14/05/2025
"সব যুদ্ধই কেবল সাহসের গল্প নয়, কিছু যুদ্ধ কাঁদে অবহেলায় হারিয়ে যাওয়া মানুষদের বুকের ভেতর।"
ওবায়েদ হকের লেখা 'তেইল্যা চোরা' সেই হারিয়ে যাওয়া, অবহেলিত কিছু মানুষের মুক্তিযুদ্ধের গল্প। যাদের আমরা সমাজের নিচু তলার মানুষ বলে এড়িয়ে যাই, তুচ্ছ করে দেখি—তাদের বুকে যে দেশপ্রেম জ্বলজ্বল করতো, সেটাই এ বইয়ের মূল আলো।
গল্পের কেন্দ্রবিন্দু ফজর আলী। একটা সময় চুরি করেই বেঁচে থাকা ফজর আলী আজ যুদ্ধের মাঝখানে। তার বুক ফেটে কান্না আসে, কারণ নিজের সন্তানের মুখটাও সে ভুলে যাচ্ছে। এই কান্না, এই যন্ত্রণাই বলে দেয়—দেশের মাটির টানে কেমন করে বদলে যায় একজন 'অপরাধী'র জীবনও।
বইয়ের উৎসর্গপত্রে 'নাদের গুণ্ডা'র কথা আলাদা করে উঠে এসেছে। ঢাকার ভদ্রলোকেরা যেখানে নিরাপদে ঘরের কোণে লুকিয়েছিলেন, সেখানে এই কথিত 'গুণ্ডা'রাই হাতিয়ার তুলে নিয়েছিলো পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে। লেখক ভালোবাসায় আর শ্রদ্ধায় স্মরণ করেছেন সেইসব অশ্রুত মুক্তিযোদ্ধাদের।
'তেইল্যা চোরা' ছোট বই হলেও ওজনদার। এখানে গ্রাম্য ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে সাবলীলভাবে, যা চরিত্রগুলোকে করে তুলেছে জীবন্ত। বাচ্চু, ইউসুফ মুন্সি, সুজন মাস্টার, ফজর আলী, আমেনা, রোশনী—প্রত্যেকের গল্প মনে করিয়ে দেয়, যুদ্ধ কেবল বীরত্বের নয়, ভাঙাচোরা মানুষের ভেতরের যুদ্ধেরও গল্প। পাগলা প্রফেসর চরিত্রটি বইয়ের সবচেয়ে রহস্যময়। এক অদ্ভুত নির্লিপ্ততায় ঢাকা এই মানুষটি বাকিদের জীবনে আলতো করে পরিবর্তন এনে দেয়। তার কথা, তার ভাবনা যেন অনুচ্চ স্বরে বলা বড় কোনো দর্শন।
'তেইল্যা চোরা' আমাদের শেখায়—ভদ্র-অভদ্র, গরিব-ধনী কোনো ভেদ নেই দেশের টানে। স্বাধীনতার লড়াই ছিলো সবার। ছিলো সেইসব অচেনা-অবহেলিত মানুষদেরও, যাদের নাম ইতিহাস বইয়ের পাতায় ওঠে না।
সহজ ভাষায় বলা যায়, 'তেইল্যা চোরা' হলো সেইসব অবহেলিত হৃদয়ের এক বুক কান্না আর সাহসের কাহিনি।
কিছু কান্না আছে, যা প্রকাশ পায় না শব্দে। কিছু ভালোবাসা আছে, যা শুধু বুকের গভীরে নরম হয়ে রয়ে যায়। ওবায়েদ হকের 'তেইল্যা চোরা' তেমনই এক নরম, মলিন ভালোবাসার গল্প। যা চোখের জলের মতোই স্বচ্ছ, বুকের ভেতরের চাপা দীর্ঘশ্বাসের মতোই গভীর।
রিভিউঃ Md. Shahriar Shakil