03/03/2026
অস্তিত্বের দায়বদ্ধতা (Responsibility of Existence)
আমরা 'আশরাফুল মাখলুকাত' বা সৃষ্টির সেরা জীব। মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের এই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন শ্রেষ্ঠত্বের এক অনন্য মর্যাদা দিয়ে। এই মহাবিশ্বে অজস্র প্রাণের মাঝে মানুষের এই শ্রেষ্ঠত্ব কেবল শারীরিক গঠনে নয়, বরং তার বিবেক, বুদ্ধি এবং অন্যের প্রতি দায়বদ্ধতার মধ্যে নিহিত। পৃথিবীতে জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও শ্রেণিভেদে নানা বৈচিত্র্য থাকলেও দিনশেষে আমাদের ধ্রুব পরিচয়—আমরা মানুষ। সামাজিক জীব হিসেবে আমরা একে অপরের পরিপূরক এবং একটি দেশের সচেতন নাগরিক হিসেবে সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি আমাদের রয়েছে কিছু অনস্বীকার্য নৈতিক দায়িত্ব।
ব্যস্ত জীবনের এই ঘূর্ণাবর্তে আমরা প্রতিনিয়ত ছুটছি। আমাদের ভাবনার জগৎ দখল করে থাকে নিজের পরিবার, সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ আর ব্যক্তিগত সাফল্যের সুনিপুণ সব পরিকল্পনা। এই আত্মকেন্দ্রিক বলয়ে বন্দি থাকতে থাকতেই আমাদের দিন, মাস ও বছরগুলো ঝরাপাতার মতো ঝরে যায়। কিন্তু কখনো কি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের বিবেকের কাছে প্রশ্ন করেছি—দিনশেষে আমাদের ভাবনাগুলো কি কেবলই নিজেকে নিয়ে?
আমাদের চারপাশেই একদল মানুষ বাস করে, যাদের জীবন কাটে চরম অনিশ্চয়তায়। আমাদের মাথার ওপর যখন নিরাপদ ছাদ আর তিন বেলা সুস্বাদু খাবারের নিশ্চয়তা, তখন অনেকেরই সারা দিনের একমাত্র সংগ্রাম থাকে অন্তত এক বেলা পেট ভরে দুমুঠো অন্ন জোগাড় করা। এই ছিন্নমূল পথশিশু, অসহায় বৃদ্ধ কিংবা শ্রমজীবী দিনমজুরদের কথা আমরা নিজেদের সুখের সাগরে বিভোর থেকে প্রায়ই বিস্মৃত হই। সমাজের বিত্তবান ও সামর্থ্যবান শ্রেণির কাছে অভাব হয়তো কেবলই একটি শব্দ, কিন্তু নিম্নবিত্ত এই মানুষগুলোর কাছে অভাব মানে হলো অস্তিত্ব রক্ষার এক কঠিন লড়াই।
ব্যক্তিগতভাবে হয়তো আমাদের কারো পক্ষেই গোটা সমাজের সব সমস্যার আমূল পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। কিন্তু আমরা যদি প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে এই পিছিয়ে পড়া মানুষগুলোর পাশে দাঁড়াই, তবে এক বিশাল সামাজিক বিপ্লব ঘটানো সম্ভব। আমাদের সামান্য একটি ক্ষুদ্র পদক্ষেপ একজন মানুষকে স্বাবলম্বী করতে পারে, যা পরোক্ষভাবে দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে মজবুত করবে। এর ফলে সমাজ থেকে ভিক্ষাবৃত্তি, মাদকাসক্তি এবং কিশোর অপরাধের মতো অন্ধকার অধ্যায়গুলো স্থায়ীভাবে মুছে ফেলা সহজ হবে।
তাই বর্তমান সময়ের দাবি হলো—সমাজের সচেতন এবং সামর্থ্যবান প্রতিটি মানুষ যেন তাদের সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধ থেকে জেগে ওঠেন। গোপনে হোক কিংবা প্রকাশ্যে, আমরা যেন আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী আর্তমানবতার সেবায় এগিয়ে আসি এবং অন্যকেও এই মহৎ কাজে অনুপ্রাণিত করি। নাগরিক সচেতনতা এবং পারস্পরিক ভ্রাতৃত্বই পারে একটি বৈষম্যহীন ও শান্তিময় পৃথিবী গড়ে তুলতে। আমাদের অস্তিত্বের সার্থকতা তখনই ফুটে উঠবে, যখন আমরা কেবল নিজের জন্য নয়, বরং অন্যের মুখে হাসি ফোটানোর জন্যও বেঁচে থাকব।