03/02/2024
একটি হায়ার স্টাডি প্ল্যাটফর্মের মডারেটর হিসেবে কাজ করার সুবাদে পৃথিবীর নানা দেশে উচ্চশিক্ষারত বাংলাদেশী ভাইদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ হয় আমার। বলা যেতে পারে, এই যোগাযোগ করাই আমার প্রধানতম অ্যাসাইনমেন্ট। বাইরে অধ্যয়নরত ভাইদের বিস্ময়কর জীবনগল্প শুনি, উচ্চশিক্ষার জন্য তাঁদের সংগ্রামের রুদ্ধশ্বাস বর্ণনা শুনে আপ্লুতও হই কখনো কখনো।
এই সব গল্পের কিছু যেমন অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করে, আবার কিছু সৃষ্টি করে সম্মোহন এবং শ্রদ্ধা। তেমনই এক শ্রদ্ধা জাগানিয়া অভিজ্ঞতা হলো একবার। কোনো এক সন্ধ্যায় অচেনা নাম্বার থেকে হোয়াটসঅ্যাপে একটি টেক্সট পেলাম। টেক্সট করেছেন মিশরের কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বাংলাদেশী ভাই। তিনি সেখানে মেডিসিনে আন্ডারগ্রাজুয়েট করছেন। তিনি জানালেন— বাংলাদেশের এক ভাইয়ের মাধ্যমে তিনি আমার নাম্বারটি পেয়েছেন।
এরপর আলাপে আলাপে বেশ কিছু অবাক করা তথ্য জানলাম। তিনি মূলত চীনের একটি স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্ডারগ্রাজুয়েট পড়তে গিয়েছিলেন। ফুল ফান্ড নিয়েই পড়তে গিয়েছিলেন সেখানে। সুযোগ-সুবিধা সবদিক থেকেই ভালো। তবে সমস্যা একটাই— সেখানকার পরিবেশে দ্বীন মেনে চলা তার জন্য বেশ কষ্টকর হয়ে যাচ্ছিল। আশেপাশে কোনো দ্বীনি ভাইকেও পাচ্ছিলেন না, দ্বীন মেনে চলতে যার টুকটাক সাহায্য নেওয়া যেতে পারে।
তিনি কায়মনোবাক্যে চাচ্ছিলেন দ্বীনি পরিবেশ পাওয়া যাবে, এমন কোনো দেশে চলে যেতে। শুধু একাডেমিক ক্যারিয়ারটাই তার কাছে মুখ্য নয়, দ্বীন মেনে চলার মতো পরিবেশ পাওয়াটাও তার জন্য সমান জরুরি। চেষ্টা এবং দোয়া অব্যাহত রাখলেন। একদিন সত্যি সত্যিই আল্লাহর সাহায্য এসে পৌঁছল তার কাছে। ডাক পেলেন মিশরের কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বার, যেখানে চীনের সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের চাইতেও অধিক সুযোগ-সুবিধা অপেক্ষা করছিল তার জন্য।
পাকিস্তানের জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পী জুনায়েদ জামশেদ যখন খ্যাতির একদম চূড়ায় অবস্থান করছিলেন, তখনই ছেড়ে দিলেন সঙ্গীত। সেসময় তিনি একেকটা স্টেজ পারফর্ম করে যে পরিমাণ অর্থ কামাচ্ছিলেন, অঙ্কের হিসেবে সেটা চোখ কপালে ওঠার মতো। যশ-খ্যাতি, অর্থ-বিত্তে মোড়ানো এক অভিজাত জীবন কাটাচ্ছিলেন তিনি। পৃথিবীব্যাপী কোটি কোটি ভক্তকুল আর এমন অভিজাত জীবন ছেড়ে চলে আসা মোটেও সহজ ছিল না তাঁর জন্য।
দ্বীনের জন্য সঙ্গীত ছেড়ে দেওয়ার পর নিদারুন দারিদ্রতা নেমে এলো জুনায়েদ জামশেদের জীবনে। অবস্থা এমন বেগতিক হলো যে, বেতন দিতে না পারার কারণে ছেলে-মেয়েকে স্কুল থেকে ছাড়িয়ে আনতে বাধ্য হলেন। বিক্রি করে দিতে হলো শখের গাড়িটিও। নগদ যা টাকা-পয়সা ছিল, তা-ও ফুরিয়ে আসতে লাগল দ্রুত। সর্বশেষ যেদিন পকেটে ১০০ টাকা ছিল, সেদিন স্ত্রীর হাতে টাকাটা তুলে দিয়ে বললেন— 'এই আমার শেষ সম্বল! কাল থেকে সংসার কীভাবে চলবে, তা আমি জানি না।'
জীবনসঙ্গিনী ছিলেন তাঁর জন্য আল্লাহর এক নেয়ামত। তিনি স্বামীকে অভয় দিয়ে বললেন, 'আপনাকে চিন্তা করতে হবে না। আজ যিনি রিজিক দিচ্ছেন, আগামীকালও তিনিই রিজিক দিবেন।' বস্তুত আল্লাহ বান্দার কাছ থেকে কুরবানী চান, কিন্তু কুরবানী নেন না। ঠিক এমনটিই ঘটেছিল ইবরাহীম আলাইহিস সালামের জীবনে। জুনায়েদ জামশেদ রাহিমাহুল্লাহর জীবনেও পরীক্ষার সময়টি ফুরিয়ে এল একপর্যায়ে। অনেক কষ্টে কিছু অর্থ জোগাড় করে তিনি পাঞ্জাবির ব্যবসা শুরু করলেন।
বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, প্রায় মুখ থুবড়ে পড়া সেই ব্যবসা একসময় উঠে দাঁড়াল। ধীরে ধীরে গোটা পাকিস্তানজুড়ে প্রায় ৪৬ টি পাঞ্জাবির শো রুম দিলেন তিনি। সেসব ব্যবসায় তাঁকে আর খুব একটা সময় দিতে হতো না। ফলে পুরোটা সময় তিনি দাওয়াহ’র পেছনে ব্যয় করতে লাগলেন। একদিন আল্লামা তাকী উসমানী হাফিজাহুল্লাহ তাঁকে ডেকে একটি হামদ ধরিয়ে দিয়ে সেটি রেকর্ড করতে বললেন। ২০০৭ সালে সেই হামদের সিডিটি সর্বোচ্চ বিক্রির রেকর্ড ভঙ্গ করে ফেলল।
তিনি দ্বীনের জন্য যা যা হারিয়েছিলেন, আল্লাহ ধীরে ধীরে তার সবটাই তাঁকে ফিরিয়ে দিলেন অন্য এক মাধ্যমে। সেই সাথে তিনি পেলেন গোটা পৃথিবীর কোটি কোটি মুসলিম জনতার হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা। বিমান দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যুতে কেঁদেছে গোটা দুনিয়া। আজও পৃথিবীর লাখো কোটি মুসলমানের অন্তরে অমলিন হয়ে আছে একটি নাম— জুনায়েদ জামশেদ রাহিমাহুল্লাহ। বিশ্বাস রাখুন! আল্লাহর জন্য আপনি যা ত্যাগ করবেন, তাঁর চাইতে উত্তম কিছু ফিরিয়ে দিবেন তিনি।
'আল্লাহকে যারা বেসেছে ভালো'/ লাবিব আহসান