11/06/2025
"কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি" (Sexual Harassment at Workplace)
যৌন হয়রানি কর্মক্ষেত্রে একটি লুকায়িত কিন্তু অত্যন্ত গুরুতর সমস্যা। এটি শুধু নারীদের জন্যই নয়, যেকোনো লিঙ্গের মানুষকে মানসিক, শারীরিক ও সামাজিকভাবে বিপর্যস্ত করতে পারে। বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অনেক দেশে নারীরা কর্মক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের হয়রানির শিকার হন, যা তাঁদের পেশাগত অগ্রগতি ও আত্মবিশ্বাসে প্রভাব ফেলে। কয়েকদিন আগে জানতে পারলাম একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ষাটোর্ধ্ব এক কর্মকর্তা তার এক নারী সহকর্মীকে নিয়ে একই গাড়িতে অন্য একটি অফিসে যাওয়ার সময় গায়ে হাত দেয়। যদিও ঐ কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।
যৌন হয়রানির সংজ্ঞা ও ধরন:
যৌন হয়রানি বলতে বোঝায়—অসৌজন্যমূলক মন্তব্য, দৃষ্টিভঙ্গি, স্পর্শ, ইঙ্গিত, বার্তা কিংবা আচরণ যা ভুক্তভোগীকে অস্বস্তিকর ও অপমানজনক পরিস্থিতিতে ফেলে। কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি ও সুরক্ষা আইন ২০২৪: মোতাবেক যৌন হয়রানি হল শিকারের লিঙ্গ বা লিঙ্গের উপর ভিত্তি করে এক প্রকার হয়রানি । এটি আপত্তিকর যৌনতাবাদী বা যৌন আচরণ, মৌখিক বা শারীরিক ক্রিয়াকলাপ, ঘুষ, জবরদস্তি এবং আক্রমণ পর্যন্ত জড়িত থাকতে পারে। জাতিসংঘসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশের আইনে বর্তমানে যেভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে এ অপরাধকে, তার একটা সোজাসুজি বাংলা দাঁড়াবে—এমন সব অনাকাঙ্ক্ষিত শারীরিক, মৌখিক, অমৌখিক বা অন্য কোনো যৌন প্রকৃতিবিশিষ্ট বা লিঙ্গভিত্তিক আচরণ, যা কোনো ব্যক্তির জন্য অনিরাপদমূলক, হুমকিস্বরূপ, অস্বস্তিকর, অপরাধমূলক, বিব্রতকর অথবা অপমানজনক বলে যুক্তিসংগতভাবে প্রতীয়মান হয়। যৌন হয়রানিমূলক আচরণের মূল উপাদানটি হলো, যে ব্যক্তির প্রতি এই আচরণ করা হয়েছে, তার কাছে আচরণটি অনাকাঙ্ক্ষিত বা অনভিপ্রেত।
এর ধরনগুলো হলো:
মৌখিক হয়রানি: অশালীন মন্তব্য, কটূক্তি, আপত্তিকর প্রশ্ন
অলিখিত হয়রানি: অশ্লীল বার্তা, ইমেইল বা ছবি পাঠানো
শারীরিক হয়রানি: অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ, জোরপূর্বক ঘনিষ্ঠতা
মানসিক চাপ: প্রমোশন বা চাকরি দেওয়ার শর্ত হিসেবে যৌন সুবিধা চাওয়া (quid pro quo harassment)
তীব্র নজরদারি ও আড়ালে অপমানজনক মন্তব্যে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট:
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে শুধুমাত্র জানুয়ারি মাসেই উত্ত্যক্তকারীদের মাধ্যমে ১১ জন নারী যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। একই প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটেছে ১৬৫টি, ২০২৩ সালে ১৪২টি।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ এবং “অ্যাওয়ারনেস বাংলাদেশ” পরিচালিত ২০২০ সালের একটি জরিপ অনুযায়ী, কর্মক্ষেত্রে ৫৮% নারী কর্মী শারীরিক বা মানসিকভাবে হয়রানির শিকার হয়েছেন। এছাড়া প্রায় ৪৩% নারীর কর্মস্থলে যৌন হয়রানির ঘটনাও ঘটেছে।
বাংলাদেশে নারীর কর্মসংস্থানের হার ধীরে ধীরে বাড়লেও, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ এখনো অনেক প্রতিষ্ঠানে অনুপস্থিত। পোশাক শিল্প, অফিস, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমনকি মিডিয়া—সবখানেই যৌন হয়রানির ঘটনা প্রায়শ ঘটে।
২০০৯ সালে হাইকোর্ট যৌন হয়রানির সংজ্ঞা নির্ধারণ করে একটি নির্দেশনা দেয়, যেখানে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে অভিযোগ কমিটি গঠনের নির্দেশনা দেওয়া হয়। তবে বাস্তবে অনেক প্রতিষ্ঠানে এখনো এই নির্দেশনার সঠিক বাস্তবায়ন নেই। কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি ও সুরক্ষা আইন ২০২৪ প্রণীত ও বাস্তবায়নে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রভাব:
আত্মবিশ্বাস ও মানসিক স্বাস্থ্য নষ্ট হয়
কর্মক্ষেত্র ত্যাগের প্রবণতা তৈরি হয়
কর্মী ও প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক নষ্ট হয়
কর্মক্ষমতা হ্রাস পায়
সামাজিকভাবে অপমানিত ও বিচ্ছিন্ন অনুভব করে ভুক্তভোগী
প্রতিরোধ ও করণীয়:
1. প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠন করা
2. সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণ ও ওয়ার্কশপ চালু করা
3. হয়রানির অভিযোগ জানানোর জন্য নিরাপদ ও গোপন ব্যবস্থা রাখা
4. আইন অনুযায়ী দোষীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ
5. সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমে এই ইস্যু নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করা
6. ভুক্তভোগীদের মানসিক সহায়তা ও পুনর্বাসনের সুযোগ সৃষ্টি করা
কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি শুধু একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নয়, এটি একটি সামাজিক ব্যাধি। একটি নিরাপদ ও মর্যাদাসম্পন্ন কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হলে সমাজ, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র—সব পক্ষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা দরকার। বিশেষ করে নারীদের আত্মমর্যাদা রক্ষায় আমরা যেন কখনো পিছিয়ে না থাকি।
সংকলিত ১১/৬/২০২৫