10/09/2026
ইনানীর বনে অপরূপ মেঘলা চিতা, কেন এত হৈচৈ?
কক্সবাজারের প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত ইনানী বনে প্রথমবারের মতো মেঘলা চিতার উপস্থিতির প্রমাণ মিলেছে। বন্যপ্রাণী সংক্রান্ত এক গবেষণার ক্যামেরা ট্র্যাপে ধরা পড়েছে মহাবিপন্ন এই প্রাণীটির ছবি। বিরল এই প্রাণীর উপস্থিতির খবরে বন বিভাগ ও বন্যপ্রাণী গবেষকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে উচ্ছ্বাস—বলা যায়, ইনানীর বনে মেঘলা চিতা নিয়ে রীতিমতো হৈচৈ পড়ে গেছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, মেঘলা চিতা নিয়ে এত হৈচৈ কেন?
মেঘলা চিতা বাংলাদেশের সবচেয়ে দুর্লভ বন্যপ্রাণীদের একটি। নিশাচর এই প্রাণী সাধারণত ঘন ও দুর্গম পাহাড়ি বনে বিচরণ করে। স্বভাবগতভাবেই এরা লোকচক্ষুর আড়ালে থাকে। ফলে ক্যামেরা ট্র্যাপে এদের উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়াও বিরল ঘটনা। স্থানীয় মানুষ অনেক সময় প্রাণীটিকে চিনতে না পেরে অন্য কোনো বন্যপ্রাণী ভেবে ভুল করেন; কখনো ভয় বা ভুল ধারণা থেকে এগুলোকে হত্যার চেষ্টাও করা হয়।
বাংলাদেশে বর্তমানে বন্দি অবস্থায় থাকা একমাত্র মেঘলা চিতাটি কক্সবাজারের ডুলাহাজারা সাফারি পার্কে রয়েছে। ২০২৩ সালে রাঙামাটি থেকে পাচারকারীদের হাত থেকে উদ্ধার করার পর প্রাণীটিকে সেখানে রাখা হয়।
দেশে বিভিন্ন সময়ে মেঘলা চিতার উপস্থিতির প্রমাণ মিলেছে। তবে সেগুলো বহু পুরোনো রেকর্ড নয়। ১৯৯২ সালে চট্টগ্রামের চন্দনাইশে দুটি মেঘলা চিতার বাচ্চা ধরা পড়ে। এরপর ২০০৫ সালে ময়মনসিংহের গারো পাহাড়, ২০০৬ সালে জামালপুর, ২০০৯ সালে রাঙামাটি, ২০১৪-১৫ সালে বান্দরবান, ২০১৮ সালে সাঙ্গু-মাতামুহুরী বনাঞ্চল এবং ২০২১ সালে কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানে মেঘলা চিতার দেখা মেলে।
বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেটের ঘন, দুর্গম পাহাড়ি বনাঞ্চলে এখনো এরা টিকে আছে। তবে সংখ্যাটি খুবই কম। বিশ্বজুড়ে প্রাপ্তবয়স্ক মেঘলা চিতার সংখ্যা এক হাজারেরও কম বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশেও প্রাণীটির অস্তিত্ব এখন গভীরভাবে নির্ভর করছে অবশিষ্ট প্রাকৃতিক বন ও আবাসস্থল রক্ষার ওপর।
ইনানীর এই গবেষণায় শুধু মেঘলা চিতাই নয়, ক্যামেরা ট্র্যাপে ধরা পড়েছে আরও বহু প্রজাতির বন্যপ্রাণী। এর মধ্যে রয়েছে এশিয়ান হাতি, মুখপোড়া হনুমান, উল্টোলেজি বানর, শজারু, রেসাস মেকাক, শিয়াল, গন্ধগোকুল, ছোট ও বড় খাটাশ, বনবিড়াল, চিতাবিড়াল, বন্য শূকর, কাঁকড়াভুক বেজি, গোরখোদক, ইরাবতী কাঠবিড়ালি, গেছো ছুঁচো, মায়া হরিণ, দাঁতাল ফেরেট ব্যাজার, ছোট রক্তপেকো বাদুড়, বাদামি কাঠবিড়ালি, লজ্জাবতী বানর ও লাল উড়ন্ত কাঠবিড়ালি।
২০২২ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৩ সালের নভেম্বর পর্যন্ত টানা ১৩ মাস কক্সবাজারের একটি সংরক্ষিত বনে এই গবেষণা পরিচালনা করা হয়। দীর্ঘ সময় ধরে ক্যামেরা ট্র্যাপের মাধ্যমে বনের প্রাণবৈচিত্র্য পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে মেঘলা চিতার উপস্থিতির গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ পাওয়া যায়।
একসময় কক্সবাজারের বনাঞ্চল ছিল বন্যপ্রাণীর আদর্শ আবাসস্থল। দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের এই বনগুলো ছিল অসংখ্য প্রজাতির প্রাণী ও উদ্ভিদের নিরাপদ আশ্রয়। কিন্তু গত এক দশকে রোহিঙ্গা বসতি, রেললাইন নির্মাণ এবং হাজার হাজার একর বনভূমি দখলের কারণে সেই আবাসস্থল ক্রমেই সংকুচিত হয়েছে। বনের ওপর মানুষের চাপ বেড়েছে, হারিয়েছে অনেক প্রাকৃতিক আবাস।
এমন বাস্তবতায় ইনানীর বনে মেঘলা চিতার উপস্থিতি নিঃসন্দেহে স্বস্তির খবর। এটি শুধু একটি বিরল প্রাণীর ছবি পাওয়ার ঘটনা নয়; বরং ধ্বংসের মুখে থাকা একটি বন যে এখনো বন্যপ্রাণীর আশ্রয় হয়ে টিকে আছে, তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ।
তবে এই আবিষ্কার আমাদের আনন্দের পাশাপাশি একটি বড় দায়িত্বের কথাও মনে করিয়ে দেয় মেঘলা চিতাকে বাঁচাতে হলে শুধু প্রাণীটিকে নয়, তার পুরো আবাসস্থলটিকেই বাঁচাতে হবে। ইনানীর বন বাঁচলে হয়তো মেঘলা চিতার মতো আরও অনেক অদৃশ্য প্রাণীর অস্তিত্বও টিকে থাকবে।