19/03/2026
গতকাল সময় স্বল্পতার কারনে সঞ্চালক এই বক্তব্য শেষ করতে পারেনি। আমাদের মাননীয় প্রধান অতিথিসহ সিনিয়র অ্যালামনাই সবাই এটা পড়ার পর তাদের যথাসাধ্য সাহায্যের আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
নাটোর সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশান
উন্নয়ন পরিকল্পনা ও ভবিষ্যৎ কর্মপথ
বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম।
সম্মানিত প্রধান শিক্ষক, শ্রদ্ধেয় শিক্ষকবৃন্দ, উপস্থিত সম্মানিত রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, প্রিয় বড় ভাইয়েরা এবং আমার প্রিয় সহপাঠী ও ছোট ভাইয়েরা—আপনাদের সকলকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও সালাম। মাহে রমজানের এই শেষ প্রান্তে ইফতার সামনে নিয়ে স্কুলের সবাই একত্রিত হতে পেরে সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানাচ্ছি।
নাটোর বয়েজ স্কুল শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, এটি একটি নেতৃত্ব তৈরির কারখানা। এই স্কুলের রয়েছে দীর্ঘ ১১৬ বছরের গৌরবময় ইতিহাস। এখান থেকে উঠে এসেছে অসংখ্য সফল ব্যক্তি—কর্পোরেট, প্রশাসন, রাজনীতি, ব্যবসা এবং সামাজিক নেতৃত্বের প্রতিটি ক্ষেত্রে আমাদের স্কুলের শিক্ষার্থীরা গৌরবের সাথে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছে।
আমাদের ইতিহাস শুধু একাডেমিক সাফল্যের নয়, বরং সামাজিক সচেতনতা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকার ইতিহাসও বটে। শিক্ষা সংস্কার আন্দোলন, তনু হত্যার বিচার, সড়ক আন্দোলন, কোটা সংস্কার আন্দোলন এবং সাম্প্রতিক স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন—প্রতিটি ক্ষেত্রেই নাটোর বয়েজ স্কুলের শিক্ষার্থীরা সাহসিকতার সাথে অংশগ্রহণ করেছে এবং সকল সামাজিক-রাজনৈতিক অনাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ অব্যাহত রেখেছে। এই পথচলায় অনেকেই আহত হয়েছে, মামলা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে—তবুও আমরা থেমে থাকিনি।
এছাড়া, আমাদের অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে। ২০১০ সালের শতবর্ষ উদযাপন , গরীব মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান , ২০২৪ সালের বন্যায় আমরা একত্রিত হয়ে লক্ষ্মীপুর জেলার রামগতিতে চার লক্ষাধিক টাকার ত্রাণ সহায়তা প্রদান করেছি। পাশাপাশি গ্র্যান্ড ইফতার, ফুটবল টুর্নামেন্টসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের মাধ্যমে আমরা একটি ঐক্যবদ্ধ কমিউনিটি গড়ে তুলেছি।
তবে বাস্তবতা হলো—আমাদের এই গৌরবময় ধারাবাহিকতা কিছু ক্ষেত্রে ব্যাহত হয়েছে। আমাদের কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা এবং স্কুলের সামগ্রিক পরিবেশ স্বাভাবিকভাবে উন্নতির দিকে এগিয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও, দুঃখজনকভাবে তা প্রত্যাশিতভাবে অগ্রসর হয়নি; বরং অনেক ক্ষেত্রে অবনতির দিকেই গেছে। এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো বিগত সময়ে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় কিছু অসাধু স্থানীয় চক্রের প্রভাব, যারা আমাদের স্কুলের শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে।
এর ফলে র্যাগ ডে-এর মতো একটি আনন্দঘন অনুষ্ঠানও অপব্যবহারের শিকার হয়েছে, যেখানে বহিরাগত ও অছাত্র ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করে অনভিপ্রেত ও লজ্জাজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে আমাদের সম্মানিত শিক্ষকদের অপমানিত করা হয়েছে, যা অত্যন্ত নিন্দনীয়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—কিছু ক্ষেত্রে স্কুল চলাকালীন সময়ে, এমনকি ইউনিফর্ম পরিহিত অবস্থায় শিক্ষার্থীদের অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার ঘটনাও পরিলক্ষিত হয়েছে, যা আমাদের সবার জন্যই গভীরভাবে দুঃখজনক।
আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এই প্রতিকূল পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে এসে আমাদের প্রিয় প্রতিষ্ঠানের হারানো গৌরব পুনরুদ্ধার করা সম্ভব। সেই লক্ষ্যেই আমরা সম্মিলিতভাবে কাজ করতে বদ্ধপরিকর।
আজকের এই ইফতার মাহফিল শুধু একটি সৌহার্দ্যের অনুষ্ঠান নয়—এটি আমাদের নতুন করে শুরু করার একটি অঙ্গীকার।
আমাদের লক্ষ্য:
নাটোর বয়েজ স্কুলের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনা এবং আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ, নিরাপদ ও নেতৃত্ব বিকাশের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা।
এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য আমরা কিছু সুসংগঠিত পরিকল্পনা উপস্থাপন করছি—
১. ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং প্রোগ্রামঃ
প্রতিবছর অন্তত ১-২ বার অ্যালামনাইদের অংশগ্রহণে ক্যারিয়ার গাইডলাইন সেশন আয়োজন করতে হবে।
২. মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা (Mental Health Counseling):
শিক্ষার্থীদের মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে নিয়মিত কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।
৩. স্কুল-বান্ধব পরিবেশ শক্তিশালীকরণ কার্যক্রমঃ
সিনিয়র-জুনিয়র সম্পর্ক উন্নয়ন ও ইতিবাচক পরিবেশ তৈরিতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হবে।
৪. বিভিন্ন ক্লাব প্রতিষ্ঠাঃ
সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে সায়েন্স, ক্যারিয়ার, বিজনেস, ডিবেট, স্পোর্টস, কালচারাল, ফটোগ্রাফি ও কনটেন্ট ক্রিয়েশন ক্লাব গঠন করতে হবে।
৫. বৃত্তি কার্যক্রম সম্প্রসারণঃ
মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য অ্যালামনাই স্কলারশিপ আরও বৃদ্ধি করতে হবে।
৬. জাতীয় পর্যায়ের ইভেন্ট আয়োজনঃ
প্রতিবছর অন্তত ১-২টি বড় ফেস্ট, বিজ্ঞান মেলা বা কার্নিভাল আয়োজন করতে হবে।
৭. আর্টস ও কমার্স বিভাগের পুনরুজ্জীবনঃ
শিক্ষার্থীদের বহুমুখী ক্যারিয়ারের সুযোগ তৈরি করতে আর্টস, কমার্স বিভাগগুলো পুনরায় সক্রিয় করার উদ্যোগ নিতে হবে।
৮. শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক অপব্যবহার প্রতিরোধঃ
প্রশাসন, শিক্ষক ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সমন্বয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে এবং শিক্ষার্থীদের জন্য একটি নিরাপদ শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
৯. বার্ষিক অ্যালামনাই সভাঃ
প্রতিবছর অন্তত একটি সাধারণ সভা এবং বার্ষিক কার্যক্রম মূল্যায়ন ও পরিকল্পনা সভার আয়োজন করতে হবে।
পরিশেষে বলতে চাই—
নাটোর গভর্নমেন্ট বয়েজ হাই স্কুল অ্যালামনাই শুধু অতীতের গৌরব নয়, এটি আমাদের ভবিষ্যতের দায়িত্ব। আমরা সবাই যদি একসাথে কাজ করি, তাহলে অবশ্যই আমরা আমাদের প্রিয় প্রতিষ্ঠানকে আবার তার প্রাপ্য স্থানে নিয়ে যেতে পারবো।
আসুন, আমরা প্রতিজ্ঞা করি—
আমরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে থাকবো, আমরা শিক্ষার পক্ষে থাকবো, আমরা নেতৃত্ব গড়ে তুলবো।