10/09/2026
ইবলিস কি পাগল ছিল?
নাকি সে আল্লাহকে চিনত না?
নাকি সে বুঝতে পারেনি, আল্লাহর অবাধ্য হওয়ার পরিণতি কী?
আসলে কোনোটাই নয়।
ইবলিস আল্লাহকে চিনত। আল্লাহর অস্তিত্বে তার কোনো সন্দেহ ছিল না। এমনকি আল্লাহ যখন তাকে আদম (আ.)-কে সিজদা করার নির্দেশ দিলেন, সে সেই নির্দেশ সরাসরি আল্লাহর কাছ থেকেই শুনেছিল।
তবুও সে অবাধ্য হলো।
কেন?
আল্লাহ তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “তোমাকে কিসে বাধা দিল যে তুমি সিজদা করলে না?”
খেয়াল করুন, আল্লাহ তাকে শুধু “কেন অবাধ্য হলে?” জিজ্ঞেস করেননি। বরং জানতে চেয়েছেন, কী তাকে বাধা দিল।
কারণ ইবলিসের ভেতরে এমন কিছু তৈরি হয়েছিল, যা তাকে সত্য মেনে নিতে বাধা দিচ্ছিল।
আর সেটা ছিল তার অহংকার।
ইবলিস নিজের সম্পর্কে একটা ইমেইজ তৈরি করে নিয়েছিল।
সে নিজেকে অন্যদের চেয়ে আলাদা ভাবত। ফেরেশতাদের সঙ্গে থাকার কারণে তার মনে হয়েছিল, সে বুঝি বিশেষ কেউ। তার একটা ভিআইপি পরিচয় তৈরি হয়ে গিয়েছিল।
তারপর আল্লাহ আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করলেন।
সবাইকে আদম (আ.)-কে সিজদা করতে বলা হলো।
সেখানেই ইবলিসের ভেতরের আসল সমস্যাটা বের হয়ে এলো।
সে ভাবল, “আমি কেন তাকে সিজদা করব?”
কারণ সে আদম (আ.)-কে নিজের চেয়ে নিচে মনে করেছিল।
তার কাছে বিষয়টা আর আল্লাহর আদেশ মানার ছিল না। বিষয়টা হয়ে গেল, “আমি কার সামনে নত হব?”
নিজের বানানো শ্রেষ্ঠত্বের ইমেজটাকে বাঁচাতে গিয়ে সে আল্লাহর আদেশ অমান্য করল।
এরপর আরও ভয়ংকর একটা কাজ করল ইবলিস।
সে নিজের ভুল স্বীকার করল না।
বরং দোষ চাপিয়ে দিল অন্যের ওপর।
প্রথমে আদম (আ.)-এর ওপর।
তারপর আল্লাহর ওপরও!
সে যুক্তি দেখাল, আল্লাহ তাকে আগুন দিয়ে সৃষ্টি করেছেন আর আদমকে মাটি দিয়ে। তাই সে কেন আদমকে সিজদা করবে?
অর্থাৎ, নিজের অহংকারকে প্রশ্ন করার বদলে সে আল্লাহর সিদ্ধান্তকেই প্রশ্ন করতে শুরু করল।
এখানেই ইবলিসের সবচেয়ে ভয়ংকর মানসিকতাটা ধরা পড়ে।
সে নিজের মাথার ভেতর একটা গল্প বানিয়ে নিল।
সেই গল্পে সে নির্দোষ। সে অবিচারের শিকার। সমস্যা তার মধ্যে নয়, সমস্যা অন্যদের মধ্যে।
এখন তার কাছে সত্য বলতে যা-ই থাকুক, নিজের বানানো গল্পটাই সত্য!
আর এটাই শয়তান মানুষের মধ্যেও তৈরি করতে চায়।
“আমি ঠিক, অন্য সবাই ভুল।”
“আমি খারাপ কিছু করিনি।”
“আমাকে বাধ্য করা হয়েছে।”
“ওর কারণেই আমি এমন করেছি।”
“আমার পরিস্থিতিই এমন ছিল।”
এভাবে মানুষ নিজের ভুলের সামনে দাঁড়ানোর বদলে নিজের জন্য একটা গল্প বানিয়ে নেয়।
একসময় সেই গল্পটাই তার কাছে সত্য হয়ে যায়।
ইয়াকুব (আ.)-এর সন্তানদের ঘটনাতেও আমরা এর একটি ভয়ংকর উদাহরণ দেখি।
তারা নিজেদের মনে একটা গল্প তৈরি করে নিয়েছিল। তারা মনে করেছিল, তারা ঠিক আর ইউসুফ (আ.) ও তাদের বাবা ভুল।
এমনকি তাদের সামনে একজন নবী থাকা সত্ত্বেও তারা নিজেদের বানানো সেই গল্প থেকে বের হতে পারেনি।
সমস্যা শুধু ভুল করা নয়।
মানুষ ভুল করতেই পারে।
আসল সমস্যা হলো, ভুল করার পরও নিজের কাছে নিজেকে সঠিক প্রমাণ করতে থাকা।
ইবলিসের পতন শুরু হয়েছিল এখান থেকেই।
অহংকার তাকে ভুল করিয়েছে।
ভুল স্বীকার না করার জেদ তাকে আরও দূরে নিয়ে গেছে।
আর নিজের বানানো গল্পকে সত্য মনে করতে করতে সে শেষ পর্যন্ত আল্লাহর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গেছে।
শয়তান জানে তার পরিণতি কী।
তাই তার এখন সবচেয়ে বড় লক্ষ্য শুধু আমাদের কোনো একটা পাপ করানো নয়।
সে চায় আমাদের ভেতরেও তার মতো অহংকার তৈরি হোক।
আমরা যেন নিজের ভুল স্বীকার না করি।
আমরা যেন সবসময় অন্যকে দোষ দিই।
আমরা যেন নিজের বানানো গল্পকেই সত্য মনে করি।
হয়তো আমরা অজান্তেই ইবলিসের দেখানো পথে কয়েক কদম হেঁটেও ফেলেছি।
কিন্তু পার্থক্য হলো, ইবলিস ফিরে আসেনি।
আমাদের জন্য এখনও ফিরে আসার দরজা খোলা।
নিজের ভুল স্বীকার করে আল্লাহর কাছে ফিরে আসাই তাই সবচেয়ে বড় বিজয়।
(লেখাটি 'Iblis: A Psychological Profile' লেকচারের ভাবানুবাদ)