11/10/2026
আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা কে যদি বলতে হয়, আমি সবার প্রথমেই বলবো মেহেদী হাসান রবিনের কথা। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত রবিনের হাইকোর্টের আইনজীবী কতৃক আদালতের রায় বিতর্কিত করার চেষ্টার প্রেক্ষিতে রবিনের সম্পৃক্ততার কিছু তথ্য জানানো প্রয়োজন।
আসামী মোঃ মেহেদী হাসান রবিনের নিজের ১৬৪ ধারার জবানবন্দি এবং আসামী ইফতি মোশাররফ সকালের জবানবন্দিতে উঠে আসা রবিনের ভূমিকার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক:
১. আবরারকে সন্দেহ করা ও হত্যার আগেই মারার নির্দেশ: রবিনের নিজের জবানবন্দি অনুযায়ী, ৪ অক্টোবর ২০১৯ তারিখে শেরে বাংলা হলের ছাত্রলীগ-সংশ্লিষ্ট ১৫ ও ১৬ ব্যাচের মেসেঞ্জার গ্রুপে সে লেখে, আগামী দুই দিনের মধ্যে আবরারকে যাচাই করে শিবির প্রমাণিত হলে তাকে মেরে হল থেকে বের করে দিতে হবে। আবরারের ফেসবুক মন্তব্যের স্ক্রিনশটও সে ওই গ্রুপে পোস্ট করে।
২. আবরারের ওপর সরাসরি শারীরিক নির্যাতন: রবিনের নিজের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, ৬ অক্টোবর রাতে হলের ২০১১ নম্বর কক্ষে গিয়ে সে আবরারের মোবাইলে পাওয়া ভিডিও দেখে। এরপর আবরারকে চশমা খুলতে বলে তার গালে ডান হাতে কয়েকটি জোরে চড় মারে। রবিনের বক্তব্য অনুযায়ী, এরপর মেফতাহুল ইসলাম জিয়নও আবরারকে অনেকগুলো চড়-থাপ্পড় মারে এবং ক্রিকেট স্ট্যাম্প দিয়ে মারধর শুরু করে। অনিক সরকারও আরেকটি স্ট্যাম্প দিয়ে আবরারের শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করতে থাকে।
৩. মারধরে উসকানি ও অন্যদের নির্দেশ: আসামী ইফতি মোশাররফ সকালের জবানবন্দি অনুযায়ী, রবিন আবরারের বিরুদ্ধে কী কী তথ্য পাওয়া গেছে তা জানতে চায়। আবরার শিবির করে না বলার পরও রবিন তাকে শিবির আখ্যা দিয়ে বলে, “ও শিবির, ওরে পিটা।” সে আরও বলে, শিবির ধরতে বেশি প্রমাণ লাগে না। বুয়েটে আর কারা শিবির করে, আবরারের কাছ থেকে তাদের নাম বের করার নির্দেশও দেয় রবিন।
৪. মারধরের সময় উপস্থিতি ও অন্যদের নির্যাতন: রবিনের নিজের জবানবন্দি অনুযায়ী, রাত আনুমানিক ১১টার দিকে আবার ২০১১ নম্বর কক্ষে গিয়ে সে আবরারকে মারধর হতে দেখে। সেখানে মাহমুদ সেতুর কথার পর অনিক সরকার ক্রিকেট স্ট্যাম্প দিয়ে আবরারের মাথা বাদে পিঠ, পাঁজর, বুক ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে সর্বশক্তি দিয়ে আঘাত করতে থাকে। রবিনের বক্তব্য অনুযায়ী, আবরার তখন চিৎকার করে বাঁচার আকুতি জানাচ্ছিল। সে আরও জানায়, ইফতি মোশাররফ সকাল আবরারকে লাথি মারছিল এবং মুজাহিদুর রহমান স্কিপিং রোপ দিয়ে তার পায়ে আঘাত করছিল।
৫. অন্যদের দিয়ে তথ্য আদায়ের নির্দেশ: সকালের জবানবন্দি অনুযায়ী, রাত আনুমানিক ১০টা ১৫ মিনিটের দিকে রবিন, অনিক ও জিয়ন কক্ষ থেকে বের হয়ে বাইরে থাকা ১৬ ব্যাচের শিক্ষার্থীদের ডাকে। রবিন সকাল, মনিরুজ্জামান মনির, মুজাহিদুর রহমান ও তানভীরকে আবরারের কাছ থেকে বুয়েটে আর কারা শিবির করে, তাদের নাম বের করার নির্দেশ দেয়। একই জবানবন্দিতে সকাল জানায়, রবিন ফোনে রাসেলের সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং রাসেল তথ্য বের করতে বলেছে বলে জানায়। রবিন আবরারকে বলে, তার জন্য ২০০ কিলোমিটার দূর থেকে মুন্না ভাই আসছে।
৬. আবরারের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলেও নাটক বলার ঘটনা: রবিনের নিজের জবানবন্দি অনুযায়ী, আবরার অসুস্থ হয়ে পড়ার খবর পেয়ে সে আবার ২০১১ নম্বর কক্ষে যাওয়ার পথে জানতে পারে, আবরারকে ২০০৫ নম্বর কক্ষে নেওয়া হয়েছে। পরে নিচে অন্যরা আবরারের অবস্থা খারাপ বলে জানালে রবিন বলে, “তার কিছু হয়নি, সে নাটক করছে।” সকালের জবানবন্দিতেও আবরারের অবস্থা খারাপ হওয়ার পর রবিনের এমন মন্তব্যের কথা রয়েছে।
৭. চিকিৎসার বদলে পুলিশে সোপর্দ করার উদ্যোগ: রবিনের নিজের জবানবন্দি অনুযায়ী, সে মেহেদী হাসান রাসেলের ৩০১২ নম্বর কক্ষে গিয়ে ঘটনার বিষয়ে কথা বলে। রাসেল আবরারকে পুলিশে সোপর্দ করার নির্দেশ দেয় বলে রবিন উল্লেখ করে। পরে রবিন নিরাপত্তাকর্মীকে অ্যাম্বুলেন্স ডাকতে ও প্রভোস্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলে। তার জবানবন্দি অনুযায়ী, অ্যাম্বুলেন্স ও প্রভোস্টদের আসতে দেরি হয়। অন্যদিকে, সকালের জবানবন্দি অনুযায়ী, আবরারের অবস্থা গুরুতর হওয়ার পরও রবিন ও অনিক তাকে দেখে বলে, সে ঠিক আছে। পরে রবিন ও অনিক ১৬ ব্যাচের শিক্ষার্থীদের নিচে নামতে বলে এবং আবরারকে পুলিশের হাতে দেওয়ার জন্য নিচে নামানোর নির্দেশ দেয়। শেষ পর্যন্ত চিকিৎসক এসে আবরারকে মৃত ঘোষণা করেন।
সংযুক্ত গ্রুপে দেওয়া মেহেদী হাসান রবিনের মেসেজের স্ক্রিনশট।