09/10/2024
বেদ-পুরাণ অনুসারে দুর্গা হিমালয়ের কন্যা,
যিনি কৈলাস পর্বতের অধিষ্ঠাত্রী।
কিন্তু বাংলার সমাজ ও সংস্কৃতিতে ক্রমেই তিনি হয়ে উঠেছেন বাংলার...
কিন্তু কিভাবে তার একটা ছোট্ট আলোচনা করার চেস্টা করলাম আমার মত ইচ্ছা ছিল একটা ভিডিও বানাবো কিন্তু তাতে আগামী পূজার টাইম হয়ে যাবার চান্স আছে তাই লেখা আকারেই দিলাম। একটু বড় লেখা তাই যারা স্কিপ করতে চান করতে পারেন...
ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে প্রায় ২৫০টির মতো ধর্মমত সারা বিশ্বে ছড়িয়েছে, যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রচলিত ধর্ম হলো সনাতন ধর্ম, এই ধর্ম প্রাচীন এবং জটিল বিভাজনের মাঝ দিয়ে বিকশিত হয়েছে এমনকি অঞ্চল ভেদে এই ধর্মের দেব-দেবীর প্রাধান্যতাও ভিন্ন।
উত্তর ভারতে রাম, কৃষ্ণ ও শিব, পশ্চিম ভারতে গণেশ ও অম্বা, দক্ষিণ ভারতে মুরগান, বালাজী ও মীনাক্ষী এবং পূর্ব ভারতে দুর্গা ও জগন্নাথের পূজা করা হয়। এটির পেছনের কার ঐতিহাসিক, প্রাকৃতিক এবং অনান্য।
একটু সহজ করার চেষ্টা করি...
হিন্দু ধর্মের প্রধান তিন দেবতা হলেন:
ব্রহ্মা (সৃষ্টির দেবতা), যার স্ত্রী সরস্বতী, বিদ্যার দেবী।
বিষ্ণু (পালনের দেবতা), যার স্ত্রী লক্ষ্মী, ধন-সম্পদের দেবী।
শিব (ধ্বংস ও পুনর্জন্মের দেবতা), যার স্ত্রী পার্বতী, এবং দুর্গা তাঁর একটি বিশেষ রূপ। তাদের সন্তানরা হলেন গণেশ (বুদ্ধি ও সমৃদ্ধির দেবতা) এবং কার্তিক (যুদ্ধের দেবতা)। সরস্বতী এবং লক্ষ্মী কেউ দুর্গার কন্যা হিসবে বা তার প্রতিরুপ হিসবেই ধরা হয়।
এখানে একটা ব্যাপার খেয়াল করা যায় দুর্গাই একমাত্র দেবী, যিনি সকল প্রধান দেবতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
বাংলা বরাবরেই পুরো ভারত থেকে কিছুটা সতন্ত্র চরিত্রের ছিল, বঙ্গোপসাগরের পাড়ের এই জনগণ ছিল মুলত কৃষি নির্ভর তাই তাদের নতুন ফসলের সুরক্ষার জন্য বিষ্ণু এবং ঝড়, বন্যা প্রাকৃতিক জলোচ্ছ্বাস থেকে মুক্তি পেতে শিবের দয়ার দরকার ছিল। এছাড়াও বিদ্যা বুদ্ধি সম্পদ এসব হারালেও তো হবে না তাই সব চিন্তা করে এই অঞ্ছলের মানুষ দুর্গাকেই প্রধান দেবী হিসেবে গ্রহণ করেন। এভাবে অন্যান্য প্রধান দেবতাদের রুষ্ট হওয়ার সুযোগ নেই, কারণ সকলেই দুর্গার সাথে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। আর দুর্গা পূজা মানে এই ত্রি-শক্তির ( শিব, বিষ্ণু এবং ব্রহ্মার সম্মিলিত শক্তির প্রতিফলন) আরাধনা করা। তবে এর পেছনে শাক্ত মতবাদ (দেবী শক্তির উপাসনা) প্রভাব অস্বীকার করার উপায় নেই।
ধর্মীয় ভাবে,
দুর্গার উল্লেখ প্রথম পাওয়া যায় "মহিষাসুরমর্দিনী" রূপে মার্কণ্ডেয় পুরাণে, এবং ঋগ্বেদে "দুর্গা" শব্দটি এসেছে "দুর্গ" থেকে, যার অর্থ 'দুর্গম'। তিনি প্রতিরক্ষামূলক ও রক্ষাকর্ত্রী সত্তার প্রতীক।
হিন্দুদের বিশেষ দুটি ইভেন্ট রামায়ন এবং মহাভারতেও কিন্তু দুর্গা পূজার উল্লেখ আছে...
#রামায়নে রামচন্দ্র ,যিনি নিজেই ভগবান বিষ্ণুর একটি অবতার ছিলেন তিনি, রাবণের বিরুদ্ধে যুদ্ধের পূর্বে #অকাল_বোধন (অসময়ে দেবী কে ডাকা) করে দেবী দুর্গার কাছে আশীর্বাদ প্রার্থনা করেন। বর্তমানে শরৎ কালের যে পুজা তা কিন্তু সেই সময় থেকেই প্রচলিত। আগে এটা বসন্ত কালে বাসন্তী পুজা হিসেবে হতো।
#মহাভারতে দুর্গার পূজারও উল্লেখ আছে। যুধিষ্ঠির এবং অন্যান্য পাণ্ডবরা যুদ্ধের আগে দেবী দুর্গার আশীর্বাদ লাভের জন্য পূজা করেন। তারা বিশ্বাস করেন যে, দুর্গার পূজা তাঁদের যুদ্ধের শক্তি ও জয়ের পথ উন্মুক্ত করবে। এবং তাই হয়।
#নবাবী_আমলে এই পূজার ব্যাপ্তি এত ব্যাপক ছিল না, মুলত সিরাজ উদ্দৌলার পতনের পর থেকেই বাড়তে থাকে এর প্রচলন। জমিদাররা নিজেদের প্রভাব ও প্রতিপত্তি প্রদর্শনের জন্য বেশ জমকালোভাবে এই পূজার আয়োজন করতে থাকেন। ১৭৫৭ সালে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের আয়োজনকৃত দুর্গা পূজাকে অনেকেই এই অঞ্চলে পূজার প্রচলনের পথিকৃৎ মনে করেন অনেকেই।
এছাড়াও বাংলার বিভিন্ন জমিদার বাড়িতে এই আয়োজনের ব্যাপকতা ছিল ব্যাপক, শ্রীদত্ত জমিদারবাড়ি (নবদ্বীপ) ও নাটোরের জমিদারবাড়ির দুর্গা পূজার খরচ কয়েক লক্ষ টাকা ছিল, যা সে সময়ে জন্য অনেক, অনুমান করা হয় তা তখনকার ১লক্ষ টাকা এখনকার ৫ কোটির মত মূল্যমান যদিও আমার কাছে মনে হয় অনুপাত টা আরো অনেক বেশি হবে।
তবে গেইম চেঞ্জিং ব্যাপার ছিল, যখন বারোয়ারী পূজার প্রচলন শুরু হয় জাত পাতের ক্লাসিফিকশানে জর্জরিত হিন্দু সমাজে এমন সার্বজনীন অংশগ্রহন অন্য কোন কিছুতে আর হয়ে উঠেনি। ১৭৯০ সালে হুগলির গোপীমোহন ঠাকুরের বাড়িতে সার্বজনীন তথা বারোয়ারি পুজা ধারণা শুরু হয়।
১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের সময় থেকে দুর্গা পূজা ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। এই সময় বাঙালি হিন্দুদের জাতীয়তাবাদী চেতনাকে জাগ্রত করতে দুর্গা পূজাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক সভা, আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হত। বিপ্লবীরা দুর্গাকে মাতৃভূমির প্রতীক হিসেবে কল্পনা করেন। এই সুযোগে তারা তাদের ম্যাসেজ ও সবার কাছে খুব সহজে ছড়িয়ে দিতে পারতো।
আর তাই ইংরেজরাও এই ব্যাপারটা মোটেও ভাল ভাবে দেখতো না তখন।আসলে এত বিভাজনের দেশে কোন একটা ইস্যুতে এতটা ঐক্য এই ব্যাপারটা ক্ষমতাশীনরা কখনোই ভাল ভাবে নেয় না।
বঙ্গভঙ্গের সময় বাঙালি-হিন্দুরা জাতীয়তাবাদী চেতনা জাগ্রত করতে দুর্গা পূজা কেন্দ্র করে রাজনৈতিক সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হত। #বঙ্কিমচন্দ্র_চট্টোপাধ্যায়ের "আনন্দমঠ"-এ দেবী দুর্গার রূপে মাতৃভূমিকে চিত্রিত করা হয়, যা ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের এক প্রতীকী ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
“বন্দে মাতরম” গানটি তখন জাতীয় স্লোগান হয়ে ওঠে।
বিপ্লবী নেতা অরবিন্দ ঘোষ দুর্গাকে "মাতৃশক্তি" বলে অভিহিত করেন এবং তাঁকে ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামে এক জাতীয় প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেন।
ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সময় দুর্গা পূজা বিপ্লবীদের জন্য একটি শপথের মঞ্চ ছিল। তাঁরা দেবীর সামনে শপথ নিতেন ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করার। দুর্গার যুদ্ধের প্রতীকী রূপ #মহিষাসুরমর্দিনী বিপ্লবীদের অনুপ্রেরণা দিত।বিপ্লবীরা মনে করতেন, দুর্গার মতোই তাঁরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করে বিজয় অর্জন করবেন।
আজও দুর্গা পূজা ধর্মীয় উৎসব ছাড়াও একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মিলনমেলা। দেবী দুর্গা শুধুমাত্র ধর্মীয় দেবী নন, তিনি বাঙালির জাতীয়তাবাদ, স্বাধীনতার লড়াই ও সামাজিক ঐক্যের একটি প্রতীক।
সকল হিন্দু ভাই বোনকে দুর্গা পূজার শুভেচ্ছা।। ধন্যবাদ নতুন সরকারকে যারা এদেশের হিন্দু ভাই বোনদের প্রানের দাবী মেনে নিয়ে পূজার ছুটি বাড়িয়ে দিয়েছেন, এবারের পুজা হোক ঐক্যের সৌহার্দের ।।
বিঃ দ্রঃ আমার লেখা শত ভাগ সঠিক নাও হতে পারে এবং লেখার কোন কথা নিয়ে যদি কেউ আঘাত পেয়ে থাকেন তবে আমাকে নিজ গুনে ক্ষমা করবেন, সম্ভব হলে আমাকে জানাবেন আমি চেঞ্জ করে দিবো।