11/06/2025
#রচনা_প্রতিযোগিতা_২০২৫
❝বন্যা ও বাংলাদেশ:উওরণের উপায়❞
ভুমিকা :বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। এই ভূখণ্ডে অসংখ্য নদ-নদী, খাল বিল ও জলাশয় রয়েছে। পদ্মা, মেঘনা,যমুনা সহ অসংখ্য নদী এদেশের উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এই নদ-নদীর সৌন্দর্য যেভাবে প্রকৃতিকে ও মাটি উর্বর করে সেভাবে নদীগুলো ভয়নকর মনোমুগ্ধকর রূপ ধারণ করে বয়ে আনে বন্যা। বন্যার কারণে গ্রামের বহু মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়ে। তাদের অনেকে আশ্রয়হীন হয়ে খোলা আকাশের নিচে বসবাস করতে বাধ্য হয়। খাবার ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে থাকে। ডায়রিয়া, টাইফয়েড, চর্মরোগ ও হেপাটাইটিসসহ পানিবাহিত রোগগুলোর প্রকোপ বৃদ্ধি পায় এ সময়।দেশের রাস্তাঘাটসহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়ন কার্যক্রম বন্যার কারণে বারবার থমকে যায়। নদীতীরবর্তী এলাকাগুলোতে বাড়িঘর, রাস্তা ও ব্রিজগুলোকে বন্যা প্রতিরোধী করে তৈরি করা প্রয়োজন । বন্যাকালীন ও বন্যা পরবর্তী সময়ে ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনায় আরও সমন্বিত ও দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করার বিকল্প নেই।
বাংলাদেশের ইতিহাসে বন্যা:
বন্যা সাধারণত মৌসুমী ঋতুতে হয়ে থাকে (জুন থেকে সেপ্টেম্বর)। প্রতিবছর বাংলাদেশের প্রায় ২৬,০০০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা ১৮% বন্যায় প্লাবিত হয়। অতীতে বন্যা বাংলাদেশে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে বিশেষ করে ১৯৬৬, ১৯৮৮, ১৯৯৮, ২০০৪, ২০০৮, ২০১৭, ২০২২ ও ২০২৪ সালে। অর্থ্যাৎ দেখা যায়,২০০০ সালের পূর্ব পর্যন্ত প্রতি ১০ বছর পর বাংলাদেশে একটি বড় বন্যা হয়ে ছিল।
বাংলাদেশের বন্যার প্রধান কারণ ও তার প্রভাব:
বাংলাদেশের বিশেষ ভৌগলিক অবস্থান ও জলবায়ুর জন্য প্রায় প্রতিবছরই বন্যার সম্মুখীন হতে হয়।তাছাড়া মানবসৃষ্ট বহু কারণে বন্যা প্রভাব বেড়েই চলেছে। এর মধ্যে নদী দখল ও ভরাট,
বন উজাড় ও পাহাড় ধ্বংস অন্যতম কারণ। মৌসুমি বর্ষা ও ঘূর্ণিঝড়ের সময় অতিবৃষ্টি হয়ে নদ-নদীগুলোতে পানি বেড়ে যায়।ভারতের উজান থেকে যমুনা, গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র নদী দিয়ে বিপুল পরিমাণ পানি বাংলাদেশের দিকে আসে।বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে বরফ গলে পানি বাড়ছে এবং মৌসুমি বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ও সময়ও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। বাংলাদেশের প্রায় ৭০% অঞ্চলই নিম্নভূমি হওয়ায় অল্প বৃষ্টিতেও পানি জমে থাকে ।
পরিবহণ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়া :
বন্যায় রাস্তাঘাট প্লাবিত হয়ে যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয়। ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। এতে জরুরি সেবা পৌঁছানো এবং ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করতে যথেষ্ট সমস্যা হয় ।
বন্যা প্রতিরোধ ও ব্যবস্থাপনা:
বাংলাদেশ সরকার ও বিভিন্ন এনজিও বন্যা মোকাবেলায় বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। তবে তা এখনও পুরোপুরি কার্যকর হয়ে ওঠেনি।
অবকাঠামোগত ব্যবস্থা:
(১)উঁচু জায়গায় বাড়ি নির্মাণ করা।
(২)নদীর তীরবর্তী এলাকায় বেড়িবাঁধের বাইরে বাড়ি নির্মাণ করা উচিত নয়। সব সময় বাঁধের ভিতরে বাড়ি নির্মাণ করা উচিত।
(৩)নতুন জেগে উঠা চরে বসতবাড়ি নির্মাণ করলে বন্যা হলে অধিক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এতে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
(৪)ঘরের চারপাশে ঘন ঘন বাঁশ অথবা শক্ত কাঠের খুঁটি পুঁতে ঘের দিয়ে রাখা।
(৫)টিউবওয়েল উঁচু স্থানে স্থাপন করা বা প্রয়োজনবোধে তা উঁচু করার ব্যবস্থা করা।
বন্যা মোকাবেলায় মানুষের করণীয়:
(১)বন্যা মৌসুমে বাড়িতে সর্বদা কিছু চিড়া, মুড়ি, গুড় মজুদ করা।
(২)বাড়িতে বন্যার পানি উঠলে কোথায় আশ্রয় গ্রহণ করতে হবে বা মালপত্র স্থানান্তর করতে হবে তা পূর্বেই ঠিক করে রাখা।
(৩)গবাদিপশু মূল্যবান সম্পদ, রক্ষা করার ব্যবস্থা করা।
(৪)ছেলে-মেয়ে সবাইকে সাঁতার শিখা।
+৫)নৌকা থাকলে ব্যবহারযোগ্য করে রাখা।আপনার এলাকার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি / স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখুন এবং তাদের পরামর্শ করা।
(৬)আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেয়া।
বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি ও স্বেচ্ছাসেবকদের করণীয়:
(১)বন্যার্তদের জন্য আশ্রয় কেন্দ্র তৈরি।
(২)শুকনো খাবার, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, ওষুধ সরবরাহ।
(৩)ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য কৃষি ও ব্যবসায়িক পুনর্গঠনে
সহযোগিতা।
(৪)বন্যার সময় বিভিন্ন রোগ প্রতিষেধক টিকা/ইনজেকশন এর ব্যবস্থা করা।
(৫)পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট/ফিটকিরির সাহায্যে বিশুদ্ধ করে ব্যবহার করার ব্যবস্থা।
(৬)যাতায়াতের জন্য নৌকার ব্যবস্থা।
প্রযুক্তি ও পূর্বাভাস :
(১)স্যাটেলাইট প্রযুক্তির মাধ্যমে বন্যার পূর্বাভাস দেওয়া৷
(২)মোবাইল ও গণমাধ্যমে বন্যা সতর্কবার্তা প্রচার।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা:
(১)টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনা।
(২)নদী ব্যবস্থাপনার সমন্বিত নীতি।
(৩)ভারতসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে যৌথ পানি ব্যবস্থাপনা।
জনগণের করণীয়:
সরকারের পাশাপাশি জনগণেরও কিছু দায়িত্ব রয়েছে বন্যা মোকাবেলায়:
(১)প্লাস্টিক ও আবর্জনা নদীতে না ফেলা।
(২)বন্যার মৌসুমে খাদ্য ও ওষুধ মজুত রাখা।
(৩)নিজ এলাকা থেকে বন্যার পূর্বাভাস সংগ্রহ করা
পরিবেশ সংরক্ষণ ও সচেতনতা সৃষ্টি।
উপসংহার:
বাংলাদেশে বন্যা একটি অবশ্যম্ভাবী দুর্যোগ হলেও এর ধ্বংসযজ্ঞ হ্রাস করা সম্ভব। এজন্য প্রয়োজন সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা, সচেতনতা এবং কার্যকর বাস্তবায়ন। উন্নত প্রযুক্তি, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে বাংলাদেশ বন্যার ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে একটি দুর্যোগ সহনশীল দেশ হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। বন্যার সময় যাতে ক্ষয়ক্ষতি কম হয় সেজন্য টেকসই অবকাঠামো তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় প্রশিক্ষিত লোকবল ও আধুনিক সরঞ্জাম নিশ্চিত করা জরুরি। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বন্যা মোকাবিলায় সরকারের কার্যকরী উদ্যোগগুলোর পাশাপাশি বন্যাদুর্গত এলাকার মানুষের আবাসন, ফসল, যোগাযোগ, স্বাস্থ্যরক্ষাসহ নানাবিধ বিষয়ে সময়োপযোগী সচেতনতা তৈরি করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
"বন্যা সাফল্যের পথে বাধা নয়; এটি বিজয়ের পথে একটি চক্র মাত্র"
নাম:ওয়াসীকা বিনতে আলম।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান :ঢাকা সিটি কলেজ, ঢাকা।