26/04/2024
যয়নাব আর গাজী আপুর লেখা
আমার বিয়ের সময় যখন আমি উনাকে বললাম,আমার অতীত নিয়ে কোনো কিছু জানার থাকলে আপনি জিজ্ঞেস করতে পারেন। কেনো আমার আগে একবার সংসার ভেংগেছিল, এটা জানার অধিকার আপনার আছে। যদি আমার সমস্যায় সংসার ভাঙে তবে আপনাকে আবারো ভাবতে হবে আসলেই কি আমাকে বিয়ে করতে চান কিনা!
জবাবে উনি বলেছিলেন- আমার কোনো কিছু জানার ইচ্ছে নেই। এবং অতীত নিয়ে মাথা ব্যথাও নেই। এবং আপনার কাছেও অনুরোধ থাকবে আপনি কখনওই শুধু আমার কাছে না,বরং কারো কাছেই আপনার অতীত জিকির করবেন না। আমার সাথেই আপনার প্রথম বিয়ে। আপনি মনে প্রানেই বিশ্বাস করুন এটাই আপনার প্রথম বিয়ে।
আমাদের যেইদিন বিয়ে হয় সেইদিন আমি উনাকে বলছিলাম- আজ থেকে আমার জীবন শুরু হলো,আজকের আগে আমি কখনওই কোনো দিন কাটাইনাই।জবাবে উনিও বলেছিলেন- আজ থেকে তোমার নতুন করে পথ চলা,আজকের আগের কোনো অতীত নাই তোমার!
তারপর থেকে আজ পর্যন্ত আমি তার কাছে নিজের অতীত বলিনি।তবে জীবনযুদ্ধের কথা বলেছিলাম। যা মূলত শুরু হয়েছিল বিয়েটা ভেংগে ফিরে আসার পর।
এখানে একটা বিষয় লক্ষণীয়, অতীতের জিকির বা অতীত নিয়ে পড়ে থাকা বা অতীত নিয়ে বিচার করা বা খোঁটা দেওয়া কোনোটাই সুখ বা শান্তি কিছুই এনে দেয়না। বরং সম্পর্ককে তিক্ত করে দেয়। তাই বুদ্ধিমানের কাজ হচ্ছে যা গত হয়েছে তা পুরোটাই বাদ দেওয়া।
আমার বিয়ে হয় ১৭ বছরে। আমি কখনওই ভাবিনি যে আমার আর্লি বিয়ে হয়েছে।বরং আমার এই বয়সে অনেকে ২ বাচ্চারও মা হয়ে যায়। শুধু এইটুক বলি আমার পরিবেশ এমনই ছিল যে আমি বিয়ের জন্য ইনাফ ম্যাচুয়ার হইনি।ঘরের কাজ, রান্না,খেদমত করা সবই শিখেছি।কিন্তু হিকমা শিখিনি।একজন মানুষকে কীভাবে চিনতে হয় বুঝতে হয়, ভুল শুধরাতে হয় সেসব নিয়ে কোনো আইডিয়া ছিল না।সর্ব পরিস্থিতিতে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার মত যে মানসিকতা দরকার আমার তাও ছিল না। একটা খামিরের দলা ছিলাম।চাইলে সে নিজের মত করে আমাকে বানিয়ে নিতে পারতো।কিন্তু তার বদনসিব। বোবার মত সব কিছু মেনে নিয়ে চুপ থাকার একটা অসীম ক্ষমতা শুধু রপ্ত করছিলাম ডে বাই ডে।
এখন মাঝে মাঝে ভাবি,এখনকার মেয়েদের বিবাহিত বান্ধবি থেকে,বা অনলাইনে অন্যের কাহিনী পড়ে বা নাটক সিনেমা দেখে ইভেন নিজেও সম্পর্কে জড়িয়ে বা ঘরে আত্মীয়স্বজনদের সংসার দেখে অনেক অনেক কিছু জানে,শিখে।আমার না ছিল ম্যারিড ফ্রেন্ড সার্কেল,না অনলাইন,না নাটক সিনেমা দেখার স্কোপ আর না আত্মীয়স্বজন।
স্কুল+ঘর+স্কুল ব্যাস এই ছিল দৌড়। ঘরের কাজ সব করতাম। পাশাপাশি শেলাই,মেহেদি দেওয়া ইত্যাদি নানান গুনের কাজ শিখতাম।
ভাবতাম বিয়ের পরে এর থেকে বেশিই বা আর কী হবে। রান্না করবো,জামাই নিয়ে থাকবো, বাচ্চা হবে, সংসার দেখা শোনা করবো এই তো ব্যাস!
সংসার সামলানোর গুন থাকলেই কেউ বিয়ের জন্য তৈরি হয়ে যায়না। বিয়ের জন্য আসলে আলাদা ভাবে তৈরি হতে হয়। প্রচুর হিকমা লাগে। যে কোনো সমস্যা ম্যানেজ করার বুঝ লাগে।কারো না পছন্দনীয় অভ্যাস পরিবর্তন করার জন্য সবর ও নানান টেকনিক জানা লাগে।এক কথায় পরিপূর্ণ ম্যাচুয়ার হওয়া লাগে।আর এসব শিক্ষা বই খাতায় পাওয়া যায় না, পাওয়া যায় জীবন থেকে। জীবনের গল্প থেকে।
আমি বা আমার পরিবার যেমনটা চেয়েছিলাম,আমার জন্য আল্লাহর প্লান ছিল ভিন্ন কিছু।
বড় ভাইয়া মাঝে মাঝে বলত,আমাদের ভবিষ্যৎ যদি দেখতে পেতাম কী নিয়ামাহ আল্লাহ দিবে,তাহলে বর্তমানের কষ্টকর দিনগুলো আমরা ইঞ্জয় করে করে অনেক বেশি খুশি হয়ে কাটাতাম।এখন দোষ দিওনা কাউকে। না আল্লাহকে না তোমার অতীতকে আর না কাউকে। তাহলে সামনে নিয়ামত পাওয়ার পর লজ্জিত হতে হবে।
ভাইয়ার এই নাসিহায় আমি পরবর্তীতে কখনওই কাউকে দোষারোপ করিনি,এমনকি এটাও বলিনি যে আমার জীবনটা বরবাদ করেছে কেউ। বরং আমার মনে হয় আমার সাথে উত্তমটাই হয়েছে। যদি আমি আরো কষ্ট পেতাম,তবে বর্তমানে আমি আরো বেশি নিয়ামাহ পেতাম।
আমার নিজের কাহিনী লেখার উদ্দেশ্য এই একটাই। সবর করা ও কাউকে দোষারোপ করা থেকে যেন বিরত থাকে সবাই।আর তাওয়াক্কুল যেন রাখে আল্লাহর ওপর।
একটা বিষয় স্মরণ করি।আমি বালিগা হওয়ার আগে বেশ কিছু স্বপ্ন দেখেছিলাম,যার অর্থ ঐ মুহূর্তে আমি বুঝিনি। ঘুম থেকে ওঠে আমি অবাক হয়ে ভাবতাম। এইসবের মানে কী?
বালেগা হওয়ার আগে,হয়ত ৭/৮ বছর হবে,আমি স্বপ্ন দেখেছি আমার বিয়ে হয়েছে,আবার আরেকদিন দেখেছি আমার ছেলে হয়েছে,আবার আরেকদিন দেখেছি আমার তালাক হয়েছে।এরপর আবার দেখেছি আমার ছেলেকে কোলে নিয়ে পথে পথে পাগলের মত ঘুরেবেড়ানো এক পাগলা জীবন।
এসব স্বপ্ন গুলোকে কখনওই স্বপ্ন মনে হয়নি।যেন টাইম ট্রাভেল করে এসেছি। ঘুম থেকে ওঠে দেখতাম চোখে পানি। বুকে পেইন করত।এতো কষ্ট কেনো?
আম্মুকে জিজ্ঞেস করলাম,আম্মু তালাক মানে কী? আম্মু অবাক হলে আমি বলি, আমি স্বপ্নে দেখেছি আমার তালাক হয়েছে। আম্মু বলতো বামে থুতু দে তিনবার ইস্তিয়াজা বলে।
আমার এই স্বপ্নগুলো একের পর এক বাস্তব হয়েছে! আজীব না?
এই স্বপ্নগুলো আল্লাহর তরফ থেকেই ছিল,আর বড় ভাইয়ার কিছু নাসিহাগুলোও।
আমি বাবার বাড়িতে ফিরে আসার পর শুধু আমার না,আমার পুরোটা পরিবারের জীবন বদলে যায়। আব্বু শপ থেকে ফিরে আসতো গম্ভীর মুখে। পাশের রুম থেকে আমি শুনতাম আর কাঁদতাম, আব্বু আম্মুকে বলছে আজ অমুকে এসে বলে গেলো কই কই নাকি শুনছে আমার মেয়ে কোন ছেলের সাথে সম্পর্ক থাকার কারণে তালাক হয়েছে।
আব্বু বলতো যারা সম্মান দেখিয়ে আগে কখনো চোখ তুলে তাকাতোনা,আজ তারাই এসে আমার মজা উড়ায়।
এলাকার আন্টিরা(আল্লাহ প্রত্যেককে হিদায়াত দিন ও আমার দীর্ঘশ্বাস থেকে মাফ করুন) আম্মুকে এসে এসে কত কথা বলতো।আমার চরিত্র নিয়ে তখন নিয়মিত চর্চা হতো পরিচিত সব ঘরগুলোতে!
মানে এমন সব কথা যা শুনে ইচ্ছে করতো গলায় দঁড়ি দেই।আস্তে আস্তে ঘরের সবাই থমথমে হয়ে গিয়েছিল।কারো মুখে হাসি নাই।সবাই ঘরকুনো হয়ে গেছে, না কেউ কোথাও যায় আর না কাউকে বাসায় আসতে দেয়। আমাকে সবাই সাপোর্ট করলেও আস্তে আস্তে আমার ওপর বিরক্ত হতে থাকে। কারণ আমি তখন মানসিক ভাবে অসুস্থ এক মানুষ। সারাদিন ঘরের লাইট অফ করে টেবিলের নিচে বসে থাকতাম। না খেতাম না মুহাম্মাদের খবর রাখতাম। আম্মু একা আর কত করবে। আমি শুধু ভাবতাম আমি এমনই এক অপদার্থ যে কিনা এই হাসিখুশি পরিবারের শান্তি নষ্ট করে দিলাম। এই এক কষ্টে সারাক্ষণ ভাবতাম কিভাবে পালানো যায়, কিভাবে মরে যাওয়া যায়। নিজেকে বোঝা বোঝা মনে হতো। আমার এমন কর্মকান্ডে দিনে দিনে বড় ছোট সবাই বিরক্ত হওয়া শুরু করলো। একটা সময় আমার ঘরের কাউকেই আর ভাল লাগতো না। কেউ কিছু বলতে আসলে চিৎকার করে কাঁদতাম আর বলতাম সবাই ইচ্ছে করে আমাকে বিয়ে দিয়ে জীবনটা নষ্ট করেছেন! আর মারধর করতাম প্রচুর। মুহাম্মাদকে,ভাই বোনকে। লিমিট ছাড়া মার। মারতে মারতে অজ্ঞান করে ফেলতাম। খুনই করে ফেলতে ইচ্ছে করতো।
আমি নিজেই টের পাচ্ছিলাম। আমি দিন দিন কতটা অসুস্থ হয়ে যাচ্ছি। আমি কী চাই,কী ভাবি কিছুই কাউকে বোঝাতে পারতাম না। বাসার সবাই চাইত সুস্থ মানুষের মত বাঁচতে। আমার জীবনে আল্লাহ কী রেখেছেন সেটার অপেক্ষা করতে তবে সুস্থ মানুষ হয়ে। সকালে আর্লি ওঠে নাস্তা ,পড়া লেখা করা,মুহাম্মাদের কেয়ার করা। রান্নাবান্নায় আম্মুকে হেল্প করা। মানে একটা সুস্থ জীবন কাটানো। কিন্তু আমি এমন হয়ে ছিলাম যে আমার এক কদমও আগাতো না।
আমার এই হালত দেখে আম্মু বলছিলেন আবার বিয়ের কথা। আমার তো কলিজা শুকায়ে আসছে এটা শুনে। কারণ তখন নানানজন বলাবলি করছিল এবার আমার বিয়ে হবে কোনো বুড়ার সাথে বা বিপত্নীক কিংবা কারো মাসনা হিসেবে।এসব শুনে শুনে আরো বেশি মরে যাচ্ছিলাম আমি। আর দ্বিতীয়বার বিয়ে না করার দৃঢ় সংকল্প করছিলাম মনে মনে।
আমার সবে ইদ্দত শেষ হলো।এর মাঝে এক মহিলা আমাকে দেখে খুব পছন্দ করলেন। তার একটাই ছেলে,ছেলেটা অবিবাহিত এবং ডক্টর। সবাই মোটামুটি অবাক হলো! এমন একটা প্রস্তাব কেউই কল্পনা করেনি। সবাই আগাতে চাইলেও আমি বেঁকে বসলাম। কারণ সাংসারিক জীবনের যে অসহ্যকর অভিজ্ঞতা ছিল আমার! আর না!
সেখানে না আগালেও আমি মানসিক ভাবে একটু শান্তি পেয়েছিলাম। নিজেকে যেমন পচে গেছে ফেলে দেওয়ার মত বস্তু ভাবা শুরু করেছিলাম সেটা অনেকখানিই কেটে গেলো।
আমার এমন একটা বাজে সময়ে ফেসবুকে পরিচয় হয় ইলমার সাথে।ও ছিল সম্পুর্ন আমার বিপরীত। প্রচুর চাল্লু,চঞ্চল, তিড়িংতিড়িং করা,বান্ধুবি নিয়ে ঘুরেবেড়ানো টাইপ পাব্লিক। ওর সাথে প্রচুর কথা বলতাম। বর্তমান সময়টা ভুলে থাকতাম যতক্ষণ কথা বলতাম। কিংবা আমার কষ্টগুলো শেয়ার করে হালকা হতাম। কিছুই রাখতাম না।সব বলতাম। ও শুনতো। বকত,বুঝাইত। আমাকে খুব কেয়ার করতো। আমি খাওয়া দাওয়া কিছুই করতাম না ঠিক মত। আর ও খাওয়ার টাইমে না খাওয়া পর্যন্ত ঘ্যান ঘ্যান করতো। ২৪টা ঘন্টা ও আমাকে ঘিরে রাখতো।( আই লাভ ইউ ইলমা,আমার জন্য ঐ সময়ে কতটা শান্তি ছিলি তুই,এইটা আমি নিজেও কখনো বোঝাতে পারবোনা। )
আমি এখন খুব বুঝি। এমন হালতের ওপর দিয়ে যখন কেউ যায়,তার এটলিস্ট নিজের ভিতরটা দেখানোর জন্য একজনকে খুব বেশি দরকার।আমি যে সময়টা পেয়েছি, যে প্রায়োরিটি পেয়েছি,যে কেয়ার পেয়েছি এসব আস্তে আস্তে আমার হালত পরিবর্তন করে দিচ্ছিল। মারধর করতাম না আর কাউকে। সুস্থ মানুষের মত চলার যুদ্ধ করতাম। একটু একটু করে আস্তে আস্তে পুরো পরিবারের দায়িত্ব নিয়ে নিলাম।পুরো বলতে পুরোটা। এ টু জেড।বাসায় বসে টিউশনি করতাম। এলাকার মানুষজনের কাপড় শেলাই করতাম। কারো বিয়ে শাদি হলে মেহেদি লাগাতাম। এইসব করে করে নিজের খরচ নিজে চালাতাম।আলহামদুলিল্লাহ্।
এভাবে বছর কেটে গেলো। নানান জনের নানান কথায়, আড় চোখের চাহুনিতে, আত্মীয়দের খোঁটানিতে নানান বদনাম শুনে শুনে কাটতে থাকে দিনগুলো। আমি খুব কাঁদতাম সে সময়ে। প্রতিটাদিনই কোনো না কোনো কাহিনী হতো কাঁদার জন্য।এতোটাই কাঁদতাম যে বিরক্তি চলে আসছিল।একটা সময় নানান যুদ্ধের পাশাপাশি কান্না না করার যুদ্ধটাও শুরু হলো।
অতীতের কাহিনী মনে আসতো না। বা সেসব ভেবে কাঁদতাম না কখনওই। কারণ তালাকটা আমিই চেয়েছি, আর তালাক পেয়ে সবচেয়ে বেশি আমিই খুশি হয়েছি। তাই মনে আনন্দ কাজ করতো সেই জীবন থেকে মুক্তি পেয়ে।
একটা বিষয় খুব বুঝেছি, ঘরে হাত পা গুটিয়ে বসে থাকা কোনো সদস্যকেই কেউ সহজ ভাবে মেনে নিতে পারেনা।অল্প কদিন আদরযত্ন করবে,এরপর আস্তে আস্তে বিরক্তি ভাব আসবে।সে ছেলে হোক মেয়ে হোক বা অন্য কেউ।ঘরের মিনিমাম যে কোনো একটা কাজে ব্যস্ত তো থাকতেই হবে। এভাবে ঘরে যদি ফিরে আসতে হয় কাউকে,সে যদি নিজের কষ্ট হোক এরপরেও সংসারের ম্যাক্সিমাম কাজের আঞ্জাম দেয় তবে এটলিস্ট পরিবারের মানুষের কাছ থেকে কষ্ট পাবেনা। বরং তার থেকে খেদমত পেয়ে তার প্রতি সহানুভূতিশীল হবে।
বছরখানেক পরেও আমি মানসিকভাবে সুস্থ হতে পারছিলাম না।মনে প্রচুর অশান্তি কাজ করতো।লোক সমাজ এড়িয়ে একা চুপচাপ আর কত থাকা যায়? কুরআনের হালাকায় ভর্তি হলাম। তখন দুনিয়ার সমস্ত কিছু ছেড়ে আমি হিফজো আর সংসারের কাজে মনোযোগী হলাম।তবে প্রায় খুব ভাবনায় পড়ে যেতাম। আমার ফিউচার কী? বিয়ে যদি নাইবা করি তবে বাবার বাড়িতে আজীবন থাকবো? বাবা মা চলে গেলে এরপর ভাইদের সাথে থাকবো? এই ভাবনা আমাকে পেইন দিতো খুব।আমি জানি আমার জন্য উত্তম হচ্ছে আবার বিয়ে বসা।কিন্তু মানসিক ভাবে আগাতে পারতাম না। অনেক প্রস্তাব আসতো আমার জন্য। এমনও হয়েছিল একই সাথে ৩/৪টা প্রস্তাব আসছে।কিন্তু প্রস্তাব আসলেই আমার ভিতর একটা অশান্তি শুরু হয়ে যেতো। এখানে কিছুটা ভয় আর কিছুটা জীনের সমস্যার কারণও ছিল। প্রস্তাব আসলেই তখন ঘরের সবাই প্রেশার দিতো।আর আমি না করতাম। কোনো ভাবেই রাজি হতাম না। এই নিয়ে কিছুদিন রাগারাগি চলতো।
আমি খুব সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতাম। মন থেকে চাইতাম না আবার সংসারের মারপ্যাঁচে পড়ি। কিন্তু নিজের ও ছেলের ফিউচার ভাবলে বুঝতাম বিয়েটা জরুরি। মুরুব্বিরা বোঝাতো ছেলে ছোট আছে এখনই বিয়ে করে ফেলো,বড় বলে সমস্যা হবে পরে।
আমি বুঝতাম না কী করা দরকার। পড়াশোনায় মন দিলাম। দিন দিন পড়ার চাপ বাড়াতে লাগলাম। বাড়াতে বাড়াতে একটা সময় রোবটিক একটা লাইফ শুরু করলাম।সারাদিনে ৩ ঘন্টা ঘুমাতাম, বাকিটা সময় টিউশনি,জব,ক্লাস ইত্যাদি।এই ভাবে ব্যস্ত হওয়াটা আমার জন্য খুব দরকার ছিল।আমি অবসর বসে থাকলেই মাথায় প্রচুর টেনশন কাজ করতো। ডিপ্রেশনে ভুগে ভুগে পাগলা পাগলা লাগতো।নানান জনের নানান বিহেভে প্রচুর পেইন পেতাম।অহেতুক কান্না করতাম।
তবে একটা সত্য কথা কী, যে হালতেই থাকতাম আমি শোকর আদায় করতাম। আল্লাহ যা দিয়েছে তা নিয়ে খুব ভাবতাম। যা নাই আমার তা নিয়ে ভাবতাম না। যত বেশি আল্লাহর দিকে ঝুঁকছিলাম তত বেশি দিলে শান্তি পাচ্ছিলাম। ইবাদাতে প্রচুর যত্নশীল হচ্ছিলাম।খুব দুয়া করতাম। আমার সব কিছু দুয়া করে করে চেয়ে নিতাম। কখনো নিরাশ হইনি। সবচেয়ে বেশি দুয়া করতাম আল্লাহ যে হালতে রাখছেন সেই হালতের ওপর যেন আমার নাশোকরি না আসে।হ্যা,মাঝে মাঝে শয়তান ওয়াসওয়াসা দিতো। কষ্ট গুলো হাইলাইট করে দিত,সাময়িক পেইন পেতাম। আবার ইস্তেগফার করে শোকর আদায় করতাম।
একটা পর্যায়ে এসে বিয়ের প্রতি অনিহা হলেও চাচ্ছিলাম বিয়ে হোক। বিয়ে হয়ে গেলে ঠিক হয়ে যাবে মানসিকতা। প্রস্তাব আসলে আগাতাম। এভাবে পর পর ৩/৪ বার আগায়ে আমি খুব ধাক্কা খাই। ছেলে বা ছেলে পক্ষ খুব আগ্রহের সাথে আসে। খুব পছন্দ করে। যেন আমার মত মেয়েই নাই আর। এরপর কিছুদূর যাওয়ার পর মিনমিন করে মুহাম্মাদের ব্যপারটা বলবে। আমাকে তারা মুহাম্মাদ ছাড়া চায়।
এইটুক শুনলেই মেজাজ চড়ে যেতো।
কষ্ট পেতাম।সমাজের এইসব ভাবনা,চাওয়া ইত্যাদি আমাকে অনেক পেইন দিতো। মানুষের মানসিকতা দেখে অবাক হতাম।ভাবতাম,কেমনে পারে?প্রচুর কাঁদতাম একা একা।
একবার আম্মু খুব রাগ হলেন আমার বিয়ে নিয়ে।তখন বলেছিলাম একটা বছর সময় দেন। আমি এরপর বিয়েতে আর না করবো না।আসলে সেসময় পড়াশোনা নিয়ে খুব সিরিয়াস ছিলাম।দায়ীয়া কোর্সটা শেষ করলে আমি আমার স্বপ্ন ছুঁইতে পারবো!
আম্মু রাগ হওয়ার পর থেকে আমি আমার যেমন পাত্র পছন্দ তেমন ভাবে চেয়ে চেয়ে দুয়া করা শুরু করলাম।
সত্যি বলতে এর আগে এভাবে আকুলতা দিয়ে আর চাইনি।আমার ৫ বছরের সংসারে আমি যে বিষয় গুলো নিয়ে কষ্ট পেয়েছি তা যেন না থাকে। সেই সিফত গুলো যেন না থাকে। আমাকে যেন আবার কষ্ট পেতে না হয় কোনো কারণে। আমি পাগলের মত দুয়া করতাম।বাইতুল্লাহ ধরে কেঁদে কেঁদে দুয়া করেছিলাম। রিয়াদুল জান্নাতে বসে দুয়া করেছিলাম।
আমি জানতাম আমার দুয়া কবুল হয়েছে।আমি অনুভব করতাম।ভিতর থেকে সুকুন ফিল করতাম।
যেইদিন আমি আমার পুর্বের সিদ্ধান্ত বদলে এই সিদ্ধান্ত নিলাম যে আমার বিয়ে করতে হবে। সেইদিন থেকে ওঠতে বসতে শুধু এই দুয়াই করেছি আমার ও আমার ছেলের দ্বীন ও দুনিয়ার জন্য উত্তম হবে,এমন কাউকে যেন মিলিয়ে দেন।প্রতিটা বিষয় উল্লেখ করে করে দুয়া করেছি। এমন যেন হয়,অমন যেন হয়।
আম্মুকে দেওয়া ওয়াদার ১ বছর শেষ। আমার জন্য প্রস্তাব আসলো,আম্মুও রাজি হয়ে গেলেন। অন্য দেশে থাকে তারা। ছেলের বোন আসছে আমাকে দেখতে।কিন্তু আমার কোনো ভাবেই দিল টানেনা। অনেক নরম হয়ে অনেক মিনুতি করে আম্মুকে বললাম। আমাকে আরো একটা বছর সময় দেন।
আম্মু এবার দ্বিগুণ রেগে বললেন আমি আর কিছু বলবো না,তুইই বল কি চাস? আমি বললাম ইন শা আল্লাহ আগামী রমজানের আগেই আমি বিয়ে করবো।
আমার সেই সময় গুলো সুখের ছিল। আলহামদুলিল্লাহ্। অনেক অনেক কষ্টের পর, অনেক গুলো কান্নারাতের পর, অনেক গুলো বদনাম,কটু কথার পর অনেক গুলো কালো দিনের পর তখন আমার আকাশটা আলোতে ছেয়ে যাচ্ছিল আস্তে আস্তে ।একটা হিফজোখানায় পড়াতাম।পাশাপাশি টিউশনি করতাম। পড়াশোনা করতাম।ছেলেকে নিয়ে একটা ছোট ফ্লাট দেখে চলে গেলাম নিজের সংসার করতে।
আলাদা হওয়ার পর আবার ভুত চাপছিল। আমাকে তো আল্লাহ দেখে রাখছেন। আলহামদুলিল্লাহ্ আমি অনেক বেশিই ভাল আছি। বিয়ের কি দরকার! তখন মনে মনে নিজের সাথেই ঝগড়া করতাম। আস্তে আস্তে আমি বুঝতে শুরু করলাম এই সময়টা পারফেক্ট আমার জন্য। এতোদিনে আমি রেডি হলাম সংসারের জন্য। হ্যা, খুব শান্তির দিন ছিল আমার। স্ট্রাগল ছিল। তবে দিন শেষে আমাকে কিছু বলার, খোঁটা মারার,রাগারাগি করার,কষ্ট দেওয়ার,অপমান করার কেউ ছিল না। সম্পর্ক গুলোকে খুব যত্ন করে ধরে রাখার চেষ্টা করতাম। আমার মা বাবা,ভাই বোন,ভাবি,বাচ্চারা আর ইলমা এবং শেষের দিকে এসে তাহমিনা,এই এইটুকুই ছিল আমার পরিবার। আর এটা ছাড়া ছিল শুধু পড়াশোনা।
আনুমানিক ৯টা বছর পর,রমজান ছুঁই ছুঁই, এমন সময় আম্মু আমাকে দেখলেই বলতো সময় শেষ তোর। পাত্র নিয়ে কথা বলতো,মন মত হতো না কিছু। আমি দুয়া করতাম আল্লাহ রমজানের আগেই যেন আমার বিয়ে হয়। রমজান শুরু হয়ে গেলো। দুয়া করতাম আল্লাহ ঈদের আগেই যেন আমার বিয়ে হয়!
আমার যেইদিন বিয়ে,সেইদিন আমার জানা ছিল না আজই বিয়ে।আমি জানতাম আমাকে দেখতে আসবে। আগের দিন রাতে একটা প্রস্তাব আসে,পাত্রের মা আমার হাত ধরে অনেক্ষন বসে থাকে। আমরা ছিলাম মাসজিদ আন নাবাওইতে।আমাকে অনেক কিছু বলছিল,তার ছেলের ব্যপারে,ছেলে কত ভাল, ছেলে ডক্টর,ছেলে এই স্যালারি পায় ছেলে একটা দ্বীনদার বউ চায় শুধু ইত্যাদি। মনে মনে বলছিলাম আগামীকাল আমাকে দেখতে আসবে। সব ঠিকঠাক হলে সে না জানি কত কষ্ট পায়!
পরদিন আমি ঘর গুছায়ে গোসল করে রেডি হচ্ছিলাম। এমন সময় আব্বু কল দিয়ে বলে বিয়া পড়ায়ে দিসি তোর!
আমি তো থ! খুব কান্না করছিলাম।কেনো যে করেছিলাম তাও জানিনা। তবে এইটুক জানি,আমি খুব বেশি আনন্দিত ছিলাম।আলহামদুলিল্লাহ্।
আমি একটা উন্নত সমাজে থেকে,একটা শিক্ষত সমাজে থেকেও অনেক কষ্ট করেছি। পদে পদে ধাক্কা খেয়েছি। আমার ভিতর আবেগ,ভালবাসা বলতে কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করেছি,তবে সর্বক্ষণ আল্লাহর কাছে এই দিন গুলোর জন্য দুয়া করেছি। কেউ যদি ঈমান ও দ্বীনের হেফাজত চেয়ে দুয়া করে তবে খুব দ্রুত তা কবুল হয়,কারণ ইন্নামাল আমালু বিন্নিয়াত। আল্লাহ বান্দার নিয়তটা দেখেন।
এইযে বিয়ে হলো আমার, না আমার অতীত আর না মুহাম্মাদকে নিয়ে মাথা ব্যথা আছে।এইগুলো কী? সবর ও দুয়ার ফল। নিরাশ না হওয়ার ফল। নাফরমানি না করার ফল। তাড়াহুড়ো না করে ধীরেসুস্থে নিজেকে তৈরি করে নেওয়ার ফল। প্রতিদিন দুই সিজিদার মাঝের বৈঠকে আমি আমার সম্মানের জন্য দুয়া করেছিলাম। যে সমাজ একটা সময় আমাকে নিয়ে বাজে বকতো সে সমাজ থেকে নিয়ে যেন আমাকে কোনো সম্মানিত সমাজে নিয়ে যান। প্রতিদিন সকাল বিকেল উত্তম ইলম, আমল ও রিজিকের জন্য দুয়া করেছিলাম।যা আমার ও দশের উপকারে আসে।
শুধু গধবাধা মুখস্ত দুয়া পড়ে গিয়েছি যে তা নয়। দিল দিয়ে অনুভব করে চোখের পানি ফেলে ফেলে। ভাইয়া বলতো,সবার দিন আসে।তোরও দিন আসবে। নিজ থেকে কিছু করতে হবেনা। শুধু ইবাদাত কর,সবর কর। আল্লাহ দিবে। আল্লাহর দেওয়ার অপেক্ষা কর। ভুল পথে যাইস না।
হাজার বার ভুল পথে হাটলেও বার বার ফিরে আসছি।আমাদের ওয়ালি একমাত্র আল্লাহ। উনিই দিবেন। উনিই দেন। পরীক্ষা দেন আগে এরপর ফল দেন। উনি ছাড়া আর কেউ নেয় না,কেউ দেয় না।
যদি সঠিকটা না পাই তবে বুঝতে হবে কর্মফল। যদি দেখেন এতো সৎপথে চলেও শান্তি পাচ্ছেন না,বুঝবেন কোথাও কমতি আছে।সুরাহ বাকারার শেষ দুই আয়াতে আছে। আমরা তাই পাই যা করি।যদি দেখেন ভুল করছেন না কিন্তু তাও পরীক্ষা আসছে। তবে এটাকে আল্লাহর রহমত ভেবে সবর করতে থাকুন।
একবার ভেংগে গেলে আবার হতে পারে সংসার। বরং আগের সংসার থেকে হাজারগুন বেশি ভাল সংসার। তবে কোনো নিয়ামত পেতে অবশ্যই অনেক পরীক্ষা দিতে হয়।কষ্টকর পরীক্ষা।
শোকর+দুয়া+সবর+তাওয়াক্কুল
Zainab Al-Gazi