24/05/2024
টিফু (২)
প্রদীপ মাহবুব .......................
এবার কুকুর ছানাটি আনার পর বাড়ির সবাইকে দেখানো হলো। এতো সুন্দর ছানা দেখে সবাই আহ্লাদে আটখানা। ছোট বড় সবাই কুকুরের ছানার ব্যাপারে সিরিয়াস হয়ে গেলো। কোথায় রাখবে, কী খাওয়াবে, শীতে কী পোষাক পরাবে- সব মিলে এক এক হুলুস্থুল কাণ্ড। এর পাশাপাশি কুকুরের ছানাটির নাম ঠিক করা হলো। নাম দেয়া হলো টিপু। আমাদের আঞ্চলিক ভাষায় যার নাম হয় 'টিফু।' এই টিফুর জন্য দাদার (নানাকে দাদা ডাকতাম) পশ্চিমের ভিটে একটা গর্ত করা হলো। আমরা পাঁচজনে মিলে গর্তটা করলাম। সেখানে খড় আর পাটের তৈরী বস্তা দিয়ে ঠাণ্ডা মাটি ঢেকে দেয়া হলো। তারপর টিফুকে ওখানে রাখা হলো। সারাদিন টিফুকে খাওয়ানোর কতো চেষ্টা। চার পাঁচ দিন বয়সের টিফুকে বোতলে দুধ ভরে খাওয়ানোর চেষ্টা করা হলো। পরে স্বপন মামা নিজ হাত টিফুর মুখে হাত ঢুকিয়ে দুধ ঢেলে দিয়েছিলো। এভাবে সারাদিন পার করার পর সন্ধ্যা বেলায় যখন টিফুকে গর্তে রাখা হলো তখনই সে কান্নাকাটি শুরু করলো। তারপর সে সময়ে চারপাশে শেয়ালের উৎপাত। আমরা সারারাত জেগে জেগে টিফুকে পাহারা দিলাম। এরপরের দিন দাদার উত্তরের ঘরের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে আর একটা গর্ত করে গর্তের মুখ কাঠ দিয়ে বন্ধ করার ব্যবস্থা করে টিফুকে সেখানে রাখা হলো। সেখানে টিফু খুব একটা কান্নাকাটি করতো না। সেই সাথে ছোটন ভাই নিজের শার্ট কেটে টিফুর গায়ের জামা বানিয়ে দিলো। টিফুর জন্য একটা ফিডারের ব্যবস্থা করা হলো। সেই ফিডারেই টিফুকে ভাতের মাড়, দুধ আর পানি খাওয়ানো হতো। সবাই মনের খুশিতে টিফুকে খাবার দিতো।
এদিকে রাতে টিফু কান্নাকাটি না করলেও শেয়ালের ভয়ে আমরা রাতে জেগে থাকতাম। তবে আমাদের রাত জেগে থাকা ছিলো খুবই আনন্দের। শীতের সময় ধান কাটা হলে ধান মাড়াই করে সেই নাড়া দিয়ে পালা দেয়া হতো। পালা দুই ধরণের ছিলো। একটা হচ্ছে ধান মাড়াইয়ের পর ধানের কাঁচা খড় দিয়ে এক ধরণের পালা দেয়া হতো। যেটাতে কিছু ধান থেকে যেতো। আরেকটা বেশ কিছুদিন পর এই ধানের নাড়ার মুঠি খুলে দিয়ে উঠোনে ছিটিয়ে দেয়া হতো। সেখানে চার পাঁচটা গরুকে জোয়াল দিয়ে বেধে চারদিকে হাঁটানো হতো। এতে করে ধানের নাড়ায় থেকে যাওয়া ধান মাটিতে পড়তো। সেই মাড়াই করা খড় রোদে শুকিয়ে পরে পালা দেয়া হতো। এই পালার খড় সারা বছর গরুকে খাওয়ানো হতো। আবার সেই খড় জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ধানযুক্ত কাঁচা খড়ের এই পালা এক বিশেষ প্রক্রিয়াই বানানো হতো। ধানের নাড়া একটার উপর আর একটা রেখে গোলাকার আকৃতিতে বিশাল আকারের পালা বানানো হতো। এই পালার উচ্চতা মাটি থেকে পনেরো বিশ ফুটের মতো হতো। একজন পালার মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতো আর অন্যরা একটা একটা করে ধানের নাড়া ছুড়ে মারতো। এভাবে একটা বিশাল পালা বানানো হয়ে যেতো। সেই পালার ভেতরে বাসা বানিয়ে আমরা টিফুকে পাহারা দিতাম।
সেই বাসা বানানোর জন্য আমরা একসাথে কাজ করতাম। পালা থেকে একটা নাড়া টেনে খুলে একটু জায়গা বানাতাম। তারপর সেখান থেকে আরও কয়েকটা নাড়া সরিয়ে সুড়ঙ্গ এর মতো করে ভেতরের ঢুকতাম। ভেতরে ঢুকে সেখানে সাত আটজন বসা যায় এমন একটা ফাঁকা জায়গা বানাতাম। এই পালার একেবারে উপরের দিকে বিছানার চাদর দিয়ে ঢেকে রাখতাম যাতে কুয়াশা না পড়তে পারে। একে একে সবাই কাঁথা বালিশ নিয়ে পালার ভেতর ঢুকে সুড়ঙ্গ বন্ধ করে দিতাম। সারারাত বৃষ্টির মতো কুয়াশা পড়লেও নাড়ার কারণে খুব একটা শীত অনুভত হতো না। একটু পর পর আমরা টিফু বলে ডাক দিতাম। আর কুকুর ছানা শব্দ করতো। এরমধ্যে আবার আমরা কিচ্ছা শুনতাম। কিচ্ছা বলার জন্য সোহেল মামা ছিলো এক প্রকার ওস্তাদ। তিনি ছিলেন আরমান মামার ফুফাতো ভাই। তিনি নানানরকম কিচ্ছা শোনাতেন। টোনাটুনির কথা, রাক্ষসের কথা, ঝুলাঝুলির কথা, শাকছুন্নীর কথা- আরও কথা কী! এভাবেই রাত পেরিয়ে সকাল হয়ে যেতো। মাঝেমধ্যে কেউ কেউ আবার টিফুর গর্তের মুখ দেখে নিশ্চিত হতাম যে তার কোনও ক্ষতি হয়নি। এভাবেই কষ্ট করে টিফুর প্রতি যত্ন নিতাম। আমরা টিফুকে পেয়ে খুশি হলেও বন্ধুদের কাছে শুনেছি যে বাবলু ভাই আর তার ভাই শিবলু টিফুকে ফিরিয়ে নেয়ার জন্য পরিকল্পনা করেছে। এমনকি লোক মারফতে ভয়ও দেখানো শুরু করেছিলো।
২৪ মে ২০২৪ ইং
গ্লেনফিল্ড, অস্ট্রেলিয়া।