15/07/2026
১৯৬৪ সাল; অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে সরকারি সহায়তাপ্রাপ্ত একটি কর্মসূচির আওতায় কাজ করছিলেন ওয়েলসের তরুণ ব্রায়ান রবসন।
কিন্তু চাকরিটি একেবারেই ভালো লাগছিল না তার। পরিবার ও নিজের দেশের জন্য প্রবল মন খারাপ ছিল। তিনি শুধু বাড়ি ফিরতে চেয়েছিলেন।
সমস্যা ছিল বিমানের টিকিট। ওয়েলসে ফিরতে প্রয়োজন ছিল প্রায় ৭০০ পাউন্ড। সেই সময় ব্রায়ানের কাছে যা ছিল প্রায় অসম্ভব এক অঙ্কের অর্থ।
তখনই দুই বন্ধুকে নিয়ে এক অবিশ্বাস্য পরিকল্পনা করেন তিনি- বিমানের যাত্রী হয়ে নয়, মালামাল হিসেবে নিজেকেই পাঠাবেন বাড়িতে!
তিন বন্ধু মিলে প্রায় ৩০ ইঞ্চি লম্বা, ২৬ ইঞ্চি চওড়া ও ৩৮ ইঞ্চি উচ্চতার একটি কাঠের বাক্স তৈরি করেন। সেই ছোট্ট বাক্সের ভেতর ঢুকে পড়েন ব্রায়ান। সঙ্গে নেন একটি বালিশ, টর্চলাইট, স্যুটকেস এবং অল্প পরিমাণ পানি।
এরপর বাক্সটিকে লন্ডনগামী বিমান পরিবহনের মালামাল হিসেবে পাঠানো হয়।
পরিকল্পনা অনুযায়ী সরাসরি ফ্লাইটে প্রায় ৩৬ ঘণ্টার মধ্যেই তার যাত্রা শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শুরু থেকেই সবকিছু ওলটপালট হতে থাকে।
দ্রুতগতির যাত্রীবাহী বিমানের বদলে ব্রায়ানের বাক্স তুলে দেওয়া হয় ধীরগতির একটি কার্গো বিমানে। এরপর ভুল পথে পাঠানো হয় যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে!
শুরু হয় ভ/য়ং/ক/র এক ব*ন্দি/জীবন।
টানা ৯২ ঘণ্টা কাঠের ছোট্ট বাক্সের ভেতরে আটকে ছিলেন ব্রায়ান। অধিকাংশ সময় চারপাশ ছিল পুরোপুরি অন্ধকার। শরীর নড়ানোর জায়গাও ছিল না।
একপর্যায়ে বাক্সটি উল্টো করে রাখা হয়। টানা ২২ ঘণ্টা মাথা নিচের দিকে রেখে উল্টো অবস্থায় আটকে থাকতে হয় তাকে! অসহনীয় ব্যথায় প্রায় জ্ঞান হারানোর অবস্থায় পৌঁছে যান ব্রায়ান।
বাক্সের ভেতরে শ্বাস নেওয়াও কঠিন হয়ে উঠছিল। হাত-পা অবশ হয়ে আসছিল। ব্রায়ানের মনে হচ্ছিল, কেউ বাক্সটি খোলার আগেই হয়তো তার মৃত্যু হবে।
অবশেষে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর পর বিমানবন্দরের কর্মীদের নজরে আসে বাক্সটি উল্টো অবস্থায় রয়েছে। তারা ভেতর থেকে ক্ষীণ শব্দও শুনতে পান।
দ্রুত কাঠের বাক্সটি খুলে ফেলা হয়।
ভেতরে পাওয়া যায় প্রায় মৃত্যুপথযাত্রী ব্রায়ান রবসনকে।
তাকে গ্রেপ্তার করার বদলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসার পর সুস্থ হয়ে ওঠেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ওয়েলস সরকার তার দেশে ফেরার খরচ বহন করে। এবার আর কাঠের বাক্সে নয়, স্বাভাবিকভাবেই বাড়ি ফেরেন ব্রায়ান।
তবে এই গল্পের আড়ালে ছিল তার দুই বন্ধুর কথাও।
পরবর্তী সময়ে কর্তৃপক্ষ তাদের বিষয়ে জানতে চাইলেও ব্রায়ান কখনো বন্ধুদের পরিচয় প্রকাশ করেননি। তার আশঙ্কা ছিল, একজন মানুষকে অবৈধভাবে আন্তর্জাতিক মালামাল হিসেবে পাঠাতে সাহায্য করার দায়ে তারা গুরুতর আইনি সমস্যায় পড়তে পারেন।
কয়েক দশক পর ব্রায়ান জানান, তার দুই বন্ধু আসলে পুরো পরিকল্পনা নিয়েই আতঙ্কিত ছিলেন। তারা বারবার তাকে সিদ্ধান্ত বদলানোর অনুরোধ করেছিলেন।
তারপরও শেষ পর্যন্ত সাহায্য করেছিলেন। কারণ তাদের মনে হয়েছিল, গভীর হতাশা ও বাড়ি ফেরার আকুতি থেকে ব্রায়ান এমন এক মানসিক অবস্থায় পৌঁছেছেন, যেখানে তাকে এই অবস্থায় রেখে দেওয়া ঠিক হবে না।
বাড়ি ফেরার মরিয়া আকুতি, দুই বন্ধুর ভয় ও বন্ধুত্বের টান- সব মিলিয়ে ব্রায়ান রবসনের ৯২ ঘণ্টার সেই বাক্সবন্দী যাত্রা বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে অদ্ভুত ভ্রমণকাহিনিগুলোর একটি হয়ে আছে।