি বললাম, ইস্কুলে গেছিলাম। আব্বা জোর দিয়া কইলো, সত্য কথা ক। কই গেছিলি? অবস্থা বেগতিক দেখে বললাম, মজিদ নানার বাড়িতে গেছিলাম। মজিদ নানা আম্মার মামা ছিলেন। এরপর শুরু হলো মাইর। সিনেমা দেখার স্বাদ একেবারে মিটিয়ে দিয়েছে। সাথে যুক্ত হলো তিনদিন বাড়িতে ভাত না খেতে পারার শাস্তি। আব্বা আম্মাকে স্পষ্ট বলে দিলো, এই পুলারে তিনদিন কোনও ভাত দিবানা। যেই কথা সেই কাজ। আমার ভাত বন্ধ। এই তিনদিন নানু আমাকে খাবার দিয়েছেন। বাড়িতে সত্যিই ভাত পাইনি।

তিনদিন পর ছোটন ভাই মুচকি হেসে আমাকে জিজ্ঞেস করেন, কীরে সিনেমার মজা কিমুন বুজলে? পরে জানতে পারলাম ছোটন ভাই নিজেই বাড়িতে বলে দিয়েছে যে আমি মৌসুমি হলে সিনেমা দেখতে গিয়েছিলাম। এরপর বহুবার আমকে ফুসলিয়ে হলে সিনেমা দেখাতে নিয়ে যেতেন আর বাড়ি এসে বলে দিতেন। তাপরেও ছোটন ভাইয়ের সাথে সিনেমা দেখতে যেতাম। আমাদের শৈশবে ছোটন ভাই এমন এক মজার চরিত্র যে বলার মতো না। উনার অসংখ্য গল্প আছে। আমি যদি কখনও শৈশবের স্মৃতি নিয়ে কোনও গ্রন্থ লিখি তবে সেই গ্রন্থের অবধারিত কেন্দ্রিয় চরিত্র হবেন ছোটন ভাই।

০৮ মে ২০২৮ ইং
গ্লেনফিল্ড, সিডনি

Address

Rajshahi
6000

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when তারুণ্য, রাজশাহী posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Share