03/09/2026
🇧🇩 বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা: আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছি?
স্বাস্থ্যসেবা কোনো বিলাসিতা নয়—এটি মানুষের মৌলিক অধিকার
একজন মানুষ যখন হাসপাতালে যান, তিনি শুধু চিকিৎসা নিতে যান না—তিনি সঙ্গে নিয়ে যান তাঁর আশা, আস্থা এবং জীবনের নিরাপত্তার প্রত্যাশা। একজন রোগীর কাছে হাসপাতাল হওয়ার কথা নিরাপত্তার শেষ আশ্রয়স্থল। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় আজ অনেক রোগী ও তাঁদের পরিবারকে চিকিৎসার পাশাপাশি মোকাবিলা করতে হচ্ছে অতিরিক্ত ব্যয়, দীর্ঘ অপেক্ষা, জনবল সংকট, অব্যবস্থাপনা, দালালচক্র, জবাবদিহিতার ঘাটতি এবং কখনো কখনো অনৈতিক আচরণের।
তবে শুরুতেই একটি কথা পরিষ্কার করা জরুরি—বাংলাদেশের সব চিকিৎসক, নার্স কিংবা স্বাস্থ্যকর্মী অনিয়মের সঙ্গে জড়িত নন। অসংখ্য চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও দিন-রাত মানুষের সেবা করে যাচ্ছেন। তাঁদের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা রয়েছে।
আমাদের প্রশ্ন চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে নয়; আমাদের প্রশ্ন সেইসব অনিয়ম, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহিতার অভাবের বিরুদ্ধে, যা একজন রোগীর অধিকারকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার সংকট
সরকারি হাসপাতাল বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসা। কিন্তু সেখানে রোগীর তুলনায় চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি এবং অতিরিক্ত কর্মচাপ একটি বাস্তব সমস্যা।
WHO-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে বাংলাদেশে প্রতি ১০ হাজার মানুষের বিপরীতে চিকিৎসক, নার্স ও মিডওয়াইফ মিলিয়ে মাত্র ১৩ জন ছিল; একই সময়ে বৈশ্বিক মধ্যমা ছিল ৪৯ জন। WHO আরও উল্লেখ করেছে, দেশের স্বাস্থ্যকর্মীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ প্রয়োজনীয় যোগ্যতার ঘাটতিতে রয়েছে।
World Health Organization
আরও আগে WHO-সমর্থিত গবেষণায় বাংলাদেশের সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় বিভিন্ন পর্যায়ে জনবল ঘাটতি ও উচ্চ কর্মচাপের বিষয়টি উঠে এসেছে।
World Health Organization
অর্থাৎ, সমস্যাটি শুধু একজন চিকিৎসকের নয়; সমস্যাটি পুরো ব্যবস্থাপনার।
একজন চিকিৎসকের সামনে যদি অস্বাভাবিক সংখ্যক রোগী থাকে, পর্যাপ্ত নার্স না থাকে, পর্যাপ্ত বেড না থাকে এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি বা সহায়ক জনবল না থাকে—তাহলে কাঙ্ক্ষিত মানের সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
তাহলে সাধারণ রোগীর ভোগান্তি কোথায়?
সরকারি হাসপাতালে একজন সাধারণ রোগীকে অনেক সময় দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করতে হয়। বেডের সংকট দেখা দিলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—সীমিত বেড ও চিকিৎসাসুবিধা কি সবার জন্য সমানভাবে নিশ্চিত হচ্ছে?
কোনো রোগী যদি মনে করেন যে অর্থ, পরিচয়, রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাবের কারণে অন্য কেউ তাঁর আগে সুবিধা পাচ্ছেন, তাহলে শুধু একটি চিকিৎসা-সেবা নয়—রাষ্ট্র ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি তাঁর আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তাই সরকারি হাসপাতালের বেড, আইসিইউ, অপারেশন, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অন্যান্য জরুরি সেবা বরাদ্দে স্বচ্ছ ও যাচাইযোগ্য নীতিমালা এবং জবাবদিহিতা থাকা অত্যন্ত জরুরি।
সরকারি হাসপাতাল থেকে বেসরকারি হাসপাতালে—তারপর?
সরকারি হাসপাতালে দীর্ঘ অপেক্ষা, বেডের সংকট বা কাঙ্ক্ষিত সেবা না পাওয়ার আশঙ্কায় অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতালে চলে যান।
এখানেই শুরু হয় আরেকটি বড় সমস্যা—চিকিৎসার ব্যয়।
বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ উপলব্ধ WHO Global Health Expenditure Database-ভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বাংলাদেশের মোট বর্তমান স্বাস্থ্যব্যয়ের ৭৯.৩১% মানুষের নিজস্ব পকেট থেকে এসেছে (out-of-pocket expenditure)।
World Bank Open Data
এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সংখ্যা।
কারণ একজন নিম্ন বা মধ্যম আয়ের পরিবারের জন্য চিকিৎসা ব্যয় শুধু হাসপাতালের বিল নয়—এর সঙ্গে যুক্ত হয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ওষুধ, অস্ত্রোপচার, আইসিইউ, যাতায়াত, থাকার খরচ এবং কর্মক্ষমতা হারানোর আর্থিক ক্ষতি।
WHO-এর ২০২৫ সালের বাংলাদেশ-সংক্রান্ত UHC আলোচনায় বলা হয়েছে, দেশের Universal Health Coverage Service Coverage Index মাত্র ৫৪/১০০, এবং ২০২৫ সালে প্রায় ৪১.৭% মানুষ out-of-pocket স্বাস্থ্যব্যয়ের কারণে আর্থিক কষ্টের মুখোমুখি হয়েছে—প্রায় ৭ কোটি মানুষ।
World Health Organization
এটা কি আমাদের জন্য সতর্ক সংকেত নয়?
চিকিৎসা কি রোগীর ভয়ের ওপর নির্ভর করবে?
সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর একটি হলো রোগী ও চিকিৎসকের সম্পর্ক।
একজন রোগী যখন চিকিৎসকের কাছে যান, তিনি সাধারণত চিকিৎসাবিজ্ঞানের জটিল বিষয় বোঝেন না। তিনি চিকিৎসকের ওপর আস্থা রাখেন।
তাই রোগীকে তার রোগের প্রকৃতি, সম্ভাব্য ঝুঁকি, বিকল্প চিকিৎসা, অস্ত্রোপচারের প্রয়োজনীয়তা এবং সম্ভাব্য ব্যয় সম্পর্কে সহজ ভাষায় বোঝানো চিকিৎসা-নৈতিকতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বাংলাদেশের ওপর পরিচালিত একটি গবেষণায় জনসাধারণ, রোগী ও চিকিৎসকদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে doctor-patient relationship তুলনামূলকভাবে দুর্বল পাওয়া যায়। গবেষণায় রোগীকে পর্যাপ্ত সময় না দেওয়া, প্রেসক্রিপশন পরিষ্কারভাবে না বোঝানো এবং সামাজিক অবস্থার ভিত্তিতে রোগীর সঙ্গে ভিন্ন আচরণকে সমস্যার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
PubMed
আমরা তাই বলতে চাই—
রোগী কোনো নম্বর নয়।
রোগী কোনো ক্রেতা নয়।
রোগী একজন মানুষ।
অনিয়ম ও কমিশনভিত্তিক রেফারেলের অভিযোগ
বাংলাদেশের বেসরকারি স্বাস্থ্যখাত নিয়েও গবেষণায় উদ্বেগজনক কিছু বিষয় উঠে এসেছে।
BMJ Open-এ প্রকাশিত একটি qualitative study-তে বাংলাদেশে বেসরকারি স্বাস্থ্যখাতে রোগী আনার জন্য দালাল বা broker ব্যবহারের এবং কিছু ক্ষেত্রে পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা প্রতিষ্ঠানে রোগী পাঠানোর সঙ্গে commission-based referral-এর অভিযোগ ও বর্ণনা উঠে এসেছে।
BMJ Open
এখানে অত্যন্ত সতর্কভাবে বলা দরকার—এই গবেষণার তথ্যকে সব চিকিৎসক বা সব হাসপাতালের বিরুদ্ধে সাধারণীকরণ করা যাবে না।
কিন্তু যেখানে এমন অনৈতিক প্রণোদনা রয়েছে, সেখানে প্রশ্ন অবশ্যই উঠবে:
একজন রোগীর জন্য কোনো পরীক্ষা বা চিকিৎসা সত্যিই প্রয়োজনীয়, নাকি এর পেছনে আর্থিক স্বার্থ কাজ করছে?
এই প্রশ্নের উত্তর রোগীর জানার অধিকার রয়েছে।
অতিরিক্ত পরীক্ষা, ওষুধ ও চিকিৎসা ব্যয়
২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ঢাকার সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের ৩৯৯টি প্রেসক্রিপশন বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণায় উভয় ধরনের হাসপাতালেই WHO-এর prescribing indicators থেকে বিচ্যুতি পাওয়া যায়; বিশেষ করে private hospitals-এ polypharmacy বা একাধিক ওষুধ ব্যবহারের হার বেশি ছিল।
PubMed
এখানেও আমাদের বক্তব্য চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে নয়।
বরং প্রশ্ন হলো—
যে পরীক্ষা প্রয়োজন নেই, সেটি কেন হবে?
যে ওষুধ অপরিহার্য নয়, সেটি কেন দিতে হবে?
যে চিকিৎসা পদ্ধতি রোগীর জন্য প্রয়োজনীয় নয়, সেটির আর্থিক বোঝা কেন রোগীর পরিবার বহন করবে?
প্রতিটি চিকিৎসা সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত রোগীর স্বার্থ ও চিকিৎসাগত প্রয়োজন, আর্থিক লাভ নয়।
তাহলে সমাধান কী?
শুধু চিকিৎসকদের দোষারোপ করে এই সমস্যার সমাধান হবে না।
প্রয়োজন একটি সমন্বিত স্বাস্থ্যব্যবস্থা সংস্কার।
আমাদের দাবি হতে পারে—
১. সরকারি হাসপাতালে পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স ও সহায়ক জনবল নিশ্চিত করতে হবে।
২. বেড, ICU, অপারেশন ও জরুরি চিকিৎসা বরাদ্দে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
৩. হাসপাতালকেন্দ্রিক দালালচক্র ও অবৈধ কমিশন প্রথার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
৪. বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের চিকিৎসা ব্যয় ও সেবার মানের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে।
৫. অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা, ওষুধ ও চিকিৎসা ব্যয়ের বিরুদ্ধে পেশাগত ও প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি বাড়াতে হবে।
৬. রোগীকে রোগ, চিকিৎসা-পদ্ধতি, ঝুঁকি ও ব্যয় সম্পর্কে পরিষ্কার তথ্য দেওয়া বাধ্যতামূলক করতে হবে।
৭. চিকিৎসকদেরও পর্যাপ্ত জনবল, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, প্রশিক্ষণ ও যুক্তিসঙ্গত কর্মপরিবেশ দিতে হবে। কারণ অতিরিক্ত কর্মচাপও চিকিৎসাসেবার মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
World Health Organization
৮. রোগীর অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্তের জন্য স্বাধীন ও কার্যকর grievance redress mechanism গড়ে তুলতে হবে।
৯. সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতেই রোগীর অধিকার, informed consent এবং privacy-কে গুরুত্ব দিতে হবে।
১০. স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে এমনভাবে সংস্কার করতে হবে, যাতে একজন মানুষ চিকিৎসা নিতে গিয়ে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে না যায়।
শেষ কথা
বাংলাদেশ চিকিৎসাক্ষেত্রে অনেক অগ্রগতি অর্জন করেছে—এটি অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু সেই অগ্রগতির পাশাপাশি স্বাস্থ্যব্যবস্থায় যে কাঠামোগত দুর্বলতা, আর্থিক চাপ, জনবল সংকট, সেবার বৈষম্য এবং জবাবদিহিতার সমস্যা রয়েছে, সেগুলোও আমাদের স্বীকার করতে হবে। WHO-ও বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় অগ্রগতির পাশাপাশি এই গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জগুলোর কথা উল্লেখ করেছে।
World Health Organization
আমরা চিকিৎসকদের শত্রু নই।
আমরা সৎ চিকিৎসকের পাশে আছি।
আমরা স্বাস্থ্যকর্মীদের সম্মান করি।
আমরা চাই চিকিৎসকের মর্যাদা আরও বৃদ্ধি পাক।
কিন্তু একই সঙ্গে আমরা চাই—
অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হোক।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হোক।
দালালচক্র বন্ধ হোক।
অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বন্ধ হোক।
রোগীর সঙ্গে অমানবিক আচরণ বন্ধ হোক।
চিকিৎসায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত হোক।
কারণ একজন মানুষ যখন হাসপাতালের দরজায় পৌঁছান, তখন তাঁর পরিচয় হওয়া উচিত শুধু “রোগী”—তিনি ধনী না গরিব, ক্ষমতাবান না সাধারণ, সেটি যেন চিকিৎসার অধিকারের ক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য সৃষ্টি না করে।
স্বাস্থ্যসেবা কোনো পণ্য নয়।
স্বাস্থ্যসেবা মানুষের অধিকার।
বাংলাদেশের মানুষের জন্য আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত—
“মানবিক চিকিৎসা, সবার জন্য সমান অধিকার এবং একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থা।”
মোঃ আওলাদ হোসেন
নির্বাহী পরিচালক
Society for Human Rights
পরিচালক (আইন ও সালিশ)
মানুষের জন্য আইনি সহায়তা ফাউন্ডেশন।
তথ্যসূত্র
WHO Bangladesh; WHO Global Health Expenditure Database/World Bank; BMJ Open; Health Science Reports; এবং PubMed-indexed গবেষণা।