22/01/2026
বিচার বিভাগ কেন নিজের স্বাধীনতা রক্ষা করতে পারছে না?
বিচার বিভাগকে আমরা স্বাধীন বলি, কিন্তু বাস্তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—বিচার বিভাগ কি আদৌ নিজেকে স্বাধীন রাখতে চায়? ইতিহাস আমাদের বলে, স্বাধীনতার জন্য সবসময় আধুনিক সংবিধান বা সুযোগ-সুবিধার প্রয়োজন হয় না। লর্ড জাস্টিস কোক, লর্ড অ্যাকটন, লর্ড ম্যানশিল, আমেরিকার জাস্টিস মার্শাল কিংবা পাকিস্তানের জাস্টিস ইফতেখার চৌধুরী—তাদের সময়ে আজকের মতো সুবিধা ছিল না, কিন্তু ছিল স্বাধীন বিচারিক চেতনা। পাকিস্তান আমলে বাংলাদেশের জাস্টিস মোর্শেদও একইভাবে কাজ করেছেন। তাদের সবার একটি মিল—তারা নিজেদের এক্সিকিউটিভের অধীন ভাবেননি।
একজন বিচারকের সবচেয়ে লজ্জাজনক অবস্থান হলো judicial subservience—এ কথা বলেছেন জাস্টিস খান্নাহ। আবার judicial tyranny, অর্থাৎ আদালতের ওপর প্রভাব বিস্তার করে বলা “আমার কোর্টে এটা হবে, ওটা হবে না”—এটিও একটি জাতির জন্য ভয়াবহ। বিচার বিভাগ যদি নিজেই চাপের কাছে নতি স্বীকার করে, তাহলে তার স্বাধীনতা কাগজে সীমাবদ্ধ থেকে যায়।
এই প্রেক্ষাপটে Judicial Secretariat গঠনের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর অর্থ শুধু একটি নতুন অফিস নয়। এর মাধ্যমে বিচার বিভাগকে
নিজস্ব নির্দিষ্ট বাজেট দিতে হবে, যাতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে যেতে না হয়
বাজেট বাস্তবায়নের জন্য নিজস্ব এক্সিকিউশন মেশিনারি থাকতে হবে (LGED বা PWD-এর মতো)
নিজস্ব স্কিল ডেভেলপমেন্ট ও ইঞ্জিনিয়ারিং ডিভিশন থাকতে হবে
Judicial Administration Training Institute (JATI)-কে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপ দিতে হবে
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, বিচার বিভাগকে নিজেই তার বাজেট খরচ করার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে—নইলে আবার স্বাধীনতা হারাবে
মাঠপর্যায়ে গেলে বাস্তব চিত্র আরও স্পষ্ট। একই জেলায় ডিসি-এসপি অফিসগুলো কাঠামোগতভাবে আধুনিক ও উন্নত হলেও জেলা ও দায়রা আদালতের অবস্থা সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনটি অফিস পাশাপাশি থাকলেও বোঝা যায়—বৈষম্যের শিকার সবসময় বিচার বিভাগ। এই অবস্থায় স্বাধীনতার প্রশ্নটি শুধু তাত্ত্বিকই থেকে যায়।
বাজেটের দিক থেকেও বিচার বিভাগ মারাত্মকভাবে পিছিয়ে। রাষ্ট্রের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের একটি হওয়া সত্ত্বেও বিচার বিভাগের বরাদ্দ মাত্র ২০০০ কোটি টাকা। অথচ তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্বপূর্ণ মৎস সেক্টরেই বরাদ্দ ৩৬০০ কোটি টাকা। বর্তমান বাস্তবতায় বাজেট বৃদ্ধি ছাড়া বিচার বিভাগের উন্নয়নের কথা ভাবাই যায় না। প্রতিটি জেলায় বিচারকদের জন্য গেস্ট হাউজ, গাড়ির ব্যবস্থা এবং বিচারকের সংখ্যা বৃদ্ধি—এসব এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং জরুরি প্রয়োজন।
বর্তমানে বাংলাদেশে গড়ে ৮০–৮৫ হাজার মানুষের জন্য ১ জন বিচারক। ভারতে এই সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ ভালো, আর আমেরিকায় প্রায় ১০ গুণ। দেশে ঝুলে থাকা মামলার সংখ্যা প্রায় ৪৬ লাখ। যদি আজ থেকে আর একটি নতুন মামলাও না হয়, তাহলেও শুধু এসব মামলা নিষ্পত্তি করতে সময় লাগবে ২৫ বছর। এই সংকট মোকাবিলায় নিম্ন আদালতে অন্তত ৫০০০ বিচারক এবং উচ্চ আদালতে আরও ১০০ বিচারক নিয়োগের বিকল্প নেই।
এই সংকটের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ। বাংলাদেশে একটি ৫ লাখ টাকার দেওয়ানি মামলা নিষ্পত্তি হতে গড়ে ২০ বছর লাগে। এই সময়ে একজন ভুক্তভোগীকে অন্তত ২০০ দিন কোর্টে আসতে হয়, আয় বন্ধ থাকে, স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়, পারিবারিক চাপ বাড়ে। শেষ পর্যন্ত আপিল করতে গিয়ে অনেক সময় তার ক্ষতি মামলার মূল অর্থমূল্যের চেয়েও বেশি হয়ে যায়। ফলে অনেকে মাঝপথেই মামলা ছেড়ে দেয়—ন্যায়বিচার হারিয়ে যায় আদালতের পথেই।
এর সহজ কিছু সমাধান আছে। যেমন,
Pre-action protocol: উকিল মামলা নেওয়ার আগে যাচাই করবেন, আর মামলা দায়েরের সময় সিনিয়র বিচারক দেখবেন prima facie কেস আছে কি না। শুধু কোর্ট ফি দেওয়া মানেই মামলা নেওয়া—এই অভ্যাস বন্ধ করতে হবে।
Plea bargaining: ছোটখাটো মামলায় দোষ স্বীকারের বিনিময়ে কম শাস্তির ব্যবস্থা, যা ভারত ও পাকিস্তানে কার্যকরভাবে চালু আছে।
সবশেষে কথা আসে দৃষ্টিভঙ্গির। বাস্তবতা হলো—অনেক ক্ষেত্রে আইন মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিচারকদের অধঃস্তন হিসেবে দেখে, চাপ সৃষ্টি করে, ধমকের সুরে কথা বলে। অথচ আইনমন্ত্রী, আইন সচিব, রেজিস্ট্রার ও প্রধান বিচারপতি—এই চারজন যদি সত্যিই চান, তাহলে মাত্র ছয় মাসেই বিচার বিভাগের দৃশ্যমান পরিবর্তন সম্ভব।
আমরা বিচার বিভাগের রাজনৈতিককরণ চাই না, আবার রাজনীতির বিচারিকরণও চাই না। আমরা চাই—একটি শক্তিশালী, আত্মমর্যাদাশীল ও সত্যিকার অর্থে স্বাধীন বিচার বিভাগ।
Main Speech:
Barrister Shameem Haider Patwary
Transcribed and Summarized by:
Md Jihad Ali,