19/01/2026
সুবোধের খোঁজে-১৬
সুবোধের সন্ধানে,ঢাকার ছায়া আর চিৎকার
আমি জন্মেছি এমন প্রত্যন্ত এক গ্রামে, যেখানে আশা খুব নীরব এবং ক্ষীণ, আর বেঁচে থাকা হলো এক অবিরাম সংগ্রাম। আমার বাবা অন্যের জমিতে কাজ করতেন, আমাদের কিছুই নিজের ছিল না। ক্ষুধা ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী, বারবার মনে করাত,জীবন শুধু বেঁচে থাকা নয়, এটি প্রতিদিনের যুদ্ধে টিকে থাকার নাম। ছোটবেলায় নিজেকে প্রশ্ন করতাম:
এটাই কি জীবন, যেখানে শুধু সৌভাগ্যমানদের জন্য সব কিছু আছে, আর আমাদের ভাগে শুধু নিঃশব্দ কষ্ট?
গ্রামের স্কুলেও পড়াশোনা করার সময় শ্যাম বর্ণের চেহারা হওয়ার কারণে, অনেক কথা শুনতে হতো অনেক কিছু শুনতে হয়েছে, এক সময় পাগলামো করে নিজের চামড়া পরিবর্তন করতে যে চেহারায় এসিড দিয়ে দিয়েছিলাম, এটা ভেবেছিলাম আমার চামড়া পরিবর্তন হয়ে যাবে। ফলে আমার মুখের দুই পাশ এসিডিক বিক্রিয়ায় পুড়ে গেছিল।
এই পোড়া মুখ নিয়ে২০১৮ সালে, আমি আমার গ্রাম থেকে, কিশোরগঞ্জ জেলা তে আসি পড়াশোনা করতে।
মাঝখানের গল্প গুলো ছিল ক্ষুধা, এবং নিজের পোড়া চেহারা নিয়ে কষ্টের গল্প, এবং ২০১৯ সালের এইচএসসি পরীক্ষাতে যখন আমি বসি
পরীক্ষা হলে আমার শরীর ভেঙে পড়ল(কারণ আমি কখনো তিন বেলা ভালো করে খেতে পারিনি, মাঝে মাঝে মুড়ি খেয়ে সারাদিন পার করে দিতে হতো) অসুস্থতার কারণে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়া যায়নি। বছরের পরিশ্রম মুহূর্তে বিলীন হয়ে গেল। এরপর , বন্ধ দরজা। সমাজ এক শব্দে সবকিছু ব্যাখ্যা করল-ব্যর্থতা।
নিজের ব্যর্থতা এবং সবকিছুকে থাকতে অনেকটা আমি ঢাকাতে পালিয়ে আসি,
আমি ঢাকায় এলাম-পরিবারকে সাহায্য করতে, পড়াশোনা করে বড় হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে। ছোট একটি ঘর ভাড়া, হাতে সীমিত টাকা, বড় শহরের ভিড় আর অসংখ্য চ্যালেঞ্জ। কিন্তু এই শহরের কাছ থেকে পেয়েছি- উপহাস, ঘৃণা, অবমাননা, এমন মানুষদের কাছ থেকে যারা আমাকে দেখলই না মানুষের চোখে।
আমি কষ্টে নিজের উপর হাসতাম, এবং ভাবতাম তারা আমাকে কেনই বা ভালোবাসা দিবে? কেনই বা আমার দিকে সম্মানের চোখে তাকাবে? আমি তো সুন্দর নই আমি তো সুদর্শন নই!
আমার মুখ শোক ও ক্লান্তিতে ভরা, চোখগুলো কাঁপছে ক্ষুধা আর অবহেলার কারণে।
তিন বেলা ঠিকমতো খাওয়া না পাওয়ার কারণে আমি ক্ষুধার যন্ত্রণায় অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম , একটা সময় আমি মিরপুরের,যেই মেসে থাকতাম সেখানে সবাই খেয়ে যাওয়ার পরে আমি, পাতিল এর মধ্যে শেষ ভাত টুকু খেতাম অনেকটা না বলে চুরি করার মত,
শরীর ক্রমে ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছিল। রাস্তার পাশে বসে গাড়ির হেডলাইটের আলো দেখতাম,প্রতিটি আলো যেন চলমান জীবনের প্রতীক, আর আমি ছিলাম অদৃশ্য। মনে প্রশ্ন উঠত:
যদি আমি আজ রাতেই হারিয়ে যাই, কি কেউ খুঁজবে আমাকে?
শহরের ভিড়ের মধ্যে থেকেও আমি অদৃশ্য।
আমার কাছে শহরের দেয়ালগুলো একটা আয়নার মতো মনে হতো, যে আয়নাগুলো, আমাকে চিৎকার করে বলতো কে আমি?
রাতে ধুলোমাখা মিরপুরের রাস্তায় হেঁটে হেঁটে যখন বিভিন্ন জায়গাতে, ছোটখাটো কাজ খুজতাম এবং ক্লান্ত হয়ে রাস্তার একপাশে বসে চোখ থেকে অঝোরে পানি পড়তো এবং আমি নিজেকে প্রশ্ন করতাম,
"এই হৃদয়হীন শহরে কি আমি বেঁচে থাকতে পারবো?
আমি কি ক্ষুধার্থ নাকি আমার আশা?"
কিন্তু আমি চাইতাম সমাজকে প্রশ্ন করতে,
ব্যর্থতা আসলে কি? সমাজের চোখে সার্থক হওয়ার মাপকাঠি আসলে কি?
ধীরে ধীরে সুবোধ স্রোতের মধ্যে দাঁড়ানোর ক্ষমতা অর্জন করল। আমি বুঝতে পারলাম, জীবন কোনো ভাঙা রেখা নয়,এটি উত্তরহীন প্রশ্নের মানচিত্র।
আজও আমি কষ্ট বহন করি, আজও প্রশ্ন বহন করি। কিন্তু এখন আমি পালাই না।
আমি এখনও সুবোধের সন্ধানে আছি। শুনছি ঢাকার নিঃশব্দ রাতকে, দেখছি হেডলাইটের আলো ও ঝড়কে। কিন্তু এখন জানি: আমি দাঁড়াতে পারবো এখন যেকোনো ঝড়কে মোকাবেলা করার জন্য।
-- শাহরিয়ার হোসাইন সাগর
Social Entrepreneur
Founder, NextGen