01/06/2026
শহীদ রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমান : আধুনিক বাংলাদেশের পথপ্রদর্শক
ইতিহাসের প্রতিটি জাতির জীবনে এমন কিছু মানুষ জন্ম নেন, যাঁরা শুধু একটি সময়কে নেতৃত্ব দেন না; তাঁরা হয়ে ওঠেন একটি জাতির স্বপ্ন, সংগ্রাম ও আত্মপরিচয়ের প্রতীক। বাংলাদেশের ইতিহাসে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তেমনই এক নাম। তিনি ছিলেন একাধারে মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানায়ক, স্বাধীনতার অগ্রসৈনিক, রাষ্ট্রনায়ক, উন্নয়নের রূপকার এবং জাতীয় আত্মমর্যাদার এক দৃপ্ত প্রতীক।
৩০ মে এলে বাংলাদেশের আকাশে যেন এক ধরনের বিষণ্নতা নেমে আসে। এই দিনটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় সেই মানুষটির কথা, যিনি নিজের জীবনকে বিলিয়ে দিয়েছিলেন দেশ ও জাতির কল্যাণে। তাঁর শাহাদাত শুধু একজন রাষ্ট্রপতির মৃত্যু ছিল না; এটি ছিল বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় এক যাত্রাপথে আকস্মিক আঘাত।
জিয়াউর রহমানের জীবন ছিল কর্মের, সাহসের এবং আত্মত্যাগের এক অনন্য কাব্য। পাকিস্তানি শাসনামলে যখন বাঙালিদের অবজ্ঞার চোখে দেখা হতো, তখন একজন তরুণ সেনা কর্মকর্তা হিসেবে তিনি প্রমাণ করেছিলেন—বাঙালি দুর্বল নয়, বাঙালি সাহসী, বাঙালি যোদ্ধা। ১৯৬৫ সালের যুদ্ধে তাঁর বীরত্ব যেমন সেনাবাহিনীতে নতুন আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি করেছিল, তেমনি ১৯৭১ সালে তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত স্বাধীনতার আহ্বান লক্ষ কোটি মানুষের হৃদয়ে জাগিয়ে তুলেছিল মুক্তির অদম্য আকাঙ্ক্ষা।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনালগ্নে যে কয়েকজন মানুষ জাতিকে সাহস যুগিয়েছিলেন, জিয়াউর রহমান তাঁদের অন্যতম। যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁর নেতৃত্ব, দৃঢ়তা ও কৌশল তাঁকে একজন কিংবদন্তি মুক্তিযোদ্ধার মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে। কিন্তু তাঁর অবদান শুধু যুদ্ধেই সীমাবদ্ধ নয়; প্রকৃত চ্যালেঞ্জ শুরু হয়েছিল স্বাধীনতার পরে, যখন একটি বিধ্বস্ত দেশকে পুনর্গঠন করার দায়িত্ব সামনে এসে দাঁড়ায়।
সেই সময় বাংলাদেশ ছিল হতাশা, দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তায় ঘেরা। জিয়াউর রহমান সেই অন্ধকারে আশার প্রদীপ জ্বালিয়েছিলেন। তিনি মানুষকে শিখিয়েছিলেন—রাষ্ট্র শুধু সরকারের ওপর নির্ভর করে না, রাষ্ট্র এগিয়ে যায় জনগণের শ্রম, উদ্যোগ ও আত্মবিশ্বাসের মাধ্যমে। তাঁর বিখ্যাত আহ্বান ছিল উৎপাদন বাড়ানোর, কর্মসংস্থান তৈরির এবং আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গড়ার।
তিনি গ্রামকে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসেন। খাল খনন, সেচ সম্প্রসারণ, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন—এসব কর্মসূচির মাধ্যমে তিনি দেশের অর্থনীতিকে নতুন প্রাণশক্তি দেন। আজ যে তৈরি পোশাক শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি এবং যে বৈদেশিক কর্মসংস্থান দেশের কোটি মানুষের জীবনে পরিবর্তন এনেছে, তার সূচনালগ্নের দূরদর্শী পরিকল্পনায় জিয়ার অবদান স্মরণীয়।
রাজনীতির ক্ষেত্রেও তিনি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন। বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে তিনি রাজনৈতিক মতপ্রকাশের ক্ষেত্র প্রসারিত করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে জাতির শক্তি নিহিত থাকে জনগণের অংশগ্রহণে। তাই তিনি রাজনীতিকে কেবল ক্ষমতার প্রতিযোগিতা নয়, বরং জাতীয় উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন।
পররাষ্ট্রনীতিতে তিনি বাংলাদেশের মর্যাদা বৃদ্ধি করেন। মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সংহতির ধারণা প্রতিষ্ঠায় তাঁর উদ্যোগ ছিল সুদূরপ্রসারী। সার্ক প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন ছিল তাঁর আঞ্চলিক শান্তি ও সহযোগিতার দর্শনের বাস্তব প্রতিফলন।
জিয়াউর রহমানের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর চরিত্র। ক্ষমতার শীর্ষে থেকেও তিনি ছিলেন সহজ-সরল, কর্মঠ ও আড়ম্বরহীন। তিনি মাঠে গেছেন, মানুষের কাছে গেছেন, তাঁদের কথা শুনেছেন। তাঁর মধ্যে ছিল সৈনিকের দৃঢ়তা এবং মানুষের প্রতি গভীর মমত্ববোধের এক বিরল সমন্বয়।
ইতিহাসে অনেক নেতা আসেন, ক্ষমতায় থাকেন, তারপর হারিয়ে যান। কিন্তু কিছু নেতা তাঁদের কর্ম, চিন্তা ও আদর্শের মাধ্যমে সময়কে অতিক্রম করেন। জিয়াউর রহমান সেই বিরল নেতাদের একজন। তাঁর জীবন আমাদের শেখায় যে নেতৃত্ব মানে শুধু শাসন নয়; নেতৃত্ব মানে জাতিকে আশা দেওয়া, সাহস দেওয়া এবং সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ দেখানো।
আজ যখন আমরা উন্নত, সমৃদ্ধ ও আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি, তখন জিয়াউর রহমানের কর্ম, দর্শন ও আত্মত্যাগ নতুন করে স্মরণীয় হয়ে ওঠে। ইতিহাসের আদালতে তাঁর অবদান নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠন, জাতীয় পরিচয় এবং উন্নয়নের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের নাম।
তাই আজ তাঁর শাহাদাতবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি এই বীর মুক্তিযোদ্ধা ও রাষ্ট্রনায়ককে। তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করি। আর স্মরণ করি সেই আহ্বান—দেশকে ভালোবাসতে হবে, দেশকে গড়তে হবে, দেশকে এগিয়ে নিতে হবে। কারণ জাতির অগ্রযাত্রার পথে সত্যিকারের পথপ্রদর্শকেরা কখনও হারিয়ে যান না; তাঁরা তাঁদের কর্মের মধ্যেই চিরজাগরুক থাকেন।
ছবি : শিল্পী আসিফ আকবর এর পেজ থেকে নেয়া