22/04/2026
খুলনায় এনসিডি মোকাবিলা মডেল: টেকসই স্বাস্থ্যসেবা ও সচেতনতার নতুন দিগন্ত
আজ বুধবার (২২ এপ্রিল, ২০২৬), খুলনা সিভিল সার্জন কার্যালয় এবং এশিয়া আর্সেনিক নেটওয়ার্ক (AAN)-এর যৌথ উদ্যোগে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেমিনারের মূল প্রতিপাদ্য ছিল “খুলনা জেলায় ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে এনসিডি মোকাবিলা মডেলের প্রচার ও বাস্তবায়ন”।
সেমিনারের মূল আলোচ্য বিষয়সমূহ:
১. প্রকল্পের অগ্রগতি ও কারিগরি সহায়তা:
অসংক্রামক রোগ (NCD) নিয়ন্ত্রণে এশিয়া আর্সেনিক নেটওয়ার্কের পক্ষ থেকে বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিম্নলিখিত সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে:
• ডিজিটালাইজেশন: ল্যাপটপ, নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সংযোগ এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ।
• স্ক্রিনিং টুলস: ডিজিটাল বিপি মেশিন, ওজন মাপার যন্ত্র, উচ্চতা ও কোমর পরিমাপের ফিতা ইত্যাদি।
• সচেতনতা বৃদ্ধি: দেয়াল পোস্টার, ফ্ল্যাশকার্ড, ব্যায়ামের নির্দেশিকা এবং তথ্য সম্বলিত লিফলেট।
• কাউন্সেলিং: দক্ষ জনবল নিয়োগ (আসবাবপত্রসহ ডেস্ক স্থাপন) এবং হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ প্রদান।
২. সামাজিক অংশগ্রহণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধি:
সেমিনারে আলোচনা করা হয় কীভাবে শিক্ষক, ইমাম, পুরোহিত, সামাজিক প্রতিষ্ঠান, যুব ক্লাব এবং কমিউনিটি গ্রুপের সদস্যরা প্রাথমিক পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। এছাড়া কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোকে সচল রাখা এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স (UHC) ক্যাম্পাসে ওয়াশ (WASH) পরিস্থিতির উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়া হয়।
৩. জনস্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রা বিষয়ক সতর্কতা:
বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি আশঙ্কাজনক ও সচেতনতামূলক তথ্য তুলে ধরেন:
• বিপজ্জনক পরিসংখ্যান: বাংলাদেশে প্রতিদিন প্রায় ৭০০ মানুষ স্ট্রোক ও হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছেন।
• খাদ্যাভ্যাস: উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে প্রতিদিন ১ চা চামচের বেশি লবণ এবং ৫ চা চামচের বেশি চিনি বর্জন করতে হবে।
• শারীরিক পরিশ্রম: সুস্থ থাকতে প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট (অথবা প্রতি বেলা খাবারের পর ১০ মিনিট) হাঁটার অভ্যাস করা জরুরি।
• উপকূলীয় সংকট: উপকূলীয় অঞ্চলে পানিতে অতিরিক্ত লবণাক্ততা উচ্চ রক্তচাপের একটি প্রধান কারণ। তাই নিরাপদ পানির সরবরাহ নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
ভবিষ্যতের জন্য সুপারিশমালা (Recommendations):
১. এনসিডি কর্নারগুলোতে মেডিকেল অফিসার ও নার্সদের দীর্ঘ মেয়াদে পদায়ন নিশ্চিত করা।
২. ডায়াবেটিস পরীক্ষার স্ট্রিপ কেনা এবং ইন্টারনেটের বিল পরিশোধের জন্য উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অনুকূলে সার্কুলার জারি করা।
৩. প্রয়োজনীয় ওষুধ ও লজিস্টিক সরবরাহ ব্যবস্থা নিরবচ্ছিন্ন রাখা।
৪. নিয়মিতভাবে 'এনসিডি স্ক্রিনিং সপ্তাহ' পালন করা।
৫. ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা আরও জোরদার করা।
৬. কমিউনিটি ক্লিনিক ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মধ্যে রেফারেল সমন্বয় শক্তিশালী করা।
অতিথিবৃন্দের বক্তব্য:
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. মোঃ মুজিবুর রহমান বলেন, "২০২৩ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত এশিয়া আর্সেনিক নেটওয়ার্ক প্রায় ১২ লাখ মানুষের দোরগোড়ায় এনসিডি সেবা পৌঁছে দিয়েছে, যা অত্যন্ত প্রশংসনীয়।" তিনি উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততার প্রভাব মোকাবিলায় নতুন প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
এশিয়া আর্সেনিক নেটওয়ার্কের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. শেখ আখতার আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন সাতক্ষীরার সিভিল সার্জন ডা. মোঃ এ. সালাম, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এনসিডি প্রোগ্রামের ফোকাল পারসন ডা. রাহাত ইকবাল চৌধুরী এবং বাংলাদেশে জাপানি মিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারি শিনজু কারাওয়াসা। স্বাগত বক্তব্য দেন খুলনার ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. মোঃ মিজানুর রহমান।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন এশিয়া আর্সেনিক নেটওয়ার্কের প্রতিনিধি অধ্যাপক হিরোশি ইয়োকোতা, এনসিডি প্রকল্পের প্রধান নির্বাহী তামিকো ইশিয়ামা, প্রকল্প পরিচালক তরুণ কান্তি হোড়, রূপসা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আরএমও ডা. এহসান উল আম্বিয়া হিমেল, ফুলতলার ছাতিয়ানি কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি মোঃ রফিকুল ইসলাম, পাইকগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স জামে মসজিদের ইমাম ও খতিব মোঃ আবু সাদিক, তেরখাদা উপজেলার শিক্ষক প্রশান্ত বিশ্বাস এবং দিঘলিয়া এলাকার রোগী রানি খাতুনসহ অনেকে।
আসুন, সচেতন হই এবং জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এনে অকাল মৃত্যু রোধ করি।