08/05/2024
শুভ রবীন্দ্রজয়ন্তী।
আজ যে বাংলায় আমরা লিখি, কথা বলি, সাহিত্য করি এমনকি ভাবি, তার সিংহভাগ কৃতিত্ব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের।
কীভাবে?
রবীন্দ্রনাথের ভাষা
সুশান্ত কর
”পাণিনির ব্যাকরণকে আজকাল গোটা বিশ্ব দাবি করে আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানের, এমনকি চমস্কি প্রবর্তিত রূপান্তরমূলক সৃজনমূলক ভাষাবিজ্ঞানেরও আদিগ্রন্থ। এটি যেমন আমাদের পক্ষে গৌরবের, তেমনি এ আমাদের এক সর্বনাশেরও কারণ। আমরা জানি, এর পর ভারতে যতগুলো ব্যাকরণ লেখা হয়েছে, সেগুলো ওই পাণিনি ব্যাকরণেরই টীকাভাষ্য। দার্শনিক মতপ্রস্থান অনুযায়ী কেউ কেউ টীকাভাষ্যের বয়ানে, গ্রহণ বর্জনে রকমফের ঘটিয়েছেন কিন্তু মূলগতভাবে সেগুলো পাণিনি ব্যাকরণেরই উত্তরভাষ্য বলা চলে। পালি-প্রাকৃত ভাষারও ব্যাকরণ যে কয়টি লেখা হয়েছে সেগুলোতেও তার ব্যত্যয় হয়নি। এমনকি প্রথম যে প্রাকৃত ব্যাকরণের খবর পাওয়া যাচ্ছে, সেই হেমচন্দ্রর "সিদ্ধহেম শব্দানুশাসনে'ও তাই আর সেটি রচিত হচ্ছে প্রাকৃতের বয়স সহস্রাব্দ পার করাবার পর খ্রিষ্টীয় একাদশ/দ্বাদশ শতকে। তত দিনে প্রত্নবাংলাও দেখা দিচ্ছে, চর্যাপদের কবিতাগুলো লেখা হয়ে যাচ্ছে। সুতরাং বাংলা ব্যাকরণ বা অভিধানের জন্যে যে আমাদের ১৭৩৪ খ্রিষ্টাব্দে পর্তুগিজ পাদ্রি মনো এল দ্য আসসুম্পসাউ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে, তাতে অবাক হবার কিছু নেই।
মনোএলের 'ভোকাবুলারিও এম ইদিওমা বেনগল্লা’ই পর্তুগিজ: দিভিদিদো এম দুয়াস পার্তেস' নামের বইটি ১৭৪৩ সালে পর্তুগালের রাজধানী থেকে ছেপে বেরোয়। পাণিনির দেশে এইটিই ছিল বাংলাভাষার ভাষাচিন্তাসংক্রান্ত প্রথম বই। আজকের পরিচিত মান বাংলাভাষাতেও লেখা নয় বইটি। বাংলাদেশের রাজধানী শহর ঢাকার অদূরে বর্তমানে গাজীপুর জেলার অন্তর্ভুক্ত, তৎকালীন ভাওয়াল পরগণার বাংলা ভাষার ওপর ভিত্তি করেই মনোএল লিখেছিলেন এই বই। কিন্তু পরে যেটি বাংলা লেখার ভাষা সাধুভাষা হিসেবে গড়ে উঠবে, তার প্রবণতাও এর মধ্যে দেখা যাচ্ছিল। যে সাধুভাষার দীর্ঘ ক্রিয়াপদগুলো মূলতই ছিল পূর্ব বাংলার উপভাষাগুলো থেকে নেওয়া। কিন্তু সেই ভাষাকেই শ্রীরামপুর মিশনের সময় থেকে সংস্কৃত শব্দবহুল প্রায় সংস্কৃত করে ফেলবার এত বেশি আয়োজন হলো যে বঙ্কিম থেকে রবীন্দ্রনাথের যুগ অব্দি তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের এক প্রস্তুতির বেলা আমাদের কাটাতে হলো। মনোএলের পর মাঝের এই প্রায় দেড় শতকে এই বাংলা ভাষাতে দেশি-বিদেশি পণ্ডিতেরা অজস্র ব্যাকরণ এবং অভিধান লিখেছেন। কিন্তু সেগুলো ছিল হয় ইংরেজি নতুবা সংস্কৃত ব্যাকরণ এবং অভিধানের ছাঁচে ঢালা। এর বাইরে ভাষাতত্ব নিয়ে আমাদের ভাবনা এগোলোই না। কারণ, কৃত্তিবাস থেকে ভারতচন্দ্রের এক দীর্ঘ সময়কাল পার করে এলেও ঔপনিবেশিক সূত্রে পাওয়া ইংরেজি আমাদের সম্পদ বাড়াল যেমন, বিপদেও তেমনি জড়াল অনেক বেশি, অনেক জটিল করে। আমরা আবার নতুন করে অবিশ্বাস করতে শুরু করলাম যে বাংলাভাষা দিয়ে ভদ্রসমাজে দুটো কাজের কাজ চালানো যেতে পারে। সেই অবিশ্বাস বর্জনের কাজটা বিদ্যাসাগর-বঙ্কিমেরা কিছুদূর এগিয়ে দিলেন। কিন্তু যাকে বলে কোমরে কাছা বেঁধে নেমে পড়া, সে কাজটা প্রথম করলেন রবীন্দ্রনাথ।”