24/11/2025
এই মানুষটাকে আমাদের সবার সালাম করা উচিত। একদিকে মানুষ শিক্ষিত হচ্ছে, ব্যক্তিগত কিংবা রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের গল্পে হত্যা করছে প্রকৃতি; অন্যদিকে এই কৃষক মাঠের ফসলের একটা অংশ রেখে দিচ্ছেন পাখিদের জন্য। এটা ওদের হিস্যা। প্রতি বছর তিনি এটা করেন।
আমার মাকে দেখেছি ভাত রান্নার সময় কুকুর বিড়াল ও পাখিদের জন্য ধরে রান্না করতে, যেন তারাও পরিবারের সদস্য। সংসারে মাকে কখনো প্রাণের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ করতে দেখিনি। একবার ইঁদুর মারার জন্য নিজেই কল পেতেছিল রান্নাঘরে। পরের দিন রাতেই একটা ইঁদুর পড়ে কলে। মা সেটাকে মারতে গিয়ে চোখের দিকে তাকিয়ে কি যেন কি কথা হয় দুজনের মধ্যে, কয়েকদিন পর আমরা সেই ইঁদুর উদ্ধার করি জ্বালানি ঘরের নিচে। কলের মধ্যেই নিয়মিত খাবার দিয়ে রেখে দিয়েছে মা। মারতে পারেনি।
বাড়িটা ছিল উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। তারপরও বাড়ির উঠোনে চলে আসে গুইসাপ কিংবা বেজি। সামনের তালগাছে ঝুলে থাকে বাবুই, পেছনের ডাবগাছের গর্তে বসে থাকে প্যাঁচা। বাড়ির পেছনে শিমুলগাছে লেজ নাচায় হলুদপাখি। মাঠে গেলে ঝোপের মধ্যে পেয়ে যাই সজারুর কাঁটা। বাড়ির প্রাচীরে আগাছা হিসেবে বেড়ে ওঠা ডুমুরের পাতা পেঁচিয়ে বাসা বেঁধেছে টুনটুনি। একদিন হয়ত পুকুরে মাছধরার জালে উঠে আসে কাছিম। আবার ছেড়ে দেওয়া হলো জলে। রান্নাঘরে খেতে বসলে দূরে বাঁশবাগান থেকে হাড়িচাটা পাখির শব্দ আসে কানে। পুকুরের চারপাশের দেয়াল ফুটো করে ঘর বেঁধেছে শত রঙের মাছরাঙা পাখি। দোয়েল-ঘুঘু-টিঙা যখন যে পারে উঠোনে এসে খেয়ে যায় কবুতরের জন্য ইঠের মাঝখানে গর্ত করে জমিয়ে রাখা জল। রাত হলেই শেয়ালের হুক্কাহুয়া উঠে আসে রাস্তায়। (বর্ষা হলে) ব্যাঙের ডাকে অস্থির চারপাশ। ডেকে ওঠে নিশিপাখি। অন্ধকার রাস্তায় হাঁটতে গেলে সাপের নিশ্চুপ চলাচলের শব্দ আসে কানে। জোনাকি পোকা তারা জ্বালিয়ে রাখে ঝোপেঝাড়ে। ঝিঁঝিঁপোকা ডাক পাড়ে মহাসমাবেশের। মাঠে একটু জল জমলেই চলে আসে ডাহুক, বক…।
এই মানুষগুলো তখন বাড়ি বাড়ি ছিল। কিন্তু উন্নয়নের ডাক পড়ে গেল চারপাশে। অসুস্থ বিকলাঙ্গ উন্নয়ন।
একবারও কেউ ভাবল না ওদের কি হবে! আজ উন্নয়ন হয়েছে—সমাজের, রাষ্ট্রের। উন্নয়নমূলক জীবের কারণে বিপর্যস্ত আজ প্রকৃতি।
কিন্তু এখনো কিছু মানুষ আছে, এই মানুষগুলো দেখে আমাদের স্মরণ করা উচিত, আমরাও মানুষ হতে পারি।