30/07/2025
আমার ঘরে মেসকাত, মোমবাতি- ইত্যাদি দেখে শিয়া মাযহাবে দাখিলকৃত এক ভাইয়ের গতরাতে এ বিষয়ে উৎকট ভাবে কিছু জিজ্ঞাসার প্রেক্ষিতে যে জবাব দিয়েছিলাম, আজ তারই কিছু রেফারেন্স সহ খুব সংক্ষেপে লিখছি।
মিসকাতে মিসবাহ প্রজ্বলন এবং সালাত, সালাওয়াত ও মোরাকাবা : ইমামিয়া ইরফানে আধ্যাত্মিক তাৎপর্য মন্ডিত একটি প্রক্রিয়া।
ইমামিয়া শিয়া আধ্যাত্মিকতায় মোরাক্বাবাহ্ (ধ্যান) খালওয়াহ্ (নির্জনতা) ও বাশিরাহ্ (অন্তর্দৃষ্টি অর্জন)কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই সাধন প্রক্রিয়ার অনেক অনুশীলনই প্রতীকময় হয়ে থাকে। এরমধ্যে বড় একটি অনুসঙ্গ হচ্ছে, মিশকাত (দীপাধার)এর উপর মিসবাহ (বাতি) প্রজ্বলন করা; যা আত্মার জাগরণ, অন্তজগতে নূর প্রবেশ এবং আল্লাহ ও নূরুল আলা নূর (আল্লাহর নির্বাচিত মাসুমিন গণ)কে উপলব্ধির মাধ্যম। আর এই প্রক্রিয়ার মধ্যে পুরোটা সময় জুড়েই সালিকগণ সালাত, সালাওয়াত ও মোরাকাবায় নিজেকে আবিষ্ট করে রাখেন।
যদিও এই রীতি সরাসরি কোনো ফিকহি ফরজ আমল নয়, তবে ইমামিয়া ইরফানি দর্শনে এর একটি গূঢ় ব্যাখ্যা ও ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে।
আলো বা নূর হচ্ছে ইরফানের কেন্দ্রীয় প্রতীক। নূর কেবল বাহ্যিক আলো নয়- এটি ইমামিয়া ইরফানে একটি আত্মিক সত্যের প্রকাশনা। আল্লাহ নিজেই বলেছেন, "আল্লাহ আসমান ও জমিনের আলো। ...আলো'র উপর আলো"। (সুরা নূর ৩৫)
এই আয়াতকে ইমামিয়া মুফাসসিরগণ আত্মিক নূর ও ইমামতের ব্যাখ্যায় ব্যবহার করেছেন, যেমন, আয়াতুল্লাহ তাবাতাবায়ী তাঁর তাফসীর আল মীযানে লিখেছেন, "এ নূর হলো আল্লাহর হেদায়াত, যা আহলুল বাইতের ইমামদের মাধ্যমে দুনিয়াতে প্রবাহিত হয়। আর খালওয়াত ও মোরাকাবা হচ্ছে আধ্যাত্মিক আলোকায়নের ভূমিকা।
এই সুরায় আল্লাহ আধ্যাত্নিক নূরের উপমা দিতে যে "মেশকাত" ও "মিসবাহ" দুটি শব্দ প্রয়োগ করেছেন- এদু'টু শব্দই কিন্তু বাহ্যিক অর্থ প্রকাশক। অর্থাৎ আল্লাহ নিজেই বাহ্যিক বস্তোর মাধ্যমে আমাদেরকে আধ্যাত্নিক সত্ত্বার উপলব্ধিতে প্রবেশ ঘটিয়েছেন।
ইমাম জাফর সাদিক আঃ বলেছেন, "আল্লাহর নৈকট্য লাভে বান্দার সবচেয়ে উত্তম উপায় হলো নির্জনে বসে আল্লাহর নিয়ামত নিয়ে গভীর চিন্তা করা"। (আল কাফি, খন্ড ২, কিতাব আল ইলম, হাদিস ৫৬)
এখানে 'খালওয়াহ' (নির্জনতা) গভীর ভাবে মনোনিবেশের আদর্শ পরিবেশ। ইরফানি রেওয়াজে এই নির্জনতা নূরের উপস্থিতির মাধ্যমে মৃদু আলোতে রূপ নেয়, যেন বাহ্যিক আলোর প্রতীক দ্বারা অন্তর আলোকপ্রাপ্ত হয়। তাই এই হাদিসের অনুপ্রেরনায় মিসকাতে মিসবাহ্ প্রজ্বলিত হতো।
মিসবাহ্ প্রজ্বলনের মাধ্যমে মোরাকাবা হচ্ছে আত্নায় আলোর প্রতিফলন ঘটানোর মাধ্যম। রসূলুল্লাহ সঃ বলেন, “যখন নূর অন্তরে প্রবেশ করে, তখন তা প্রসারিত হয় ও প্রশান্তি আনয়ন করে"। (আল কাফি, খন্ড ২, কিতাব আল ইমান ওয়াল কুফর)
এখানে ‘নূর’-এর অন্তপ্রবেশ মানসিক ও আধ্যাত্মিক প্রশান্তির সূচনা করে। এই নূর, ইরফানি ধারায় মোরাকাবা বা ধ্যানে আত্মার উন্মোচনের প্রতীক। তাই শায়রে শুলুকের সালিকগণে মিসবাহ জ্বালিয়ে মোরাকাবায় বসেন, যাতে বাহ্যিক আলো অন্তরের আলোকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
ইমাম আলী আঃ বলেছেন, “আরিফদের হৃদয়ে এমন চোখ আছে, যার মাধ্যমে তারা নূর প্রত্যক্ষ করে"। (নাহজ আল বালাঘা, হিকমাহ্ ১৪৭)
এখানে হৃদয়ের “দৃষ্টিশক্তি” নূর দেখা বোঝায়। আরিফদের হৃদয়ে এই আলো জ্বলে ওঠে ধ্যান ও আত্মসংলাপের মাধ্যমে- যার বাহ্যিক অনুশীলনে সালিকগণ মিশকাতে মিসবাহ প্রজ্বলন করে এর আবহ নির্মান করেন।
মাজারে মিসবাহ্ প্রজ্বলন হচ্ছে শ্রদ্ধা ও আধ্যাত্মিকতার প্রতিক। আল্লামা মজলিসি বর্ণনা করেন, "তারা (প্রাথমিক যুগের শিয়ারা) আয়েম্মাহ আঃএর কবরের চারপাশে বাতি জ্বালিয়ে রাখতেন সম্মান প্রদর্শণ ও আলো বিস্তারের উদ্দেশ্যে"। (বিহার আল আনওয়ার, খন্ড ১০১, পৃষ্ঠা ২৩১)
এই ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত প্রমাণ করে যে বাতি বা আলো শ্রদ্ধা ও আধ্যাত্মিক আবেশ সৃষ্টি করে। ইরফানীগণ এই চর্চাকে একধরনের আত্মিক আলোকায়ন হিসেবে গ্রহণ করেন।
ইরফানে আলো দুইভাবে অনুধাবনীয়। বাহ্যিক আলো (মিসবাহ্): মনকে একাগ্র করতে ও অন্ধকার দূর করতে ব্যবহৃত হয়। নুরুল ক্বালব (আত্মিক আলো): ইমামতের নূর, হেদায়াত ও তাওহিদের উপলব্ধি- যা মোরাকাবার মাধ্যমে হৃদয়ে জাগরূক হয়; তাই বাতি জ্বালানো এই দুই আলোর সংযোগ রূপে প্রতিফলিত হয়- যেমন বাহ্যিক বাতি দ্বারা আধ্যাত্মিক নূর ধারণে অন্তর প্রস্তুত হয়।
ধ্যানকক্ষে মিসবাহ প্রজ্বলনের ফায়েজ ইরানের গ্রান্ড বাহবার আয়াতুল্লাহ খোমেনি'র আদাবুস সালাত গ্রন্থে উল্লেখ আছে।
আল কাফামি র: তাঁর আল মিসবাহ্ গ্রন্থের শেষ অধ্যায়ে রাত্রিকালীন মোরাকাবায় মিসবাহ প্রজ্বলন করে দোয়ায়ে নূরুল মিসবাহ্ পাঠ করতে বলেছেন। এটা ইরফানি চর্চায় এক বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ অনুসঙ্গ বলে বিবেচিত, খালওয়াহ্ বা একাকী ধ্যানে বসে মিসবাহ প্রজ্বলন করে আত্মমুখী সচেতনতার অনুশীলনের একটি সূক্ষ্ম অনুষঙ্গ, ইমামিয়া শিয়া ইরফানের মোশাহাদা (অন্তর্জ্ঞানের দীপ্তি) অনুশীলনের অংশ।
মোটকথা মিসবাহ প্রজ্বলন করে মোরাকাবা করা হলো ইমামিয়া ইরফানের এক প্রতীকী আত্মিক চর্চা- যার মাধ্যমে সালিক তার অন্তরে নূরের প্রবেশ ঘটাতে চায়। এই রীতি সরাসরি ফিকহি মাসআলা না হলেও, একে পৃষ্ঠপোষকতা করে এমন বহু হাদিস, ঐতিহাসিক চর্চা ও ইরফানি ব্যাখ্যা রয়েছে।
মোটকথা, সালাত বা ইবাদতের জন্য মাটির উপরে মসজিদ থাকা সত্বেও আয়েম্মাহ আ:এর সার্দাব তৈরি হতো মাটির নিচে; সেথায় থাকতো আলোকবর্তীকা, তার উপরে দীপ্তি ছড়াতো মৃদু আলো।
শেষকথা, আহলে বাইতের পথ অনুসরণ করে যে সালিক নূরের পথে চলতে চায়, তার জন্য এই আলো কেবল ঘরের বাতি নয় বরং আত্মার জ্যোতি, যা আল্লাহর দিকে যাত্রায় সহায়ক।