22/02/2022
আলেম ভাষা সৈনিক:
ভাষা-আন্দোলনের খণ্ডিত র্চচা ও আমাদের দায়!
------------------------------------
ভাষা-আন্দোলনের উৎপত্তি ও উৎসের ইতিহাসকে আজ মনে হয় অতি সচেতন ও সূক্ষ্মভাবেই খণ্ডিত করা হচ্ছে। সাধারণত বায়ান্ন'র রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের মিছিলে সালাম-রফিক- বরকত-জব্বারের গুলিবিদ্ধপূর্বক শহীদ হওয়া দিয়েই তারা লেখা শুরু করেন।
প্রশ্ন হলো, বায়ান্নতে যারা মিছিলে যোগ দিয়েছিলেন, যারা পাক হানাদারের বুলেটবৃষ্টির মুখে শহীদ হলেন—সেদিন তাদেরকে ভাষা-আন্দোলনে নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনা দিয়েছিল কোন সংগঠন? এবং কারা?
প্রতি বছর ২১ ফেব্রুয়ারি এলে আমাদের লেখক-কবি, বুদ্ধিজীবী, সুশীলসমাজ ও রাজনীতিবিদরা বিভিন্ন সেমিনার-সিম্পোজিয়াম ও পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি করে একুশের চেতনা ছড়িয়ে দেয়ার জন্য উঠেপড়ে লাগেন। এখানে লক্ষণীয় বিষয় হল, বামপন্থী ও সেক্যুলার শ্রেণির লেখক-বুদ্ধিজীবীগণ তাদের আলোচনা ও প্রবন্ধ-নিবন্ধে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে আলেমদের যে ত্যাগ-তিতিক্ষা ও স্বর্ণোজ্জ্বল অবদান আছে তা পরিপূর্ণভাবে উপেক্ষা করেন।
১৯৪৭ সালের আগেই ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত। কিভাবে হয়েছিল, কাদের মাধ্যমে বা কোন নেতৃত্বে বেগবান হয়েছিল তা আজ অনেকেরই অজানা।
ভাষা আন্দোলনের ডামাডোলে আজ হারিয়ে গেছে ভাষা আন্দোলনের জনক সংগঠন তসদ্দুনে মজলিসের কথা। ভাষার আন্দোলনের জনক খ্যাত প্রিন্সিপাল আবুল কাসেমের কথা। ৫২'র ভাষা আন্দোলনের মূখপাত্র সাপ্তাহিক সৈনিকের কথা। সাপ্তাহিক সৈনিকের সম্পাদক অধ্যাপক আব্দুল গফুর স্যার আজ অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী। কিন্তু খোঁজ নেয়ার কেউ নেই এই ইসলামি বুদ্ধিজীবীর। এভাবেই আজ বায়ান্নর আন্দোলন থেকে হারিয়ে গেছেন মাওলানা ভাসানী ও তর্কাবাগিশরা। হারিয়ে গেছে ২১শের মাওলানাদের ভাষাযুদ্ধের কথা।
অত্যন্ত পরিতাপের সঙ্গে বলতে হয়, যে ৫২'তে যে সংগঠনটির মাধ্যমে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ভিত্তি গড়ে ওঠে সেই সংগঠনটি অর্থাৎ তমুদ্দন মজলিসের কথা সেকুলার সুশীলদের কথায়, লেখায় ও আলোচনায় গুরুত্ব পায় না। সে কারণেই বর্তমান প্রজন্ম একুশে ফেব্রুয়ারির দিন পাক হানাদারের গুলিতে শহীদ হওয়া বরকত-রফিক- জব্বার-সালামের নাম জানলেও রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া মূল সংগঠন তমদ্দুন মজলিসের নাম ও অবদানের ইতিহাস জানতে পারে না। তাই স্মরণও করা হয়না।
আমি আজ কিছু ঐতিহাসিক তথ্য আপনাদের সামনে তুলে ধরব। ভাষা আন্দোলনের এই ৬৮বছরে কম ইতিহাস বিকৃতি করা হয় নি এদেশে। শহীদ শব্দ আর মিনারের ধর্মীয় আবহের সুউচ্চ শিরের মতো ভাষা আন্দোলনে আলেমদের অবদান ও প্রধান নেতৃত্বকে নুজ্যু ও বিকৃতি করার কম চেষ্টা করা হয় নি এদেশে। কিন্তু ইতিহাস কি মুছা যায়?
ছবিও কথা বলে। ইতিহাস তার গতিপথে স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে বেড়িয়ে পরে। ভাষা আন্দোলনের ক্ষেত্রে অনেকে নির্লজ্জভাবে আলেম-উলামা ও ইসলামী সংগঠনগুলিকে উর্দুপন্থী হিসাবে প্রচার করে।জ্ঞানপাপী ইতিহাস বিকৃতকারীরা নাটক,সিনেমায় এ কথা বুঝানোর চেষ্টা করে যে হুজুর, মোল্লা মানেই উর্দুপ্রেমি !!
অথচ আমরা ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসের দিকে থাকেলে কি দেখতে পাই..!!!
অনেকের কাছেই সম্ভবত অজানা যে, সর্বপ্রথম মাওলানা আকরম খাঁ সংগ্রাম ও সাংগঠনিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে ১৮৯৯ সালে কলকাতা আলিয়া মাদরাসায় বাংলা ভাষাকে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে সিলেবাসভুক্ত করা হয়। মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ছিলেন৫২'র সর্বদলীয় রাষ্টভাষা সংগ্রাম পরিষদের প্রথম সভাপতি। পাকিস্তান পার্লামেন্টে প্রথম বাংলা ভাষাতে বক্তৃতা দেন মাওলানা। ২১শে ফেব্রুয়ারি হত্যাকাণ্ডের প্রথম প্রতিবাদকারী মাওলানা তর্কাবাগিশ।
অবাক করা তথ্য ৫২থেকে বঙ্গবন্ধুর সাথে ভাষা আন্দোলন ও ভাষার যে কটি অনুষ্টানের ছবি পাওয়া যায় সব কয়টিতে এই মাওলানাদের পাওয়া যায়। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে তমদ্দুন মজলিসের নেতৃত্বের কথা উল্লেখ থাকলেও অনেকে রহস্যজনক কারণে ভুলে থাকতে চান।
দীর্ঘ দিন ধরে যারা রাজপথে, সভা-সমাবেশে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবীতে সংগ্রাম করেছেন, স্বাধীন বাংলাদেশে যারা বাংলা ভাষাকে জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে চালু করার সংগ্রাম করেন আলেমরাই। সর্বপ্রথম মাওলানা আকরম খাঁ সংগ্রাম ও সাংগঠনিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে ১৮৯৯ সালে কলকাতা আলিয়া মাদরাসায় বাংলা ভাষাকে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে সিলেবাসভুক্ত করা হয়। এমনিভাবে তিনি অত্যন্ত সচেতন ও জাগ্রত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে মাতৃভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে নিজেকে পরিপূর্ণভাবে উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন। যে ভাষা আন্দোলনের পথ ধরে আমরা একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের গর্বিত নাগরিক হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিতে পারছি, সেই আন্দোলনের একজন অন্যতম প্রাণপুরুষ হলেন মাওলানা আকরম খাঁ। [দৈনিক ইনকিলাব, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১০,পৃ: ১১]
৫ ডিসেম্বর ১৯৪৭, ঢাকাতে বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগ ওয়ার্কিং কমিটির শেষ বৈঠক বসে। এই বৈঠকে সিদ্ধান্ত গ্রহন করা হয় যে উর্দূকে পূর্ব বাঙলার সরকারি ভাষা করা হবে না। কমিটির সভাপতি মাওলানা আকরম খাঁকে এই মর্মে সংবাদপত্রে একটি ঘোষণা প্রকাশের ক্ষমতা প্রদান করা হয়। প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীনের সরকারি বাসভবন “বর্ধমান হাউসে”এই বৈঠক চলাকালে বহুসংখ্যক ছাত্র এবং কয়েকজন শিক্ষক সেখানে উপস্থিত হয়ে বাংলাকে অবিলম্বে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার দবীতে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। তাদের দাবী সহানুভূতির সাথে বিবেচিত হবে, মাওলানা আকরম খাঁর থেকে এই আশ্বাস লাভের পর বিক্ষোভকারীরা বর্ধমান হাউস ত্যাগ করেন।
ঐ দিন তমদ্দুন মজলিশের পক্ষ থেকে আবুল কাসেম এবং আবু জাফর শামসুদ্দীন মাওলানা আকরম খাঁর সাথে ভাষা প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করেন। এই আলোচনার পর একটি প্রেস বিবৃতিতে আবুল কাসেম বলেন, আলোচনা প্রসঙ্গে মাওলানা আকরম খাঁ তাদেরকে আশ্বাস দেন যে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষারুপে বাংলা ছাড়া অন্য কোন ভাষাকে চাপানোর চেষ্টা করলে পূর্ব পাকিস্তান বিদ্রোহ ঘোষণা করবে এবং তিনি নিজে সেই বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেবেন। [ পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি- বদরুদ্দীন ওমর, প্রকাশ ১৯৭০; পৃ: ১৯-২০]
এর পূর্বে উপমহাদেশে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার সর্বপ্রথম দাবি জানিয়েছিলেন সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী এবং তিনি ১৯২১ সালে ব্রিটিশ সরকারের প্রতি বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার লিখিত প্রস্তাব পেশ করেন।
'৫২'র ভাষা আন্দোলনকে ওলামায়ে কেরাম সমর্থন আরও জোরদার করতে ভূমিকা পালন করেছিল।ঃজমিয়তে উলামায়ে ইসলামের ব্যানারে হযরত মাওলানা আতহার আলী (রহ) এ আন্দোলনকে সমর্থন দিয়েছিলেন। তিনি জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম পাকিস্তানের সংবিধানের এক ধারায় তিনি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবী জানান। মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী (রহ.) তখন সুদৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন, ‘মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদা দান আমাদের ন্যায্য অধিকার তা মানতেই হবে।‘উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেম মাওলানা আবদুর রহিমও ভাষা আন্দনলনকে সমর্থন দিয়েছিলেন এবং ভাষা আন্দোলন নিয়ে বিতর্কিত কোন মন্তব্য না করতে জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা আবুল আলা মওদূদীকে সতর্ক করেছিলেন। সবচেয়ে বড় কথা হল পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর সর্বপ্রথম আন্দোলন শুরু করেছিল ইসলামী আদর্শবাদি সংগঠন 'তমদ্দুন মজলিস’।
ভাষাসৈনিক গাজিউল হক, লিখেছেন- 'মওলানা ভাসানীসহ যে ৪২ জন নেতা এই আন্দোলনের সপক্ষে ছিলেন, তাদের মধ্যে প্রভাবশালী কয়েকজন মন্ত্রিত্ব এবং রাষ্ট্রদূতের পদ নিয়ে আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করেন।' ১৯৫২ সালের ৩১ জানুয়ারি মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় যুবলীগ, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ, তমদ্দুন মজলিস, ইসলামিক ব্রাদারহুড, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ এবং পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ গঠিত হয়। ৪০ সদস্যবিশিষ্ট এই পরিষদের নেতা ছিলেন মওলানা ভাসানী। সদস্য ছিলেন আতাউর রহমান খান, কামরুদ্দীন আহমদ, খয়রাত হোসেন, আনোয়ারা খাতুন, শামসুল হক, আবুল কাসেম, আবদুল গফুর, মোহাম্মদ তোয়াহা, অলি আহাদ, মীর্জা গোলাম হাফিজ, আবদুল মতিন, কাজী গোলাম মাহবুব, শামসুল হক চৌধুরী, খালেক নেওয়াজ খান, সৈয়দ আবদুর রহিম প্রমুখ। পরিষদের সেই সভাতেই 'বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা কমিটি'র ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা শহরের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আহূত ছাত্র ধর্মঘটের প্রতি সমর্থন জানানো হয়। ৪ ফেব্রুয়ারির সভায় ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে প্রদেশব্যাপী সাধারণ ধর্মঘট আহ্বান করা হয়।
সালাম বরকত রফিক জব্বার এর শাহাদতের সাথে সাথে বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি হাজার হাজার ছাত্র জনতা প্রাণের বাংলা ভাষার জন্য লড়াই করে কারাবরণ করেন। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে অংশ নিয়ে বঙ্গবন্ধু সহ তৎকালিন ছাত্র নেতাদের সাথে মাওলানা মুহিউদ্দীন খান দেড় মাস জেল কেটেছিলেন। যে মানুষটি ছাত্র জীবন থেকে পাকিস্তান আমল হতে এদেশের গন- মানুষের প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রাম ও রক্তঝরা দিনে বলিষ্ট নেতৃত্ব দিয়েছেন আমরা নিভৃতচারী এই সংগ্রামী সাধকের জীবনের অনেক কৃর্তিগাথা ঘটনা প্রবাহ জানিনা। বকশী বাজার আলীয়া মাদরাসা থেকে ঢাকা আলীয়ার ছাত্রদের একটি মিছিল মুহিউদ্দীন খান সহ কজন ছাত্র নেতার নেতৃত্বে সেই উত্তাল সংগ্রামে শরিক হয়। তখন তরুন ছাত্রনেতাদের সাথে পুলিশি আক্রমনে শিকার হয়ে গেপ্তার হন এবং বঙ্গবন্ধুর সাথে দেড় মাস কারাবরন করেন মুহিউদ্দীন খান। (ভাষা আন্দোলনের মাওলানারা, শাকের হুসেন শিবলী)
ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে বাাঙ্গালির চেতনার মহানায়ক মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশ একটি নাম । একটি ইতিহাস । একটি দেশ রাষ্ট সর্বভৌমত্বের মহানায়ক। আজন্ম সংগ্রামি এক সিপাহসালার। বাংলা ও বাঙ্গালীর স্বাধীকার আন্দোলনের পুরোধা। তিনি হলেন ইতিহাসের সেই প্রথম ব্যক্তি যিনি ১৯৫২সালে ২১শে ফ্রেব্রুয়ারি হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে নুরুল আমিন সরকারের বিরোদ্ধে প্রথম সিংহের ন্যায় গর্জে উঠেছিলেন এবং পালামেন্ট থেকে ৩৫জন সদস্য নিয়ে তার নেতৃত্ব বিদ্রোহ করেন এবং তিনি গেপ্তার হন।
একুশের হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে আইন পরিষদে এটিই প্রথম প্রতিবাদ। ’৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি বেলা সাড়ে তিনটায় পূর্ববঙ্গ পরিষদের অধিবেশন শুরু হয়। মাত্র ঘণ্টা কয়েক আগেছাত্রদের ওপর গুলি চালনার প্রতিবাদে অধিবেশন সেদিনের জন্য স্থগিত রাখার দাবি জানান আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ। তিনিবলেন, ‘জনাব স্পিকার সাহেব, প্রশ্নোত্তরের পূর্বে আমি আপনার কাছে একটা নিবেদন করতে চাই। যখন দেশের ছাত্ররা, যারাআমাদের ভাবী আশা-ভরসাস্থল, পুলিশের গুলির আঘাতে জীবনলীলা সাঙ্গ করছে, সেই সময় আমরা এখানে বসে সভা করতে চাই না। প্রথমে ইনকোয়ারি তারপর হাউস চলবে।’ একুশে ফেব্রুয়ারি ছাত্রহত্যার প্রতিবাদে এটাই ছিল আইন পরিষদে প্রথম বক্তব্য।
শুধু কি তাই ! এই মাওলানা সেই মাওলানা । তিনি প্রথম বাঙ্গলী হিসেবে ১৯৫৮ সালের ১২ আগষ্ট পালামেন্টে বাংলা ভাষাতে বক্তৃতা করে বাংলার সম্মান উঁচু করে ইতিহাস সৃষ্টিকরেছিলেন ।
পাকিস্তান গণপরিষদে প্রথম বাংলায় বক্তৃতা ’৫২ সালের ১২ আগস্ট সব ভ্রূকুটি অগ্রাহ্য করে মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ পাকিস্তান গণপরিষদে বাংলায় বক্তৃতা শুরু করেন।পশ্চিম পাকিস্তানি গণপরিষদ সদস্যরা নানা উপহাস করে এ সময় তর্কবাগীশকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করে। কিন্তু উপহাস উপেক্ষা করেই তর্কবাগীশ বাংলায় বক্তব্য দেন। বাংলায় বক্তৃতা রেকর্ড করার জন্য ওই সময় আইনসভায় কোনো ব্যবস্থা ছিল না। মাওলানা তর্কবাগীশ বেশ কয়েকবার স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণের পর পাকিস্তান গণপরিষদে বাংলা বক্তৃতা রেকর্ড করার জন্য লোক নিয়োগ করা হয়।এরপূর্বে পাকিস্তান গনপরিষদের কোন সদস্য বাংলাতে বক্তৃতাকরেন নি। যারা অপরিসীম দরদ দেখিয়ে বাংলার দাবীতে পূর্ব পাকিস্তানের হাটে মাটে গ্রামে গ্রামে বক্তৃতা করে বেড়াতেন এবং বাংলার জন্য সংগামি হিসাবে খ্যাত ছিলেন এমন নেতারাও পালামেন্টে বাংলায় বক্তিতা দেয়ার সাহস পাননি । তেমনকি অভিব্যক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সরোয়ার্দী ও শেরেবাংলা ফজলুল হক গন পরিষদে বাংলা ভাষায় বক্তৃতা দিতে লজ্জাবোধ করেছেন ।
তিনি আন্দোলনের মাধ্যমে পাকিস্তান পার্লামেন্টে বাংলা বক্তৃতা চালু ও বাংলা ভাষা রেকর্ড করার প্রথা চালু করে এক ঐতিহাসিক অবদান সৃষ্টি করেন ।বৃট্টিশবিরোধি আন্দোলন থেকে ৫২র ভাষা আন্দোলন হয়ে ৭১এর মুক্তিযুদ্ধে তিনি ছিলেন আপোষহীন এক নেতা। উড়ে এসে জুড়ে বসে নয় বরং এই মাওলানা তীল তীল করে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্টার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছিলেন । আমাদের ইতিহাস প্রতিমুহুর্তে বদল হয় এভাবেই আজ ইতিহাসের ছাত্রদের কাছে অপরিচিত বাঙ্গালীর অবিসংবাদিত নেতা মাওলানা আবদুর রশিদ তর্কবার্গীশ ।৭১এর স্বাধীনতা সংগ্রামে তিনি ব্যপক জনমত তৈরির লক্ষ্যে মাটে ময়দানে জনগনকে মুক্তি সংগ্রামে উদ্ধুদ্ধ করতেন । তিনি সর্বশেষে স্বাধীন বাংলাদেশ এর জনমত তৈরির লক্ষ গঠন করেন উলামা পাঠি । পাকিস্তান হানাদার বাহিনী তার নাম দিয়েছিল ‘কাফের মাওলানা ‘ ।তারা তার বাড়ি ঘর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছিল । এটা নিসংকোচে এবং নিদ্ধিধায় বলা চলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের পটভুমি তৈরিতে তিনি এক মহানয়ক ও স্বপ্নদ্রষ্টা ।
সংযুক্তি :::
((("অধ্যাপক গোলাম আজমের পিঠে চড়ে রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই দাবী সম্বলিত পোষ্টার দেয়ালে লাগিয়েছি।"
এ মন্তব্যটি ভাষা সৈনিক আব্দুল মতিনের।
কালের পরিক্রমায় সৃষ্ট ভাষা সৈনিকদের ভীড়ে আমরা ভুলে গেছি ১৯৪৮ সালের ১১ই মার্চ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবীতে হরতাল সফল করতে গিয়ে অধ্যাপক গোলাম আযমের গ্রেফতার হওয়ার কথা।
ইতিহাস থেকে মুছে দিয়েছি ১৯৪৮ সালের ২৭ নভেম্বরে ডাকসুর জিএস অধ্যাপক গোলাম আজম ছাত্রসমাজের পক্ষ থেকে রাষ্টভাষা বাংলার দাবী সম্বলিত ঐতিহাসিক স্মারকলিপি পাঠ করার কথা।
ভুলে গেছি ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের উত্তাল সময়ে অধ্যাপক গোলাম আজম রংপুর কারমাইকেল কলেজে অধ্যাপনা কালে, সেখানে রাজনৈতিক কর্মী ও ছাত্রদের নিয়ে সমাবেশের আয়োজন করায় তার পুনরায় গ্রেফতার হওয়ার কথা।
যাদের আত্নত্যাগ ও আত্নদানের মধ্যদিয়ে মায়ের ভাষায় কথা বলতে পারছি, আল্লাহ যেন তাদের এই অসামান্য আত্নত্যাগ ও আত্নদানের বিনিময়ে সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করেন। আমীন।)))
এই মাওলানাদের কাছে বাংলাদেশ ও বাংলাভাষীরা চিরঋনী।
পরিশিষ্ট :
১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারী পাকিস্তানের গণপরিষদের প্রথম অধিবেশনে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দানের দাবি তোলেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। যদিও তা প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল। কিন্তু ভাষা দিবসের আলোচনায় তার নামটাও খুব বেশি উচ্চারিত হয় না।
তথ্যসূত্রঃ
১.অসমাপ্ত আত্মজীবনী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান
২.মাসিক মদীনা, ডিসেম্বর-২০০৮
৩.ভাষা আন্দোলনের ডায়রী-মোস্তফা কামাল
৪.বাংলা সাহিত্যের ধারা- ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ
৫.বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস-সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়
৬.পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি- বদরুদ্দীন ওমর
৬.দৈনিক ইনকিলাব, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১০,পৃ: ১১
৭. মাওলানা হাকীম সৈয়দ আনোয়ার আবদুল্লাহ
(লেখক, গবেষক, অনুবাদক ও বহুগ্রন্থপ্রণেতা)
মুহতামিম : জামিয়া কাশিফুল উলুম ঢাকা,
মহাপরিচালক, জাতীয় কওমী শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড বাংলাদেশ
শিক্ষা, গবেষণা ও সিলেবাস পরিচালক, জাতীয় কওমী মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড বাংলাদেশ
সম্পাদক, মাসিক দ্বীনি দাওয়াত (আত-তাহকীক)।