02/12/2025
☁️ চতুর্থ আসমানের যাত্রী: হযরত ইদ্রিস (আঃ)-এর অলৌকিক সমাপ্তি ।
☁️হযরত ইদ্রিস (আঃ): চতুর্থ আসমানের যাত্রী ও চিরস্থায়ী জান্নাতবাস ।
হযরত ইদ্রিস (আঃ) ছিলেন মানবজাতির আদি পিতা হযরত আদম (আঃ)-এর ষষ্ঠ প্রজন্মের বংশধর এবং তাঁর পরবর্তীকালের মহান নবী। তিনি ছিলেন আল্লাহ্র পক্ষ থেকে জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় বিশেষ অনুগ্রহপ্রাপ্ত।
তাঁর নামঃ-
তাঁর আসল নাম ছিল আখনূখ (অথবা হানোখ)। তিনি অত্যন্ত বেশি পড়াশোনা করতেন এবং আল্লাহর কিতাব পাঠ করতেন।
এই তথ্যগুলো হযরত ইদ্রিস (আঃ)-এর জ্ঞান, আধ্যাত্মিকতা এবং আল্লাহর সাথে তাঁর বিশেষ মর্যাদার প্রমাণ বহন করে।
জ্ঞান ও সভ্যতার ভিত্তিপ্রস্তরঃ
ইদ্রিস (আঃ) ছিলেন মানব ইতিহাসের এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব। আল্লাহ্র হুকুমে তিনি সমাজকে স্থবিরতা থেকে সভ্যতার দিকে নিয়ে যান। তিনি ছিলেন:
প্রথম লেখক: তিনিই সর্বপ্রথম কলম ব্যবহার করে লেখার কাজ শুরু করেন।
প্রথম দর্জি: তিনি সুই-সুতার সাহায্যে চামড়া ও কাপড় সেলাই করে পোশাক তৈরি করার পদ্ধতি আবিষ্কার করেন, যা মানবসভ্যতার পোশাক পরিধানে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে।
গণনাবিদ: প্রাথমিক গণিত ও গণনা বিদ্যার ভিত্তি স্থাপন করে তিনি মানুষকে হিসাব-নিকাশ শেখান।
শহর নির্মাতা: কিছু বর্ণনা মতে, তিনি বিভিন্ন স্থানে শহর নির্মাণ করেন, এমনকি মিশর ও তার আশেপাশে সভ্যতার গোড়াপত্তন করেন।
দাওয়াত ও ইবাদতের পরাকাষ্ঠাঃ
দাওয়াত ও ইবাদতের পরাকাষ্ঠা হলো মানুষকে আল্লাহর পথে আহ্বান করা এবং নিজেও সৎকর্ম ও ইবাদতে মশগুল থাকা।
হযরত ইদ্রিস (আঃ) তাঁর জাতিকে প্রায় তিন শত বছর ধরে এক আল্লাহ্র ইবাদতের দিকে দাওয়াত দিয়েছিলেন এবং মানুষকে রোজা রাখার জন্য উৎসাহিত করতেন। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তিনি এত বেশি রোজা রাখতেন যে একসময় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন।
তাঁর জীবন ছিল আল্লাহ্র প্রতি পরিপূর্ণ উৎসর্গীকৃত।
আসমানে আরোহণ ও শেষ যাত্রাঃ
হযরত ইদ্রিস (আঃ)-এর এই একনিষ্ঠতা ও ইবাদতের কারণে আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন তাঁকে এক বিশেষ মর্যাদা দান করেন। একদিন, অলৌকিকভাবে তাঁকে জীবিত অবস্থায় চতুর্থ আসমানে উঠিয়ে নেওয়া হয়।
মালাকুল মাউতের সাথে কথোপকথনঃ
ইবনে কাসীর (রহঃ) এর বর্ণনায় একটি চমকপ্রদ ঘটনা পাওয়া যায়, যা তাঁর আসমানে আরোহণের সাথে সম্পর্কিত:
বর্ণনা অনুসারে, মালাকুল মাউত আল্লাহর কাছে অনুমতি চাইলেন ইদ্রিস (আঃ)-এর সাথে দেখা করার জন্য।
সাক্ষাৎকালে ইদ্রিস (আঃ) মালাকুল মাউতকে অনুরোধ করেন তাঁকে জান্নাত ও জাহান্নাম দেখানোর জন্য।
আল্লাহর নির্দেশে মালাকুল মাউত প্রথমে তাঁকে জাহান্নাম দেখান। জাহান্নামের ভয়াবহ দৃশ্য দেখে তিনি আল্লাহর কাছে আশ্রয় চান।
এরপর তাঁকে জান্নাতে নিয়ে যাওয়া হয়। জান্নাতের সৌন্দর্য দেখার পর তিনি সেখানে প্রবেশ করেন এবং আর বের হতে রাজি হননি।
মালাকুল মাউত তাঁকে বের হতে বললে ইদ্রিস (আঃ) বলেন, আল্লাহ কুরআনে বলেছেন, "প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে" (সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১৮৫)। আমি তো মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করে ফেলেছি। আর আল্লাহ বলেছেন, "তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করার পর তা থেকে আর বের হবে না" (সূরা হিজর, আয়াত ৪৮)।
এই যুক্তিতর্কের পর আল্লাহ তা'আলা ইদ্রিস (আঃ)-কে জান্নাতেই থাকার অনুমতি দেন। এই বর্ণনাটি যদিও মুহাদ্দিসদের দ্বারা বিতর্কিত, তবে এটি ইদ্রিস (আঃ)-এর জ্ঞান ও আল্লাহ্র প্রতি তাঁর ভালোবাসা ফুটিয়ে তোলে।
সেখানে তিনি মালাকুল মাউতের (মৃত্যুর ফেরেশতা) সাথে সাক্ষাৎ লাভ করেন, জান্নাতও দেখেন এবং এরপর আল্লাহর ইচ্ছায় মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করেন। কিন্তু এরপর যখন তাঁর রূহ (প্রাণ) আবার তাঁর দেহে ফিরে আসে, তখন তিনি আর জমিনে ফিরে আসেননি। তিনি সারাজীবনের জন্য সেখানেই থেকে যান।
পবিত্র কোরআনের সূরা মারইয়ামের ৫৬ থেকে ৫৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর এই সম্মানজনক অবস্থান নিশ্চিত করে বলেন:
"আর কিতাবে ইদ্রীসের কথা আলোচনা করুন, তিনি ছিলেন সত্যবাদী নবী। আর আমি তাঁকে উচ্চ মর্যাদায় উন্নীত করেছিলাম।"
এভাবেই হযরত ইদ্রিস (আঃ) তাঁর পার্থিব জীবন সমাপ্ত করে এক অভূতপূর্ব ও সম্মানজনক উপায়ে আল্লাহ্র সান্নিধ্যে চিরস্থায়ী হলেন।