29/03/2026
ম্যাকডোনাল্ডস ফাস্ট ফুড নাকি রিয়েল এস্টেট কোম্পানি?
ম্যাকডোনাল্ডসের গল্পটা স্রেফ বার্গার বিক্রির চেয়ে অনেক বেশি গভীর এবং ধূর্ত। একে বলা যায় ইতিহাসের অন্যতম সেরা বিজনেস ম্যানিপুলেশন। সাধারণ মানুষের চোখে ম্যাকডোনাল্ডস একটা ফাস্ট ফুড চেইন হলেও কর্পোরেট দুনিয়ায় তারা মূলত একটা ল্যান্ড লর্ড বা জমিদার কোম্পানি। এই পুরো সিস্টেমটা দাঁড়িয়ে আছে হ্যারি সোনবোর্নের মস্তিষ্কপ্রসূত একটা ফর্মুলার ওপর। সে রে লরক-কে বুঝিয়েছিল যে, বার্গার বেঁচে বড়জোর কোটিপতি হওয়া যায়, কিন্তু বিলিয়নিয়ার হতে হলে জমির মালিকানা হাতে রাখতে হবে।
ম্যাকডোনাল্ডস যখন কোনো এলাকায় ব্যবসা করার সিদ্ধান্ত নেয়, তারা প্রথমেই সেই এলাকার সবচেয়ে দামি আর স্ট্র্যাটেজিক জমিটা কিনে নেয়। তারা জানে যে, ভালো লোকেশন মানেই সেখানে কাস্টমার আসবেই। এরপর তারা ওই জমিটা একজন ফ্র্যাঞ্চাইজিকে লিজ দেয়। এই লিজের চুক্তিটা এমনভাবে করা হয় যে, ফ্র্যাঞ্চাইজিকে প্রতি মাসে একটা নির্দিষ্ট মোটা অঙ্কের ভাড়া দিতেই হয়, আর তার ওপর বার্গার বিক্রির লাভের একটা পার্সেন্টেজও ম্যাকডোনাল্ডসকে দিতে হয়। অর্থাৎ, বার্গার বিক্রি হোক বা না হোক, জমিওয়ালা হিসেবে ম্যাকডোনাল্ডসের পকেটে টাকা আসা কেউ আটকাতে পারে না। অনেক সময় দেখা যায় বার্গার বিক্রি করে একজন ফ্র্যাঞ্চাইজি যা আয় করছে, তার চেয়ে বেশি আয় করছে ম্যাকডোনাল্ডস কেবল ওই জায়গার ভাড়া থেকে।
রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় এমন কিছু লিগ্যাল লুপহোল আছে যা অন্য কোনো ব্যবসায় নেই। ম্যাকডোনাল্ডস তাদের হাজার হাজার আউটলেটের বিল্ডিং আর সাজসজ্জার ওপর 'ডেপ্রিসিয়েশন' দাবি করে। আইনের ভাষায় তারা দেখায় যে, প্রতি বছর তাদের বিল্ডিংগুলোর মান কমছে বা পুরনো হচ্ছে, তাই সেই পরিমাণ টাকা তারা তাদের মোট লাভ থেকে মাইনাস করে দেয়। এই টাকাটা কিন্তু তাদের পকেট থেকে খরচ হচ্ছে না, এটা স্রেফ কাগজের হিসাব। এর ফলে তারা বিশাল অংকের প্রফিট করার পরেও সরকারকে দেখাতে পারে যে, তাদের লাভ অনেক কম হয়েছে। ফলে কয়েকশ কোটি টাকার ট্যাক্স তারা স্রেফ এই একটা চালেই বাঁচিয়ে ফেলে!
তার ওপর রয়েছে লোনের চক্কর। ম্যাকডোনাল্ডস যখন কোনো নতুন জমি কেনে, তারা সেটা নগদ টাকায় না কিনে ব্যাংকের লোনে কেনে। এই বিশাল লোনের যে সুদ তারা ব্যাংকে দেয়, সেটাকে তারা ব্যবসায়িক 'এক্সপেন্স' বা খরচ হিসেবে দেখায়। এতে করে তাদের ট্যাক্স দেওয়ার মতো আয়ের পরিমাণ আরও কমে যায়। অথচ তাদের কেনা ওই জমির দাম দশ বছরে দশ গুণ বেড়ে যায়। যখন তারা ওই জমি অনেক বছর পর বিক্রি করে বা পুনর্মূল্যায়ন করে, তখন তারা '১০৩১ এক্সচেঞ্জ' এর মতো আইন ব্যবহার করে সেই ট্যাক্সটাও অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে দেয়।
সহজ কথায়, তারা এক হাতে জাংক ফুড দিয়ে মানুষের পকেট কাটছে, আর অন্য হাতে জমির মালিক হয়ে সরকারের ট্যাক্স ফাইল নিয়ে খেলছে। এই ডাবল গেমের কারণেই আজ তারা দুনিয়ার অন্যতম সেরা বিজনেস জায়ান্ট।