21/01/2026
#পূর্বাভাস: আসন্ন ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ — আমরা কি প্রস্তুত?
মাকসুদুল হক
টরন্টো, অন্টারিও ২০ জানুয়ারি ২০২৬ইং
“আপনি যদি সমাজের ইতিহাস জানতে চান, গ্রামের ইতিহাস জানতে চান, সাধারণ মানুষের ইতিহাস জানতে চান আপনাকে যেতে হবে ফকির-সন্ন্যাসী আন্দোলনে। ইতিহাস একটা শ্রেণী দিয়ে হয় না।” — ইতিহাসবিদ অধ্যাপক আফসান চৌধুরী- ২০২৬
[মূল প্রবন্ধটি ২০১৭ সালে ইংরেজিতে লেখা এবং বর্তমানে এটি প্রথমবারের মতো বাংলায় অনূদিত হয়েছে। দীর্ঘ লেখাটি অনেকগুলো পর্বে চলবে—সবার একান্ত ধৈর্য ও সহযোগিতা কাম্য।]
📝ভুমিকা: ২০১৭ সালে যখন আমি বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান ইসলামীকরণের গতিপথ নিয়ে আমার পর্যবেক্ষণগুলো প্রকাশ করেছিলাম, তখন দেশটির রাজনৈতিক দৃশ্যপট আওয়ামী লীগের শাসনের অধীনে সুদৃঢ় ছিল। সেই সময় ২০২৪ সালের মধ্যে একটি ইসলামপন্থী শক্তির উত্থান বা ক্ষমতা দখলের কথা বলা অনেকের কাছেই অবিশ্বাস্য বা নিছক আশঙ্কা বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের নাটকীয় ঘটনাপ্রবাহ—শেখ হাসিনার আকস্মিক পতন এবং পরবর্তী ক্ষমতার শূন্যতা—সেই সময়ের পূর্বাভাসগুলোকে আজ এক রূঢ় বাস্তবে পরিণত করেছে।
এই প্রবন্ধে আমি ২০১৭ সালের সেই পূর্বাভাসগুলো পুনরায় বিশ্লেষণ করব এবং দেখাব কীভাবে তৃণমূল পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানগুলোতে ইসলামপন্থী আদর্শের অনুপ্রবেশ আজকের এই পরিস্থিতির পথ তৈরি করেছে। বিশেষ করে, গত কয়েক মাসে আমরা দেখেছি দেশের হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ওপর এক নজিরবিহীন আঘাত। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বাউলদের ওপর হামলা, লালন অনুসারীদের লাঞ্ছনা এবং অসংখ্য মাজার ও সুফি দরগাহ ভাঙচুর প্রমাণ করে যে, এই ‘পরিবর্তন’ কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং এটি আমাদের হাজার বছরের সমন্বিত সংস্কৃতির মূলে আঘাত হানার একটি সুপরিকল্পিত প্রক্রিয়া।
আমি দৃঢ় ভাবে তখনো এবং এখনো বিশ্বাস করি
ও করবো যে এই গভীর সংকট থেকে উত্তরণের পথটি নিছক রাজধানী ঢাকা-তে ক্ষমতার রদবদলে বা কোনো উচ্চবিত্ত রাজনৈতিক দলের ও তাদের মূলত মধ্যবিত্ত অনুসারীদের মাধ্যমে সম্ভব নয়।
বাংলাদেশের সামনে একমাত্র প্রকৃত সমাধানের পথ হলো ঐতিহাসিক 'ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ'-এর মতো একটি সর্বাত্মক গনজাগরণ। ১৮শ শতাব্দীতে যেভাবে অবহেলিত ও নিপীড়িত সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ ও ধর্মীয় সাধকরা একতাবদ্ধ হয়ে শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন, ঠিক তেমনি আজ দেশের 'প্রান্তিক ও হতদরিদ্র মানুষের' (the poorest of the poor) প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ও নেতৃত্ব ছাড়া রাষ্ট্র সংস্কার সম্ভব নয়। প্রয়োজন সম্পূর্ণ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংস্কার ও হতদরিদ্র প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উত্থান—যাদের আমরা বছরের পর বছর সস্তা ‘রাজনীতি’ করে বঞ্চিত করেছি ও করেছি ঢালাও নিপীড়ন—যা সব সময় চলেছে ও এখনো চলছে।
“পালাবদল করে ক্ষমতা দখল
আজ ব্যবসা বাংলাদেশে
দলীয়করণ আর মানুষের মরণ
চলেছে হাতে হাত রেখে”
মাকসুদুল হক - ১৯৯৬
যতক্ষণ না সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত মানুষগুলো—যাদের সংস্কৃতি, পরম্পরা, বিস্বাস ও জীবনবোধ আজ ভূলুণ্ঠিত—ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে নিজেদের অধিকার আদায় করে নিচ্ছে, ততক্ষণ এই অস্থিরতার কোনো টেকসই সমাধান হবে না। আমার ২০১৭ সালের পূর্বাভাস এবং ২০২৪-এর বাস্তবতা—উভয়ই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, একটি সত্যিকারের 'গণবিপ্লব' ছাড়া বাংলাদেশের এই অন্ধকার সময় থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব না।
জয়গুরু - আলেক সাই 🙏