চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র

চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র উন্নত রুচি চাই, বিকশিত জীবন চাই। সমাজপ্রগতির আন্দোলনের পরিপূরক সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলাই "চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের" উদ্দ্যেশ্য...

শিবরাম চক্রবর্তী বাংলা রম্যসাহিত্যের অন্যতম পুরোধা শিবরাম চক্রবর্তী। তাঁর অসাধারণ শিল্পনৈপুণ্যে বাঙালির স্বাভাবিক রম্য ক...
27/08/2026

শিবরাম চক্রবর্তী

বাংলা রম্যসাহিত্যের অন্যতম পুরোধা শিবরাম চক্রবর্তী। তাঁর অসাধারণ শিল্পনৈপুণ্যে বাঙালির স্বাভাবিক রম্য কৌতুক পেয়েছে সার্বজনীন রুপ। তিনি ব্যক্তিজীবনেও প্রচন্ড খেয়ালি ও রসিক মানুষ ছিলেন। শিবরামের জন্ম ১৩১০ বঙ্গাব্দের ২৭শে অগ্রহায়ণ; অর্থাৎ ১৯০৩ সালের ১৩ ডিসেম্বর। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন দুরন্ত ও স্বাধীনচেতা। পড়তেন মালদহের সিদ্ধেশ্বরী ইনস্টিটিউশনে। ১৯১৯ এ সেখান থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষার জন্য নির্বাচনী পরীক্ষা দেওয়া হলেও চূড়ান্ত পরীক্ষা আর দেওয়া হয়নি। সেসময় ভারতবর্ষে চলছিল আন্দোলনের হাওয়া। অসহযোগ আন্দোলনের এক প্রচারসভায় মালদহে এসেছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন ও বাসন্তী দেবী। কলকাতা ফিরে যাওয়ার সময় তাদের যাত্রাসঙ্গী হন স্বয়ং শিবরাম। কলকাতা গিয়ে ভর্তি হন গৌড়ীয় সর্ববিদ্যায়তনে, যে প্রতিষ্ঠানের প্রধান ছিলেন নেতাজী সুভাষচন্দ্র বোস। পরে সেখান থেকেই পাশ করেন ম্যাট্রিক। স্বাধীনচেতা শিবরাম স্বদেশী আন্দোলনের সাথে যুক্ত হয়ে কারাবরণও করেন। ম্যাট্রিকের পর পড়ালেখাটা আর চালাননি। সামান্য কিছুকাল চাকরি করলেও পরবর্তীতে সম্পূর্ণ মনোনিবেশ করেন সাহিত্যে। খেয়ালি ও স্পষ্টবাদিতার বদৌলতে পরবর্তী জীবনে সাংবাদিকতা করতে গিয়েও জেল খেটেছেন, চাকুরি হারিয়েছেন। কলকাতার মুক্তোরাম স্ট্রীটের এক মেসবাড়িতে কাটিয়েছেন সারাজীবন। নিজেকে নিয়েও খুব মজা করতেন। ঠিকানা বলতেন "মুক্তারামের তক্তারাম"।সৃষ্টি করেছেন অসামান্য সব রম্য গল্প, উপন্যাস। মূলত রম্যসাহিত্যিক হলেও সাহিত্যজগতে প্রবেশ করেছিলেন কবিতা দিয়েই। তৎকালীন সাহিত্য পত্রিকা ‘ভারতী’তে প্রকাশিত হয় তার প্রথম কবিতা। পরে বেশ কিছু রাশভারি লেখা লিখলেও ধীরে ধীরে সমস্ত মনোযোগ দেন রম্যসাহিত্যেই। এছাড়াও লিখেছিলেন বেশ কিছু উপন্যাস, নাটক এবং প্রবন্ধ। এভাবেই তিনি গড়ে তোলেন এক বিশাল সাহিত্যের ভাণ্ডার। তবে ব্যক্তিজীবনের খেয়ালের প্রভাব পড়েছিল তার সাহিত্যকর্মেও। নিজের অনেক লেখাই সংরক্ষণ করে যাননি। ১৯২৯ সালে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘মানুষ’ প্রকাশিত হয়। একই বছরে প্রকাশিত হয় আরেকটি কাব্যগ্রন্থ- ‘চুম্বন’। লিখেছেন ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’ এবং ‘হাতির সাথে হাতাহাতি’-এর মতো অসাধারণ কিছু উপন্যাস। ‘ঈশ্বর পৃথিবী ভালোবাসা’ নামের স্মৃতিকথা গ্রন্থে তিনি লিখে গেছেন নিজের কথা। সৃষ্টি করেছেন হর্ষবর্ধন-গোবর্ধন, বিনি, ইতুর মতো স্মরণীয় কিছু চরিত্র। মানবতাবাদী অভিনেতা পরিচালক চার্লি চ্যাপলিনের মতো হাস্যরসের মধ্য দিয়ে ফুটিয়ে তুলতেন জীবনের গভীরভাব। ছোটবেলায় নিজে একবার বাড়ি থেকে পালিয়েছিলেন, সেই অভিজ্ঞতা থেকে লিখেছেন বিখ্যাত 'বাড়ি থেকে পালিয়ে' উপন্যাস। সেখানে বাড়ি পালানো এক সরল কিশোরের চোখ দিয়ে দেখিয়েছেন সমাজের দুঃখের নানা রূপ। রম্য লেখকের এই উপন্যাস পড়তে পড়তে পাঠকের সজল হৃদয়ে কিশোর কাঞ্চন এর মতই প্রশ্ন উঠবে 'হরি দা, এখানে এত দুঃখ কেন?' ঋত্বিক ঘোটক এই উপন্যাসের চিত্রায়ণে তৈরি করেছেন অসাধারণ এক সিনেমা। নিজের শেষ জীবনও কেটেছে একাকী, আর্থিক কষ্টে। কোনদিন অর্থ সম্পদের পিছনে ছোটেননি। পৈতৃক জমিদারী সম্পত্তি হেলায় ত্যাগ করেছেন। জমিদার বাড়ির ছেলে কলকাতায় এসে আর কোনদিন ফিরে যান নি সেখানে। খুব সাধারণ জীবন যাপন করতেন। একটা শোবার চৌকি ছাড়া আর কোন আসবাবপত্র ছিল না তাঁর ঘরে। শেষ জীবনে নিদারুণ কষ্টে ও রোগভোগে ২৮ আগস্ট, ১৯৮০ সালে মৃত্যুবরণ করেন। আজ মৃত্যুদিনে তাঁকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি।

বাংলা সঙ্গীতের অন্যতম দিকপাল এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দ্বিজেন্দ্রলাল রায় ও রজনীকান্ত সেনের সমসাময়িক 'পঞ্চকবি'র একজন অতুল প...
26/08/2026

বাংলা সঙ্গীতের অন্যতম দিকপাল এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দ্বিজেন্দ্রলাল রায় ও রজনীকান্ত সেনের সমসাময়িক 'পঞ্চকবি'র একজন অতুল প্রসাদ সেন। জন্মেছিলেন ১৮৭১ সালের ২০ অক্টোবর ফরিদপুর জেলার দক্ষিণ বিক্রমপুরের মগর গ্রামে। দেশের প্রতি ছিল তাঁর গভীর মমত্ববোধ।
অতুল প্রসাদ সেন এর গানের মূল উপজীব্য বিষয় ছিল দেশপ্রেম, ভক্তি ও প্রেম। জীবনের দুঃখ ও যন্ত্রণাগুলোকে তিনি সঙ্গীতের মায়ায় তুলে ধরেছেন। তাঁর বহুগান আজীবন মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে। একজন বিশিষ্ট বাঙালি গীতিকার ও সুরকার হিসেবে তাঁর খ্যাতি ছিল ব্যাপক। বাংলা গানের ঠুমরি, খেয়াল ও গজল ধারা প্রবর্তন করে এক অনন্য মাত্রা তিনি যোগ করেছিলেন।
অতুল প্রসাদ সেন এর রচিত দেশাত্মবোধক গানগুলো মানুষের হৃদয়ে গভীর আলোড়ন তৈরি করেছে। তাঁর রচিত বিখ্যাত দেশাত্মবোধক গান 'মোদের গরব মোদের আশা আ মরি বাংলা ভাষা' গানটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় বাঙালিদের মধ্যে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। তিনি সরাসরি রাজনীতিতে অংশগ্রহণ না করলেও প্রথমে কংগ্রেসের সমর্থক ছিলেন, পরে লিবারেলপন্থী হন। তিনি তাঁর জীবনে উপার্জিত সমগ্র অর্থের বৃহৎ অংশ স্থানীয় জনকল্যাণে ব্যয় করেন। তাঁর বাসগৃহ ও গ্রন্থস্বত্বও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কল্যাণে দান করে যান।
১৯৩৪ সালের ২৬ আগস্ট আজকের এই দিনে লক্ষ্মৌতে তাঁর মৃত্যু হয়। প্রয়াণ দিবস স্মরণে চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের পক্ষ থেকে গভীর শ্রদ্ধা জানাই।

ওস্তাদের কাছে শুনেছিলেন, "আগর সুর মে তাসির পয়দা করনা হ্যায়, তো সুভে সে লেকে শাম তক একভি ঝুট নাহি বোলনা" (যদি সুরের উপর প...
21/08/2026

ওস্তাদের কাছে শুনেছিলেন, "আগর সুর মে তাসির পয়দা করনা হ্যায়, তো সুভে সে লেকে শাম তক একভি ঝুট নাহি বোলনা" (যদি সুরের উপর প্রভাব সৃষ্টি করতে চাও, তাহলে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত একটাও মিথ্যা কথা বলো না)। শিষ্য সারাজীবন সেই সুর তুলে গেছেন 'শেহনাই' ধরে। বেনারসের গঙ্গায় নৌভ্রমণে গিয়ে বিশ্ববিখ্যাত সেতারবাদক রবিশঙ্কর মন্দির দেখিয়ে সঙ্গীদের বললেন "এইসব মন্দিরের গায়ে থাকেন বিসমিল্লাহ খান"। হ্যাঁ, 'শেহনাই-নওয়াজ' বিসমিল্লাহ খানের কথাই বলেছিলেন পন্ডিত রবিশঙ্কর। বিহারের বক্সার জেলার মফস্বল শহর দুমরাও-এ এক ধর্মপ্রাণ দরিদ্র সানাইবাদকের ঘরে ১৯১৬ সালে জন্ম নেওয়া বিসমিল্লাহ খানের নাম মিশে আছে কাশীর মন্দিরে আর বিশ্বনাথের আরতির সাথে।
একবার ইরাকের এক মাওলানা বলেছিলেন, ইসলামে এই সঙ্গীত চর্চা হারাম। বিসমিল্লাহ খান মাওলানাকে সানাই বাজিয়ে শুনানোর পর বলেছেন "সঙ্গীত যদি হারাম হয়, তবে তা আমাকে এমন স্বর্গীয় উচ্চতায় পৌঁছে দেয় কেমন করে? আমার কাছে এটাই হকিকত, আমার দুনিয়া। আমার নামাজ আদায় হয় সাতটি শুদ্ধ ও চারটি কোমল সুরে। যে সঙ্গীতকে জেনেছে তাঁর কাছে সঙ্গীতই একমাত্র ধর্ম"।
সকালে রোজ গঙ্গাস্নান করতেন। দিনে পাঁচ বার নামাজ পড়তেন। ভোরের নামাজ শেষে বিশ্বনাথের মন্দিরে গিয়ে দেবতার ঘুম ভাঙ্গাতেন সানাইয়ের সুরে। তার পর সন্ধ্যায় রোজ বালাজি মন্দিরের চাতালে রেওয়াজ করতেন। মহররমের কাফেলা কি আরতির ঘন্টাধ্বনির সাথে ছিলো "বিসমিল্লাহ'র সানাই"। তাঁর নাম, তাঁর সানাইয়ের ফুঁ-য়ের সাথে মন্দির মসজিদ অভিন্ন হয়ে গেছে।
বাপ-দাদার পাশে বসে তিন বছর বয়সে হাতে তুলে নিয়েছেন সানাই। সানাইয়ের প্রতি আকর্ষণ দেখে ছয় বছর বয়সে তাকে বারাণসীতে মামা আলী বক্সের কাছে সানাইবাদন শিখতে পাঠানো হয়। মামা বিশ্বনাথ মন্দিরের নহবতখানার সানাইবাদক। আর বিসমিল্লাহ খান মন্দিরের চাতালে বসে সে সুর শোনেন। মামা পাঠিয়ে দিলেন তাঁকে বালাজি মন্দিরে। সেখানে মন্দির প্রাঙ্গণে, কখনো বা গঙ্গার ঘাটে বসে সানাই বাজাতে বাজাতে তন্ময় হয়ে যেতেন। গভীর রাতেও গঙ্গার স্রোতের সঙ্গী হয় বিসমিল্লাহ'র সানাই। সানাইয়ের সুর যেন অশ্রু হয়ে বয়ে যেত গঙ্গায়। সঙ্গীতের সাধনায় কিশোরবয়সে তাঁর উপলব্ধি হয়, "ঈশ্বরকে কোন ধর্মের গন্ডিতে বাঁধা যায় না। গন্ডি তৈরি করে মানুষ।"
১৯৩০ সাল। এতদিনকার সুরসাধনা পরখ করার সুযোগ এলো। এলাহাবাদে সর্বভারতীয় সঙ্গীত সম্মেলনে সেরা সঙ্গীত পরিবেশকের শিরোপা পেলেন বিসমিল্লাহ খান। এরপর ১৯৩৭ সাল। কলকাতায় সর্বভারতীয় সঙ্গীত সম্মেলনে সানাই পরিবেশন করলেন ২১ বছরের তরুণ বিসমিল্লা খান, পেলেন তিনটি স্বর্ণ পদক। কলকাতায় তখন সঙ্গীতের সেরা আসরগুলি বসত, এখানে ছিলেন নামজাদা সঙ্গীতজ্ঞ আর সমঝদার শ্রোতা। তাঁর সানাই বাদন বিষ্ময় জন্ম দিল। লোকবাদ্য হিসেবে পরিচিত সানাই বিয়ে, জন্মোৎসব কি শোভাযাত্রায় বেজে উঠতো। সে সানাই ওস্তাদ বিসমিল্লাহ খানের অঙ্গুলিচালনায় মার্গসঙ্গীতের দরবারে প্রবেশ করলো, মর্যাদার সাথে। বিদেশেও ছড়িয়ে পড়লো তাঁর খ্যাতি। নানা দেশে সঙ্গীত পরিবেশন ছাড়াও তিনি সত্যজিত রায়ের জলসাঘর এবং কন্নড় ছবিতে সানাই বাজিয়েছেন। কিন্তু খুব বেশিদিন চলচ্চিত্র জগতের ফরমায়েশি কাজে মন টিকলো না।
বিসমিল্লাহ খানের জীবনী নিয়ে গৌতম ঘোষ তৈরী করেন তথ‍্যচিত্র 'সঙ্গ মিল সে মুলাকাত'। নন্দনে যখন তথ্যচিত্রটি প্রদর্শিত হয়, সত্যজিৎ রায় দেখার পর মন্তব্য করেছিলেন "বিসমিল্লাহ ভাল সানাই বাজায় জানতাম, এত ভাল মিষ্টি সুরে কথা বলে আজ জানলাম। বিসমিল্লাহ বেনারসকে বলেন বানারস। সত্যিই তো যেখানে শিল্প রস বানানো হয়।"
একে একে পেয়েছেন তানসেন পুরস্কার, সঙ্গীত নাটক আকাদেমি পুরস্কার(১৯৫৬), পদ্মশ্রী পুরস্কার(১৯৬১), পদ্মভূষণ পুরস্কার(১৯৬৮), পদ্মবিভূষণ পুরস্কার(১৯৮০), ইরানের তহর মোউসিক ও ভারতের সেরা নাগরিক পুরস্কার ভারতরত্ন। তাঁর ৮০তম জন্মদিন পালিত হয়েছিল নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড মিউজিক ইন্সটিটিউটে।
বারানসীর শ্রমিক মহল্লায়, যেখানে মুসলমান ও হিন্দু দুই সম্প্রদায়েরই মজদুরি করে দিন গুজরান করা মানুষের বাস, সেখানেই ছিলেন আজীবন। রিক্সায় যাতায়াত করতেন। বিদেশে গিয়ে ফাইভ স্টার হোটেলে থাকতে চাইতেন না। নিউওয়র্কে তাঁর জন্মবার্ষিকী পালন শেষে তাঁর এক প্রিয় শিষ্য এবং উদ্যোক্তারা সবিনয়ে তাঁকে সেদেশে থেকে যাবার অনুরোধ করে। ছলছল চোখে পুণ্যভূমি স্বদেশের কথা স্মরণ করে বলেছেন, "শুকরিয়া, কিন্তু বারানসীতে না থাকলে তো আমার সানাই সুর হারিয়ে ফেলবে। আমার সানাই বাজাতে হলে চাই বারানসী, যেখানে গঙ্গা বহমান, যেখানে বালাজী মন্দির। আমার বাড়ি ভারত ছাড়া আর কোথাও হতেই পারে না"।
কাশী আর মক্কা-মদিনা তাঁর কাছে সমার্থক। সুরের ঘরানাতেও তিনি ছিলেন অভিন্ন। বলতেন, "বিভিন্ন ঘরানা থেকে ফুল তুলে এনে আমার সানাইয়ে ভরে দিই। তৈরি হয় গুলদস্তা ( ফুলের তোড়া)।" কখনও দাঁড়িয়ে সানাই বাজাতেন না। শুধু বছরে এক দিন। মহরমের দিন। ওই একটা দিন তিনি রাস্তায় বেরিয়ে কোনও রাগ বাজাতেন না, বাজাতেন বিলাতগীতি নৌহা।
অসাম্প্রদায়িক এই সঙ্গীত গুরু বিশ্বাস করতেন যে, সঙ্গীত শোনার বিষয়–দেখার বা দেখাবার নয়। ভারতের স্বাধীনতা দিবস পালনের সাথে জড়িত হয়ে আছে তাঁর সানাইয়ের সুর। মানুষের প্রতি ভালবাসায় মোড়ানো সে সুর সম্পর্কে রবিশঙ্কর বলেছেন "দেখো, বছরের পর বছর লোকটা বাজিয়ে যাচ্ছে, কী সুন্দর, কী চমৎকার, তার মধ্যে কতখানি ভালোবাসা মেশানো থাকে, লোকে ভালওবাসে তা। অনেকে হয়তো বলবে, বলেও যে, সে রকম রাগ-রাগিণীর বিরাট কিছু অ্যাসেম্বলি বা আয়োজন নেই। কিন্তু ভগবানদত্ত ওই যে একটা ফুঁ একটা অন্য স্তর সৃষ্টি করে গেল লোকটা। কত লোকেই তো সানাই বাজিয়েছে, কিন্তু সানাই-বাজিয়ের স্থান কোথায় ছিল? সেই বিয়ের মণ্ডপে, কিংবা প্রসেশনে। কিন্তু বিসমিল্লাহ সেটাকে এমন পাতে তুলে দিয়েছেন যে, লোকে সানাইকে ক্লাসিকাল সঙ্গীত হিসেবেই শুনছে, নিচ্ছে…. বিসমিল্লাহ একটা অদ্ভুত প্রতিভা এ যুগে, মানে ভাবতে পারা যায় না। তাছাড়া ওই জিনিসটা, যেটা আমি বলতে চাই যে ভালোবাসা, আছে।’
আজ ওস্তাদ বিসমিল্লাহ খানের প্রয়াণদিবস। আমৃত্যূ সঙ্গীতের সাধনায় থেকে তিনি তৈরি করেছেন অসংখ্য সঙ্গীত অনুরাগী শিল্পী। অনাড়ম্বর জীবনে সুরসাধনাই ছিল তাঁর ঈশ্বরসাধনার নামান্তর। তাঁর স্মৃতি, তাঁর দৃষ্টান্ত, সুরমগ্ন জীবন আজকের এ অন্ধকারে আলো জ্বালুক ভোরের সানাইয়ের মত। তাঁর মৃত্যূবার্ষিকীতে বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।

"There is no art without discipline and no discipline without sacrifice"- এই দীক্ষা বুকে ধরে যিনি নাট্যাঙ্গনে বার বার পর...
19/08/2026

"There is no art without discipline and no discipline without sacrifice"- এই দীক্ষা বুকে ধরে যিনি নাট্যাঙ্গনে বার বার পরিক্ষীত হয়েছিলেন, তিনি উৎপলরঞ্জন দত্ত। লেখক, পরিচালক, নাট্যনির্দেশক, অভিনেতা, থিয়েটারের তাত্ত্বিক- এমন অনেক পরিচিতির পিছনে ছিল ঐ গুপ্তমন্ত্র।
ইংলণ্ডের বিখ্যাত পরিচালক ও অভিনেতা জেফ্রি কেণ্ডাল যখন ঐ গুপ্তমন্ত্র উচ্চারণ করেছেন, তখন উৎপল দত্ত নেহাতই কিশোর। বিস্ময়াবিষ্ট কিশোর থেকে ভারতে নাট্য আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা নাট্য ব্যক্তিত্ব উৎপল দত্ত-এ পরিণত হতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়েছে তাঁকে।
ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষে জন্মেছেন, কিন্তু কৈশোরেই দেখেছেন দেশভাগ। দেশভাগের ২ মাস পরে জেফ্রি কেন্ডাল তাঁর নাট্যদল নিয়ে ভারত সফরে আসেন। সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুলে কিশোর উৎপল দত্তের অভিনয় দেখে তাঁকে নিজের দলে টেনে নেন জেফ্রি কেন্ডাল। ‘দ্য শেক্সপিয়রানা ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার কোম্পানি’তে অভিনেতা হিসেবে কাজ শুরু করে সে কিশোর। প্রথমে কোলকাতা এবং পরবর্তীতে সারা দেশ ঘুরে এই দলের পেশাদার অভিনেতা হিসেবে শেক্সপিয়রের মোট আটটি নাটকে অভিনয় করেন।
শুরুতে পেশাদার অভিনেতা হবার প্রতি ছিল দুর্বার আকর্ষণ। সদ্য স্বাধীন ভারতের বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে এই আকর্ষণ একটা প্রবল দায়বোধে রূপ নিতে থাকে। এই রূপান্তরের অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে তিনি একাধিক নাট্যগ্রুপ, অভিনেতা, নির্দেশকের সাথে কাজ করেছেন। শুরু করলেন 'দি শেক্সপিয়ারানা' থেকে। এরপর লিটল থিয়েটার গ্রুপ। যুক্ত হলেন 'গণনাট্য সংঘ'-এ। তাঁর কথায়, গণনাট্য সংঘ হাতেকলমে কাজ করতে শিখিয়েছে। সেই সময়টাকে উদ্ধৃত করতে গিয়ে তিনি এও বলেছেন, "গণনাট্য আন্দোলনই তো সব। সেই তো মূল কেন্দ্র। তার থেকেই তো প্রেরণা আসছে চারদিকে"। গণনাট্য সংঘ-এ কাজ করতে গিয়ে তিনি উপলব্ধি করলেন, নাটক নিছক বিনোদন নয়- প্রপাগান্ডার অল্টারনেটিভ মাধ্যম হিসেবে নাটককে ব্যবহার করতে হবে।
উৎপল দত্তের নাটকগুলো ছিল কৃষক, মজুর, সমাজের নিচুতলার মানুষের গল্প। বার্টোল্ট ব্রেখট থেকে অনুপ্রানিত হয়ে তিনি 'এপিক থিয়েটার' শৈলীতে নাটক লিকতে থাকেন। এই বিশেষ শৈলী দর্শককে আবেগাক্রান্ত করে না, কিন্তু চিন্তা করতে বাধ্য করে। দর্শক চিন্তা করতে গিয়ে সমাজের অসঙ্গতি চিহ্নিত করে, প্রতিকার নির্ণয় করে। কয়লাখনির দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে ১৯৫৯-এ তাঁর লেখা নাটক 'অঙ্গার' পুঁজিবাদী শোষণের বিভৎসতা তুলে ধরে। ১৯৪৬ সালের রয়্যাল ইন্ডিয়ান নেভির বিদ্রোহকে চিত্রিত করে লিখেন 'কল্লোল'(১৯৬৫)। ১৯৬৭ সালে নকশাল আন্দোলন নিয়ে লিখেন 'তীর'। শাসকশ্রেণীর কাছে তীব্র প্রতিক্রিয়াধর্মী নাটকগুলোর জন্য তিনি দু'বার গ্রেপ্তার হন। কখনো মুচলেকাও দিতে হয়েছে।
তিনি বলতেন fact আর truth এর মধ্যে পার্থক্য আছে। fact হলো বুর্জোয়াশ্রেণীর সৃষ্ট আর truth হলো বিপ্লবী ইতিহাস। ইতিহাসের নিপীড়িত মানুষের লড়াইয়ের কাহিণীর সাথে তিনি যুক্ত করেন বর্তমান অধিকারের লড়াই। লড়াইটা কৃষক, মজুর, গ্রামীন পেশাজীবীদের সামনে তাদের মতো করেই উপস্থাপন করতেন। 'বৈশাখী মেঘ'; 'অরণ্যের ঘুম ভাঙছে'; 'সাদা পোশাক' যাত্রা নাটকে তিনি ঐতিহাসিক চরিত্রগুলো হাজির করেছেন। আবার এই যাত্রা নাটক থেকে পুঁজিবাদ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সঞ্চার ঘটিয়েছেন।
পথনাটিকা বা স্ট্রিট থিয়েটারের মাধ্যমে সরাসরি দর্শকের কাছে রাজনৈতিক বার্তা তুলে দিয়েছেন। তাঁর নাট্যদল পথে ঘুরে ঘুরে 'স্পেশাল ট্রেন', 'সমাজতান্ত্রিক চাল', 'দিন বদলের পালা'- এই পথনাটিকাগুলো করেছে।
'দ্য গ্রেট বেঙ্গল অপেরা' নামের একটি যাত্রাদলকে ঘিরে রচনা করেছেন 'টিনের তলোয়ার'। নাটকটা উৎসর্গ করেছিলেন থিয়েটারের অসংখ্য নট-নটীদের-যাঁরা খেয়ে না খেয়ে থিয়েটারে কাজ করে গেছেন। এই নাট্যগ্রন্থের ভূমিকায় উৎপল দত্ত লিখেছিলেন, ‘বাংলা সাধারণ রঙ্গালয়ের শতবার্ষিকীতে প্রণাম করি সেই আশ্চর্য মানুষগুলিকে— যাঁহারা কুষ্ঠগ্রস্ত সমাজের কোনো নিয়ম মানেন নাই, সমাজ যাঁহাদের দিয়াছিল অপমান আর লাঞ্ছনা। যাঁহারা মুৎসুদ্দিদের পৃষ্ঠপোষকতায় থাকিয়াও ধনীর মুখোস টানিয়া খুলিয়া দিতে ছাড়েন নাই। যাঁহারা পশুশক্তির ব্যাদিত মুখগহ্বরের সম্মুখে টিনের তলোয়ার নাড়িয়া পরাধীন জাতির হৃদয়বেদনাকে দিয়েছিলেন বিদ্রোহ মূর্তি"। ১৯৭১ সালের ১২ আগস্ট কলকাতার রবীন্দ্রসদন মঞ্চে উপস্থাপন করা হয় 'টিনের তলোয়ার'। সত্যজিৎ রায় নাটকটিকে ‘আধুনিক ভারতীয় থিয়েটারের সর্বোচ্চ শিখর’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। এই নাটকে উৎপল দত্ত দৃশ্যত ১৮৭৬ সালের নাট্য নিয়ন্ত্রণ আইনকে দর্শকের কাঠগড়ায় দাঁড় করান। ১৯৭১-এর পশ্চিমবাংলায় তখন একদিকে নকশালবাড়ি আন্দোলন, আদিবাসী সমাজের গণজাগরণ, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, জরুরি অবস্থার প্রেক্ষাপটে সরকার কর্তৃক কবি-শিল্পী-নাট্যকর্মীদের প্রতিক্রিয়াধর্মী অভিব্যক্তি দমনের নানা পদ্ধতি চলমান। 'টিনের তলোয়ার'-এর দৃঢ় প্রতিঘাত থিয়েটারে প্রবল আলোড়নকারী।
উৎপল দত্ত শেক্সপীয়ার, গোগোল, গোর্কী, মলিনিয়েরের নাটক অনুবাদ করেছেন। বিপ্লবী সিনেমা ও থিয়েটারের উপর প্রবন্ধ লিখেছেন। তাঁর লেখা 'অন থিয়েটার' নাট্যকর্মীদের জন্য অবশ্য-পাঠ্য। শতাধিক নাটক রচনা করেছেন। তাঁর নাটক নিষিদ্ধ হয়েছে, কিন্তু তাঁর স্বপ্ন নিষিদ্ধ করা যায়নি। শিল্পী জীবনের কঠোর শৃঙ্খলার সাথে নাট্যআন্দোলনের প্রতি প্রবল দায়বোধের সমন্বয় ঘটিয়ে উৎপল দত্ত থিয়েটারকে দিয়েছেন এক অনন্য মর্যাদা। তিনি বুঝিয়েছেন, থিয়েটার নিছক বিনোদনের জন্য নয়। থিয়েটার একটা বিপ্লবী মাধ্যম যেখানে অভিনেতা অভিনেত্রীরা সমাজের প্রতি গভীর দরদবোধ থেকে মঞ্চে এসে দাঁড়ায়।
আজ তাঁর প্রয়ানদিবসে আমরা গভীর শ্রদ্ধার সাথে তাঁকে স্মরণ করছি।

"এ যুগের বাঙালি শিল্পীদের মধ্যে তিনি ছিলেন পুরুষোত্তম। তাঁর কণ্ঠ ছিল সমুদ্রশঙ্খের মতো, লোনা হাওয়ায় তা বেজে উঠত- গভীর তলদ...
18/08/2026

"এ যুগের বাঙালি শিল্পীদের মধ্যে তিনি ছিলেন পুরুষোত্তম। তাঁর কণ্ঠ ছিল সমুদ্রশঙ্খের মতো, লোনা হাওয়ায় তা বেজে উঠত- গভীর তলদেশ থেকে"। দেবব্রত বিশ্বাস সম্পর্কে এ অনুভূতি ব্যক্ত করেছিলেন বিশিষ্ট গণসঙ্গীত শিল্পী হেমাঙ্গ বিশ্বাস।
দেবব্রত বিশ্বাস জন্মেছিলেন ১৯১১ সালের ২২ আগস্ট অবিভক্ত বাংলার কিশোরগঞ্জে। তাঁর বাবা ও ঠাকুরদা দু'জনেই ছিলেন গোঁড়া ব্রাহ্ম। নিরাকার ঈশ্বরই ছিল তাঁদের একমাত্র আরাধ্য। কোন ধরনের দেবদেবীর স্থান ছিলনা তাঁদের কিশোরগঞ্জের বাড়িতে। তাই ছোটবেলা থেকেই নিজেকে 'ম্লেচ্ছ' বলে প্রচার করতে দ্বিধা করেননি তিনি। তাঁর জন্মের কয়েকদিন আগে ইংল্যান্ডের রাজা পঞ্চম জর্জের দিল্লির দরবারে আগমন ঘটে বলে বাবা-মা তাঁকে আদর করে 'জর্জ' নামে ডাকতেন। পরবর্তীতে তিনি 'জর্জদা' নামেই সবার কাছে অধিক পরিচিতি লাভ করেন।

দেবব্রত বিশ্বাস এর পিতা ছিলেন সংস্কৃতিপ্রেমী এবং সঙ্গীতানুরাগী। পিতার প্রভাবেই সঙ্গীতের প্রতি তাঁর আগ্রহ বাড়ে। খুব ছোটবেলা থেকেই দেবব্রত বিশ্বাসের রবীন্দ্রচর্চা শুরু হয়। মূলত মায়ের হাত ধরেই দেবব্রতর রবীন্দ্রনাথ, তাঁর দর্শন এবং রবীন্দ্রসঙ্গীত এর চর্চার সূত্রপাত ঘটে।

রবীন্দ্রসঙ্গীতের গায়ক হিসেবে অধিক পরিচিত হলেও তাঁর শিল্পীসত্তা ছিল বহুমাত্রিক। তাঁর গায়কীতে এমন কিছু ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য ছিল, যা তৎকালীন রবীন্দ্রসঙ্গীত এর প্রচলিত ধারা থেকে একেবারেই আলাদা। তিনি বিশ্বাস করতেন, রবীন্দ্রসঙ্গীত শুধু কণ্ঠে নয়, অন্তরে ধারণ করতে হয়। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, গানের পরিবেশনায় অতিরিক্ত নিয়ম-কানুনের কড়াকড়ি, কঠোর স্বরলিপি মেনে চলা, এর ফলে রবীন্দ্রসঙ্গীতের স্বাভাবিক প্রাণশক্তিকে নিঃশেষ করে দিচ্ছে। এই বিশ্বাস থেকে তিনি কিছু গানকে গতির বৈচিত্র্যতায়, তালের প্রয়োগে ভিন্নতা এবং সৃজনশীলতায় সামান্য পরিবর্তন করে গাইতেন। কিন্তু তাঁর এই চিন্তার সাথে বিরোধ ঘটে বিশ্বভারতীর সঙ্গীত বিভাগের। বিশ্বভারতীর সঙ্গীত কর্তৃপক্ষ তাঁর এই চিন্তাকে গ্রহণ করতে পারেননি। তারা একে 'রবীন্দ্রনাথের অনুমোদিত রচনার বিকৃতি' বলে মনে করতেন। তারা মনে করতেন, রবীন্দ্রনাথ যে রচনাপদ্ধতি ও স্বরলিপি রেখে গেছেন, তা থেকে বিচ্যুতি ঘটানো উচিত নয়। দেবব্রত বিশ্বাস এ বদ্ধ চিন্তার তীব্র সমালোচনা করেছেন। তাঁর এ অবস্থানের ফলে বিশ্বভারতী তাঁর গানের রেকর্ড ও প্রচারের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলেন। তাঁকে নানাভাবে আড়াল করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সঙ্গীতের প্রতি ছিল তাঁর গভীর অনুরাগ। এই বিরোধের ফলে তিনি নতুন কোন রবীন্দ্রসঙ্গীত রেকর্ড করেননি, তবে তাঁর সঙ্গীত সাধনা অব্যাহত রেখেছিলেন। নিয়মিত গান গেয়েছেন এবং ক্যাসেটে রেকর্ড করেও রেখেছেন। দেবব্রত বিশ্বাসের প্রতি গভীর শ্রদ্ধায় তাঁর অসংখ্য শ্রোতা এবং বিশিষ্টজন বলেছেন- 'যিনি গানকে প্রাণ দিয়েছেন, তাঁকে বাঁধা যায় না।'

জীবদ্দশায় অসংখ্য গণসঙ্গীত গেয়েছেন ও সুর করেছেন দেবব্রত বিশ্বাস। তিনি ছিলেন একজন প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। গণনাট্য সংঘ এবং ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির (অবিভক্ত) সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন তিনি। গণনাট্য সংঘের শুরুর দিনগুলোকে সবচেয়ে সজীব করে তুলেছিল দেবব্রত বিশ্বাস এর পরিচালনায় সঙ্গীতগুলো। দেশের পরাধীনতা, জনগণের সীমাহীন দুঃখ, দারিদ্রতা এবং অশিক্ষা তাঁর মনকে ব্যথিত করেছিল। জনসচেতনতা গড়ে তোলার লক্ষ্যে তিনি শহরে, গ্রামেগঞ্জে, হাটে-বাজারে গণনাট্যের গান এবং রবীন্দ্রনাথ এর দেশাত্মবোধক গানগুলো গাইতেন।

দেবব্রত বিশ্বাস ছিলেন একাধারে সঙ্গীতশিল্পী, লেখক, চিন্তাবিদ ও সংস্কৃতি-সচেতন প্রতিবাদী কণ্ঠ। তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ 'ব্রাত্যজনের রুদ্ধসঙ্গীত' তাঁর শিল্পীসত্তার গভীরতা,অভিমান, প্রতিবাদ আর যন্ত্রণাকে যেমন তুলে ধরেছেন, তেমনি প্রকাশ্যে এনেছেন তাঁর জীবনের বহু জানা-অজানা অধ্যায়। ১৯৮০ সালের ১৮ আগস্ট এই গুণীজনের জীবনাবসান ঘটে। চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের পক্ষ থেকে এই গুণীজনের প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা!

শামসুর রাহমান বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের অন্যতম প্রধান বাঙালি কবি এবং আধুনিক বাংলা সাহিত্যের এক অবিসংবাদিত নক্ষত্র। তা...
17/08/2026

শামসুর রাহমান বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের অন্যতম প্রধান বাঙালি কবি এবং আধুনিক বাংলা সাহিত্যের এক অবিসংবাদিত নক্ষত্র। তাঁকে নাগরিক কবি হিসেবেও অভিহিত করা হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মধ্যবিত্ত নাগরিক জীবনের বহুমাত্রিক বাস্তবতা তাঁর কবিতায় গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। কবি
শামসুর রাহমানের আজ ২০ তম মৃত্যুবার্ষিকীতে চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের পক্ষ থেকে জানাই গভীর শ্রদ্ধা।

শামসুর রহমান আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান পুরুষ। নগরজীবনের একাকিত্ব, মধ্যবিত্তের মানসিক টানাপোড়েন, রাজনৈতিক সচেতনতা ও দেশপ্রেম তাঁর কবিতার মূল বৈশিষ্ট্য। রোমান্টিকতা ও সমাজমনস্কতার সংমিশ্রণে তিনি একটি স্বতন্ত্র নাগরিক কাব্যধারা নির্মাণ করেন।

'শহরের আনাচে কানাচে
প্রতিটি রাস্তায়
অলিতে গলিতে
রঙিন সাইনবোর্ডে, প্রত্যেক বাড়িতে
স্বাধীনতা নামক শব্দটি
লিখে দিতে চাই
বিশাল অক্ষরে
স্বাধীনতা শব্দ এত প্রিয় যে আমার
কখনো জানি নি আগে।'
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালে তাঁর কবিতা ছিল মুক্তিকামী মানুষের প্রেরণার উৎস। ‘স্বাধীনতা তুমি’ এবং ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য, হে স্বাধীনতা’ বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী কবিতা হিসেবে স্বীকৃত।

শামসুর রাহমান সারাজীবন প্রত্যক্ষ রাজনীতি থেকে দূরত্ব রক্ষার চেষ্টা করলেও তিনি তা করতে পারেননি। ১৯৬৭ সালে পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী খাজা সাহাবুদ্দীনের নির্দেশে রেডিও পাকিস্তানে রবীন্দ্র সঙ্গীত সম্প্রচার নিষিদ্ধ করলে এর প্রতিবাদে মুনীর চৌধুরী রচিত একটি বিবৃতিতে কবি স্বাক্ষর করেন। ১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতের সঙ্গে পাকিস্তান যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে, ১৭ দিনের যুদ্ধের উম্মাদনায় অনেকের মতো শামসুর রাহমানও কয়েকটি কবিতা ও একটি মিনি কাব্যনাটক রচনা করেন। এর কোনোটিই তার কোনো কাব্যে অন্তর্ভুক্ত হয়নি, তবে তাঁর মতে সেসব কবিতায় উত্তেজনা সৃষ্টির কোনো প্রয়াস ছিল না বরং শান্তির পক্ষেই ছিল উচ্চারণ। এ যুদ্ধের পর পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে যে আন্দোলন শুরু হয় তা রাজনীতিবিমুখ কবিকেও উজ্জ্বীবিত করে।

১৯৬৯ সালের জানুয়ারি ছিল প্রবলভাবে উত্তাল। প্রতিদিনই যুব সমাজের মিছিলে ধ্বনিত হয়েছে সামরিক শাসনবিরোধী শ্লোগান। ২০ ও ২৪ জানুয়ারি বামপন্থি আসাদুজ্জামান ও কিশোর মতিউর রহমানকে পাকিস্তানি স্বৈরাচারী সরকারের পুলিশ গুলি করে হত্যা করে। ওইদিনই আসাদের রক্তে রঞ্জিত শার্ট নিয়ে মিছিল করে ছাত্রজনতা। শামসুর রাহমানের হৃদয়মনে এই মিছিলটি প্রবলভাবে ছুঁয়ে যায়। আসাদের এই শার্ট নিয়ে তিনি লিখলেন ‘আসাদের শার্ট’ কবিতাটি। আসাদ-মতিউরের এই আত্মাহুতি, সরকারি নির্যাতন ও দমননীতির প্রতিবাদে ২৪ জানুয়ারি গণঅভ্যুত্থানে উত্তাল হয়ে ওঠে ঢাকা শহর। সমগ্র শহরে প্রতিবাদে ও বিক্ষোভে ফেটে পড়ে মানুষ। শামসুর রাহমানের ‘আসাদের শার্ট’ কবিতাটিতে সেদিনটির প্রতিবাদ নানাভাবে রূপায়িত হয়েছে। ‘আসাদের শার্টে’র সঙ্গে এ-সময়টি তাঁর কবিতায় প্রবল প্রতিবাদী-চেতনা নিয়ে প্রতিফলিত হয়েছে। গণঅভ্যুত্থানের পরই এলো একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপন । এই সময়ে রচিত তাঁর কয়েকটি কবিতাও সময়চেতনার দিক থেকে ঐতিহাসিক মূল্য পেয়েছে। কী অসাধারণ সব পঙক্তি, যা উদ্দীপিত করেছিল সংগ্রামরত ছাত্র ও জনতাকে। সংগ্রাম ও কবিতা সমার্থক হয়ে-ওঠা বাংলা কবিতার পথযাত্রায় এর দায়ই বহন করেছে।
১৯৬৮ সালের ৩১ আগস্ট প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান পাকিস্তানে একটি সাধারণ ভাষা প্রচলনের প্রস্তাব দিলে এর তীব্র বিরোধিতা করে ৪০জন বাঙালি সাহিত্যিক শিল্পী ও সাংবাদিক একটি বিবৃতি প্রকাশ করেন। কবির ‘বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা’ নামে বিখ্যাত কবিতাটি রচনার অনুপ্রেরণা ছিল সেই প্রতিবাদ। বহির্বিশ্ব কবির কবিতায় ছায়া ফেলতে শুরু করে তাঁর দ্বিতীয় কাব্য রৌদ্র করোটিতে-র সময় থেকে। বিধ্বস্ত নীলিমা কবিতাগুচ্ছে আরও এক ধাপ এগিয়ে যান কবি তাঁর বহির্বিশ্ব- চেতনার বিকাশের পথে। ১৯৭০ সালে প্রকাশিত তাঁর 'নিজ বাসভূমে কাব্য' তিনি উৎসর্গ করেন আবহমান বাঙলার শহীদদের উদ্দেশ্যে। ‘বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা’, ‘ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯’, ‘পুলিশ রিপোর্ট’, ‘ব্যক্তিগত হরতাল’, ‘এ লাশ আমরা রাখব কোথায়’, এ কবিতাগুলির ছত্রেছত্রে লেগে আছে এক বিক্ষুব্ধ সময়ের ছাপ।
একাত্তরের ঘটনাবলীর প্রত্যক্ষ বিবরণ তিনি লিখে গিয়েছেন আত্মজীবনী 'কালের ধুলোয় লেখা' গ্রন্থে। এই সব পরোক্ষ বিবরণ বিধৃত আছে ঐ সময়ের অভিজ্ঞতার ওপর রচিত তাঁর উপন্যাস 'অদ্ভুত আঁধার এক'-এ। 'কালের ধুলোয় লেখা' শামসুর রাহমানের আত্মজীবনী প্রথমে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকায়। গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। সাড়াতলীতে থাকার সময় তিনি রচনা করেন তাঁর অত্যন্ত জনপ্রিয় কবিতা ‘স্বাধীনতা তুমি’ ও ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য, হে স্বাধীনতা’। যুদ্ধকালীন লেখা কবিতাগুচ্ছ মুক্তিযুদ্ধ শেষে ‘বন্দী শিবির থেকে’ নামে কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের ফসল অজস্র গল্প, উপন্যাস কবিতার মধ্যে ‘বন্দী শিবির থেকে’র কবিতাগুচ্ছ এক অনন্য মর্যাদার অধিকারী। একই সঙ্গে অন্তরের রক্তক্ষরণ, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা ও একাত্মতা, নিজের বন্দীত্বের বেদনা ও অসহায়তা ও মুক্তির স্বপ্ন এ কবিতাগুচ্ছকে দিয়েছে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের এক অনন্য কাব্যের গৌরব।
কবি ও প্রাবন্ধিক ফয়েজ আলম বলেন, কোনো বিশেষ রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রতি শামসুর রাহমানের পক্ষপাত ছিল না। তবে তিনি সাম্প্রদায়িকতা, স্বৈরাচার, সমাজের অন্যায় অবিচারের প্রতি বরাবর সোচ্চার ছিলেন। যেসব বিষয় জনসাধারণের স্বার্থের বাইরে গেছে, তিনি তার প্রতিবাদ করে কবিতা লিখেছেন। সে কারণে তাঁর কবিতা অনেক সময় বর্ণনাধর্মী ও চিত্রকল্পময় মনে হতে পারে; কিন্তু তিনি ছিলেন নবায়নশীল। তাঁর কবিতা শৈলীগতভাবে যেমন নিজস্বতাময়, তেমনি তাঁর কাব্যভাষা ও বিষয়বস্তুর স্বতন্ত্রতা সুন্দর।
কবি বলেন, আমি ধর্মের বিরুদ্ধে নই, কিন্তু ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে। যারা মানুষকে হত্যা করে, পৃথিবীতে যেসব শুভবাদী বস্তু আছে এগুলোকে নষ্ট করে আমি তাদের বিরুদ্ধে।
কবি ১৯২৯ সালের ২৩ অক্টোবর পুরান ঢাকার ৪৬ নং মাহুতটুলী নানাবাড়িতে জন্মগ্রহন করেন । শামসুর রহমানের ডাক নাম ছিল 'বাচ্চু'। তার পৈত্রিক বাড়ি নরসিংদী জেলার রায়পুর থানার পাড়াতলী গ্রামে। পিতা মোখলেসুর রহমান চৌধুরী এবং মাতা আমেনা খাতুন ।১৯৫৫ সালের ৮ ই জুলাই তিনি জোহরা বেগমকে বিয়ে করেন। কবির তিন মেয়ে ও দুই ছেলে।
তিনি ঢাকার পোগোজ স্কুল থেকে ১৯৪৫ সালে ম্যাট্রিকুলেশন এবং ১৯৪৭ সালে ঢাকা কলেজ থেকে আই এ পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হন। কিন্তু তিনি অনার্স ফাইনাল পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেননি। তবে তিনি ১৯৫৩ সালে বি এ (পাস কোর্স) করেন। আঠারো বছর বয়সে শামসুর রাহমান প্রথম কবিতা লেখা আরম্ভ করেন। ১৯৪৩ সালে তাঁর প্রথম কবিতা “উনিশ শ উনপঞ্চাশ’’ প্রকাশিত হয় নলিনীকিশোর গুহ সম্পাদিত সোনার বাংলা পত্রিকায় । বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রজীবনে ১৩ জন তরুণ কবির কবিতার সংকলন, নতুন কবিতায় তাঁর পাঁচটি কবিতা তাঁর কবি পরিচয়কে সুধী মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন । “ রুপালি স্নান’কে বলা যায় শামসুর রাহমানের আগমনী কবিতা । এর সর্বাংশেই জড়িয়ে আছে তাঁর স্বকীয়তা ও সৃষ্টিশীলতার চিহ্ন । জীবদ্দশাতেই তিনি বাংলাদেশের প্রধান কবি হিসেবে মর্যাদা লাভ করেছেন। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় ভাগ তথা পঞ্চাশের দশকে তিনি আধুনিক কবি হিসেবে বাংলা কবিতায় তিনি আবির্ভূত হন এবং অল্প সময়ের ভেতরে দুই বাংলায়(তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিমবাংলায়) কবি হিসেবে পরিচিতি পান।

শামসুর রাহমান ১৯৫৭ সালে সাংবাদিকতা জীবন শুরু করেন ইংরেজী দৈনিক মর্নিং নিউজ এর সহসম্পাদক হিসেবে । কিছুদিন এ পত্রিকায় কাজ করার পর তিনি পেশা পরিবর্তন করে যোগ দেন রেডিও পাকিস্তানে । ১৯৬০ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত তিনি রেডিও তে কাজ করার পর ১৯৬৪ সালে মর্নিং নিউজে উচ্চতর পদে যোগ দেন । শামসুর রহমানের প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ৬৬ টি।উপন্যাস ৪টি, প্রবন্ধগ্রন্থ ১টি, ছড়ার বই – ১টি। এলাটিং বেলাটিং, ৮,অনুবাদ ৬টি।

তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে'(১৯৬০)। তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ হল-রৌদ্র করোটিতে, বিধ্বস্ত নীলিমা, বন্দী শিবির থেকে, বাংলাদেশ স্বপ্ন দেখে, খন্ডিত গৌরব ইত্যাদি। কবি শামসুর রাহমান জীবনে বহু সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। পুরো এক দশক (১৯৭৭ -১৯৮৭) শামসুর রাহমান দৈনিক বাংলা (স্বাধীন বাংলাদেশ দৈনিক পাকিস্তান ,দৈনিক বাংলায় পরিণত হয় ) ও সাপ্তাহিক বিচিত্রার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন । বাংলা সাহিত্যে অবদানের জন্য শামসুর রাহমান আদমজী পুরষ্কার(১৯৬৩) বাংলা একাডেমী পুরষ্কার, জীবনানন্দ পুরষ্কার, একুশে পদক, আবুল মনসুর আহমদ স্মৃতি পুরষ্কার, নাসিরউদ্দীন স্বর্ণ পদক, ভাসানী পুরষ্কার, পদাবলী পুরষ্কার, স্বাধীনতা পুরষ্কারে ভূষিত হন। সাংবাদিকতায় অবদানের জন্য ১৯৮২ সালে তিনি জাপানের মিতসুবিশি পুরষ্কার পান । ১৯৯৪ সালে কলকাতায় আনন্দ বাজার পত্রিকা তাঁকে আনন্দ পুরষ্কারে ভূষিত করে। ওই বছর তাঁকে সাম্মানিক ডিলিট উপাধীতে ভূষিত করে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়।

১৭ আগস্ট ২০০৬ সালে তিনি ঢাকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর ইচ্ছানুযায়ী তাঁকে বনানী কবরস্থানে দাফন করা হয়।

শামসুর রাহমান কেবল একজন কবি নয়, অসাম্প্রদায়িকতা, মানবিকতা ও প্রগতিশীল চিন্তার সাহসী কণ্ঠস্বর হিসেবে আধুনিক বাংলা কবিতায় তিনি চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তাঁর প্রয়াণ দিবসে জানাই গভীর শ্রদ্ধা।

শ্রদ্ধা ও স্মরণইউজিন বের্টোল্ট ফ্রিডরিশ ব্রেখট  (১০ ডিসেম্বর ১৮৯৮ - ১৪ আগস্ট ১৯৫৬)১৮৯৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি, জার্মানির বা...
14/08/2026

শ্রদ্ধা ও স্মরণ

ইউজিন বের্টোল্ট ফ্রিডরিশ ব্রেখট (১০ ডিসেম্বর ১৮৯৮ - ১৪ আগস্ট ১৯৫৬)
১৮৯৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি, জার্মানির বাভারিয়া রাজ্যের আউগসবুর্গ (Augsburg) শহরে এক সচ্ছল মধ্যবিত্ত পরিবারে তাঁর জন্ম। পুরো নাম ইউজিন বের্টোল্ট ফ্রিডরিশ ব্রেখট ।
সংক্ষেপে বের্টোল্ট ব্রেখট (Bertolt Brecht)। তিনি একাধারে একজন জার্মান নাট্যকার, কবি বা চলচ্চিত্র পরিচালক ; তিনি ছিলেন থিয়েটারের এক বিপ্লবী চিকিৎসক। তিনি দেখেছিলেন, সমাজের অসুখটা অনেক গভীরে, আর প্রচলিত থিয়েটার সেই অসুখের ওপর কেবল সুন্দর একটা ব্যান্ডেজ লাগিয়ে দেয়, ভেতরের ক্ষতটাকে সারানোর চেষ্টা করে না। ব্রেখট সেই ব্যান্ডেজটা সজোরে টেনে খুলে ফেলতে চেয়েছিলেন। তিনি থিয়েটারের জন্মলগ্ন থেকে চলে আসা ব্যাকরণটাই নতুন করে লিখতে চেয়েছিলেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল একটাই – থিয়েটার কেবল বিনোদনের আফিম হবে না, যা দিয়ে মানুষ কিছুক্ষণের জন্য বাস্তবতার কষ্ট ভুলে থাকবে। থিয়েটার হবে একটা পরীক্ষাগার, একটা ক্লাসরুম, একটা বিতর্কের মঞ্চ, যেখানে সামাজিক সমস্যাগুলোকে ব্যবচ্ছেদ করে দেখানো হবে। এবং শেষ পর্যন্ত, থিয়েটার হবে পৃথিবীকে বদলে দেওয়ার একটা ধারালো অস্ত্র।
বাবার কাছ থেকে পাওয়া প্রখর যুক্তিবোধ, বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি এবং কঠোর নিয়মানুবর্তিতা অন্যদিকে মায়ের কাছ থেকে পাওয়া সংবেদনশীল মন, যা তাঁকে সমাজের নিচুতলার মানুষের কষ্ট বুঝতে সাহায্য করেছিল। অদ্ভুত এক দ্বান্দ্বিক মিশেলে ব্রেখট একইসাথে একজন শাণিত যুক্তির মার্ক্সবাদী এবং আবেগপ্রবণ কবি।
ছোটবেলা থেকেই প্রথাগত পড়াশোনার প্রতি তাঁর ছিল তীব্র অনীহা। স্কুলের গৎবাঁধা নিয়মের মধ্যে তিনি হাঁপিয়ে উঠতেন। তাঁর জগৎ ছিল বই, কবিতা আর গানের মধ্যে। কিশোর বয়সেই তিনি গিটার বাজাতে শেখেন এবং নিজের লেখা কবিতা ও গানে সুর দিতে শুরু করেন। বন্ধুদের নিয়ে তিনি একটি ছোট আড্ডা বা দল তৈরি করেন, যা ‘ক্লিক’ নামে পরিচিত ছিল। এই আসরগুলোতে তিনি সমাজের প্রচলিত ভণ্ডামি, বুর্জোয়া নৈতিকতা, দেশপ্রেমের ফাঁপা বুলি এবং রাষ্ট্রকে ব্যঙ্গ করে নিজের লেখা গান গাইতেন। তাঁর মধ্যে একটা বোহেমিয়ান, ভবঘুরে ভাব বরাবরই ছিল। তিনি প্রচলিত সামাজিক রীতিনীতির ধার ধারতেন না। তাঁর প্রথম দিকের কবিতার নায়ক ছিলেন জলদস্যু, ভবঘুরে, খুনি, পতিতা – সমাজের সেইসব ব্রাত্যজনেরা, যাদের ‘সভ্য’ সমাজ এড়িয়ে চলে।
১৯১৭ সালে, যখন ইউরোপ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগুনে জ্বলছে, ব্রেখট মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাবিদ্যা (Medicine) নিয়ে পড়া শুরু করেন। ১৯১৮ সালে তাঁকে আউগসবুর্গের একটি সামরিক হাসপাতালে অর্ডারলি (Medical Orderly) হিসেবে কাজ করতে হয়। এখানেই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায়। চোখের সামনে তিনি দেখলেন যুদ্ধের সবচেয়ে বীভৎস, মহত্ত্বহীন রূপ – ক্ষতবিক্ষত, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত সৈনিকদের আর্তনাদ, অঙ্গহানি, মৃত্যু, যন্ত্রণা আর অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় প্রোপাগান্ডার আড়ালে লুকিয়ে থাকা কদর্য মিথ্যাচার।
দেশপ্রেম, বীরত্ব আর জাতীয়তাবাদের নামে সাধারণ ঘরের ছেলেদের কীভাবে কামানের খোরাক হিসেবে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, তা তিনি খুব কাছ থেকে উপলব্ধি করেন। এই অভিজ্ঞতা তাঁর ভেতর গভীর এক যুদ্ধবিরোধী এবং রাষ্ট্রবিরোধী মনোভাব তৈরি করে দেয়। তিনি বুঝতে পারছিলেন, রাষ্ট্র, সমাজ, ধর্ম আর ক্ষমতা – এই শব্দগুলোর আড়ালে বিশাল সব ফাঁকিবাজি লুকিয়ে আছে। তিনি দেখলেন, কীভাবে রাষ্ট্র তার প্রয়োজনে মানুষের শরীর ও মনকে নিয়ন্ত্রণ করে, ব্যবহার করে এবং ছুঁড়ে ফেলে দেয়।
এ ভণ্ডামিকে তীব্রভাবে আক্রমণ করে লিখেন তাঁর বিখ্যাত কবিতা, “লেজেন্ড অফ দ্য ডেড সোলজার” (Legend of the Dead Soldier)।
আনুমানিক ১৯২৬ সাল নাগাদ, তিনি গভীরভাবে কার্ল মার্ক্স (Karl Marx) এবং ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস (Friedrich Engels)-এর রচনার সঙ্গে পরিচিত হন। এই পড়াশোনা তাঁর জগতকে দেখার চোখটাই আমূল বদলে দেয়।
মার্ক্সবাদ তাঁকে সমাজ, ইতিহাস এবং মানুষকে বিশ্লেষণ করার একটি নতুন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি দেয়। তিনি বুঝতে পারেন, মানুষের দুঃখ, কষ্ট, লোভ বা মহত্ত্ব – এগুলো কোনো ব্যক্তিগত বা আধ্যাত্মিক ব্যাপার নয়, যেমনটা বুর্জোয়া শিল্প-সাহিত্য দেখানোর চেষ্টা করে। এগুলো আসলে নির্দিষ্ট সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ফসল। তিনি মার্ক্সবাদের মূল ধারণাগুলো – যেমন দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ (Dialectical Materialism), ঐতিহাসিক বস্তুবাদ (Historical Materialism), শ্রেণি সংগ্রাম (Class Struggle), উদ্বৃত্ত মূল্য (Surplus Value) এবং বিচ্ছিন্নতাবোধ (Alienation) – গভীরভাবে আত্মস্থ করতে শুরু করেন।
ঐতিহাসিক বস্তুবাদ তাঁকে শেখায় যে, ইতিহাস কোনো মহান ব্যক্তি বা দৈবশক্তির দ্বারা নির্মিত হয় না। ইতিহাস নির্মিত হয় উৎপাদনের উপকরণের (Means of Production) পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এবং তার ফলস্বরূপ শ্রেণি সংগ্রামের মাধ্যমে। অর্থাৎ, সমাজকে বুঝতে হলে তার অর্থনৈতিক ভিত্তিটাকে (Economic Base) বুঝতে হবে।
নতুন আলোয় জগৎকে দেখার পর ব্রেখট উপলব্ধি করেছিলেন যে, সমাজ পরিবর্তনের জন্য কেবল রাজনৈতিক সংগ্রামই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন একটি সাংস্কৃতিক বিপ্লবেরও। আর সেই বিপ্লবের অন্যতম প্রধান যুদ্ধক্ষেত্র হবে থিয়েটার। ব্রেখট এক নতুন থিয়েটারের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন, যা এমন এক থিয়েটার যা দর্শককে আবেগের ঘোরে ডুবিয়ে দেবে না, বরং তাকে বারবার ধাক্কা দিয়ে জাগিয়ে রাখবে। এমন এক থিয়েটার যা দর্শককে ভাবতে, প্রশ্ন করতে এবং বিশ্লেষণ করতে শেখাবে। এমন এক থিয়েটার যা জগৎকে যেমন আছে তেমনভাবে দেখাবে না, বরং দেখাবে যে জগৎটা পরিবর্তনশীল এবং তাকে পরিবর্তন করা সম্ভব। এই বৈপ্লবিক ভাবনা থেকেই জন্ম নিল তাঁর বিশ্ববিখ্যাত তত্ত্ব – মহাকাব্যিক থিয়েটার বা এপিক থিয়েটার (Epic Theatre)। এটি ছিল থিয়েটারের ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা ।
বের্টোল্ট ব্রেখট এমন একজন শিল্পী ছিলেন যিনি থিয়েটারকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন, কিন্তু তার চেয়েও বেশি ভালোবাসতেন মানুষকে এবং মানুষের পৃথিবীকে। তাঁর কাছে থিয়েটার নিজে কোনো উদ্দেশ্য ছিল না, ছিল উদ্দেশ্য সাধনের একটা উপায়। আর সেই উদ্দেশ্য ছিল এক শোষণহীন, ন্যায়পরায়ণ এবং যুক্তিবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের চিন্তার ক্ষমতা অসীম, কিন্তু পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা সেই চিন্তার ক্ষমতাকে ভোঁতা করে দিয়ে তাকে একজন নিষ্ক্রিয় ভোক্তা বানিয়ে রাখে। ব্রেখটের আজীবনের সংগ্রাম ছিল শিল্পের মাধ্যমে মানুষের সেই ঘুমন্ত চিন্তাশক্তিকে জাগিয়ে তোলা। তাই তিনি থিয়েটারের আরামদায়ক, অন্ধকার জগৎ থেকে আমাদের বের করে এনে বাস্তব পৃথিবীর কড়া, নির্মোহ আলোয় দাঁড় করিয়ে দিতে চেয়েছিলেন।
তাছাড়া লাইফ অফ গ্যালিলিও (১৯৪৩-এর প্রথম সংস্করণ), দ্য গুড পার্সন অফ সেৎচুয়ান (১৯৪১), দ্য রেসিস্টেবল রাইজ অফ আর্তুরো উই (১৯৪১), দ্য ককেশিয়ান চক সার্কেল (১৯৪৪) ইত্যাদি নাটক রচনা করেন। এছাড়াও অসংখ্য কবিতা, ছোটগল্পসহ সাহিত্য রচনা করে বিশ্বে খ্যাতি অর্জন করেন। তার বিখ্যাত নাটক ও লেখার ওপর ভিত্তি করে এবং তার চিত্রনাট্যে বেশ কিছু চলচ্চিত্র নির্মিত হয়।
সাম্যবাদ বিশ্বাসী এবং পুঁজিবাদ, যুদ্ধবিরোধী সমালোচনা ও লেখনীর জন্য একবার ১৯৩৩ সালে জার্মানি থেকে ,আবার ১৯৪৭ সালে আমেরিকা থেকে নির্বাসনে যেতে বাধ্য হয়। ব্যক্তিগতচরিত্রের নানা ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এ বিশ্ববিখ্যাত নাট্যকার শোষণ বঞ্চনার বিরুদ্ধে ন্যায়-নিষ্ঠ মানবতার পক্ষে একজন আপোষহীন সামাজিক যোদ্ধা।
বের্টোল্ট ব্রেখট ১৯৫৬ সালের বসন্তে হৃদরোগে আক্রান্ত হন। সেই বছরের ১৪ আগস্ট, মাত্র ৫৮ বছর বয়সে, তিনি হৃদযন্ত্র বিকল হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
আজ ১৪ আগস্ট এ খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিত্বের প্রয়াণ দিবসে তাঁর ক্ষুরধার জীবন সংগ্রামের প্রতি চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন করছে।

Address

TSC, University Of Dhaka
Dhaka

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Contact The Organization

Send a message to চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র:

Shortcuts

Share