The main goal of this social platform is to uphold the rights of the citizens of Bangladesh - protecting their human and democratic rights, ensuring justice and equality. সরকারের জুলুম, নির্যাতন বন্ধ, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা ও ফ্যাসিবাদ প্রতিরোধের অঙ্গীকার নিয়ে গঠিত এই ‘ন্যাশনাল কমিটি ফর সিভিল রাইটস’ বা নাগরিক অধিকার রক্ষা জাতীয় কমিটি । সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ইনসাফ কায়েম হলো এই প্লাটফর্মের ম
ূল ভিত্তি । এর মাধ্যমে সরকারের জুলুম, নির্যাতন বন্ধ, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা ও ফ্যাসিবাদ প্রতিরোধ করতে দেশে-বিদেশে অবস্থানরত প্রত্যেক সচেতন বাংলাদেশীর কাছে জাগরণের বার্তা পৌঁছাতে সচেষ্ট থাকবে ।
আমরা বাংলাদেশে বিভাজনের রাজনীতি আর চাই না। আমরা চাই ধ্বংসাত্মক ও অপরিণামদর্শী রাজনীতির দ্রুত অবসান। আমরা এগিয়ে যেতে চাই। সেই লক্ষ্যে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নাগরিক ও মানবিক অধিকারকে সমুন্নত রেখে জনগণের ন্যায়সঙ্গত লড়াই-সংগ্রামকে যৌক্তিক পরিণতির দিক নিয়ে যাওয়ার পথ নির্ধারণ করার জন্য সমাজের সর্বস্তরে আমরা অব্যাহতভাবে সংলাপ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।
উপনিবেশবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, আধিপত্যবাদ, ফ্যাসিবাদবিরোধী সংগ্রামে সদা-সোচ্চার ও লড়াকু জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্য ধারণ করি। ভাষা, স্বাধিকার ও স্বাধীনতার মহান যুদ্ধে বিজয়ী জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার আমরা উত্তরসূরি। সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সবার প্রতি ইনসাফ নিশ্চিত করতে সক্ষম একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কায়েম করার জন্য সদা সংগ্রামী জনগণের পাশে থেকে আমরা নিরন্তর লড়াই-সংগ্রাম করে যাচ্ছি। বাক, ব্যক্তি, বিবেক, চিন্তা ও মতপ্রকাশ এবং সাংস্কৃতিক বিকাশ ও ধর্মচর্চার স্বাধীনতা সমুন্নত রেখে নিজেদের আত্মপরিচয় এবং নৈতিক শক্তিকে দৃঢ় করতে আমরা বদ্ধপরিকর; বিশ্বসভায় নিজেদের স্বাতন্ত্র্য ও সার্বভৌমত্ব যে কোনো ত্যাগের বিনিময়ে মরণপণ রক্ষা করতে আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
১. বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং ইনসাফ বা সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সক্ষম একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের জন্য আমরা স্বাধীনতা যুদ্ধ করেছিলাম, স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘোষণাপত্রই তার প্রমাণ। অথচ আমাদের সে আশা পূর্ণ হয়নি। একদলীয় শাসন, বেসামরিক ও সামরিক একনায়কতন্ত্র কায়েম এবং মৌলিক নাগরিক ও মানবিক অধিকার বারবার লঙ্ঘন ও অস্বীকার করা হয়েছে, গণতন্ত্রের আত্মাকে বারবার হত্যা করা হয়েছে এবং এরই মধ্যে সংবিধানের বিতর্কিত পঞ্চদশ সংশোধনীর মধ্য দিয়ে একটি দেশের সংবিধানকে দলীয় ম্যানিফেস্টোতে পরিণত করা হয়েছে। ধর্মপ্রাণ জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে যেমন অস্বীকার করা হয়েছে, একইভাবে বাঙালি ছাড়া অন্য সব ক্ষুদ্রজাতিসত্তার অধিকারও স্বীকার করা হয়নি। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিয়োজন ঘটিয়ে রাজনীতিতে সংঘাতের শর্ত তৈরি করা হয়েছে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের নামে অস্বচ্ছ বিতর্কিত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অভিযুক্তের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকারকে ক্ষুণ্ন করা হয়েছে। বিরোধী দল ও মতকে নজিরবিহীন নৃশংসতায় দমনের অপচেষ্টা, রাষ্ট্রীয় ফ্যাসিবাদের পাশাপাশি শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের নামে সামাজিক ফ্যাসিবাদ উগড়ে দেয়া, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর সরকারদলীয় নিপীড়ন, মুক্তিযুদ্ধের প্রতিপক্ষ হিসেবে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্ম ইসলামকে দাঁড় করিয়ে অবমাননার হিংস্র আয়োজন বাংলাদেশের গণতন্ত্রপ্রিয় ধর্মপ্রাণ জনগোষ্ঠীকে অস্তিত্বের প্রান্তসীমায় উপনীত করা হয়েছে। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকে গুলি চালিয়ে স্তব্ধ করার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অসভ্য ঘোষণা, বিরোধী দলের মিছিল-সমাবেশে পুলিশের নির্বিচার গুলি, দলীয় কার্যালয়ে তালা দেয়া ও হামলা করে নেতাকর্মীদের গণগ্রেফতার এবং তাদের ডাণ্ডাবেড়ি পরিয়ে আদালতে হাজির করানোর মতো নজিরবিহীন পৈশাচিকতা প্রত্যক্ষ করে জাতি স্তম্ভিত। গত কয়েকদিনে পুলিশের গণহত্যায় দু’শতাধিক সর্বস্তরের মানুষ, আলেম, মুসল্লি, কৃষক, ছাত্র গৃহবধূ নিহত হয়েছেন। প্রতিদিন পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারাচ্ছে মানুষ এবং প্রতিটি জনপদ আজ রাষ্ট্র-সন্ত্রাস তাড়িত। বাংলাদেশের সামগ্রিক জনজীবন আজ স্থবির, ভীতসন্ত্রস্ত্র। ফ্রিডরিশ নিটেশর বিকৃত মনের সৃষ্টি ‘শ্বেত জানোয়ার’-এর শ্রেষ্ঠত্বের বহুবিতর্কিত তত্ত্ব হিটলার তার ‘মেইন ক্যাস্ফ’ গ্রন্থে নতুন মোড়কে পরিবেশন করে সমগ্র বিশ্বের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছিলেন। তেমনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ ধারণা কার্যত ‘ডিজিটাল ফ্যাসিবাদ’ কায়েমের হাতিয়ারে পর্যবসিত। ক্ষমতায় থেকে যাওয়ার অভীলিপ্সায় শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগ তথা মহাজোটভুক্ত দলগুলো সভ্যতা-স্বীকৃত মানবাধিকারকে চ্যালেঞ্জ করেছে।
২. অগণতান্ত্রিক এবং গণবিরোধী কু-শাসনের সর্বব্যাপী বিস্তারে রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র, মৌলিক ও মানবাধিকার আজ চরমভাবে বিপন্ন। অর্থনীতি, মহাজোট সরকারের চার বছরের বেশি শাসনকালে নতজানু বৈদেশিক চুক্তি সম্পাদন, সীমান্তে প্রায় প্রতিদিন ভারতীয় বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশী হত্যার মচ্ছবকে উপেক্ষা, সরকারের পরোক্ষ মদতে ২০০৯-এর ২৫ ফেব্রুয়ারি বিডিআরে নিয়োজিত ৫৬ বীর সেনা কর্মকর্তাকে নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ধসিয়ে দেয়া, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় চরম ব্যর্থতা, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের লাগাতার বর্বরতা এবং হত্যাকাণ্ড, প্রশাসন ও বিচার বিভাগের নির্লজ্জ দলীয়করণ, পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির আন্তর্জাতিক অভিযোগ আমলে না নেয়া, শেয়ারবাজার থেকে লক্ষ কোটি টাকার লুটেরাদের বিচার না করা, হলমার্ক ডেসটিনির কেলেঙ্কারিতে সরকারি তরফে আনুকূল্য প্রদান, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং গুমের তাণ্ডব মহাজোট সরকারের চার বছরেরও বেশি শাসনকালকে কালিমাযুক্ত করে ফেলেছে। নির্লজ্জ দলীয়করণ, আক্রোশ, প্রতিহিংসা ও একদেশদর্শিতায় রাষ্ট্রের তিনটি স্তম্ভ যথাক্রমে আইন প্রণয়ন, বিচার ও নির্বাহী বিভাগ আজ বে-ইনসাফিতে ডুবে গেছে। গণমাধ্যম অর্থাত্ চতুর্থ স্তম্ভের একাংশ এবং সুশীল সমাজের খানিকটাও আজ ফ্যাসিবাদের প্রতি নিরুচ্চার মুগ্ধতায় আবিষ্ট। গণহত্যা এবং মানবতাবিরোধী অসভ্যতাকে আড়াল করে তথ্যসন্ত্রাস দেগে দেয়া হয়েছে। অত্যাচারী অগণতান্ত্রিক শাসককুলের কাছে ‘তথ্য হলো এমন এক বস্তু যা অপরকে ঘায়েল করার জন্য জড়ো করা হয় এবং নিজেদের বাঁচানোর জন্য অদৃশ্য করা বা গুলিয়ে দেয়া যায়।’ অস্থিরতা, ঘৃণা ও জিঘাংসা উসকে দিতে চমকে দেয়া তথ্যের পুরিয়া যেন ক্ষমতাসীনদের একমাত্র অবলম্বন। কতক মিডিয়ায় অমানবিক নিষ্ঠুরতা প্রদর্শিত হচ্ছে বুক ফুলিয়ে, ফাঁসি, জবাই, খতমের দাবিদাররা যেন হিটলারের সেই ব্রাউনশার্ট বাহিনী। অপরদিকে গত চার বছরে মিডিয়া দলনে সরকারের উগ্রতায় নির্যাতিত সাংবাদিকদের সংখ্যা দু’হাজারের মতো। প্রতিদিন সাংবাদিকরা আইনপ্রয়োগকারী অথবা শাসকদলীয় ক্যাডারদের হাতে নির্যাতিত হচ্ছেন। সাংবাদিক খুন হয়েছে। ভিন্নমতের কারণে কবি, লেখক, শিল্পীদের ওপর পীড়ন, পেশাজীবীদের হয়রানি ও চাকরিচ্যুতি ত্রিশের দশকে ফ্যাসিবাদের জনক মুসোলিনির সভ্যতাবিরোধী কাণ্ডকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
৩. বর্তমান সরকারের কারাগারে আজ লক্ষ লক্ষ রাজবন্দি, আদালত ও থানার মামলায় অগণন রাজনৈতিক নেতাকর্মী আসামি। জাতির বরেণ্য ব্যক্তিত্বরাও আজ রাষ্ট্রীয় রোষানলমুক্ত নন।
৪. জগদ্বিখ্যাত বুদ্ধিজীবী রোমাঁ রোলা এবং অঁরি বারব্যুসের সেই ‘মুক্ত মানবাত্মার নিকট আবদেন’ (১৯২৭) শীর্ষক খোলা চিঠিতে বলেছিলেন, ‘আমরা সর্বত্র লক্ষ করছি, ফ্যাসিবাদের নামে স্বাধীনতার সব বিজয়কে ধ্বংস নতুবা বিপদাপন্ন করা হচ্ছে। সংগঠন গড়ার অধিকার, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, মতপ্রকাশ ও বিবেকের স্বাধীনতা, যা শত শত বছরের আত্মত্যাগ ও আয়াসে অর্জিত হয়েছে, আজ সেই সবকিছুকেই নির্দয়ভাবে নির্মূল করা হয়েছে। প্রগতির এই দেউলিয়া অবস্থায় আমরা আর নীরব দর্শকের ভূমিকায় থাকতে পারি না। নিষ্ক্রিয় ও পক্ষপাতশূন্য থাকা আর নিরাপদ নয়।’ আজকের বাংলাদেশের চলমান ফ্যাসিবাদে আমরাও আর নিরুত্তর থাকতে পারি না। বুদ্ধিজীবী ও পেশাজীবী মাত্রই ফ্যাসিস্ট শাসনের বিরোধী। তিরমিযী শরিফে হজরত ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত আছে : ‘আফদাদুল জেহাদে কালিমাতু হাক্কিন ইনদা সুলতানিন জায়েরিন’; অর্থাত্ অত্যাচারী শাসকের সামনে হক কথা বলা হচ্ছে উত্তম জিহাদ।
আত্মপ্রকাশের স্বাধীনতা মানবসমাজের অন্যতম সাধনা হলেও সেই স্বাধীনতার কণ্ঠরোধ প্রতিদিন প্রবল হয়ে উঠেছে। এই অমানবিকতাকে চূড়ান্ত প্রত্যাঘাতে স্তব্ধ করতেই হবে। মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ইনসাফ কায়েমে সোচ্চার হওয়া এখন মূল কর্তব্য।
৫. অবিলম্বে গণহত্যা, পুলিশি বর্বরতা, আল্লাহ ও রসুলবিরোধী প্রচারণা বন্ধের দাবি জানাচ্ছি । একইসঙ্গে বর্বরতার প্লাবনে নিমজ্জমান বাংলাদেশকে উদ্ধারে আন্তর্জাতিক অভিজন সমাজের সমর্থন প্রত্যাশা করছি । সব মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ড বন্ধের পাশাপাশি গ্রেফতারকৃত রাজবন্দি, বুদ্ধিজীবী ও পেশাজীবীদের মুক্তি এবং সব মিথ্যা হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারের দাবি করছি। ফ্যাসিজমের তীব্র সুরায় যুবশক্তির একাংশকে উন্মত্ত করে তোলার অপচেষ্টা থেকে কুচক্রীদের বিরত থাকারও আহ্বান জানাই । আমাদের গভীর উপলব্ধি হচ্ছে, গণহত্যা ও ফ্যাসিবাদ চাপিয়ে দিয়ে বর্তমান সরকার দেশময় জিঘাংসা, অনৈক্য সর্বোপরি গৃহযুদ্ধাবস্থা তৈরি করেছে। এই বিপজ্জনক পরিস্থিতি থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে সমাজের সর্বস্তরে সংলাপ চালিয়ে যেতে হবে।
৬. আমরা মনে করি, বর্তমান ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে নতুনভাবে গণতান্ত্রিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই। গণতন্ত্র হচ্ছে এমন একটি রাষ্ট্র যেখানে মৌলিক মানবিক ও নাগরিক অধিকার হরণ বা লঙ্ঘন করার কোনো অধিকার বা এখতিয়ার রাষ্ট্রের থাকে না বা নাগরিক এ ধরনের কোনো দানবীয় ক্ষমতা রাষ্ট্রকে দেয় না। অর্থাত্ নির্বাহী বিভাগ, আইন প্রণয়নী সংসদ বা বিচার বিভাগ কারোরই এমন কোনো ক্ষমতা থাকতে পারে না যাতে নাগরিকদের মৌলিক মানবিক অধিকার হরণ করা যায়।
স্বাধীনতার মূল চেতনা রূপায়নে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের সর্বস্তরে ইনসাফ কায়েমে সমগ্র জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করাই আমাদের প্রধান কাজ।