Sylhet Azadari

Sylhet Azadari Its a page which promote sylhets people azadari . also promote sylheti nohakhans, azadar, majlis , jalus,

07/05/2026

মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বায় বর্ণিত হয়েছে যে:
​📜 ইবনে সাবিত, সাদ (রা.) থেকে বর্ণনা করেন যে তিনি বলেছেন:
​মুয়াবিয়া তার কোনো এক হজের সফরে সাদের কাছে আসলেন। সেখানে আলী (আ.)-এর প্রসঙ্গ উত্থাপিত হলে মুয়াবিয়া আলী সম্পর্কে কটূক্তি করেন। এতে সাদ রাগান্বিত হয়ে বললেন:
​"তুমি কি এমন এক ব্যক্তির সম্পর্কে মন্দ কথা বলছো?! আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)'-কে তাঁর সম্পর্কে বলতে শুনেছি:
​আলীর মধ্যে এমন তিনটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে যে, যদি তার একটিও আমার থাকত, তবে তা আমার কাছে লাল উট (তৎকালীন আরবের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ) অপেক্ষাও অধিক প্রিয় হতো:
​১. আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)'-কে বলতে শুনেছি:
'আমি যার মাওলা (অভিভাবক/বন্ধু), আলীও তার মাওলা।'
​২. আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)'-কে বলতে শুনেছি:
'আমার নিকট তোমার মর্যাদা ঠিক তেমনই, যেমন মুসার নিকট হারুনের ছিল; তবে আমার পরে আর কোনো নবী নেই।'
​৩. আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)'-কে বলতে শুনেছি:
'আগামীকাল আমি অবশ্যই এমন এক ব্যক্তির হাতে ঝাণ্ডা (পতাকা) দেব, যাকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ভালোবাসেন এবং সেও আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসে।'"
​তথ্যসূত্র ও নির্ভরযোগ্যতা:
​📚 মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বা
✅ হাদিস নম্বর: ৩২৭৪১ — এর সনদ (সূত্র) অত্যন্ত মজবুত।
​📚 এবং ইবনে আবি আসিম তাঁর 'আস-সুন্নাহ' (১৩৮৭) গ্রন্থে মুসান্নাফ থেকে একই সনদে এটি বর্ণনা করেছেন।
​📚 অনুরূপ সনদে এটি ইবনে মাজাহ (১২১) বর্ণনা করেছেন।
✅ নাসিরুদ্দিন আলবানী একে সহিহ (সঠিক) বলে আখ্যায়িত করেছেন।
​📚 এবং ইমাম নাসায়ী তাঁর 'আস-সুনান আল-কুবরা' (৮৩৯৯) গ্রন্থে মুসা বিন মুসলিমের সূত্রে এটি বর্ণনা করেছেন।

​👈 এবং একটি জামাত (বর্ণনাকারীদের একটি দল) এটি বর্ণনা করেছেন, তবে "আমি যার মাওলা, আলীও তার মাওলা" বাক্যটি ব্যতীত; কারণ তাঁদের বর্ণনায় এর পরিবর্তে এই শব্দগুলো রয়েছে: "হে আল্লাহ! এরা আমার আহল (পরিবার)", আর এটি সেই সময়ের ঘটনা যখন এই আয়াতটি নাজিল হয়েছিল: "অতঃপর বলো: এসো, আমরা আমাদের পুত্রদের এবং তোমাদের পুত্রদের ডাকি..."
​✅ যেমনটি সহিহ মুসলিম-এ বর্ণিত হয়েছে:
​📜 আমাদের কাছে কুতাইবা বিন সাঈদ এবং মুহাম্মদ বিন আব্বাদ বর্ণনা করেছেন—উভয়ের বর্ণিত শব্দগুলো কাছাকাছি—তাঁরা বলেছেন: আমাদের কাছে হাতেম বিন ইসমাইল বর্ণনা করেছেন বুকাইর বিন মুসমার থেকে, তিনি আমির বিন সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস থেকে এবং তিনি তাঁর পিতা (সাদ) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন:
​মুয়াবিয়া বিন আবি সুফিয়ান সাদকে নির্দেশ দিলেন এবং বললেন: "তোমাকে কোন জিনিসটি আবু তুরাবকে (হযরত আলী আ.) গালি দেওয়া বা মন্দ বলা থেকে বিরত রাখছে?"
​তখন তিনি (সাদ) জবাব দিলেন: "যতক্ষণ আমার সেই তিনটি কথা স্মরণে আছে যা রাসূলুল্লাহ (সা.)' তাঁর (আলী) সম্পর্কে বলেছিলেন, ততক্ষণ আমি কখনোই তাঁকে মন্দ বলব না। সেই তিনটি কথার একটিও যদি আমার হতো, তবে তা আমার কাছে লাল উটের চেয়েও বেশি প্রিয় হতো।
​১. আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)'-কে বলতে শুনেছি, যখন তিনি একটি যুদ্ধে আলীকে পেছনে রেখে যাচ্ছিলেন, তখন আলী (আ.) আরজ করলেন: 'হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি আমাকে নারী ও শিশুদের মাঝে রেখে যাচ্ছেন?'
তখন রাসূলুল্লাহ (সা.)' বললেন: 'তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, আমার সাথে তোমার সম্পর্ক ঠিক তেমনই হোক যেমন মুসার সাথে হারুনের ছিল? তবে পার্থক্য এই যে, আমার পরে আর কোনো নবী নেই।'
​২. এবং আমি তাঁকে (রাসূলুল্লাহ (সা.)') খায়বারের দিন বলতে শুনেছি: 'আমি অবশ্যই পতাকা এমন এক ব্যক্তির হাতে দেব, যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোবাসে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলও তাকে ভালোবাসেন।'"

​"আমরা সবাই তার (সেই ব্যক্তির) জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম, তখন রাসূলুল্লাহ (সা.)' বললেন: আলীকে ডাকো। তাঁকে আনা হলো এমতাবস্থায় যে তাঁর চোখে ব্যথা ছিল। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.)' তাঁর চোখে লালা লাগিয়ে দিলেন এবং পতাকাটি তাঁর হাতে তুলে দিলেন; অতঃপর আল্লাহ তাঁর হাতে বিজয় দান করলেন।
​এবং যখন এই আয়াতটি নাজিল হলো:
'অতঃপর বলো: এসো, আমরা আমাদের পুত্রদের ডাকি এবং তোমরা তোমাদের পুত্রদের, এবং আমাদের নারীদের এবং তোমরা তোমাদের নারীদের...' (আল-ইমরান: ৬১)
​তখন রাসূলুল্লাহ (সা.)' আলী (আ.), ফাতিমা (আ.), হাসান (আ.) এবং হুসাইন (আ.)-কে ডাকলেন এবং বললেন:
'হে আল্লাহ! এরা আমার আহলে বাইত (পরিবার-পরিজন)।'"
​📚 সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর: ৬০০০-৬০০২

প্রতি নিশ্বাসে মওলা আলীর নাম‘চান্দার প্রতিটি নিশ্বাস যেন কাটে আলীর নামে।’ —মাহ লাকা বাইহজরত আলীর (রা.) স্মৃতিধন্য হায়দরা...
07/05/2026

প্রতি নিশ্বাসে মওলা আলীর নাম

‘চান্দার প্রতিটি নিশ্বাস যেন কাটে আলীর নামে।’

—মাহ লাকা বাই

হজরত আলীর (রা.) স্মৃতিধন্য হায়দরাবাদের একটি টিলার নাম ‘মওলা আলী’। টিলার ওপরে একটি পাথরে হজরত আলীর হাতের চিহ্ন আছে। পাথরটিকে কেন্দ্র করে সেখানে তার নামে একটি মাজার তৈরি হয়েছে। তার ভক্তদের কাছে এটি এক পুণ্যভূমি। ভক্তদের সমাগমে মুখরিত সে স্থান। রাজ কুয়াঁর বাইও তাদেরই একজন। গর্ভবতী অবস্থায় দোয়া প্রার্থনার উদ্দেশ্যে তিনি সেখানে জেয়ারত করতে গিয়েছেন। সঙ্গে আছেন শুভাকাঙ্ক্ষী শাহ তাজাল্লি আলী। তিনি একজন বিদ্বান ও সুফি সাধক। ক্যালিগ্রাফি ও চিত্রকলায়ও দখল আছে। হাস্যরস ও প্রজ্ঞায় সমসাময়িকদের মধ্যে তার তুলনা মেলা ভার। হায়দরাবাদের আসাফ জাহি সাম্রাজ্যের বিস্তৃত ইতিহাস ‘তুজুক-ই-আসাফিয়া’ রচনা করে তিনি খ্যাতি লাভ করেছেন। সব ঠিকই ছিল। একাগ্র চিত্তে হজরত আলীর দরবারে প্রার্থনা করছিলেন রাজ কুয়াঁর বাই। কিন্তু হঠাৎ করে তার মধ্যে গর্ভপাতের লক্ষণ দেখা দেয়। শুরু হয় রক্তপাত। শাহ তাজাল্লি আলী দ্রুত মাজারের ভেতরে যান। সেখান থেকে নিয়ে আসেন রঙিন সুতা ও জ্বলন্ত আগরবাতি। তিনি রাজ কুয়াঁর বাইর কোমরের চারপাশে সুতাটি বেঁধে দেন। আগরবাতির ধোঁয়া তার দিকে ঠেলে দিতে থাকেন। আর এতেই ঘটে এক অলৌকিক ঘটনা। হজরত আলীর কৃপায় রাজ কুয়াঁর বাইর গর্ভপাত রোধ হয়। বন্ধ হয় রক্তপাত। গর্ভে ভ্রুণের অবস্থান ঠিকঠাকই থাকে। অতঃপর ১৭৬৮ সালের ৪ এপ্রিল রাজ কুয়াঁর বাইর গর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হয় সে সন্তান। এক কন্যা। তার নাম রাখা হয় চান্দা বিবি। পরবর্তী সময়ে যে ‘মাহ লাকা বাই’ নামে বিখ্যাত হবেন।

এ অলৌকিক ঘটনা আমলে নিলে বলা যায়, চান্দা বিবি ওরফে মাহ লাকা বাই হজরত আলীর (রা.) দান। সেক্ষেত্রে মাহ লাকা বাই তার প্রতি ঐশ্বরিক টান তো অনুভব করবেনই। তবে অলৌকিকতাকে এক পাশে সরিয়ে রেখেও হজরত আলীর (রা.) প্রতি মাহ লাকা বাইর ঐশ্বরিক টানকে ব্যাখ্যা করা যায়। তার মা ছিলেন শিয়া মতের অনুসারী। তাই স্বাভাবিকভাবেই হজরত আলীর (রা.) অনুরাগী ছিলেন মাহ লাকা বাই। পরবর্তী সময়ে পৃষ্ঠপোষক হিসেবে তিনি যেসব অভিজাত ব্যক্তিকে পেয়েছেন, তাদের অধিকাংশই ছিলেন শিয়া মতাবলম্বী। শুভাকাঙ্ক্ষী শাহ তাজাল্লি আলী শিয়া ছিলেন না। কিন্তু সুন্নি হলেও তিনি চিশতিয়া তরিকার অনুসারী একজন সুফি সাধক ছিলেন। আর সুফিদের কাছে হজরত আলীর (রা.) অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এভাবে পারিবারিক ও সামাজিক প্রভাবে মাহ লাকা বাই শিয়া মতের অনুসারী হয়ে ওঠেন। স্বরচিত প্রায় প্রতিটি গজলের শেষে তিনি হজরত আলী (রা.) ও অন্য শিয়া ইমামদের প্রতি নিজের আনুগত্য, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা ব্যক্ত করতেন। তাদের প্রতি মাহ লাকা বাইর অনুভূতির এ বহিঃপ্রকাশ ছিল তীব্র, অভিনব ও মনোমুগ্ধকর। আধ্যাত্মিকতা ও ঐশী প্রেম ছিল তার গজলের অন্যতম বিষয়বস্তু। মাহ লাকা বাইর আগে হজরত আলী (রা.) ও অন্য শিয়া ইমামদের প্রশংসা কেবল কাসিদা (প্রশংসাগীতি) ও মর্সিয়াতেই (শোকগীতি) সীমাবদ্ধ ছিল। মাহ লাকা বাইই প্রথম গজলে (প্রেমকাব্য) তাদের প্রশংসা শুরু করেন। গজলে এটি তার উল্লেখযোগ্য অবদান। তার রচিত একটি গজলের শেষ পঙ্‌ক্তি এমন, ‘ও আলী, আপনি ছাড়া আমার আর কোনো সাহায্যকারী নেই!’ মাহ লাকা বাই তার গজলে হজরত আলীকে (রা.) ‘নাজাফের বীর’ বলেও সম্বোধন করেছেন। একটি গজলে তিনি নিজেকে বলছেন, ‘যদিও তুমি মাথা থেকে পা পর্যন্ত পাপের সমুদ্রে ডুবে আছ, তথাপি ও চান্দা, তোমাকে নাজাফের বীর আগলে রেখেছেন।’ উল্লেখ্য, নাজাফ ইরাকের একটি শহর। সেখানে হজরত আলী (রা.) সমাহিত আছেন। শিয়াদের তো বটেই, সুফি তরিকার অনুসারী সুন্নিদের কাছেও এ শহর তাই অন্যতম তীর্থভূমিতে পরিণত হয়েছে। মাহ লাকা বাই তার গজলে সেদিকেই ইঙ্গিত করেছেন। মাহ লাকা বাই যে নিজেকে আপাদমস্তক পাপের সমুদ্রে ডুবে আছেন বলে দাবি করেছেন, এর অন্তত তিনটি ব্যাখ্যা হাজির করা যেতে পারে। হয়তো এ পাপের সমুদ্র বলতে তিনি সার্বিকভাবে দুনিয়াকে বুঝিয়েছেন, যেখানে নানা রঙিন হাতছানিতে কলুষিত হয় মানুষ। কিংবা এর দ্বারা তিনি নিজের পেশার প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। মাহ লাকা বাইর ভয় ছিল, তিনি যে জীবন যাপন করছেন, তার জন্য শেষ বিচারের দিন তাকে শাস্তির রায় দেয়া হবে। অথবা নিজের হীনতা, ক্ষুদ্রতা ও তুচ্ছতাকে বোঝাতে তিনি পাপের সমুদ্রে ডুবে থাকার কথা বলেছেন। যাই হোক না কেন, নিজের আত্মিক পরিত্রাণ নিয়ে মাহ লাকা বাইর মনে বেশ ভয় ছিল। কিন্তু তার মনে যে আশাবাদ বিরাজিত, তা সেই ভয়ের চেয়েও শক্তিশালী। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে তিনি যতই পাপী হন, নাজাফের বীর তথা হজরত আলী (রা.) তাকে উদ্ধার করবেন। তার কৃপাতেই পরম করুণাময় মাহ লাকা বাইর সব পাপ ক্ষমা করবেন। শিয়াদের বিশ্বাস অনুসারে, হজরত মুহাম্মদ (দ.) ছাড়াও তার পরিবারের সদস্য হজরত আলী (রা.), মা ফাতেমা (রা.), ইমাম হাসান (রা.) ও ইমাম হোসাইন (রা.)ও হাশরের দিন আল্লাহর কাছে পাপী উম্মতের পরিত্রাণের জন্য সুপারিশ করতে পারবেন। মাহ লাকা বাইর গজলে সে বিশ্বাসই প্রতিফলিত হয়েছে। আরেকটি গজলের শেষে হজরত আলীকে (রা.) তিনি ‘হায়দার’ বলে সম্বোধন করেছেন। তিনি এমনও বলেছেন যে বেহেশত ও দোজখ নিয়ে তার কোনো চিন্তা নেই। তিনি কেবল হজরত আলীকেই (রা.) চান। মাহ লাকা বাই লেখেন, ‘চান্দা বেহেশতের আশা করে না, দোজখের ভয়ও তার নেই, ইহকাল ও পরকালে সে কেবল চায় প্রবল পরাক্রম সিংহ হায়দারকেই!’ উল্লেখ্য, হজরত আলীর (রা.) একটি উপাধি ‘হায়দার-এ-কাররার’। এর অর্থ ‘ভয়হীন সিংহ’। একটি গজলে তিনি মা ফাতেমাকে (রা.) ‘কুররাতুল আইন’ তথা ‘চোখের প্রশান্তি’ বলে সম্বোধন করেছেন। তিনি লেখেন, ‘পুষ্পশয্যায় শুয়েও আমার চোখে ঘুম আসে না, যখন আপনার পায়ে মাথা রাখি, তখনই ঘুম আসে।’ আরেকটি গজলে তিনি লেখেন, ‘ফাতেমার (রা.) পরিবারের প্রতি চান্দার ভালোবাসা বেড়েই চলেছে, আর যতই সে তাদের নিয়ে ভাবছে, মনে হচ্ছে সে এখনো খুব কমই ভাবছে!’ এসব পঙ্‌ক্তি থেকে মা ফাতেমা (রা.) ও তার পরিবারের প্রতি তার আনুগত্য, শ্রদ্ধা, ভক্তি ও ভালোবাসার প্রমাণ মেলে। ইমাম হাসান (রা.) ও ইমাম হোসাইনকে (রা.) সম্বোধন করেও গজল লিখেছেন মাহ লাকা বাই। তেমনই একটি গজলের শেষ দুটি পঙ্‌ক্তি এমন, ‘ও ক্ষমতাধর আলী, আপনি তো চান্দার প্রতিটি ইচ্ছা পূরণ করেন; এবার তাকে হাসান ও হোসাইনের জন্য সবকিছু উৎসর্গ করার সুযোগ দিন।’ হজরত আলী (রা.) ও তার পরিবারের প্রতি অনুরাগ ও ভালোবাসার সর্বোচ্চ বহিঃপ্রকাশ হিসেবে নিজের সবকিছু বিলিয়ে দিতে চেয়েছেন মাহ লাকা বাই। গজলের সুরে সে আকাঙ্ক্ষাই ব্যক্ত করেছেন তিনি।
মাহ লাকা বাই নিজের গুণে ও পৃষ্ঠপোষকদের যথাযথ অবদানে হায়দরাবাদের নিজামের দরবারে গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করেছিলেন। সম্ভবত তিনিই একমাত্র বাইজি, যিনি আমির হয়েছিলেন। তাকে জায়গির দেয়া হয়েছিল। তার জন্য ব্যক্তিগত বাহন ও প্রহরী বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল। সম্ভবত এ গুরুত্ব ও মনোযোগ হারানোর ভয় মাহ লাকা বাইর মনে ছিল। তাই তিনি হজরত আলীর (রা.) কাছে প্রার্থনা করেছেন, তার এ সমৃদ্ধি যেন সবসময় বজায় থাকে। একটি গজলে তিনি লেখেন, ‘ও আলী, চান্দার এ খ্যাতি যেন সবসময় বজায় থাকে। তার যৌবনের উদ্দীপনা বসন্তকালের চেয়ে শতগুণ বেশি দামি।’ পরকালেও তিনি মর্যাদা প্রার্থনা করেছেন হজরত আলীর (রা.) কাছে। একটি গজলে তিনি লেখেন, ‘ও আলী, আপনার মহানুভবতায় চান্দাকে উভয় জগতে মর্যাদাসম্পন্ন ও ক্ষমতাপূর্ণ স্থান দান করুন।’ মাহ লাকা বাই চিরদিন যুবতী ও সুন্দরী থাকতে চান। তার নিজের পক্ষে তো তা সম্ভব নয়। কিন্তু তার বিশ্বাস, হজরত আলীর (রা.) দোয়ায় আল্লাহ তার এ আশা পূরণ করবেন। তবে চিরদিন যুবতী ও সুন্দরী থাকার অন্য ব্যাখ্যাও থাকতে পারে। সম্ভবত এর দ্বারা তিনি ঐশী প্রেমকেই বুঝিয়েছেন। হজরত আলী (রা.) ও তার পরিবারের প্রতি মাহ লাকা বাইর অন্তরের গভীরে লালিত ভক্তি ও ভালোবাসা যেন কখনই টলে না যায়, সে প্রার্থনাই হয়তো তিনি করেছেন। কারণ বিভিন্ন গজলে মাহ লাকা বাই দাবি করেছেন যে জাগতিক কোনো প্রাপ্তির জন্য তিনি হজরত আলীকে (রা.) ডাকেন না। বরং অন্তরের গভীরে লালিত ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা থেকেই তিনি হজরত আলীকে (রা.) স্মরণ করেন। তিনি হজরত আলীর (রা.) আলোয় আলোকিত হতে চান। একটি গজলে তিনি লেখেন, ‘ও আলী, চান্দাকে আপনার আলোকচ্ছটায় আলোকিত রাখুন। যেভাবে আপনার দীপ্তিতে প্রতিদিন সূর্য প্রজ্বলিত হয়।’ আলীর (রা.) প্রতি মাহ লাকা বাইর এ ভালোবাসা ছিল হৃদয়ের গভীর থেকে উৎসারিত। আর তা এতটাই শক্তিশালী ছিল যে এটিকেই তিনি নিজের পাথেয় হিসেবে আঁকড়ে ধরেছেন। আর তাই মন্ত্রপুত কোনো তাবিজ-কবজ ধারণের প্রয়োজনীয়তা তিনি অনুভব করেননি। একটি গজলে তিনি লেখেন, ‘জ্যোতিষীর দেয়া তাবিজ কিংবা মন্ত্রপুত কবজের প্রয়োজন চান্দার নেই। আলীর (রা.) ভালোবাসাই আমার অন্তরের একমাত্র আকর্ষণ।’ অশুভ কোনো কিছুর ভয়ও তাকে তাড়িত করে না। একটি গজলে তিনি লেখেন, ‘অশুভ কোনো কিছুর ভয় চান্দার নেই। কারণ তার রক্ষাকর্তা হলেন আলী, যার প্রভায় ইহকাল ও পরকালে সূর্য দীপ্তিমান হয়।’ মাহ লাকা বাইর পক্ষে প্রতিনিয়ত সশরীরে হজরত আলীর (রা.) মাজার জেয়ারত করা সম্ভব নয়। তাই তিনি ভোরের বাতাসকে সে দায়িত্ব দিয়েছেন। একটি গজলে তিনি লেখেন, ‘ও ভোরের বাতাস, তুমি নাজাফের অধিপতির কাছে যাও, চান্দার হয়ে চুমু খাও তার চৌকাঠে।’ গজলে তিনি হজরত আলীকে (রা.) ‘আবু তোরাব’ নামেও সম্বোধন করেছেন। এটিও হজরত আলীর (রা.) একটি উপাধি। তিনি লেখেন, ‘ও আবু তোরাব, ইহকাল ও পরকালে চান্দার একটিই আবেদন, ভালোবাসার প্রতিটি বাঁকে তাকে আপনার পাশেই রাখুন।’

হজরত আলীর (রা.) প্রতি মাহ লাকা বাইর প্রেমের বহিঃপ্রকাশ কেবল গজলেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমেও সে ভালোবাসার প্রমাণ দিতেন। হায়দরাবাদে অবস্থিত মওলা আলীতে প্রতি বছর হজরত আলীর (রা.) ওরসের আয়োজন করা হয়। ওরসের সময় মাহ লাকা বাই সেখানে যেতেন। সেখানে সমবেত সাধকদের জন্য চারদিন ধরে দুই বেলা খাবারের বন্দোবস্ত করতেন তিনি। ওরস শেষে বিদায় নেয়ার সময় প্রত্যেক সাধককে এক রুপি করে দক্ষিণা দেয়া হতো। ক্ষেত্রবিশেষে অনেকের খ্যাতি ও মর্যাদার ওপর নির্ভর করে পাঁচ রুপি, ৫০ রুপি ও ১০০ রুপি পর্যন্তও দক্ষিণা দেয়া হতো। সেখানে অবস্থিত হজরত আলীর (রা.) রূপক মাজারের খাদেম ও ভক্তদেরও তিনি অর্থকড়ি, পোশাক কিংবা মূল্যবান দ্রব্যাদি উপহার দিতেন। তাছাড়া প্রতি বছর রজবের ১৩ তারিখ মওলা আলীতে হজরত আলীর (রা.) জন্মদিন পালন করা হয়। এ অনুষ্ঠানকে বলা হয় ‘জশন-এ-হায়দারি’। সে অনুষ্ঠানে সমাগত অতিথিদের খাওয়ানোর জন্য আর্থিক সহায়তা দিতেন মাহ লাকা বাই। মহররমও গুরুত্ব সহকারে পালন করতেন তিনি। মহররমের চাঁদ ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই মাহ লাকা বাই সুস্বাদু ও দামি খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকতেন। এভাবে কারবালায় প্রাণ বিসর্জন দেয়া হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) ও তার পরিবারের স্মৃতিতে শোক প্রকাশ করতেন তিনি। আশুরার সময় তিনি অসংখ্য বিদ্বানদের তাদের খ্যাতি অনুযায়ী ১ থেকে ৫ রুপি পর্যন্ত দক্ষিণা দিতেন। হজরত মুহাম্মদের (দ.) বংশধর ও তাদের অনুরাগীদের তিনি হাজার হাজার রুপি হাদিয়া দিতেন। মাহ লাকা বাই তার প্রাসাদে মেয়েদের নাচ ও গানের প্রশিক্ষণ দিতেন। কিন্তু মহররমের সময় তিনি এ প্রশিক্ষণ বন্ধ রাখতেন। হায়দরাবাদ থেকে ‘মওলা আলী’তে যাওয়ার পথে তিনি তীর্থযাত্রীদের জন্য সুপেয় পানির কূপ ও চৌবাচ্চা তৈরি করেছিলেন। মানবিক কারণেই তিনি এটি করেছেন। কিন্তু আরেকটি উদ্দেশ্যও তার ছিল বৈকি। এ গজলেই তার বহিঃপ্রকাশ, ‘ও আলী, কেয়ামতের দিন আপনি কি চান্দাকে স্বর্গীয় সুধার এক চুমুক দেবেন না?’
শিয়া সম্প্রদায় ছাড়াও সুন্নিদের কিছু আচার-অনুষ্ঠানও পালন করতেন মাহ লাকা বাই। তিনি বিখ্যাত সুফি হজরত আবদুল কাদের জিলানির (রা.) স্মরণে ‘ফাতেহা-এ-ইয়াজদাহম’ জাঁকজমকের সঙ্গে পালন করতেন।

মাহ লাকা বাই কবি, সভাসদ, নৃত্যগীতে পারদর্শী ও আমির হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছেন। কিন্তু তার গজলগুলো প্রমাণ করে আধ্যাত্মিকতা ও ঐশী প্রেমেও তিনি সিদ্ধিলাভ করেছিলেন। তার জন্মের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ‘মওলা আলী’র স্মৃতি। তার সমাধিও সেখানেই। মওলা আলীর পাদদেশে চিরনিদ্রায় শুয়ে আছেন মাহ লাকা বাই।

07/05/2026

'হযরত আলী (আঃ)-এর প্রজ্ঞা ও বীরত্ব' - প্রথম অংশ

হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর ঘনিষ্ঠ অনুসারী যে চারজন বিশেষ মর্যাদাবান সাহাবী খোলাফায়ে রাশেদীন হিসেবে মুসলিম উম্মার কাছে সম্মানিত, হযরত আলী (রাঃ) হলেন তাঁদের অন্যতম, তিনি নবী (সাঃ) এর জামাতা । তিনি যেমন ছিলেন বীর যোদ্ধা তেমনি ছিলেন জ্ঞানী ও বিদ্বান । রাসূল (সাঃ) তাঁকে ‘জ্ঞানের দরজা’ আখ্যায়িত করেন । শৌর্য-বীর্যের জন্য তিনি ‘আসাদুল্লাহ’ আল্লাহর সিংহ ও ‘ইয়াদুল্লাহ’ আল্লাহর হাত উপাধিতে ভূষিত হন । তিনি ৫৮৬টি হাদীস বর্ণনা করেন এবং তিরাশিটি সশস্ত্র জিহাদে বিজয় লাভ করেন । সাহাবীদের মধ্যে হযরত আলী (রাঃ) অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজনীতি বিশেষজ্ঞ এবং আরবী ভাষা ও সাহিত্যে ছিলেন সুপন্ডিত । অনন্য জ্ঞান প্রজ্ঞার পাশাপাশি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর বিশেষ নৈকট্যে থেকে সূরা নাজিলের প্রেক্ষেতসহ আয়াতসমূহের অর্থ ও তাৎপর্য হৃদয়ঙ্গম করার সুযোগ লাভ করেন তিনি । তিনি আল কুরআনের অন্যতম সংকলক । হযরত ওমর (রাঃ) কে হিজরত হতে মুসলিম সন গণনার পরামর্শ দেন তিনিই । হযরত ওমর (রাঃ) বলেছেন, ‘আলী না হলে ওমর ধ্বংস হতো ।’

আলী (রাঃ) এর অসাধারণ বাগ্মিতা ও সাহসিকতার কাছে সকল প্রতিদ্বন্দ্বীই হার মানতো । তিনি ছিলেন সুকবি । তাঁর কবিতার বিভিন্ন সংকলন হয়েছে । ‘দীওয়ান-ই-আলী’ তাঁর বিশ্ববিখ্যাত কাব্য সংকলন । মুসলিম বিশ্বে তো বটেই, এর বাইরেও তাঁর কাব্য সমাদৃত হয়েছে । সার্বজনীন ও কালোত্তীর্ণ বাণী ও শিল্পসৌন্দর্যে এ গ্রন্থ কালজয়ী ।

হযরত আলী (রাঃ) মানবিক সকল মহত গুণে ও কর্মে অত্যুজ্জ্বল এক মর্দে মুজাহিদ । তাঁর অসাধারণ বিচারবুদ্ধি প্রজ্ঞা, ন্যায়বিচার ধৈর্য, বীরত্ব ও ত্যাগ সাধনা অতুলনীয় । তিনি মানবতার মূর্তপ্রতীক ।

হযরত আলী (রাঃ) এর মতো এত সব বড় বড় মহত গুণে উজ্জ্বল ব্যক্তি আর নেই । মুসলিম জাতির মর্যাদা ও গৌরব সমুন্নত করে রেখেছেন তিনি ইতিহাসে । আলী (রাঃ) সত্যি-আলী । এমন বিশাল মহত ব্যক্তির মহত্ত্ব ও কার্যাবলী যত বেশি আলোচনা করা যায়, যত বেশি প্রচার করা যায়, পাঠকগণ ততবেশি অনুপ্রাণিত ও উজ্জীবিত হবেন ।

এ উদ্দেশ্য সামনে রেখে হযরত আলী (রাঃ) এর অসাধারণ প্রজ্ঞা সূক্ষ্ম বিচার-বুদ্ধি, সাহসিকতা, বীরত্ব ত্যাগ-সাধনা, ন্যায় বিচার ও মানবতা বোধ সম্পর্কে টুকরো টুকরো কিছু চমকপ্রদ ঘটনা গল্পাকারে এ গ্রন্থে বর্ণনা করা হয়েছে । তাঁর বিশ্ববিখ্যাত ‘দীওয়ান-ই-আলী’ থেকে কয়েকটি কবিতা সংযোজন করে দেয়া হয়েছে । কবিতার টুকরোগুলো মনিমুক্তার মতো উজ্জ্বল ও মূল্যবান উপদেশপূর্ণ । আশা করি সবার ভালো লাগবে, বিশেষ করে তরুণ সমাজ প্রেরণা পাবেন ।

মহানবী (সাঃ) এর বাণী

এক. আমি প্রজ্ঞার নগরী আর আলী তার তোরণ ।

দুই. হে আলী, তোমার সাথে আমার বন্ধন, তুমি আমার ভাই এ জগতে এবং পরজগতে ।

তিন. যে ব্যক্তি আমার বন্ধু সে আলীরও বন্ধু, আর যে আলীর বন্ধু সে আমারও বন্ধু ।

চার. আলী আমার একাংশ আর আমি আলীর একাংশ ।

পাঁচ. আলীর তলোয়ারের এক আঘাত আসমান ও জমিনের সবার ইবাদতের চেয়ে শ্রেয় ।

ছয়. হারুন যেমন মুসার প্রতিনিধি, আমার পক্ষ থেকে তুমিও সেরূপ প্রতিনিধি ।

পরিচয়:
হযরত আলী (রাঃ) । শৌর্যে-বীর্যে আশ্চর্য রকম দীপ্তিময় একটি নাম । বিশ্বের ইতিহাসে অনেক জ্ঞানী-গুণী, ধ্যানী সাধক কবি সাহিত্যিক, রাষ্ট্রনায়ক, সাহসী সেনানায়ক বীর যোদ্ধা এবং আরো অনেক মহত গুণের অধিকারী ব্যক্তি রয়েছেন । কিন্তু হযরত আলী (রাঃ) এর মতো এত সব বড় বড় মহত গুণের উজ্জ্বল ব্যক্তি আর নেই । তিনি অতুলনীয় । আলী (রাঃ) সত্যি-আলী । মুসলিম জাতির মর্যাদা এবং গৌরব সমুন্নত করে রেখেছেন ইতিহাসে ।
মহানবী (সাঃ) নবুওত প্রকাশের দশ বছর আগে হযরত আলী (রাঃ) জন্মগ্রহণ করেন । প্রিয় রাসূল (সাঃ) এর রক্তের সাথে তাঁর ছিল ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক । আলীর পিতা আবু তালিব মুহাম্মদ (সাঃ) এর আপন চাচা । সেই সূত্রে তিনি নবীজীর আপন চাচাতো ভাই । তাঁর মা ফাতিমা বিনতে আসাদ নবীজীর ফুফু ।
হযরত আলীর (রাঃ) জন্ম হয়েছিল কাবা ঘরে । কারো কারো মতে কাবা শরীফের ভিতরে নয়, পাশে কোন হাশেমীর ঘরে । তবে একথা সত্য যে, তাঁর জন্মস্থানে পবিত্র কাবা ঘরের ছোঁয়া ছিল । এই পবিত্র পরশই ক্রমে তাঁর জীবনকে করেছে উজ্জ্বল ও মহান । তাঁর নানার নাম ছিল আসাদ । তাই তাঁর মাতা ফাতিমা ছেলের নাম রেখেছিলেন-আসাদ । ‘আসাদ’ অর্থ সিংহ । বস্ত্তত হযরত আলীর জীবনী আলোচনা করলে এই নামের সার্থকতা উপলব্ধি করা যায় । সিংহের মতোই তেজ আর শক্তি ছিল তাঁর ।
ছেলের ‘আসাদ’ নামটি পিতা আবু তালিবের পছন্দ হয়নি । ভাবলেন, তাঁর ছেলের নাম হবে আরো সুন্দর, আরো মিষ্টি । কি দেয়া যায় নাম!
তিনি ছেলের নাম রাখলেন-আলী ।
আলী শব্দের অর্থ-সমুন্নত ।
তাঁর ছেলে সমস্ত ভয়ভীতি, লোভলালসার ঊর্ধ্বে । হিংসা ঘৃণা ছুবে না তাঁর পা । ত্যাগে সাধনায় জ্ঞানে গুণে হবে অতুলনীয় ।
পিতার দেয়া নামেরও তিনি ছিলেন সার্থক রূপকার ।

শৈশবে আলী (রাঃ) এর পেট কিছুটা মোটা ছিল । এ নিয়ে সমবয়সীরা তাঁকে যথেষ্ট হাসি ঠাট্টা করত । তাতে তিনি মোটেও চটতেন না । বরং তাদের হাসিপরিহাস যেন নিজেও উপভোগ করতেন । আবু সাঈদ তামীমী বলেছেন, আমরা তাঁকে পেটমোটা বলে উপহাস করলে তিনি মোটেও রেগে যেতেন না, উল্টো পরিহাস করে বলতেন, ‘হ্যাঁ, পেটটি আমার মোটাই বটে, তবে তা বেশি খাবার কারণে নয় । এতে অনেক বিদ্যাবুদ্ধি আর ইলম জমা আছে বলেই এমন মোটা দেখাচ্ছে ।

মহানবী (সাঃ) আলীকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন । একবার আবদুল্লাহ ইবন আববাস জিজ্ঞেস করেন, আববাস মহানবী (সাঃ) কয়জন পুত্র ছিলেন । সবাই বাল্যকালে মারা গেছেন । তবু কোনটিকে তিনি সবচেয়ে বেশি ভালবাসতেন? হযরত আববাস (রাঃ) জবাব দেন-আলীকে । আব্দুল্লাহ আবার বলেন, আববা, আমি তো তাঁর পুত্রদের সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করেছি ।

হযরত আববাস বলেন, মহানবী (সাঃ) তাঁর পুত্রদের চেয়ে আলীকেই বেশি ভালবাসতেন । তিনি বাইরে না গেলে আলীকে আমি অতি অল্প সময়ের জন্যেও তাঁর কাছ ছাড়া হতে দেখিনি । আলী মহানবীর প্রতি যেরূপ অনুরক্ত ও শ্রদ্ধাশীল ছিলেন, কোনো পুত্রকেও আমি পিতার প্রতি তত অনুরক্ত ও ভক্তি পরায়ণ দেখিনি ।

হযরত আলী (রাঃ) দশ বছর বয়সে ইসলাম গ্রহণ করেন । তাঁর ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে মজার একটি ঘটনা আছে । মহানবীর ঘরের দিকে চোখ পড়ে বালক আলীর । চমকে ওঠলেন তিনি । বিস্ময়ে বড় বড় চোখ করে তাকালেন । এমন কান্ড আগে তিনি দেখেননি । রাসূল (সাঃ) আর বিবি খাদিজা (রাঃ) তাঁদের কপাল মাটিতে ঠেকাচ্ছেন । অথচ সামনে কেউ নেই, কিছু নেই । সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রশংসা করছেন । প্রার্থনা শেষ হলে আলী তাঁদের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন বিষয়টির কথা । মহানবী (সাঃ) মধুর হেসে বললেন, আমরা এক আল্লাহর ইবাদত করেছি ।

তিনি তাঁকেও সত্যের ছায়ায় আসার পরামর্শ দিলেন । এবার ভাবনায় পড়লেন আলী । বাপদাদার ধর্ম মূর্তিপূজা ছোট থেকে দেখে আসছেন । এখন বিনা চিন্তায় কি করে একে গ্রহণ করবেন? ইসলাম যে সত্যের কথা বলছে তা তিনি বুঝেছেন । তবু কেমন একটা বাধো বাধো লাগে । বাবাকে না জানিয়ে তো কিছু বলা যায় না । তাই বাবার অনুমতি নেয়ার জন্য মহানবী (সাঃ) এর কাছে সময় চেয়ে নেন ।

মহানবী এবার ভাল করে বুঝালেন আলীকে । বললেন, এ ব্যপারে কারো সাথে আলোচনা করা ঠিক হবে না । তুমি নিজেই গভীরভাবে চিন্তা করো । নিজের মন থেকেই উত্তর পেয়ে যাবে । সত্যি সত্যিই তিনি উত্তর পেয়ে গেলেন । তাঁর মনে পড়লো পিতার কথা । পিতা আগেই বলেছিলেন, মুহাম্মদ (সাঃ) এর যে কোন আদেশ বিনাদ্বিধায় মেনে নেবে । তাই পরেরদিন ভোরে তিনি মহানবী (সাঃ) এর কাছে গিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন । পঁচিশ বছর বয়সে হযরত আলী (রাঃ) রাসূল (সাঃ) এর আদুরে কন্যা ফাতিমাকে বিয়ে করেন । ফাতিমার বয়স তখন পনের কি ষোল ।

হযরত আলী (রাঃ) আপন সত্তাকে আল্লাহর নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর সত্তার মধ্যে বিলীন করে দিয়েছিলেন । তাঁর জীবন ছিল এক দর্পন স্বরূপ । এই দর্পনের মধ্যে রাসূল (সাঃ) এর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যই প্রতিফলিত হতো । আল্লাহর রাসূলের সমগ্র রূপটি যদি কোনো মানুষের মধ্যে দেখার ইচ্ছে হয়, তবে হযরত আলীর চরিত্র এবং জীবন যাত্রার দিকে তাকাতে হবে ।
অপত্য স্নেহ আদর ও ভালবাসায় নবী (সাঃ) আলীকে লালন পালন করেন । তাঁরই শিক্ষায় আলীর চরিত্র মহামানবীয় গুণে মাধুর্যমন্ডিত হয়ে ওঠে ।
হযরত আলী (রাঃ) খলিফা ছিলেন, সেনানায়ক ছিলেন, পন্ডিত ছিলেন, কবি ছিলেন, বাগ্মী ছিলেন এবং সব কিছুর উপরে তিনি ছিলেন মানুষ । মানব গুণের চরম ও পরম উৎকর্ষ সাধিত হয়েছিল তাঁর মধ্যে ।

নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর জীবনের অপর এক সাফল্য আলীর মানস গঠন । তাঁরই যতন্ন পরিশ্রম হাতের ছোঁয়া এবং সাধনার ফসল আলী (রাঃ) মানবতার গৌরব । সাধনার পথে সিদ্ধির পথে অগ্রসর হতে হতে মানুষ এমন স্তরে উন্নীত হয় যখন হয়তো স্রষ্টা এবং সৃষ্টির মধ্যে অন্তরাল থাকে না । স্রষ্টা আপন সৃষ্টিতে গর্ববোধ করেন ।

রোম সম্রাটের প্রশ্নের জবাব: হযরত ওমর (রাঃ) খেলাফত কালে রোম সম্রাট কয়েকটি জটিল প্রশ্ন দূতের মাধ্যমে হযরত ওমর (রাঃ) এর কাছে পাঠান । খলিফা প্রশ্নগুলো পাঠ করে বুঝতে পারলেন এর জবাব দেয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব নয় । তবে কে জবাব দিবেন? জবাব তো দিতেই হবে । খলিফা সোজা চলে গেলেন হযরত আলীর (রাঃ) কাছে । তাঁকে দেখালেন প্রশ্নগুলো । হযরত আলী (রাঃ) প্রশ্নগুলো পাঠ করে তখনই খুব দ্রুত কাগজে জবাব লিখে খলিফার হাতে তুলে দেন । খলিফা কাগজগুলো ভাঁজ করে দূতের হাতে দেন । দূত জিজ্ঞেস করেন, জবাবদাতা কে?

হযরত ওমর (রাঃ) বলেন, আলী । ইনি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর পিতৃব্যপুত্র, জামাতা এবং বন্ধু ।

মুক্তি পেয়ে গেল কয়েদী: ভাষা আল্লাহর এক অপরিসীম নিয়ামত । মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর মধ্যে অন্যতম পার্থক্য ভাষা । একই ভাষার একই শব্দের রয়েছে নানা রকম অর্থ ও মর্ম । কখনো ব্যবহার হয় মূল অর্থে । আবার কখনো ব্যবহার হয় রূপক অর্থে । বক্তার ভাষার অর্থ সঠিকভাবে বুঝতে না পারলে ঘটে বিপদ । ভাষার মারপ্যাঁচ বুঝতে না পালে শ্রোতার যেমন লজ্জা পেতে হয়, বক্তার ভাগ্যে ঘটে যায় জেল-হাজত বাস । এমনি এক ঘটনা ঘটেছিল দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমরের সময়ে । এক ব্যক্তি উপস্থিত হলো তাঁর দরবারে । সে নির্ভীক চিত্তে খলিফাকে উদ্দেশ্য করে বললো, নিশ্চয় আমি ফিতনাকে ভালোবাসি, হককে অপছন্দ করি এবং যা দেখিনি, তার সাক্ষ্য প্রদান করি ।

সাংঘাতিক কথা! সে আর যায় কোথায়!

এত বড় দুঃসাহস খলিফা ওমরের সামনে । যাকে মহানবী (সাঃ) মুসলিম উম্মার মধ্যে আল্লাহর নির্দেশ পালনে কঠোরতম ব্যক্তি বলেছেন । তাঁর সামনে থেকে কি এই ব্যক্তি রেহাই পেতে পারে? সে নিজেই তিনটি অন্যায়ের স্বীকৃতি প্রদান করছে । প্রথম কথা, যে ফিতনাকে ভালোবাসে, যে ভালোবাসার কোনো প্রশ্নই ওঠতে পারে না । দ্বিতীয় কথা, যে হক অপছন্দ করে, অথচ হককে পছন্দ করাই স্বাভাবিক । তৃতীয় কথা, যে না দেখে সাক্ষ্য প্রদান করে, যা গুরুতর অন্যায় । তাই খলিফা ওমর (রাঃ) তখনই তাকে বন্দী করে পাঠালেন কয়েদ খানায় ।

লোকটি তার বক্তব্যে কোনো ব্যাখ্যা প্রদান করল না । আবার খলিফাও স্বীকারোক্তি দিচ্ছেন বিধায় কোনো রকম সাক্ষ্য প্রমাণের প্রয়োজন মনে করা হলো না । চারদিকে ছড়িয়ে পড়লো সংবাদটা । মহান খলিফা ওমর, যিনি সত্য প্রতিষ্ঠায় আর অন্যায় মিথ্যা দূরীকরণে বজ্রকঠোর তাঁর সামনে এমন নির্ভয় স্বীকারোক্তি করে লোকটা শুধু অন্যায়ই করেনি, এর জন্য শুধু জেল নয়, আরো কঠিন শাস্তি হওয়া দরকার । জনগণ তার সে কঠিন শাস্তির দিন গুনছে ।

মহাজ্ঞানী রহস্য উন্মোচনকারী ও সূক্ষ্মদর্শী হযরত আলী (রাঃ) শুনতে পেলেন ঘটনাটা । তিনি সাথে সাথেই বুঝতে পারলেন লোকটির কথার মর্ম । তিনি সোজা চলে গেলেন ওমরের দরবারে । শুরু করলেন কথাবার্তা ।

হযরত আলী: হে আমীরুল মুমিনীন, আপনি অন্যায়ভাবে লোকটিকে বন্দী করেছেন ।

খলিফা: কেন? সে নিজ মুখে স্বীকার করেছে, একটি নয়, তিনটি অপরাধ করেছে ।

হযরত আলী: লোকটি বলেছে, আমি ফিতনাকে ভালোবাসী । এর দ্বারা সে বুঝাতে চাচ্ছে যে, সে সম্পদ ও সন্তানকে ভালোবাসে । কেন না, আল্লাহ বলেছেন, নিশ্চয় তোমাদের সম্পদরাজি ও সন্তানাদি হচ্ছে ফিতনা । লোকটি আরো বলেছে যে, সে হককে অপছন্দ করে । এ কথার দ্বারা সে বুঝাচ্ছে যে, সে মৃত্যুকে অপছন্দ করে । যা অবশ্যই হক ও চিরসত্য । কেন না, আল্লাহ বলেছেন, মৃত্যু যন্ত্রণা অবশ্যই আসবে । তৃতীয় কথা, লোকটি বলেছে, আমি যা দেখিনি, তা সাক্ষ্য দিই । একথার অর্থ হলো, সে এ সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ আছেন এবং এক, অথচ সে তাঁকে দেখেনি ।

হযরত আলী (রাঃ) এর এই ব্যাখ্যা শুনে খলিফা ওমর (রাঃ) লোকটির কথার মর্ম বুঝতে পারলেন এবং তখনি চিৎকার দিয়ে বলে ওঠলেন, ‘হায়! যদি না হতো আলী, তাহলে অবশ্যই ধ্বংস হয়ে যেতো ওমর ।’ এরপর কি আর লোকটি হাজতে থাকতে পারে? সাথে সাথেই সে মুক্তি পেল । লোকমুখে চারদিকে প্রচারিত হতে লাগলো হযরত আলী (রাঃ) এর তত্ত্বজ্ঞান আর অসাধারণ বিচার ক্ষমার কথা।

বেশি খেলেন কে?

মহানবী (সাঃ) তখন মদীনায় । একবার হাদিয়া হিসেবে কিছু খেজুর পেলেন । সামনে উপস্থিত ছিলেন আলী (রাঃ) । তাই মহানবী (সাঃ) আলীকে নিয়ে সেই খেজুর খাওয়া শুরু করলেন । উভয়ে সম্পর্কে চাচাত ভাই হলেও একজন ছিলেন নবী আরেকজন উম্মত । বয়সেও ছিল বিস্তর তফাত । অন্য দিকে একজন ছিলেন শ্বশুর আর অন্যজন জামাতা ।

তাই ছোট ভাই ও জামাতা হযরত আলী (রাঃ) খুব লাজুকের মতো খেজুর খাচ্ছিলেন নবীজী (সাঃ) এর পাশে বসে । কোনো দিকে খেয়াল নেই তাঁর । খেয়েই চলেছেন একটি একটি করে । আর বীচি রাখছেন সামনে ।

প্রিয় নবী (সাঃ) খেজুর খাচ্ছিলেন আর দেখছিলেন আলী (রাঃ) এর অবস্থা । যেন নিরামিষ খেজুর ভোজন অনুষ্ঠান । তাই নবী (সাঃ) একটু কৌতুক ও হাসিখুশী করতে চাইলেন আলীর সাথে । এ জন্য তিনি নিজের খাওয়া খেজুরের বীচিগুলো অত্যন্ত সতর্কতার সাথে রাখতে লাগলেন আলীর সামনে । সমাপ্ত হলো খেজুর ভোজন পর্ব ।

নবীজী (সাঃ) এর সামনে বীচি নেই । অথচ আলীর সামনে বীচির স্তূপ । হযরত আলী কিন্তু এদিকে খেয়াল করেননি । তাঁর চোখে ধরা পড়েনি বিষয়টি । শুরু হলো কৌতুক ।

প্রিয় নবী (সাঃ) : যার সামনে খেজুরের বীচি বেশি, সেই খেয়েছে বেশি ।
প্রিয় নবীর একথা শুনে খেয়াল হলো আলীর ।

তিনি চেয়ে দেখলেন যে, কোনো বীচি মহানবী (সাঃ) এর সামনে নেই । সব বীচি জমা হয়ে আছে তাঁর সামনে । তিনি বুঝতে পারলেন রহস্য । তবে একনজর দেখে নিয়েই তৎক্ষণাৎ তিনি জবাব দিলেন, যা ছিল বাস্তবভিত্তিক ও সূক্ষ্মজ্ঞানের পরিচায়ক ও রসেভরা মধুময় । কৌতুক হলেও নবীজী (সাঃ) এর আদব রক্ষা করে উম্মতের কিভাবে কথা বলা উচিত, তাও কিন্তু আলী (রাঃ) ভুলে যাননি ।

আমরা হলে হয়তো এমন পরিস্থিতিতে বলে ফেলতাম, আপনি বীচি রেখেছেন আমার সামনে, আবার আমাকে বলছেন, আমি বেশি খেয়েছি । বা বলতাম, কেনো আমার সামনে বীচি রেখেছেন? যা নবীজী (সাঃ) এর মর্যাদার পরিপন্থী হয়ে যেতো । হযরত আলী (রাঃ) এসব কোনো জবাব না দিয়ে নবীজী (সাঃ) যেমন সম্বোধনহীন প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলেন, তেমনি তিনিও সম্বোধনহীন পরোক্ষ জবাব দিলেন অত্যন্ত ভদ্র ও বিনায়বনত কণ্ঠে:
আলী : যার সামনে বীচি নেই, তিনি বীচিসহই খেজুর খেয়েছেন ।
ভেবে দেখার বিষয়, প্রশ্ন ছিল বেশি খাওয়া নিয়ে আর উত্তর হলো বীচিসহ খাওয়া নিয়ে । হয়তো আলী (রাঃ) বেশি খেয়েছিলেন । তাই তিনি পাশ কাটিয়ে গেলেন ।

এ জন্য কে রাখলো বীচি বা নবীজী (সাঃ) এর খাওয়া বীচি কোথায় গেল, সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করলেন না আলী । অথচ কৌতুকের জবাব কৌতুকসুলভই হলো । ওদিকে নবুওতী মর্যাদার খেলাফও হলো না ।

আলী (রাঃ) এমন সুসংহত জবাব দিবেন তাৎক্ষণিকভাবে তা হয়তো নবীজী (সাঃ) ভাবতে পারেননি ।
তাই বিস্ময়ে তিনি আলীর দিকে চেয়ে, হাসতে লাগলেন স্বভাবসুলভ মুচকি হাসি ।

প্রশ্নটা কিন্তু রয়েই গেল- বেশি খেয়েছেন কে?

জুলফিকার পেলেন উপহার

বদরের যুদ্ধ ।

মুসলমান আর কাফিরদের মধ্যে প্রথম যুদ্ধ ।
মুসলমানদের সংখ্যা খুব কম । আনসার আর মুহাজির মিলে সাকল্যে ৩১৩ জন । শত্রুপক্ষের শক্তি অনেক । তিনশ’ ঘোড়সওয়ার আর উষ্ট্রারোহী সাতশ’ উভয় পক্ষ মুখোমুখি । স্থান বদর প্রান্তর ।

সেকালে আরবে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বে দু’পক্ষের শ্রেষ্ঠ বীরদের মধ্যে থেকে প্রথমে দ্বন্দ্বযুদ্ধ হতো ।

কুরায়েশদের পক্ষ থেকে তিনবীর- উৎরা, শায়বা ও ওলিদ মাঠে নামলো ।
মুসলমানদের পক্ষ থেকে এগিয়ে এলেন হামযা, উবায়দা ও হযরত আলী (রাঃ) ।

বীরে বীরে শুরু হলো যুদ্ধ ।
দ্বন্দ্বযুদ্ধ । ভীষণ রকম অবস্থা ।
আলীর হাতে নিহত হলো ওলিদ ।
হামযা হত্যা করলেন উৎবাকে ।

প্রবল বিক্রমে যুদ্ধ করেও শায়বার হাতে শহীদ হলেন উবায়দা (রাঃ) ।
এবার আলীর রক্ত টগবগিয়ে উঠলো ।
তিনি আল্লাহ আকবার বলে ঝাঁপিয়ে পড়লেন ।
মল্লযুদ্ধ শুরু হলো শায়বার সাথে ।
কিন্তু মহাবীর আলীর সাথে শায়বার তুলনা?

অল্পক্ষণের মধ্যে শায়বার ধড় থেকে মাথাটা আলাদা করে ফেললেন মহাবীর আলী ।
এবার যুদ্ধের মোড়টাই ঘুরে গেল ।
আবু জেহেল এতক্ষণ যুদ্ধের দৃশ্য দেখতে ছিল । এবার সে মুসলমানদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো ।
মুসলিম বাহিনী সংখ্যায় অল্প হলেও হযরত আলী (রাঃ) এর বিক্রম ও কৌশলে আয়ত্তে এসে গেল । জয়ী হলো মুসলিম বাহিনী ।

এ জয়ের পেছনে যাঁর বীরত্ব ভূমিকা অনন্য তিনি শের-এ-খোদা হযরত আলী (রাঃ) । যুদ্ধে অসীম সাহসিকতা ও রণনৈপুণ্য প্রদর্শন করার কারণে রাসূলে করীম (সাঃ) হযরত আলীকে তাঁর ‘জুলফিকার’ তরবারিটি উপহার দেন ।
রাসূল (সাঃ) এর নিকট থেকে তরবারি উপহার পাওয়া মানে অতুলনীয় সম্মান ও উৎসাহ পাওয়া ।

ওহুদ প্রান্তরে

বদরের যুদ্ধে পরাজিত কুরায়েশদের চোখে ঘুম নেই । তাদের গায়ে জ্বালা ধরে গেছে । পরাজয়ের অপমানে তারা অধীর অস্থির । কিভাবে প্রতিশোধ নেয়া যায়, কিভাবে মুসলমানদের দুনিয়া থেকে মুছে ফেলা যায়, সে চিন্তায় তাদের চোখে ঘুম নেই ।

আবু সুফিয়ান সৈন্য আর অর্থ সংগ্রহে ব্যস্ত হয়ে পড়লো । শেষমেশ তারা তিন হাজার সৈন্যের এক শক্তিশালী বাহিনী নিয়ে মদীনার দিকে অগ্রসর হলো ।
মহানবী (সাঃ) এর তত্ত্বাবধানে মুসলিম বাহিনীও সংঘবদ্ধ হলো । সংখ্যা তাঁদের মাত্র সাতশ’ ।
ওহুদ নামক স্থানে শত্রুর সামনে এসে দাঁড়ালো তারা । শুরু হলো দ্বন্দ্বযুদ্ধ ।
বিখ্যাত বীর তালহা কুরায়েশদের পক্ষে

আর মুসলমানদের মহাবীর আলী (রাঃ) ।
আলী (রাঃ) তো একাই একশ’ ।
তাঁর সামনে তালহা তো একটা খড় কুটো ।
আলীর বিক্রমে অবাক হয়ে যায় সবাই ।

পরাজয় হলো তালহার । এবার কুরায়েশরা সদলবলে পড়লো ঝাঁপিয়ে মুসলিমদের ওপর । প্রচণ্ড রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ । শত্রুর আঘাতে আলীর শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেছে । তবু অপরাজেয় । এগিয়ে চলেছেন সামনের দিকে । হিসেবে একটু ভুল হয়ে গিয়েছিল মুসলমানদের । মুসলিম বাহিনীর ঠিক পিছনে ছিল ওহুদ পাহাড় । সেই পাহাড়ের একটা গিরিপথ ছিল এই বিপদের কারণ । যুদ্ধের শুরুতেই মহানবী (সাঃ) সেখানে মোতায়েন করলেন একদল তীরন্দাজ । হুকুম দিলেন পরবর্তী নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত যেনো না সরে । প্রচণ্ড যুদ্ধ যখন কুরায়েশ বাহিনী পিঠ দেখিয়ে পালাতে ব্যস্ত ঠিক তখনই সেই তীরন্দাজ বাহিনী জয় নিশ্চিত জেনে গনিমত কুড়ানোর জন্যে নেমে পড়লো ময়দানে ।

আর যাবে কোথায়?

মহাবীর খালিদ, যিনি তখনো মুসলমান হননি, ছোট একটা বাহিনী নিয়ে সেই গিরিপথ দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন মুসলমানদের ওপর ।

এ সময়ে খবর রটলো রাসূল (সাঃ) আর নেই ।

মুসলিম বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে যে যেদিকে পারলো ছুটতে শুরু করলো । এ সময়ে কয়েকজন মাত্র সাহাবী নিজেদের জীবন বাজি রেখে মহানবী (সাঃ) এর চারদিক ঘিরে শত্রুপক্ষের আঘাত হজম করে নবীজীকে হেফাজত করছিলেন । হযরত আলী (রাঃ) ছিলেন এ সাহাবীদের একজন । তাঁর বাহুবলে শত্রুরা পালাতে শুরু করলো । তাঁর সেদিনের সেই বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধ দেখে উভয় পক্ষ অবাক হয়ে গিয়েছিল ।

শুধু বদর আর ওহুদে নয়, তিরাশিটি সশস্ত্র জিহাদে বিজয় লাভ করেন আলী (রাঃ) ।

03/05/2026

চৌদ্দ শত বছরেও মুসলিম জাতি জানতে পারেনি রসূলের সাথে তার কয়েকজন সাহাবী বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন

একটি ঘোর অন্ধকারের মধ্য দিয়ে আমরা এগিয়ে চলেছি। আমাদের চোখে ঠুলি পরিয়ে রাখা হয়েছে। পড়াশোনা তো নতুন করে করছি না। ষাট দশকে পড়াশোনায় আমার হাতেখড়ি। কিন্তু এত বছর বইয়ের পাতায় চোখ রেখেও জানতে পারিনি যে, আমার প্রিয় রসূলের (সা:) সাথে কয়েকজন সাহাবী বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। রসূল ছিলেন তার জাতির নেতা ও অভিভাবক। কিন্তু ক্ষমতালোভী এসব সাহাবী রসূলের মনোনীত প্রতিনিধি হযরত আলীর হক কেড়ে নিয়ে নিজেরা খলিফা হয়ে বসেন। গোলাম হয়ে প্রভুকে শাসন করেছেন। প্রভুকে গোলাম বানিয়ে রেখেছেন। চৌদ্দ শত বছর ধরে এ ইতিহাস চেপে রাখা হয়েছে।

মক্কার অদূরে গাদিরে খুম আমাদের ইতিহাসের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। গাদিরে খুমে রসূল তার চাচাতো ভাই ও মেয়ে জামাতা হযরত আলীকে তার উত্তরাধিকারী হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন।

কিন্তু এই ইতিহাসকে বর্তমান সৌদি শাসকগোষ্ঠী ভয় পায়। কাউকে গাদিরে খুমে যেতে দেয়া হয় না। তারপরও কঠোর বেষ্টনী ভেদ করে দুয়েকজন সেখানে প্রবেশ করার দু:সাহস দেখিয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি ও ফারসি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড: আহসানুল হাদি কয়েক বছর আগে ওমরাহ করতে গিয়ে চুপিচুপি গাদিরে খুমে গিয়েছিলেন। আমি তার এ দু:সাহসী অভিযান আমার কারবালা বইয়ের দ্বিতীয় সংস্করণে যোগ করেছি। গত বছরের আগস্টে মোহাম্মদপুরে তার খানকায় তার সাথে আমার দেখা হয়। আমি তাকে একথা জানালে তিনি খুশি হন।

গাদিরে খুম সফর নিয়ে চট্টগ্রামের বাসিন্দা জুয়েলউদ্দিনের আরেকটি ভিডিও আমি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছি। ২০১৮ সালে জুয়েলউদ্দিন গাদিরে খুমে গিয়ে শুধু ধ্বংসস্তূপ দেখতে পান। সেখানে হযরত আলী অথবা অন্য সাহাবীরা একটি মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। এ মসজিদ ভেংগে ফেলা হয়েছে। আছে মাত্র ইটের কয়েকটি টুকরো। সাক্ষী হিসেবে কয়েকটি গাছ দাঁড়িয়ে আছে। রসূল বিদায় হজ্জ শেষে মদিনায় ফিরে যাওয়ার পথে গাদিরে খুমে সুরা মায়েদার ৬৭ নম্বর আয়াত নাজেল হয়। এ আয়াতে রসূলকে তার রিসালাত পূর্ণ করার বা উত্তরাধিকারী নিয়োগের তাগিদ দেয়া হয়। জীবনের ইতি ঘটতে যাচ্ছে এ ইংগিত পেয়ে রসূল কাফেলাকে থামতে বলেন। নিজ নিজ বাড়িঘরের পথে ধাবমান সাহাবীদের ফিরিয়ে আনার আদেশ দেন। কয়েকটি গাছের নিচে রসূলের উটের জন্য মঞ্চ তৈরি করা হয়। লক্ষাধিক সাহাবীর সামনে রসূল বললেন: হে আমার সাহাবীগণ! তোমরা কি জান আমি মু'মিনদের কাছে তাদের জীবনের চেয়ে প্রিয়? সাহাবীরা সমস্বরে জবাব দেন: ইয়া রাসুলুল্লাহ! আপনি আমাদের নিজেদের জীবনের চেয়ে প্রিয়।
সাহাবীদের সম্মতি পেয়ে রসূল নিজের বেলায়েত ও অভিভাবকত্বের ঘোষণা দিয়ে হযরত আলীর হাত উচুঁ করে ধরে পুনরায় বললেন: তোমরা কি সাক্ষ্য দিচ্ছ যে, আমি তোমাদের সবার জীবনের আওলা (অভিভাবক)? সবাই হ্যাঁসূচক জবাব দিলে রসূল বললেন: তাহলে শোন, মান কুনতো মাওলা ফাহাজা আলীউন মাওলা। অর্থাৎ আমি যার মাওলা এই আলী তার মাওলা। রসূল হযরত আলীকে তার উত্তরাধিকারী হিসেবে ঘোষণা দেয়ার পর কুরআনের শেষ আয়াত নাজেল হয়।

আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের প্রতি আমার নেয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং ধর্ম হিসেবে ইসলামকে তোমাদের জন্য মনোনীত করলাম। (সুরা মায়েদা-৩)।

হযরত উমর হযরত আলীকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন: হে আবি তালিবের পুত্র! তোমাকে অভিনন্দন। আজ থেকে তুমি সকল মু'মিন নরনারীর মাওলা।

কিন্তু পরবর্তীকালে সাহাবীরা রসূলের সিদ্ধান্ত অমান্য করেন। হযরত উমর রসূলের উত্তরাধিকারী হিসেবে হযরত আলীকে অভিনন্দন জানালেও তিনি রসূলের দাফন-কাফন বাদ দিয়ে মদিনার সাকিফা হাউসে হযরত আবু বকরের প্রতি হাত বাড়িয়ে দিয়ে তার বাইয়াত হন।রসূলের সিদ্ধান্ত অমান্য করার পরিণতি কী হতে পারে সহীহ বুখারীর ৬৫৫৬ নম্বর হাদিসে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদের উদ্ধৃতি দিয়ে এ হাদিসে বলা হয়েছে: আমি (রসূল) তোমাদের আগে হাউসে কাউসারে পৌঁছাবো। আর সে সময় তোমাদের কতিপয় লোককে আমার সামনে উঠানো হবে। তারপর আমার সামনে থেকে তাদের সরিয়ে নেয়া হবে। তখন আমি আরজ করবো, এ আমার প্রতিপালক, তারা তো আমার সাহাবী। তখন বলা হবে, আপনার পরে তারা কী কীর্তি করেছে তা আপনি জানেন না৷


কাদের কার্যকলাপের প্রতি ইংগিত করে এ হাদিস লিপিবদ্ধ করা হয়েছে তা বুঝতে কষ্ট হয় না।

Address

Prithimpassa, Kulaura, Prithimpasa
Kulaura
3233

Telephone

+8801534902653

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Sylhet Azadari posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Share