26/03/2026
সেগমেন্ট: মুভি রিভিউ
মুভির নাম: জয়যাত্রা
আমার কাছে “জয়যাত্রা” শুধু মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা নয়—এটা আমার বাবার মুখে শোনা সেই সব গল্পের মতো, যেখানে যুদ্ধ ছিল না অ্যাকশনের, ছিল না বীরত্বগাথার; ছিল শুধু মানুষের ভয়, দিশেহারা ছুটে চলা আর বাঁচার অদ্ভুত এক জেদ।
সিনেমাটা দেখার পর মনে হচ্ছিল, যেন আমি নিজেও সেই নৌকায় বসে আছি। তৌকীর আহমেদ এখানে যুদ্ধ দেখাননি, দেখিয়েছেন যুদ্ধের সবচেয়ে বড় শিকার—সাধারণ মানুষদের। যাদের জীবন এক মুহূর্তের মধ্যে উলটপালট যায়। গ্রামের বাড়ি, গরু-ছাগল, কাঁচা ঘরের গল্প—সব কিছু মুছে যায় যখন পাকিস্তানি হানাদাররা আসে। তারপর শুরু হয় সেই নৌকাযাত্রা। একটা নৌকা, যেখানে ধনী-গরীব, হিন্দু-মুসলমান, যারা আগে কখনো একসঙ্গে বসেও খায়নি, তারা এখন একই কষ্ট ভাগ করে। এটা দেখেই বোঝা যায়, স্বাধীনতা আসলে এত সহজে আসেনি; একটা নৌকার ভেতরেও যেন পুরো বাংলার চেহারা।
হুমায়ুন ফরীদিকে তো ভুলার মতো নয়। তিনি এখানে একদম অন্যরকম। চরিত্রটা ছোট, কিন্তু দারুণ। তাঁর মুখের ভাব, হাসি আর সেই ক্লান্ত চোখ—এসব বারবার ভাবায়। আর বিপাশা হায়াত! তাঁর অভিনয় দেখে আমার চোখ ভিজে গিয়েছিল। একবার একটা দৃশ্যে তিনি নৌকা থেকে নেমে নদীতে দাঁড়িয়ে, পেছন থেকে ডাকছে সবাই, আর তিনি যেন পৃথিবীর সব দুঃখ চোখে ধরে রেখেছেন। সেটা ভোলার না।
ছবিটা বানানোয় অন্যরকম এক সততা আছে। তৌকীর আহমেদ নিজের শৈশবের অভিজ্ঞতা থেকে লিখেছেন, আর সেটা আপনি দৃশ্যে দৃশ্যে টের পাবেন। যুদ্ধের রক্ত-গোলাগুলি দেখানোর চেয়ে তিনি বেছে নিয়েছেন মানুষের চোখের ভাষা। নদীর পানি, কাশবন, গ্রাম বাংলার নির্মল সৌন্দর্য আর তার মধ্যেই বেঁচে থাকার সংগ্রাম—এসব দেখলে মনে হয়, আমরা যেন আমাদেরই কোনো হারানো আত্মীয়ের গল্প দেখছি। তবে সত্যি বলতে, প্রথমবার দেখার সময় আমার কাছে কিছু দৃশ্য ধীর লেগেছিল। সিনেমাটার গতি একটু থিতু। কিন্তু পরে বুঝেছি, ওই ধীরগতির ভেতরেই আসলে গল্পের স্পন্দন লুকানো ছিল। যুদ্ধের সময় তো আর রেসের গল্প নয়, সময় থমকে যায় মানুষের জন্য।
একদম শেষের দিকের দৃশ্যটা এখনো চোখে ভাসে। নৌকাটা যখন পৌঁছে যায়, সবাই ছড়িয়ে যায়। কিন্তু তাদের মুখে স্বস্তি নেই, আছে একটা ফাঁকা ফাঁকা ভাব। কারণ, যুদ্ধ শেষ হলেও ক্ষত থেকে যায়। সিনেমাটা আমাকে শিখিয়েছে, বিজয় মানে শুধু আনন্দ নয়, অনেকের জন্য বিজয় মানে ফিরে পাওয়া ঘরবাড়ি না, বরং না পাওয়ার হিসেব। আমার মতে, “জয়যাত্রা” সেই সব সিনেমার মতো না যেগুলো দেখে আপনি হাততালি দেবেন। এটা দেখে আপনি চুপ হয়ে যাবেন, কিছুক্ষণ শুধু বসে থাকবেন। আর হয়তো ভাববেন আমরা যে আজ কথা বলছি, লিখছি, এ দেশে আছি, এটার দাম কত ছিল।
মুক্তিযুদ্ধের অন্যান্য সিনেমার এটি আলাদা এই অর্থে—এখানে বীর নেই, আছে শুধু মানুষ। আর সেই মানুষগুলোর গল্প বলাটাই আসল সাহস।
নিহার রন্জন মুখার্জী
বিজিই ২৩