14/08/2026
শ্রদ্ধা ও স্মরণ
ইউজিন বের্টোল্ট ফ্রিডরিশ ব্রেখট (১০ ডিসেম্বর ১৮৯৮ - ১৪ আগস্ট ১৯৫৬)
১৮৯৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি, জার্মানির বাভারিয়া রাজ্যের আউগসবুর্গ (Augsburg) শহরে এক সচ্ছল মধ্যবিত্ত পরিবারে তাঁর জন্ম। পুরো নাম ইউজিন বের্টোল্ট ফ্রিডরিশ ব্রেখট ।
সংক্ষেপে বের্টোল্ট ব্রেখট (Bertolt Brecht)। তিনি একাধারে একজন জার্মান নাট্যকার, কবি বা চলচ্চিত্র পরিচালক ; তিনি ছিলেন থিয়েটারের এক বিপ্লবী চিকিৎসক। তিনি দেখেছিলেন, সমাজের অসুখটা অনেক গভীরে, আর প্রচলিত থিয়েটার সেই অসুখের ওপর কেবল সুন্দর একটা ব্যান্ডেজ লাগিয়ে দেয়, ভেতরের ক্ষতটাকে সারানোর চেষ্টা করে না। ব্রেখট সেই ব্যান্ডেজটা সজোরে টেনে খুলে ফেলতে চেয়েছিলেন। তিনি থিয়েটারের জন্মলগ্ন থেকে চলে আসা ব্যাকরণটাই নতুন করে লিখতে চেয়েছিলেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল একটাই – থিয়েটার কেবল বিনোদনের আফিম হবে না, যা দিয়ে মানুষ কিছুক্ষণের জন্য বাস্তবতার কষ্ট ভুলে থাকবে। থিয়েটার হবে একটা পরীক্ষাগার, একটা ক্লাসরুম, একটা বিতর্কের মঞ্চ, যেখানে সামাজিক সমস্যাগুলোকে ব্যবচ্ছেদ করে দেখানো হবে। এবং শেষ পর্যন্ত, থিয়েটার হবে পৃথিবীকে বদলে দেওয়ার একটা ধারালো অস্ত্র।
বাবার কাছ থেকে পাওয়া প্রখর যুক্তিবোধ, বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি এবং কঠোর নিয়মানুবর্তিতা অন্যদিকে মায়ের কাছ থেকে পাওয়া সংবেদনশীল মন, যা তাঁকে সমাজের নিচুতলার মানুষের কষ্ট বুঝতে সাহায্য করেছিল। অদ্ভুত এক দ্বান্দ্বিক মিশেলে ব্রেখট একইসাথে একজন শাণিত যুক্তির মার্ক্সবাদী এবং আবেগপ্রবণ কবি।
ছোটবেলা থেকেই প্রথাগত পড়াশোনার প্রতি তাঁর ছিল তীব্র অনীহা। স্কুলের গৎবাঁধা নিয়মের মধ্যে তিনি হাঁপিয়ে উঠতেন। তাঁর জগৎ ছিল বই, কবিতা আর গানের মধ্যে। কিশোর বয়সেই তিনি গিটার বাজাতে শেখেন এবং নিজের লেখা কবিতা ও গানে সুর দিতে শুরু করেন। বন্ধুদের নিয়ে তিনি একটি ছোট আড্ডা বা দল তৈরি করেন, যা ‘ক্লিক’ নামে পরিচিত ছিল। এই আসরগুলোতে তিনি সমাজের প্রচলিত ভণ্ডামি, বুর্জোয়া নৈতিকতা, দেশপ্রেমের ফাঁপা বুলি এবং রাষ্ট্রকে ব্যঙ্গ করে নিজের লেখা গান গাইতেন। তাঁর মধ্যে একটা বোহেমিয়ান, ভবঘুরে ভাব বরাবরই ছিল। তিনি প্রচলিত সামাজিক রীতিনীতির ধার ধারতেন না। তাঁর প্রথম দিকের কবিতার নায়ক ছিলেন জলদস্যু, ভবঘুরে, খুনি, পতিতা – সমাজের সেইসব ব্রাত্যজনেরা, যাদের ‘সভ্য’ সমাজ এড়িয়ে চলে।
১৯১৭ সালে, যখন ইউরোপ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগুনে জ্বলছে, ব্রেখট মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাবিদ্যা (Medicine) নিয়ে পড়া শুরু করেন। ১৯১৮ সালে তাঁকে আউগসবুর্গের একটি সামরিক হাসপাতালে অর্ডারলি (Medical Orderly) হিসেবে কাজ করতে হয়। এখানেই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায়। চোখের সামনে তিনি দেখলেন যুদ্ধের সবচেয়ে বীভৎস, মহত্ত্বহীন রূপ – ক্ষতবিক্ষত, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত সৈনিকদের আর্তনাদ, অঙ্গহানি, মৃত্যু, যন্ত্রণা আর অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় প্রোপাগান্ডার আড়ালে লুকিয়ে থাকা কদর্য মিথ্যাচার।
দেশপ্রেম, বীরত্ব আর জাতীয়তাবাদের নামে সাধারণ ঘরের ছেলেদের কীভাবে কামানের খোরাক হিসেবে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, তা তিনি খুব কাছ থেকে উপলব্ধি করেন। এই অভিজ্ঞতা তাঁর ভেতর গভীর এক যুদ্ধবিরোধী এবং রাষ্ট্রবিরোধী মনোভাব তৈরি করে দেয়। তিনি বুঝতে পারছিলেন, রাষ্ট্র, সমাজ, ধর্ম আর ক্ষমতা – এই শব্দগুলোর আড়ালে বিশাল সব ফাঁকিবাজি লুকিয়ে আছে। তিনি দেখলেন, কীভাবে রাষ্ট্র তার প্রয়োজনে মানুষের শরীর ও মনকে নিয়ন্ত্রণ করে, ব্যবহার করে এবং ছুঁড়ে ফেলে দেয়।
এ ভণ্ডামিকে তীব্রভাবে আক্রমণ করে লিখেন তাঁর বিখ্যাত কবিতা, “লেজেন্ড অফ দ্য ডেড সোলজার” (Legend of the Dead Soldier)।
আনুমানিক ১৯২৬ সাল নাগাদ, তিনি গভীরভাবে কার্ল মার্ক্স (Karl Marx) এবং ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস (Friedrich Engels)-এর রচনার সঙ্গে পরিচিত হন। এই পড়াশোনা তাঁর জগতকে দেখার চোখটাই আমূল বদলে দেয়।
মার্ক্সবাদ তাঁকে সমাজ, ইতিহাস এবং মানুষকে বিশ্লেষণ করার একটি নতুন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি দেয়। তিনি বুঝতে পারেন, মানুষের দুঃখ, কষ্ট, লোভ বা মহত্ত্ব – এগুলো কোনো ব্যক্তিগত বা আধ্যাত্মিক ব্যাপার নয়, যেমনটা বুর্জোয়া শিল্প-সাহিত্য দেখানোর চেষ্টা করে। এগুলো আসলে নির্দিষ্ট সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ফসল। তিনি মার্ক্সবাদের মূল ধারণাগুলো – যেমন দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ (Dialectical Materialism), ঐতিহাসিক বস্তুবাদ (Historical Materialism), শ্রেণি সংগ্রাম (Class Struggle), উদ্বৃত্ত মূল্য (Surplus Value) এবং বিচ্ছিন্নতাবোধ (Alienation) – গভীরভাবে আত্মস্থ করতে শুরু করেন।
ঐতিহাসিক বস্তুবাদ তাঁকে শেখায় যে, ইতিহাস কোনো মহান ব্যক্তি বা দৈবশক্তির দ্বারা নির্মিত হয় না। ইতিহাস নির্মিত হয় উৎপাদনের উপকরণের (Means of Production) পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এবং তার ফলস্বরূপ শ্রেণি সংগ্রামের মাধ্যমে। অর্থাৎ, সমাজকে বুঝতে হলে তার অর্থনৈতিক ভিত্তিটাকে (Economic Base) বুঝতে হবে।
নতুন আলোয় জগৎকে দেখার পর ব্রেখট উপলব্ধি করেছিলেন যে, সমাজ পরিবর্তনের জন্য কেবল রাজনৈতিক সংগ্রামই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন একটি সাংস্কৃতিক বিপ্লবেরও। আর সেই বিপ্লবের অন্যতম প্রধান যুদ্ধক্ষেত্র হবে থিয়েটার। ব্রেখট এক নতুন থিয়েটারের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন, যা এমন এক থিয়েটার যা দর্শককে আবেগের ঘোরে ডুবিয়ে দেবে না, বরং তাকে বারবার ধাক্কা দিয়ে জাগিয়ে রাখবে। এমন এক থিয়েটার যা দর্শককে ভাবতে, প্রশ্ন করতে এবং বিশ্লেষণ করতে শেখাবে। এমন এক থিয়েটার যা জগৎকে যেমন আছে তেমনভাবে দেখাবে না, বরং দেখাবে যে জগৎটা পরিবর্তনশীল এবং তাকে পরিবর্তন করা সম্ভব। এই বৈপ্লবিক ভাবনা থেকেই জন্ম নিল তাঁর বিশ্ববিখ্যাত তত্ত্ব – মহাকাব্যিক থিয়েটার বা এপিক থিয়েটার (Epic Theatre)। এটি ছিল থিয়েটারের ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা ।
বের্টোল্ট ব্রেখট এমন একজন শিল্পী ছিলেন যিনি থিয়েটারকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন, কিন্তু তার চেয়েও বেশি ভালোবাসতেন মানুষকে এবং মানুষের পৃথিবীকে। তাঁর কাছে থিয়েটার নিজে কোনো উদ্দেশ্য ছিল না, ছিল উদ্দেশ্য সাধনের একটা উপায়। আর সেই উদ্দেশ্য ছিল এক শোষণহীন, ন্যায়পরায়ণ এবং যুক্তিবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের চিন্তার ক্ষমতা অসীম, কিন্তু পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা সেই চিন্তার ক্ষমতাকে ভোঁতা করে দিয়ে তাকে একজন নিষ্ক্রিয় ভোক্তা বানিয়ে রাখে। ব্রেখটের আজীবনের সংগ্রাম ছিল শিল্পের মাধ্যমে মানুষের সেই ঘুমন্ত চিন্তাশক্তিকে জাগিয়ে তোলা। তাই তিনি থিয়েটারের আরামদায়ক, অন্ধকার জগৎ থেকে আমাদের বের করে এনে বাস্তব পৃথিবীর কড়া, নির্মোহ আলোয় দাঁড় করিয়ে দিতে চেয়েছিলেন।
তাছাড়া লাইফ অফ গ্যালিলিও (১৯৪৩-এর প্রথম সংস্করণ), দ্য গুড পার্সন অফ সেৎচুয়ান (১৯৪১), দ্য রেসিস্টেবল রাইজ অফ আর্তুরো উই (১৯৪১), দ্য ককেশিয়ান চক সার্কেল (১৯৪৪) ইত্যাদি নাটক রচনা করেন। এছাড়াও অসংখ্য কবিতা, ছোটগল্পসহ সাহিত্য রচনা করে বিশ্বে খ্যাতি অর্জন করেন। তার বিখ্যাত নাটক ও লেখার ওপর ভিত্তি করে এবং তার চিত্রনাট্যে বেশ কিছু চলচ্চিত্র নির্মিত হয়।
সাম্যবাদ বিশ্বাসী এবং পুঁজিবাদ, যুদ্ধবিরোধী সমালোচনা ও লেখনীর জন্য একবার ১৯৩৩ সালে জার্মানি থেকে ,আবার ১৯৪৭ সালে আমেরিকা থেকে নির্বাসনে যেতে বাধ্য হয়। ব্যক্তিগতচরিত্রের নানা ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এ বিশ্ববিখ্যাত নাট্যকার শোষণ বঞ্চনার বিরুদ্ধে ন্যায়-নিষ্ঠ মানবতার পক্ষে একজন আপোষহীন সামাজিক যোদ্ধা।
বের্টোল্ট ব্রেখট ১৯৫৬ সালের বসন্তে হৃদরোগে আক্রান্ত হন। সেই বছরের ১৪ আগস্ট, মাত্র ৫৮ বছর বয়সে, তিনি হৃদযন্ত্র বিকল হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
আজ ১৪ আগস্ট এ খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিত্বের প্রয়াণ দিবসে তাঁর ক্ষুরধার জীবন সংগ্রামের প্রতি চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন করছে।