18/05/2025
লিবারেল ইথিক্স অনুযায়ী নারীরা কি উত্তরাধিকার সম্পত্তি দাবী করতে পারে?
নারী সংস্কার কমিশন উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে নারীদের জন্য পুরুষের সমান সম্পদ দাবি করেছে। এই দাবির পেছনে তাদের যুক্তি হল যারা ধর্ম মানে না, তাদের জন্য তো একটা সিভিল ল লাগবে! ঐচ্ছিক। যার খুশি সে নিবে, যার খুশি সে নিবে না।
কিন্তু বাস্তবতা হল–সিভিল ল অনুযায়ী উনারা কোনো সম্পদই পাবে না। সেক্ষেত্রে নারী সংস্কার কমিশনের উচিৎ ছিল যারা কোনো ধর্মীয় আইন মানতে নারাজ, তারা যেন কোনো উত্তরাধিকার সম্পত্তি গ্রহণ না করে, সেই সুপারিশ করা।
বিষয়টা একটু বোঝার চেষ্টা করা যাক। আমরা পশ্চিমের উত্তরাধিকারের মূলনীতিগুলো বিশ্লেষণ করলে সেখানে কয়েকটা মৌলিক বৈশিষ্ট্য দেখতে পাই।
এক; লিবারেলিজমের মূল হল ‘ব্যক্তির’ শ্রেষ্ঠত্ব। ফলে আধুনিকতা প্রকল্পের অর্থনৈতিক সেগমেন্ট পুঁজিবাদে সম্পত্তির উপর ব্যক্তির ইচ্ছা-অনিচ্ছাই চূড়ান্ত। কোন পথে আয় করবে, কোন পথে ব্যয় করবে–দুই ক্ষেত্রেই ব্যক্তি সর্বোচ্চ অথরিটি।
পশ্চিমা দেশগুলো এই নীতির সাথে কনসিস্টেন্সি ধরে রেখেছে। এবং এই কারণেই এ্যাংলো-স্যাক্সন কান্ট্রিগুলোতে অর্থাৎ যুক্তরাজ্য, ওয়েলস ও যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ স্টেটে বাধ্যতামূলক কোনো উত্তরাধিকার আইন নেই। ব্যক্তির উইল সম্পদ বন্টনের সর্বপ্রধান হাতিয়ার।
যার সম্পদ, সে যাকে খুশি তাকে উইল করে দিয়ে যেতে পারে। এমনকি পত্রপত্রিকায় স্ত্রী-সন্তান সবাইকে বঞ্চিত করে কুকুর-বিড়ালকে সমস্ত সম্পত্তি উইল করে যাওয়ার ঘটনা প্রায়ই শিরোনাম হয়।
কেন? কারণ সম্পত্তির মালিক ব্যক্তি। তার ইচ্ছাই সর্বোচ্চ। তার সম্পত্তিতে অন্য কেউ বাধ্যতামূলক মালিকানা-শরিকানা দাবি করতে পারবে না।
দুই; ফ্রান্স-স্পেনের মত দুয়েকটা দেশ বাদে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ অধিকাংশ পশ্চিমা দেশে উত্তরাধিকার মূলত স্পাউস কেন্দ্রিক, সন্তান কেন্দ্রিক না। অর্থাৎ ইসলামে যেমন সম্পদের মূল অংশ সন্তানরা পায়, পশ্চিমে সেটা পায় স্বামী বা স্ত্রী।
যেমন ইংল্যান্ডে কোনো ব্যক্তি মারা গেলে তার সম্পদ প্রথমত বন্টিত হবে তার রেখে যাওয়া উইল অনুসারে। যদি উইল না থাকে, কিংবা উইলটা আইনিভাবে অবৈধ হয়, সেক্ষেত্রে তার রেখে যাওয়া সম্পদ থেকে ৩ লাখ ২৫ হাজার পাউন্ড পায় স্বামী বা স্ত্রী। আজকের বাজারদর অনুযায়ী (পার পাউন্ড ১৬০ টাকা করে ধরে) বাংলাদেশী মুদ্রায় এর পরিমাণ ৫ কোটি ২০ লাখ টাকার বেশি।
বৃটিশ ইন্টেস্টেসি রুলসের এই স্ট্যাচুরি লিগ্যাসি অনুযায়ী স্বামী বা স্ত্রী যে পরিমাণটা পায়, একে বলা হয় Nil-rate Band বা NRB, সরকার চাইলে এই রেট কমবেশি করতে পারে।
এর পর যে অংশ থাকবে, সেখান থেকে প্রথমত সরকার বিপুল অংকের কর কেটে নিবে। সেটা প্রায় ৪০-৪৫ শতাংশ পর্যন্ত হয়। কর কেটে নেওয়ার পর যা বাকি থাকবে, তারও অর্ধেক আবার নিবে স্বামী বা স্ত্রী। অবশিষ্ট ৫০ শতাংশ সন্তানদের মধ্যে সমানভাবে ভাগ হবে।
উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক একজন লোক ৬ কোটি টাকা রেখে মারা গেছে। তো এখান থেকে প্রথমেই স্বামী বা স্ত্রী পেয়ে যাবে পাঁচ কোটি বিশ লাখ টাকা। এর উপর কোনো কর আসবে না। বাকি ৮০ লাখ টাকা থেকে ৪০ লাখ নিবে স্বামী বা স্ত্রী, ৪০ লাখ নিবে সন্তানরা। উভয়েই এই চল্লিশ লাখের উপর সরকার নির্ধারিত ট্যাক্স আদায় করবে।
মোদ্দাকথা–৬ কোটি টাকার মধ্যে স্পাউসই পেয়ে গেল ৫ কোটি ৬০ লাখ! সন্তানরা পাচ্ছে মাত্র ৪০ লাখ।
সন্তানাদির পরিবর্তে স্বামী-স্ত্রীকে প্রাধান্য দেওয়ার পেছনে যেসব যুক্তি, আমরা সেদিকে যাচ্ছি না।
তিন; সন্তানরা যে অংশটুকু পায়, সেখানে ছেলে এবং মেয়ে সমান হারে পায়।
চার; পুরো খৃষ্টান বিশ্বে খৃষ্টধর্মের সুনির্দিষ্ট কোনো উত্তরাধিকার আইন অনুসরণ করা হয়নি। বর্তমানে যেরকম দেশভেদে আইন ভিন্ন ভিন্ন। যেমন জার্মানিতে কিছু অংশ এবং ফ্রান্সে বেশ বড়সড় অংশ আবার সন্তানরা পায়। ইতিহাসের পুরোটা সময় এমনই ছিল। রাজ্যভেদে, রাজাভেদে, সময়ভেদে খৃষ্টান রাজ্যগুলোর উত্তরাধিকার আইনে ব্যাপক তারতম্য ছিল। একটার সাথে আরেকটা কোনো সামঞ্জস্য ছিল না।
তবে প্রায় সব ক্ষেত্রেই মেয়েদের কোনো উত্তরাধিকার ছিল না। ছেলেদের মধ্যেও বৈষম্য ছিল। বহু সাম্রাজ্যেই বড় ছেলে দ্বিগুণ পেত।
অর্থাৎ খৃস্টান অধ্যুষিত অঞ্চলের উত্তরাধিকার আইনে এত বিপুল ব্যবধান ছিল যে একে আসলে খৃষ্টধর্মের আইন বলা যায় না।
পক্ষান্তরে ইসলামি উত্তরাধিকার আইন বিগত দেড় হাজার বছর ধরে অপরিবর্তিত ছিল। পৃথিবীর সব মুসলিম ভূখণ্ডে, মরক্কো থেকে শুরু করে চীন, জাভা থেকে শুরু করে আনাতোলিয়া–সর্বত্র একই আইন অনুসৃত হত। ইতিহাসের কোনো কালে এর কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি।
এখন যদি আমরা নারী কমিশনের প্রস্তবনাটা দেখি, সেখানে দেখতে পাব–উত্তরাধিকার সন্তানকেন্দ্রিক, এই ধারণাটা নেওয়া হয়েছে ইসলাম থেকে। সন্তানদের মধ্যে ছেলে এবং মেয়ে উভয়েই সম্পদ পাবে–এই ধারণাটাও নেওয়া হয়েছে ইসলাম থেকে।
খৃষ্টধর্ম বা হিন্দুধর্ম–কোনোটাতেই মেয়েদের কোনো মিরাস নেই।
কিন্তু ছেলে এবং মেয়ে সমান পাবে–এই অংশটা নেওয়া হয়েছে পশ্চিমের স্পাউসকেন্দ্রিক আইন থেকে।
সব জায়গা থেকে নিজেদের সুবিধাজনক অংশটা নিয়ে যে জগাখিচুড়ি তৈরি করা হয়েছে, তারা একে বলছে–’সিভিল ল’!!
অথচ কমনসেন্সের দাবি হল–তারা যদি সিভিল ল অনুসরণ করতে চায়, প্রকৃত অর্থেই লিবারেলিজম অনুসরণ করতে চায়, তাহলে উত্তরাধিকারের দাবি সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করা উচিৎ। কারণ লিবারেল ইথিক্স অনুযায়ী আপনি কখনোই, কোনোভাবেই আরেকজনের সম্পত্তিতে আপনার বাধ্যতামূলক অংশ নির্ধারণ করতে পারেন না। কখনোই না।
তাছাড়া ইসলামি উত্তরাধিকার আইনে মেয়েদের পাশাপাশি ছেলে, স্বামী বা স্ত্রী, বাবা-মায়েরও বাধ্যতামূলক অংশ রয়েছে। ফলে যেখানে মেয়ে তথাকথিত সিভিল ল অনুযায়ী সম্পদের সিংহভাগে নিজের ভাগ বসাতে চাইবে, অনিবার্যভাবেই সেখানে বাকিদের অধিকার ক্ষুণ্ণ করতে হবে।
দুনিয়ার কোন সিভিল ল এই অনুমতি দেয় যে–আরেকজনের (মৃত ব্যক্তি) সম্পত্তিতে আপনি আপনার বাধ্যতামূলক অংশ রাখবেন, সেটাতে আবার আরও আধ ডজন অংশিদারের অংশ ক্ষুণ্ণ করবেন, তারপর সেটাকে নাম দিবেন–সিভিল ল!!
যদি পরিবারের সব সদস্য স্বেচ্ছায় সমহারে বণ্টন করতে চায়, এতে ইসলাম বাধা দেয় না।
কিন্তু যখন অন্যরা নিজ নিজ প্রাপ্য অংশ নিতে চায়, সেখানে আপনি সবার অধিকার ক্ষুণ্ণ করে নিজের অংশের ষোলো আনা নিয়ে নিতে চাইবেন, একে সিভিল ল এর ছদ্মাবরণে আরেকজনের সম্পত্তি লুটপাট আর লুটেরা বর্গী মেন্টালিটি বাদে কিছুই বলা যায় না।