17/05/2025
২০২৫ সালের ১৩ মে মধ্যরাতে, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার “রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ, ২০২৫” জারির মাধ্যমে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বিলুপ্ত করেছে। এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের কর প্রশাসনের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এনবিআর-এর পরিবর্তে দুটি নতুন বিভাগ—রাজস্ব নীতি বিভাগ এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ—গঠন করা হয়েছে। এই সংস্কারের লক্ষ্য হলো কর ব্যবস্থাকে আধুনিক, স্বচ্ছ ও দক্ষ করা, রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানো এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা। এই নিবন্ধে এই সংস্কারের তাৎপর্য, প্রভাব এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করা হলো।
এনবিআর বিলুপ্তির পটভূমি
১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বাংলাদেশের কর প্রশাসনের কেন্দ্রীয় সংস্থা ছিল। এটি আয়কর, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) এবং কাস্টমস শুল্ক সংগ্রহের দায়িত্ব পালন করত। তবে, দীর্ঘদিন ধরে এনবিআর-এর বিরুদ্ধে অদক্ষতা, দুর্নীতি এবং ডিজিটালাইজেশনের অভাবের অভিযোগ উঠে আসছিল। বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত (প্রায় ৭%) প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই প্রেক্ষাপটে, সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত ১৬%-এ উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে এই সংস্কারের পথে হাঁটছে।
নতুন কাঠামো: রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ অধ্যাদেশের মাধ্যমে এনবিআর-এর কার্যক্রম দুটি স্বতন্ত্র বিভাগে বিভক্ত করা হয়েছে:
রাজস্ব নীতি বিভাগ
দায়িত্ব: কর নীতি প্রণয়ন, আইন ও বিধিমালা তৈরি, আন্তর্জাতিক কর চুক্তি ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজস্ব পরিকল্পনা।
লক্ষ্য: আন্তর্জাতিক মানের নীতি গ্রহণের মাধ্যমে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নত করা।
প্রভাব: নীতি প্রণয়ন ও সংগ্রহের দায়িত্ব পৃথক করায় দুর্নীতি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমবে।
রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ
দায়িত্ব: ভ্যাট, আয়কর, কাস্টমস শুল্ক সংগ্রহ, কর পরিদর্শন, নিরীক্ষা এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে করদাতা সেবা প্রদান।
লক্ষ্য: ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং কর ফাঁকি রোধ।
প্রভাব: স্বয়ংক্রিয় নিরীক্ষা ও অনলাইন সেবার মাধ্যমে করদাতাদের জন্য প্রক্রিয়া সহজ হবে।
এই দুই বিভাগ অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাজ করবে এবং তাদের কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য একটি উচ্চ-পর্যায়ের কমিটি গঠন করা হতে পারে।
Article content
এনবিআর বিলুপ্তির তাৎপর্য
আধুনিকীকরণ ও ডিজিটালাইজেশন: পুরোনো ব্যবস্থায় ম্যানুয়াল প্রক্রিয়া ও কাগজভিত্তিক কাজের প্রাধান্য ছিল। নতুন বিভাগগুলো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের উপর জোর দেবে, যেমন: অনলাইন রিটার্ন দাখিল, স্বয়ংক্রিয় নিরীক্ষা এবং ডাটা-ভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ। এটি করদাতাদের সময় ও খরচ বাঁচাবে।
দুর্নীতি হ্রাস: এনবিআর-এর বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। নীতি প্রণয়ন ও সংগ্রহের দায়িত্ব পৃথক করায় স্বচ্ছতা বাড়বে এবং অপব্যবহারের সুযোগ কমবে।
রাজস্ব বৃদ্ধি: বাংলাদেশের রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানোর জন্য এই সংস্কার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর সুপারিশ অনুযায়ী, নতুন কাঠামো কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে সহায়ক হবে।
আন্তর্জাতিক মান: এই সংস্কার বাংলাদেশের কর ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক মানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করবে, যা বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সহায়ক হবে।
চ্যালেঞ্জ ও সমালোচনা
যদিও এই সংস্কারকে অনেকে যুগান্তকারী বলছেন, তবে এটি বাস্তবায়নে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে:
প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামো: নতুন বিভাগগুলোর জন্য ডিজিটাল অবকাঠামো তৈরি এবং কর্মীদের প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।
বিরোধিতা: এনবিআর-এর কিছু কর্মকর্তা এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন, দাবি করে যে এটি তাড়াহুড়ো করে এবং তাদের মতামত উপেক্ষা করে করা হয়েছে।
জনসচেতনতা: করদাতাদের মধ্যে নতুন ব্যবস্থা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন, বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায়।
সময়: এই সংস্কারের পূর্ণাঙ্গ ফলাফল পেতে সময় লাগবে, যা অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
এই সংস্কার বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে:
কর ব্যবস্থা আরও ব্যবসাবান্ধব হবে, যা দেশীয় ও বিদেশী বিনিয়োগ বাড়াবে।
ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে করদাতারা দ্রুত ও সহজে সেবা পাবেন।
রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ায় সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে।
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পাওয়ায় জনগণের আস্থা বাড়বে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বিলুপ্তি এবং নতুন দুটি বিভাগের গঠন বাংলাদেশের কর ব্যবস্থায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এই সংস্কার শুধু প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়, বরং দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে শক্তিশালী করার একটি সুযোগ। তবে, এর সাফল্য নির্ভর করবে সঠিক পরিকল্পনা, দক্ষ বাস্তবায়ন এবং সকল স্টেকহোল্ডারের সহযোগিতার উপর। আমরা যদি এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারি, তবে বাংলাদেশ একটি সমৃদ্ধ ও স্বচ্ছ অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাবে।