12/05/2026
"Menopause and Mental Health"
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব এজিং (National Institute of Aging) অনুসারে, মেনোপজ প্রতিটি নারীর মধ্যবয়সের (৪৫-৫৫ বছর) একটি স্বাভাবিক প্রাকৃতিক শারীরিক পরিবর্তন যেখানে মহিলাদের মেন্সট্রুয়াল সাইকেল স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
মেনোপজ হয়েছে কিনা তা নিশ্চিত হওয়া যায়, ৪৫-৫৫ বছর বয়সে অন্য কোনো শারীরিক সমস্যা ছাড়া টানা ১২ মাস পিরিয়ড বন্ধ বা অনিয়মিত মাসিক হতে থাকলে । মেনোপজের কারণে মহিলারা তাদের প্রজনন ক্ষমতা হারায় ও স্বাভাবিক কিছু মেয়েলি স্বভাব হ্রাস পায়।
🟧মেনোপজের কারণ :
এই বিশেষ পরিবর্তন সম্পন্ন হওয়ার আগে একটি ট্রানজিশনাল পিরিয়ডের মধ্যে দিয়ে যেতে হয় যা প্রায় ২-৮ বছর পর্যন্ত চলতে থাকে (সোর্স: National Institute of Aging)। এসব পরিবর্তনের কারণ হলো শরীরে এস্ট্রোজেন ও প্রজেস্টেরন নামক দুটি হরমোনের উৎপাদন হ্রাস যারা মেন্সট্রুয়েশন কন্ট্রোল করতে দায়ী। যেহেতু একটি বিশাল পরিবর্তন তাই স্বাভাবিকভাবেই শারীরিক অনেক লক্ষণের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়, যেগুলোর কারণে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উপরে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
🟧মেনোপজের শারীরিক লক্ষণের মধ্যে রয়েছে:
১।অনিয়মিত মাসিক
২। গরম ঝলকানি (hot flush)
৩। রাতে ঘাম
৪। জয়েন্ট ও মাংসপেশিতে ব্যাথা
৫। ইউরিনারি সমস্যা
৬। ওজন বৃদ্ধি
৭। যৌন সম্পর্কে ব্যথা অনুভব ইত্যাদি।
বাংলাদেশে ২০২৫ সালে একটি রিসার্চে দেখা গেছে, ৪৫-৫৯, ৬০-৬৯ এবং ৭০+ বছর বয়সে প্রায় ৭৩% মহিলা গরম লালচে ভাব, ঘাম, যৌন সমস্যা (২৪%), বুক ধড়ফড় (৭৪%), ঘুমের ব্যাধি (৮৩%), মূত্রাশয় অসংযম (৪৫%), যোনির শুষ্কতা (১৬%), হতাশাজনক মেজাজ (৯১%) এবং জয়েন্ট এবং পেশীর অস্বস্তি (৯৬%) অনুভব করেছেন (Sultana & Saleh, 2025)
🟧মেনোপজের সাইকোলজিক্যাল সমস্যা গুলোর মধ্যে রয়েছে:
মুড সুইঙ্গস: মেনোপজের সময় সবচেয়ে সাধারণ মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাগুলির মধ্যে একটি মুড সুইং। মহিলারা মেজাজে হঠাৎ এবং তীব্র পরিবর্তন অনুভব করতে পারে, বিরক্তি এবং রাগ থেকে দুঃখ এবং উদ্বেগ পর্যন্ত। এই মেজাজ পরিবর্তনগুলি হরমোনের ওঠানামা করার জন্য দায়ী করা যেতে পারে।
উদ্বেগ এবং বিষণ্নতা (anxiety & depression): মেনোপজের সময়
উদ্বেগ এবং কখনো কখনো বিষণ্ণতাও দেখা যায়। হরমোনের পরিবর্তন মস্তিষ্কের নিউরোট্রান্সমিটারকে প্রভাবিত করতে পারে, যেমন সেরোটোনিন এবং ডোপামিন, যা মেজাজ নিয়ন্ত্রণ করে। এটি উদ্বেগ, দুঃখ এবং এমনকি ক্লিনিকাল বিষণ্নতার (depression) অনুভূতি জন্ম দিতে পারে।
একটি রিসার্চে দেখা গেছে, যারা আগে কখনও ডিপ্রেশন ছিলো না, প্রি-মেনোপজ পিরিয়ডে তাদের মধ্যেও ২-৪ বার ডিপ্রেশন হওয়ার সম্ভাবনা আছে (Santoro, Epperson & Mathews, 2015)।
জ্ঞানীয় পরিবর্তন (cognitive changes): মেনোপজ জ্ঞানীয় ফাংশনগুলিকেও প্রভাবিত করতে পারে। কিছু মহিলা "মস্তিষ্কের কুয়াশা" অনুভব করেন যার মধ্যে রয়েছে স্মৃতিশক্তি হ্রাস এবং ফোকাস করতে সমস্যা। ২০৫ জন মেনোপজের মহিলাদের উপর করা একটি স্টাডিতে দেখা গেছে, ৭২% মহিলা মেমোরি ইম্পেয়ারমেন্ট রিপোর্ট করেছেন (Woods, Mitchell & Adams, 2000).
ঘুমে ব্যাঘাত: মেনোপজের সময় ঘুমের সমস্যা হয়ে থাকে। প্রায়ই রাতে ঘাম এবং গরম ঝলকানি হয়। খারাপ ঘুম মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যাগুলিকে বাড়িয়ে তুলতে পারে, যার ফলে বিরক্তি, উদ্বেগ এবং বিষণ্নতা বেড়ে যায়।
আত্মসম্মান এবং শরীরের চিত্র (self-esteem & body-image): মেনোপজের সাথে যে শারীরিক পরিবর্তনগুলি ঘটে তা আত্মসম্মান এবং শরীরের চিত্রকে প্রভাবিত করতে পারে। ওজন বৃদ্ধি, ত্বকের স্থিতিস্থাপকতার পরিবর্তন এবং চুল পাতলা হওয়ার কারণে নেতিবাচক আত্ম-ধারণা এবং কম আত্মবিশ্বাস হতে পারে।
মেনোপজের সামাজিক প্রভাবের কারণে মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব:
মেনোপজ সামাজিক এবং মানসিক সুস্থতাকেও প্রভাবিত করতে পারে। মহিলারা বিচ্ছিন্ন বা ভুল বোঝাবুঝি অনুভব করতে পারে, যা একাকীত্বের (loneliness) অনুভূতির দিকে পরিচালিত করে। মেনোপজের সংবেদনশীলতা, পরিবার এবং বন্ধুদের সাথে সম্পর্ককে বিষাক্ত করে তুলতে পারে যা উদ্বেগ ও বিষন্নতা তৈরী করে।
🟧মেনোপজের এতো এতো পরিবর্তনের সাথে খাপ খাওয়ানোটা আবশ্যিক। এজন্য কিছু প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হতে পারে -
🔰কথা বলে থেরাপি: বাংলাদেশ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সাইকোলজিস্টদের কাছ থেকে কগনিটিভ বেহাভিওরাল থেরাপি (CBT), সাইকোথেরাপির সাহায্যে মেনোপজের সময় হওয়া শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের সাথে খাপ খাওয়ানো যায় যেখানে সমস্ত নেতিবাচক চিন্তা ভেঙে দিয়ে, চিন্তা ও অনুভূতির মধ্যে সমন্বয় করে মেনোপজের চ্যালেঞ্জ গুলোর সাথে মোকাবেলা করতে সক্ষম করা হয় যাতে মানসিক অশান্তি অনেকটাই কমে। ব্রিটিশ মেনোপজ সোসাইটি টুল ফর ক্লিনিশিয়ানরা মেনোপজের লক্ষণ, যেমন উদ্বেগ, বিষণ্ণতা, গরম ঝলকানি, রাতের ঘাম এবং অনিদ্রায় সাহায্য করার জন্য CBT খুবই
কার্যকর ।
🔰হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি: এটি দিয়ে মেনোপজের লক্ষণ হ্রাস করানো হয় তবে এই পদ্ধতি খুবই ব্যয়বহুল ও সহজলভ্য নয়।
🔰স্বাস্থ্যকর সুষম খাদ্য গ্রহণ: মেনোপজের সময় ক্যাফেইন ও স্পাইসি খাবার কম খেলে তা গরম ঝলকানির তীব্রতা কমিয়ে আনতে সাহায্য করে। এছাড়াও, ক্লেভল্যান্ডক্লিনিকের একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, ফাইটোএস্ট্রোজেন (phytoestrogen) সমৃদ্ধ খাবার, যেমন: সয়াবিন, ছোলা, মসুর ডাল, তিসি, শস্য, শিম, ফল, সবজি খেলে মেনোপজের সময় উপকার পাওয়া যায়।
🔰 ব্যায়াম: মেনোপজের পর নারীদের হৃদ্রোগ হওয়ার ও রক্তে চর্বি বাড়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। বেড়ে যায় অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকিও। নিয়মিত ব্যায়ামের মাধ্যমে ফিটনেস বজায় রাখা সম্ভব। প্রথম আলোর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, সপ্তাহে ১৫০ মিনিট ব্যায়াম করতে হবে। প্রতিদিন ২০–২৫ মিনিট ব্যায়াম যথেষ্ট। যেমন হাঁটা, জগিং, সাইক্লিং, সাঁতার কাটা, ইনডোর সাইকেল বা ট্রেডমিল বা জুম্বাও হতে পারে ভালো ব্যায়াম।
🔰 মাইন্ডফুলনেস-মেডিটেশন: একটি গবেষণা প্রকল্পের ফলাফল দেখায় যে মেনোপজকালীন মহিলারা মাইন্ডফুলনেস-মেডিটেশনের মাধ্যমে তাদের সেল্ফ-এফিকেসি (self-efficacy) ৭৮% উন্নত হয়েছে এবং মেনোপজের লক্ষণগুলি ৮৯% হ্রাস পেয়েছে (John, J. B. et. al., 2022)।
🔰 সেলফ-কেযার: মেনোপজের সময় প্রত্যেক মহিলার তার নিজেকে কিছুটা সময় দেওয়া উচিত, যেমন: নিজের পছন্দের কাজ করা, হতে পারে বন্ধুদের সাথে গল্প, ফোন কথা, ঘুরতে যাওয়া, বই পড়া, বাগান করা; যেকোনো কাজ যা আপনি করতে ভালোবাসেন। এধরনের আনন্দদায়ক কাজ গুড হরমোন রিলিজ করে যার ফলে মুড কিছুটা ভালো হয়, মন ভালো লাগে।
- অনামিকা বৈরাগী সেজুতি
কনটেন্ট রাইটার
মনোসেবা অর্গানাইজেশন।