21/01/2026
দার্শনিক নাট্যগুরু ও ঢাকার কৃতি সন্তান সাঈদ আহমেদের ১৬তম মৃত্যুবার্ষিকীতে ঢাকা কেন্দ্রের গভীর শ্রদ্ধা
কীর্তিমান নাট্য ব্যক্তিত্ব সাঈদ আহমদ (১৯৩১–২০১০)
আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নাট্যকার, দার্শনিক চিন্তার ধারক এবং আধুনিক বাংলা নাটকের অন্যতম পথিকৃৎ সাঈদ আহমদ ১৯৩১ সালের ১ জানুয়ারি পুরান ঢাকার ইসলামপুর সংলগ্ন আশেক লেনে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ এক পরিবারের সন্তান।
তাঁর পিতা মির্জা এফ. মোহাম্মদ ঢাকার ঐতিহ্যবাহী লায়ন থিয়েটারের যৌথ মালিক এবং একজন সংস্কৃতিমনা ব্যক্তিত্ব। মাতা জামিলা খাতুন। চাচা মির্জা আবদুল কাদের সরদার ছিলেন ঢাকার বাইশ পঞ্চায়েতের প্রধান সরদার। চার ভাই ও পাঁচ বোন সকলেই পুরান ঢাকার পৈত্রিক নিবাসেই জন্ম ও বেড়ে ওঠেন।
শিক্ষাজীবনে সাঈদ আহমদ ছিলেন কৃতিত্বপূর্ণ। তিনি ১৯৫৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে এম.এ. ডিগ্রি অর্জন করেন এবং ১৯৫৬ সালে লন্ডন স্কুল অব ইকনমিক্স থেকে পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করেন। শিক্ষাজীবনকালেই তিনি বেতারে সেতার বাদক হিসেবে কাজ করেন এবং ১৯৫৪ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন (বিবিসি)-এ যুক্ত ছিলেন। এ সময় তিনি ব্রিটিশ টেলিভিশনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন এবং লন্ডনের নামকরা থিয়েটার ও কনসার্ট হলে বাদ্যযন্ত্র পরিবেশন করেন।
ইউরোপে অবস্থানকালে তিনি প্যারিসের টেলিভিশন ও বিভিন্ন নাট্যমঞ্চে কাজ করেন এবং জার্মানি, স্পেন ও ইতালির বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করেন। পাশাপাশি পাক-ভারত উপমহাদেশের নাট্যচর্চা বিষয়ক বহু কর্মশালা ও আলোচনায় সক্রিয়ভাবে অংশ নেন।
কর্মজীবনের শুরুতে তিনি সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়ে করাচিতে অবস্থান করেন। চাকরির পাশাপাশি তখনই নাটক লেখায় মনোনিবেশ করেন। এ সময় তিনি Paintings of Pakistani Artists এবং পরবর্তী পনের বছরের শিল্পচর্চা নিয়ে Paintings of Bangladesh Arts সংকলন করেন। চিত্রকলার ওপর তাঁর অসংখ্য প্রবন্ধ ও গবেষণাধর্মী লেখা রয়েছে এবং তিনি বিশ্বের বিভিন্ন কর্মশালায় এ বিষয়ে বক্তব্য রাখেন ও ক্লাস নেন।
নাট্যকার হিসেবে তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনাগুলোর মধ্যে রয়েছে—
দ্য থিঙ্ক (১৯৬১) – কালবেলা, মাইলপোস্ট (১৯৬৪), দ্য সারভাইভাল (১৯৬৭) – তৃষ্ণায়, ওয়ান ডে অ্যান্ড এভরিডে (১৯৭৪) – প্রতিদিন একদিন, এবং লাস্ট নওয়াব অব বেঙ্গল – শেষ নবাব। এই নাটকগুলো তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা বাংলায় অনুবাদ করেন এবং ঢাকার বিভিন্ন নাট্যগোষ্ঠী মঞ্চায়ন করে। সাঈদ আহমদ বাংলা নাটকে অস্তিত্ববাদী দর্শন ও অধিবাস্তবতার সংমিশ্রণে এক নতুন ধারার সূচনা করেন। ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধনে তিনি যে নাট্যভাষা নির্মাণ করেন, তা একজন শেকড়ঘেঁষা অথচ আধুনিক নাট্যকারের স্বাক্ষর বহন করে।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি সচিবালয়ে যোগ দেন। অল্প সময়ের মধ্যেই বাংলাদেশ টেলিভিশনে নিয়মিতভাবে নাট্য বিষয়ক কাজ শুরু করেন। তিনি অনুষ্ঠানমালা উপস্থাপনা, বিদেশি নাট্যব্যক্তিত্ব ও কলাকুশলীদের সাক্ষাৎকার গ্রহণসহ বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
অত্যন্ত সদালাপী, রসিক ও প্রাণবন্ত মানুষ সাঈদ আহমদ নিজেকে আজীবন পুরান ঢাকার সন্তান হিসেবে গর্বের সঙ্গে পরিচয় দিতেন।
২০১০ সালের ২১ জানুয়ারি তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন। একই বছর তিনি মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত হন।
উল্লেখ্য, তাঁর বড় ভাই নাজির আহমদ—বিবিসি বাংলা বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা—ছিলেন দক্ষ অভিনেতা, আবৃত্তিকার ও সাহিত্যবোদ্ধা। অপর ভাই শিল্পী হামিদুর রাহমান ছিলেন শহীদ মিনারের নকশাকার।
২০০৬ সালে মরহুম সাঈদ আহমদ ‘ঢাকা প্রদর্শনী কক্ষ’-এর উদ্বোধন করেন—যা ঢাকার সংস্কৃতি চর্চায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
তথ্যসূত্র: ত্রৈমাসিক ঢাকা (ঢাকা কেন্দ্রের মুখপত্র)