16/01/2025
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
🔵আজ ০২ মাঘ ১৪৩১ বাংলা ১৬ জানুয়ারি ২০২৫ বৃহস্পতিবার:
মাইজভাণ্ডারীয়া ত্বরিকার স্বরূপ উন্মোচক, খাদেমুল ফোক্বারা অছিয়ে গাউসুল আযম মাওলানা শাহ্ সুফি সৈয়দ দেলাওর হোসাইন মাইজভাণ্ডারী (ক.)-এর ওফাত দিবস। এ উপলক্ষে ‘এস জেড এইচ এম ট্রাস্ট’ প্রকাশন ‘আলোকধারা বুকস্’ প্রকাশিত ‘মাইজভাণ্ডার শরিফ পরিচিতি’ পুস্তক হতে উপস্থাপন:
🔵অছিয়ে গাউসুল আযম হযরত মাওলানা শাহ্ সুফি সৈয়দ দেলাওর হোসাইন মাইজভাণ্ডারী (ক.) [১৮৯৩-১৯৮২]
মাইজভাণ্ডারীয়া ত্বরিকার প্রবর্তক গাউসুল আযম হযরত শাহ্ সুফি সৈয়দ আহমদ উল্লাহ্ মাইজভাণ্ডারী (ক.) (১৮২৬-১৯০৬) এবং তদীয় খলিফায়ে আযম হযরত সৈয়দ গোলাম রহমান মাইজভাণ্ডারী (ক.) (১৮৬৫-১৯৩৭) এই দুই মহান আধ্যাত্মিক মহাপুরুষের যুগপৎ রক্ত ও বেলায়তের যোগ্য উত্তরাধিকারী হলেন সৈয়দ দেলাওর হোসাইন মাইজভাণ্ডারী (ক.)। মাইজভাণ্ডার দরবার শরিফের উল্লিখিত দুই মহান দিকপালের আধ্যাত্মিক ফয়েজ রহমতে অভিষিক্ত হয়ে সৈয়দ দেলাওর হোসাইন মাইজভাণ্ডারী (ক.) ব্যতিক্রমধর্মী নতুন সত্তা নিয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন মাইজভাণ্ডার পরিমণ্ডলে। ভক্ত ফকির ফরিদ হোসেনের ভাষায়-
ফুটলরে ফুল গাউসে অলি, গোলাম রহমান বাবাজান বলি,/ভাষা ভুলা হাল-অলী থাকতেন বিভোর অবস্থায়।
দুই দিক হইতে ফয়েজপ্রাপ্ত, “দেলাওর হোসাইন” খোদাভক্ত,/মাইজভাণ্ডারের ভারপ্রাপ্ত কইরাছেন গাউস খোদায়।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকারের পাশাপাশি পারিবারিক জীবনে সৈয়দ দেলাওর হোসাইন মাইজভাণ্ডারী (ক.) ছিলেন গাউসুল আযম মাইজভাণ্ডারী’র পৌত্র এবং হযরত বাবা ভাণ্ডারী’র জামাতা।
🔵জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়
জন্ম: ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৮৯৩ [ফাল্গুন ১৩, ১২৯৯]
পিতা: শাহ্ সুফি সৈয়দ ফয়জুল হক মাইজভাণ্ডারী (ক.) [১৮৬৫-১৯০২]
পিতামহ: মাইজভাণ্ডারীয়া ত্বরিকার প্রবর্তক গাউসুল আযম শাহ্ সৈয়দ আহমদ উল্লাহ্ মাইজভাণ্ডারী (ক.) (১৮২৬-১৯০৬)।
সৈয়দ দেলাওর হোসাইন মাইজভাণ্ডারী (ক.) পিতা-মাতার দ্বিতীয় সন্তান। প্রথম সন্তান সৈয়দ মীর হাসানের (১৮৯১-১৯০৬) নামের সাথে মিল রেখে তদীয় পিতামহ [হযরত কেবলা] তাঁর নাম রাখেন সৈয়দ দেলাওর হোসাইন। হযরত কেবলা প্রদত্ত এই নাম ছিল ব্যঞ্জনাপূর্ণ। দেলাওর অর্থ যোদ্ধা বা সেনাপতি; হোসাইন অর্থ উত্তম। সুতরাং পুরা অর্থ দাঁড়ায় “উত্তম সেনাপতি” বা ‘‘বীরোত্তম”। পরবর্তীকালে মাইজভাণ্ডারীয়া ত্বরিকার শরাফত সংরক্ষণ এবং ত্বরিকার স্বরূপ উন্মোচনকালে তাঁর এই নামের মাহাত্ম্য ও যথার্থতা পরিস্ফুট ও প্রতীয়মান হয়। শিশু দেলাওর শৈশবে তাঁর পিতাকে হারান (১৯০২)। ফলে দাদা-দাদীর স্নেহে পালিত হন। ইতোমধ্যে ১৩ বছর বয়সে দাদাও (হযরত কেবলা) চির বিদায় নেন। পাঁচ বৎসর বয়সে দাদা হযরত কেবলার হাতেই শিশু দেলাওর হোসাইনের হাতে খড়ি। এ সময় পার্শ্ববর্তী গ্রাম বাবুনগর নিবাসী মাওলানা অলিউল্লাহ্ সাহেব তাঁর প্রথম শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হন। পরবর্তীতে মির্জাপুর নিবাসী তাঁর খালু মওলানা হাফেজ ক্বারী তফাজ্জল হোসাইন সাহেব তাঁর গৃহশিক্ষক নিযুক্ত হন। গাউসুল আযম মাইজভাণ্ডারীর (ক.) এই মহান খলিফার হাতেই তিনি আরবি, ফার্সি ও উর্দু ভাষার প্রয়োজনীয় মূল্যবান কিতাবসমূহ অধ্যয়ন করেন। এই গৃহশিক্ষকের প্রভাব সৈয়দ দেলাওর হোসাইন মাইজভাণ্ডারী (ক.)’র জীবনে সুদূরপ্রসারী হয়েছিল। উল্লেখ্য, তদীয় এই গৃহশিক্ষকের প্রতি ভক্তি শ্রদ্ধা আর কৃতজ্ঞতার নিদর্শন স্বরূপ তিনি দরবার শরিফের লাইব্রেরীর নামকরণ করেছিলেন তফাজ্জল মেমোরিয়াল লাইব্রেরী। ইতোমধ্যে তিনি ১৯১১ সনে চট্টগ্রাম মোহসেনীয়া মাদ্রাসায় অধ্যয়ন শেষ করেন।
ছাত্রজীবনে পাঠ্যবই ছাড়াও তিনি বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদদের লিখিত বিভিন্ন গ্রন্থ এবং কুরআন, হাদিস, ফিকাহ্, দর্শনশাস্ত্র ইত্যাদিতে ব্যুৎপত্তি লাভ করেন। ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি তিনি নিয়মিত বাংলা পত্র-পত্রিকা ইত্যাদির প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করতেন। আশ্চর্যের বিষয়, প্রাথমিক পর্যায়ে গৃহ শিক্ষকের নিকট শুধুমাত্র ১৭ দিন তিনি বাংলা শিখেছিলেন। তারপর আর কোন শিক্ষকের কাছে বা প্রতিষ্ঠানে বাংলা ভাষা অধ্যয়ন করেননি; অথচ মাইজভাণ্ডার সম্পর্কিত যে ১২টি মূল্যবান গ্রন্থ তিনি রচনা করেছেন তার সবই বাংলা ভাষায় রচিত।
অছিয়ে গাউসুল আযম সৈয়দ দেলাওর হোসাইন মাইজভাণ্ডারী (ক.)’র উল্লেখযোগ্য বিশেষত্ব এই যে, তিনি ছিলেন ত্বরিকার প্রবর্তক গাউসুল আযম মাইজভাণ্ডারী’র (ক.) অছি [Vicegerent]। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, গাউসুল আযম মাইজভাণ্ডারী (ক.) কর্তৃক প্রকাশ্যে গাউসিয়তের ঘোষণার অনুরূপ সৈয়দ দেলাওর হোসাইন মাইজভাণ্ডারী (ক.) ও প্রকাশ্যে তাঁর অছি’র দাবী ঘোষণা করেছিলেন। বলাবাহুল্য, প্রকাশ্য ঘোষণার এই সর্বসম্মত প্রথা জাগতিক ও আধ্যাত্মিক উভয়ভাবে স্বীকৃত ও গ্রহণীয়। অছিয়ে গাউসুল আযম হওয়ার এই দুর্লভ প্রাপ্তির সুন্দর বর্ণনা মেলে আশেক ভক্তের ভক্তি শ্রদ্ধা মিশ্রিত গানের মাধ্যমে-
হোসেন কেবলা মাইজভাণ্ডারী প্রেম সাগরের মূল কানাই/গাউসে ধনের অছি যিনি তার তুলনা পাই কোথায়? -ময়না জগত (১), ৩২ নং গান।
🔵বিবাহ ও বংশলতিকা: ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে ২৩ বছর বয়সে শাহ্ সুফি সৈয়দ গোলাম রহমান মাইজভাণ্ডারী (ক.)-এর (প্রকাশ বাবা ভাণ্ডারী) দ্বিতীয় কন্যা সৈয়দা সাজেদা খাতুনের সাথে তাঁর বিবাহ হয়। তিনি ছিলেন ৫ (পাঁচ) পুত্র ও ৬ (ছয়) কন্যার জনক।
পুত্র সন্তান: (১) সৈয়দ জিয়াউল হক (২) সৈয়দ মুনিরুল হক (৩) সৈয়দ এমদাদুল হক (৪) সৈয়দ দিদারুল হক (৫) সৈয়দ সহিদুল হক। কন্যা সন্তান: (১) সৈয়দা মোবাশ্বেরা বেগম (২) সৈয়দা মুনিরা বেগম (৩) সৈয়দা নাজিরা বেগম (৪) সৈয়দা রিজিয়া বেগম (৫) সৈয়দা কামরুন্নেসা (৬) সৈয়দা নাজমুন নেসা।
🔵গ্রন্থ তালিকা: সৈয়দ দেলাওর হোসাইন মাইজভাণ্ডারীয়া ত্বরিকার স্বরূপ উন্মোচনের পাশাপাশি মাইজভাণ্ডারী পরিমণ্ডলে লেখালেখি ও প্রকাশনার ক্ষেত্রেও এক বৈপ্লবিক যুগের সূচনা করেন। তাঁর রচিত গ্রন্থ সংখ্যা ১২:
১. বেলায়তে মোতলাকা (১৯৬০), ২. গাউসুল আযম মাইজভাণ্ডারীর জীবনী ও কারামত (১৯৬৭), ৩. গঠনতন্ত্র (১৯৬৯), ৪. মূলতত্ত্ব বা তজকীয়ায়ে মোখতাছার [১ম খন্ড] (১৯৬৯), ৫. বিশ্ব মানবতায় বেলায়তের স্বরূপ (১৯৭৪), ৬. এলাকার রেনেসাঁ যুগের একটি দিক, ৭. জীবনদর্শন (আত্মজৈবনিক) পাণ্ডুলিপি, ৮. প্রতিবাদ লিপি, ৯. মানব সভ্যতা, ১০. মিলাদে নববী ও তাওয়াল্লোদে গাউসিয়া, ১১. মুসলিম আচার ধর্ম, ১২. মূলতত্ত্ব [২য় খন্ড]
🔵খাদেমুল ফোক্বারা: ব্যক্তিগত জীবনে দেলাওর হোসাইন মাইজভাণ্ডারী ছিলেন রীতিমতো বিনয়ের অবতার। বিনয়ের মধ্যেও যে প্রচণ্ড শক্তি নিহিত থাকতে পারে, তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করে গেছেন। নিজের পরিচয় দেওয়ার সময় তিনি অতি বিনয়ের সাথে বলতেন যে, তিনি হলেন ‘খাদেমুল ফোক্বারা’ অর্থাৎ আল্লাহ’র ফকিরদের খাদেম এবং সত্যিকার অর্থে বলতে গেলে ফকিরদের খাদেমগীরিতেই তিনি সারাজীবন উৎসর্গ করেন। বিনয়ের এমন অবতার সত্যিই বিরল- ‘দেলাওর হোসাইন নাম জাহেরা পরিচয় দেন খাদেমুল ফোক্বারা। বিনয়ের এহেন অবতার, ত্রি জগতে মেলা ভার’ - ড. সেলিম।
পোশাক পরিচ্ছদের ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন নির্বিলাসী। কনুইর নিচ পর্যন্ত লম্বিত সাদা কামিজ বা কোর্তা, মাথায় সাদা টুপি, পায়ে কাঠের খড়ম এবং শীত গ্রীষ্মের উপযোগী চাদর-এ ছিল তাঁর নির্বিলাসী পোশাক পরিচ্ছদ।
শুধু জীবৎকালে নয়; ওফাতের পরও তিনি তাঁর এই বিনয়ী ও নির্বিলাস জীবনের প্রতিফলন ঘটানোর প্রয়াস পেয়েছেন। ওফাতের পর তাঁর জন্যে কোনরূপ ‘মাজার নির্মাণ’ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়ে গেছেন। প্রকৃতির ঔদার্য ও মহিমা নিয়ে প্রকৃতির কোলে চিরশায়িত থাকার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করে তাঁর নিজের এপিটাফ নিজেই রচনা করে যান। আমার বিবেচনায় এই এপিটাফটিই তাঁর ‘খাদেমুল ফোক্বারা’ অভিধার প্রবহমান প্রতিচ্ছবি।
🔵ওফাত: সুদীর্ঘ অর্ধ শতাব্দীকালেরও উর্ধে প্রত্যক্ষ কর্মময় জীবনে জাগতিক ও আধ্যাত্মিক উভয় ক্ষেত্রে সব্যসাচীর মত দুই হাতে কর্তব্য কর্ম সম্পাদন করে তথ্য, তত্ত্ব ও বিচিত্র বর্ণাঢ্য কর্মচাঞ্চল্যের অপূর্ব সমন্বয়ের মাধ্যমে মাইজভাণ্ডার শরাফতকে সুদৃঢ় ভিত্তির উপর দাঁড় করানোর ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন শেষে প্রায় ৯০ বছর বয়সে ১৯৮২ সালের ১৬ জানুয়ারি শনিবার (২ মাঘ ১৩৮৮) তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
তাঁর অন্তিম ইচ্ছা অনুযায়ী দুর্বাঘাস শোভিত শ্যামল প্রকৃতির বুকে তাঁকে সমাহিত করে তাঁর স্বহস্তে লিখিত এপিটাফটির মাধ্যমে তাঁর পরিচয় তুলে ধরা হয় এভাবে-
মানব প্রকৃতির কঠিন আকৃতি তোমার মদিরাপাত্র / সরস মাটির বিশাল দেহ তোমারই ফুলক্ষেত্র।
কোলাহল পরিহারে নির্জনতার আসরে / তোমারই প্রতীক্ষায় রহিয়াছি আজি তোমারই বাসরে।
সৈয়দ দেলাওর হোসাইন মাইজভাণ্ডারী (ক.)-এর বাণী চিরন্তনী: ১. “বাংলাদেশে খাদ্য ঘাটতির স্থায়ী সমাধানের জন্য এবং ধান উৎপাদন বাড়ানোর জন্য কৃত্রিম সেচ ব্যবস্থার বিকল্প নেই।” ২. “আগে নিজের পরিবার, ঘর-সংসার ও পেশাগত দায়িত্বের প্রতি যত্নবান হও। তারপর আধ্যাত্মিক সাধনার জন্য সময় দাও যদি তা সম্ভবপর হয়।” ৩. “পরিচ্ছন্নতা খোদায়ী গুণ। তুমি যদি কাজে-কর্মে, দেহ-প্রাণে, পোশাক-পরিচ্ছদে, মন-মানসিকতায়, আচার-ব্যবহারে পরিচ্ছন্ন না হও, তা’হলে তুমি খোদার নৈকট্য লাভ করতে পারবেনা।” ৪. “সৎভাবে হালাল ব্যবসা কর। দুর্নীতির আশ্রয় নিওনা। তেজারত রসূলের সুন্নত।” ৫. “অহমিকা বড় খারাপ। অহমিকা ও দম্ভ থেকে মুক্ত হবার চেষ্টা কর।” ৬. “জ্ঞানই শক্তি। জ্ঞান ছাড়া কোন জাতি জীবনে উন্নতি লাভ করতে পারেনা।” ৭. “তুমি যদি যোগ্য না হয়ে বুজুর্গী কামনা কর, তা তুমি পাবেনা। হযরত সাহেব (ক.)’র সাথে কেবলমাত্র রক্তের সম্পর্কের কারণে তুমি নিজেকে অলি দাবী করতে পারনা। অলি হতে হলে যোগ্যতা অর্জন করতে হবে।” ৮. “যাঁদের কামালিয়ত নেই তাঁরা মাইজভাণ্ডার শরিফের আওলাদ হলেও তাঁদের কবরের ওপর সৌধ বা রওজা নির্মাণ করা উচিৎ নয়। এটা মানুষকে বিভ্রান্ত করবে যেহেতু মানুষ প্রকৃত অলিকে তখন চিহ্নিত করতে পারবেনা।” ৯. “মাইজভাণ্ডার দরবার শরিফের যে কোন আওলাদে পাকের উরস অনুষ্ঠান করা ঠিক নয়। উরস অনুষ্ঠান কেবলমাত্র ওই সকল আওলাদের জন্য নির্ধারিত যাঁরা প্রকৃত অর্থে কামালিয়ত অর্জন করে অলি হয়েছেন। সারা বছরই যদি মাইজভাণ্ডার দরবার শরিফে কোন না কোন আওলাদের উরস হতে থাকে, তাহলে লোকজনকে তাদের পরিবার এবং চাকুরীর প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন না করে কেবল দরবার শরিফে আসা যাওয়াতেই ব্যস্ত থাকতে হবে।” ১০. “সকলকে আমার মুনিব [হযরত আকদাছ (ক.)] কে সম্মান করতে হবে এবং তাঁর রওজা শরিফ জিয়ারত করতে হবে। যদি তোমরা তা কর, তবে তার অংশ আমি পাব।” ১১. “যদি কেউ মাইজভাণ্ডারী দর্শনের প্রচার ও প্রসারের কাজ করে, তবে সে হযরত আকদাছ (ক.)’র আসহাব বা সাথী হিসেবে গণ্য হবে।” ১২. “যদি মাইজভাণ্ডারী দর্শনের মর্মকথা সারা বিশ্বের মাঝে ছড়িয়ে দেয়া যায়, তাহলে সারা বিশ্বের নজর মাইজভাণ্ডার দরবার শরিফের দিকে ঘুরে যাবে।” ১৩. “সমাজে আদলে মোতলাক (বিচার সাম্য) প্রতিষ্ঠা কর। কারও প্রতি অবিচার করনা।” ১৪. “ঈমানদার হও। হজ কর, নামায পড়, রোজা রাখ, যাকাত দাও। যেনা করনা, মিথ্যা বলনা, মিথ্যা সকল অন্যায়ের মা-বাপ”। ১৫. “বিপদে আপদে, সকল সময়ে আল্লাহ’র ওপর নির্ভর কর। আল্লাহ’র ওপর বিশ্বাস হারাবে না। আল্লাহ্ সকল সময়ে তোমাকে সাহায্য করবেন।” ১৬. “আমি ছায়র পীরি ব্যবসা করিনা। পাক-সাফ হওয়ার জন্য মানুষ পুকুরের কাছে যায়। পুকুর মানুষের কাছে যায়না।”
তাঁর শানে গান: মাইজভাণ্ডার সংক্রান্ত বিভিন্ন গানের বইতে সৈয়দ দেলাওর হোসাইন মাইজভাণ্ডারী (ক.)-এর শানে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক গান সংকলিত হয়েছে। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখ্য মওলানা বজলুল করিম মন্দাকিনী, মওলানা আবদুল্লাহ্ বাঞ্ছারামপুরী, ডাঃ মুসা আলম, ফকির ফরিদ হোসেন এবং ডাঃ আবুল কাশেমের নাম। ডাঃ মুসা আলমের গানের বইয়ের নাম ময়না জগত (তিন খণ্ডে সমাপ্ত)। ফকির ফরিদ হোসেনের বইয়ের সংখ্যা ৮ (আট)। মুক্তি ভাণ্ডার এক, মুক্তি ভাণ্ডার দুই, সৌরভ ভাণ্ডার, গৌরব ভাণ্ডার, যুক্তি ভাণ্ডার, উদয় ভাণ্ডার, হৃদয় ভাণ্ডার, চেতন ভাণ্ডার। ডাঃ আবুল কাশেমের এক মাত্র গানের বইয়ের নাম প্রেমাকর।
🔵এক নজরে অছিয়ে গাউসুল আযমের বিশেষত্ব:
১. গাউসুল আযম মাইজভাণ্ডারীর পৌত্র হিসেবে, পুত্র-বংশীয় একমাত্র আওলাদ হিসেবে যুগপৎ তাঁর ব্যক্তিগত ও আধ্যাত্মিক সোহবত লাভের সৌভাগ্যে সৌভাগ্যবান এবং ‘অছিয়ে গাউসুল আযম’ লকবে অভিষিক্ত।
২. মাইজভাণ্ডারীয়া ত্বরিকার প্রচার-প্রসারের উদ্দেশ্যে সাংগঠনিকভাবে ১৯৪৯ সালে ‘আঞ্জুমানে মোত্তাবেয়ীনে গাউসে মাইজভাণ্ডারী’ সংগঠন প্রতিষ্ঠা সহ মানবিক সামাজিক ও জনহিতকর কার্যক্রমের উদ্যোগে ও এগুলোর যথাযথ পরিচালনার প্রয়োজনে পরিচালকের দায়িত্ব পালন।
৩. গাউসে পাকের গদী শরিফের উত্তরাধিকারী হিসেবে যাবতীয় আধ্যাত্মিক দায়িত্ব পালন।
৪. একইসাথে আধ্যাত্মিক ও জাগতিক উভয় ধারাকে প্রায় সমানতালে ধারণ, লালন ও প্রতিপালনের মাধ্যমে দরবারী পরিমণ্ডলে সমন্বয়ধর্মী ইতিহাস সৃষ্টি এবং সুদীর্ঘ অর্ধশতাব্দী কালেরও অধিক সময়কাল ধরে তা নিরবচ্ছিন্নভাবে সমানতালে অব্যাহত রাখার নতুন সংস্কৃতির সৃষ্টি।
৫. মাইজভাণ্ডারের অভাবনীয় ব্যাপক প্রচার-প্রসার, অনিয়ন্ত্রিত অলিখিত কর্মকাণ্ড ও নানা ডামাডোলের মধ্যে মাইজভাণ্ডারীয়া ত্বরিকা ও দর্শনকে ওরাল ট্র্যাডিশনের যুগ থেকে শুদ্ধতম উচ্চারণে লিখিতরূপ দেওয়ার পথিক ও পথিকৃতের ভূমিকা পালন।
৬. এ ধারায় বড় ছোট ন্যূনতম ১২টি গ্রন্থ রচনা, প্রকাশ ও বিপণনের ব্যবস্থাকরণ। বলাবাহুল্য, এটি শুধু তাঁর জন্য নয়, সমগ্র মাইজভাণ্ডারের প্রায় দেড়শতাধিক বছরের ইতিহাসের ক্ষেত্রেও এক অনন্য বিশেষত্ব, এক দৃষ্টি আকর্ষণীয় মাইলফলক।
৭. স্বেচ্ছায় সজ্ঞানে আত্মনিবেদনের কঠোর-কঠিন অনুশীলন এবং সমাজ জীবনে এর অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপনের লক্ষ্যে নিজে ‘খাদেমুল ফোক্বারা’ (আল্লাহ’র ফকিরদের খাদেম) লকব গ্রহণ করে কথায়, কাজে ও চিন্তায় এর প্রতিফলন ঘটিয়েছেন জীবনাচরণের সর্বক্ষেত্রে, সর্বাবস্থায়। এককথায়, তাঁর প্রায় শতবর্ষের পুরা জীবনটাই ছিল এ স্বঘোষিত লকবের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও সফল বাস্তবায়নের প্রতিচ্ছবি। বলাবহুল্য, ওফাতের পর তাঁকে কেন্দ্র করে প্রতিযোগিতামূলক কোন স্থাপনা এবং বাহুল্য বর্জনের অসিয়ত তাঁর ‘খাদেমুল ফোক্বারা’ লকবের জীবন-মরণ সাধনার সার্থক রূপায়নের যথার্থ প্রতিফলন, কথা ও কাজের অনুসরণীয় অপূর্ব সমন্বয়ের শ্রেষ্ঠতম উদাহরণ।