09/03/2026
প্রশ্ন-৩২৭: বিদআত বলতে কি বুঝায়? কোন ধরনের উদ্ভাবনকে আমরা বিদআত বলব? বিস্তারিত বুঝিয়ে বলবেন!
উত্তর: রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজেই বলেছেন। বিদআত হল, দীনের ভেতরে কোনো কিছু উদ্ভাবন করা। বিদআতের ব্যাপারে কয়েকটা কথা মনে রাখেন। বিদআত কিন্তু কর্ম না। বিদআত হল চেতনা। বিদআতকে রাসূলুল্লাহ ﷺ মাকরুহ বলেন নি, হারাম বলেন নি। গোমরাহি বলেছেন। যেমন শিরক বা কুফর। এটা অধিকাংশ ক্ষেত্রে কর্ম নয়, বরং চিন্তা। আপনি একজনের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। আপনি যদি মনে করেন তিনি অন্তরের সব জানেন, তিনি ভালো মন্দের মালিক- তাহলে এটা শিরক। আর ভয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন যদি, তাহলে এটা শিরক না। আপনি একজনের কথায় মদ খেয়েছেন। যদি আপনি জানের ভয়ে খান, তাহলে এটা শিরক না। আর যদি মনে করেন, হুজুর মদ খেতে বলেছেন বলে মদ জায়েয হয়ে গেছে। কাজেই মদ খেলে কোনো সমস্যা নেই, তাহলে এটা শিরক। মনের চেতনা মূলত কুফরি শিরকির সাথে জড়িত। বিদআতও তাই।
বিদআতের মূল অর্থ হল, রাসূলুল্লাহ ﷺ ও সাহাবাগণ যে কাজ করেন নি, সেই কাজকে দীনের অংশ মনে করা। যেমন, আমি বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছি। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দরুদ পড়ছি অথবা সালাম পড়ছি কিংবা জিকির করছি। এটা জায়েয। কমন সেন্সের ব্যাপার যে দাঁড়িয়ে জিকির করা বা দরুদ পড়া মোটেও নাজায়েয নয়। আমি এখানে বসে ছিলাম। বসে বসে কুরআন কারীম পড়ছিলাম বা জিকির করছিলাম। হঠাৎ আপনি আসলেন। ওই কুরআন পড়তে পড়তে অথবা জিকির করতে করতে আমি দাঁড়িয়ে গেলাম, আপনার সাথে মোসাফাহ করলাম। এটাও নাজায়েয নয়। এবার মনে করেন আমি বসে ছিলাম, বসে গল্প করছিলাম। হঠাৎ মনে হল, আল্লাহর জিকি করব অথবা কুরআন পড়ব। তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়ালাম। দাঁড়িয়ে পড়তে শুরু করলাম। এটা বিদআত হবে। কারণ, আমি মনে করেছি, বসে দরুদ পড়লে, কুরআন পড়লে সোয়াব কম হবে। দাঁড়িয়ে পড়বে সোয়াব বেশি হবে। এ জন্য আমি কুরআন পড়ার জন্য দাঁড়িয়েছি। এই জন্য মনে করলাম যে, দাঁড়ানো কর্মটা ইবাদতের অংশ, দাঁড়িয়ে করলে সোয়াবটা বেশি হবে। দীনের ভেতরে ইবাদতের ভেতরে দাঁড়ানো নামক কর্মটা আমি ঢুকিয়ে দিলাম, এইটার নাম হল বিদআত। কর্মটা মূলত নাজায়েয না। কর্মটাকে দীন মনে করা নাজায়েয। কারণ, আপনি নবীর সুন্নাতকে ছোট মনে করলেন। বিদআতের পক্ষে একটা যুক্তি দেখেন। নফল নামায দাঁড়িয়ে পড়া উত্তম। নফল নামাযে দাঁড়িয়ে আমরা কুরআন তিলাওয়াত করি। তাহলে নফল নামাযে কুরআন দাঁড়িয়ে পড়া উত্তম। আপনি এইটার উপর দলিল দিয়ে বললেন, তাহলে কুরআনও দাঁড়িয়ে পড়া উত্তম। আপনার যখন কুরআন পড়তে ইচ্ছা হল, আপনি ওযু করে এসে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কুরআন পড়তে লাগলেন। এই যে আপনার চিন্তা, দাঁড়িয়ে কুরআন পড়া উত্তম, দাঁড়িয়ে কুরআন পড়লে সোয়াব বেশি হয়- এই চিন্তাটা হল বিদআত। এই চিন্তা নিয়ে যে দাঁড়ালেন, এই কর্মটা বিদআত।
কারণ, রাসূলুল্লাহ সা. নফল নামাযে দাঁড়াতে বলেছেন, কুরআন তিলাওয়াতের সময় দাঁড়াতে বলেন নি। উনি বসে পড়তেন। তবে কেউ এমনিতে দাঁড়িয়ে কুরআন পড়লে দোষ নেই। কিন্তু দাঁড়িয়ে কুরআন পড়লে সোয়াব বেশি হয় মনে করাটা বিদআত। তো এ রকম শত সহস্র বিদআত আমাদের সমাজে আছে। অনেকে বলে, রাসূলের যুগে ফ্যান ছিল না, কারেন্ট ছিল না, প্লেন ছিল না- এইগুলোকে কেউ যদি দীন মনে করে বিদআত হবে। কেউ যদি মনে করে, ফ্যান ছাড়া নামায পড়লে সোয়াব কম হবে, অথবা, প্লেনে না গিয়ে বাসে হজ্জে গেলে সোয়াব বেশি হবে- তাহলে বিদআত হবে। রাসূলুল্লাহ ﷺ যেটা করেন নি, যে পদ্ধতিতে করেন নি, যে উপকরণ দিয়ে করেন নি- সেই পদ্ধতি বা উপকরণ বা কর্মকে দীনের, ইবাদতের অংশ মনে করা, সোয়াবের উৎস মনে করা- এটা বিদআত। বিদআত গোমরাহি কেন! কারণ এর দ্বারা রসুলের সুন্নাতকে ছোট করা হয়। আমরা অনেক সময় মনে করি, কাজটা ভালো তো! অসুবিধা কি! ভালো কাজ রাসূলুল্লাহ ﷺ এর পদ্ধতিতে না হলে সেটা ভালো হয় না। একজন নামায পড়ছে, সিজদা করছে, প্রতি রাকআতে আটটা দশটা সিজদা করছে। এটা ভালো কাজ না খারাপ কাজ? নিশ্চয় খারাপ কাজ। রাসূলুল্লাহ এর শেখানো পদ্ধতির বাইরে গেলে সেটা আর ভালো থাকে না।
ড. খন্দকার আবদুল্লাহ জাহাঙ্গীর রহি:
বই : জিজ্ঞাসা ও জবাব ১ম খন্ড