24/05/2026
নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার দীর্ঘসূত্রীতা বন্ধ ও দ্রুত বিচার নিশ্চিতের দাবিতে
সংবাদ সম্মেলন
তারিখ : ২৪ মে, রোজ : রবিবার, সময় : দুপুর ১২ টা
স্থান: বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টাস এসোসিয়েশন (ক্র্যাব) মিলনায়তন
আয়োজনেঃ : বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন
“আর কত রামিসা, আর কত আসিয়া ?'
প্ৰতিবাদ
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
—
শিশু ও নারী নির্যাতনের বিচারহীনতার বিরুদ্ধে মানবিক
উপস্থিত সম্মানিত সাংবাদিক, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার প্রতিনিধিগণ, মানবাধিকারকর্মী, সুধীজন— আসসালামু আলাইকুম ।
আজকের এই গুরুত্বপূর্ণ সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত থাকার জন্য আপনাদের জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও কৃতজ্ঞতা। আপনারাই সমাজের বিবেক। আপনাদের কলম, ক্যামেরা ও কণ্ঠস্বর বহু সময় নিপীড়িত মানুষের শেষ আশ্রয় হয়ে দাঁড়ায় ।
বন্ধুগণ, আজ আমরা অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হৃদয়ে এখানে উপস্থিত হয়েছি। শিশু রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যার যে নির্মম ঘটনা ঘটেছে, তা শুধু একটি পরিবারের নয়—সমগ্র জাতির বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে। এই বর্বরতা মানবিকতার সব সীমা অতিক্রম করেছে। একটি নিষ্পাপ শিশুর জীবন এভাবে থেমে যাওয়া কেবল একটি অপরাধ নয়; এটি রাষ্ট্র ও সমাজের ব্যর্থতার নির্মম প্রতিচ্ছবি ।
আমরা গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছি, দেশে দীর্ঘদিন ধরেই শিশুদের ওপর ধর্ষণ, হত্যা ও নৃশংস নির্যাতনের ঘটনা বেড়েই চলেছে। প্রতিটি ঘটনার পর কিছুদিন আলোচনা হয়, ক্ষোভ প্রকাশ হয়, তারপর আবার সবকিছু স্তব্ধ হয়ে যায়। কিন্তু অপরাধ থামে না। বরং বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তুলছে।
আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই—সামাজিক অবক্ষয়ের পাশাপাশি বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতাও অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। অপরাধীদের মধ্যে একটি ভয়ংকর ধারণা তৈরি হয়েছে যে, মামলা বছরের পর বছর চলবে, তদন্তে গাফিলতি হবে, সাক্ষ্যপ্রমাণ দুর্বল হবে, এরপর জামিন নিয়ে বেরিয়ে আসা যাবে ।
অতীতে এমন বহু ঘটনা আমরা দেখেছি। ১৯৯৬ সালে চট্টগ্রামের রাউজান থানায় সীমা চৌধুরী ধর্ষন এবং পরে জেলখানায় তার রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনার মামলা, ১৯৯৮ সালে ঢাকার মূখ্য মহানগর হাকিমের আদালত এলাকার পুলিশ কন্ট্রোল রুমে সাত বছরের শিশু তানিয়া ধর্ষণ মামলাসহ অসংখ্য ঘটনায় বিচার বিলম্বিত হয়েছে, তদন্তে ত্রুটি ছিল, । এসব মামলায় অপরাধীরাও পার পেয়ে গেছে। আমরা বলতে চাই— বিচার বিলম্ব মানেই অনেক ক্ষেত্রে বিচার অস্বীকার ।
মাগুরার আছিয়া হত্যা মামলায় বিচারিক আদালতে দ্রুত রায় হয়েছে—এটি অবশ্যই ইতিবাচক দৃষ্টান্ত । কিন্তু বাস্তবতা হলো, সেই মামলা এখনো উচ্চ আদালতে কার্যকর শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে—শিশু হত্যা ও ধর্ষণের মতো স্পর্শকাতর মামলাগুলো কেন উচ্চ আদালতে বছরের পর বছর পড়ে থাকবে? কেন পেপারবুক প্রস্তুত ও শুনানি দ্রুত সম্পন্ন করা হবে না? গরিব মানুষ, যাদের পেপারবুক তৈরির খরচ বহনের সামর্থ্য নেই, তারা তাহলে কোথায় যাবে?
আমরা মনে করি, আসামিপক্ষ সবসময় বিচার বিলম্ব করতে চাইবে। কিন্তু রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা। রাষ্ট্রের প্রসিকিউশন বিভাগ, অ্যাটর্নি জেনারেল অফিস ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর আরও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন । দুঃখজনকভাবে, শিশু ও নারী নির্যাতনের স্পর্শকাতর মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য সমন্বিত ও কার্যকর তৎপরতা এখনো দৃশ্যমান নয় ৷
আমরা দাবি জানাচ্ছি, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং হত্যা মামলাগুলোর জন্য আইন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি বিশেষ মনিটরিং সেল গঠন করতে হবে। বিচারিক আদালতে রায়ের পর মামলাগুলো যেন উচ্চ আদালতে অযথা ঝুলে না থাকে, সে জন্য রাষ্ট্রপক্ষকে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। পেপারবুক প্রস্তুত ও শুনানি প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। গরিব ও অসচ্ছল বাদীদের জন্য রাষ্ট্রীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগন
রামিসার বাবা বারবার বলেছেন— “আমি বিচার চাই না।” একজন বাবার মুখে এই কথাটি কোনো সাধারণ বাক্য নয়; এটি রাষ্ট্রের প্রতি গভীর হতাশা ও অসীম ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। তিনি দেখেছেন, বছরের পর বছর মানুষ আদালতের বারান্দায় ঘুরে, কিন্তু বিচার পায় না। তাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব এখন শুধু বিচার করা নয়—মানুষের হারিয়ে যাওয়া আস্থা ফিরিয়ে আনা ।
আমরা বিশ্বাস করি, রামিসা হত্যা মামলায় দ্রুত তদন্ত ও বিচার সম্ভব। আসামি গ্রেপ্তার হয়েছে, স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রয়েছে, আলামতও পাওয়া গেছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে অভিযোগপত্র দাখিলের সময়সীমাও নির্ধারিত আছে। আমরা আশা করি, তদন্ত দ্রুত শেষ হবে এবং বিচারিক আদালতে স্বল্প সময়ের মধ্যেই মামলার নিষ্পত্তি হবে। একইসঙ্গে উচ্চ আদালতেও দ্রুত শুনানি নিশ্চিত করতে হবে । আমরা নতুন করে আর কোনো রামিসার কান্না শুনতে চাই না । আমরা চাই না, কোনো বাবা আবার হতাশ হয়ে বলুক— “আমি বিচার চাই না ।”
সাংবাদিক বন্ধুগণ, আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় না বললেই নয়।
আমাদের দেশে অনেক মানুষ জানেন না, একটি মামলা দায়ের করতে হলে এজাহার কীভাবে লিখতে হয়। এই অজ্ঞতার কারণে এজাহারে গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয় বাদ পড়ে যায় । আবার অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ বা আইনজীবীর অপকৌশলের কারণেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এড়িয়ে যাওয়া হয়, যা পুরো মামলাকে দুর্বল করে তোলে । ফলে অভিযুক্তরা সহজে জামিন পেয়ে যায় কিংবা শেষ পর্যন্ত খালাস পেয়ে যায় । অথচ নির্যাতিত পরিবার ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়।
এছাড়াও মৃত্যুজনিত ঘটনায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সুরতহাল ঘটনাস্থলে না করে থানায় কিংবা হাসপাতালের মর্গের পাশে সম্পন্ন করা হয়, যা কোনোভাবেই আইনসঙ্গত নয় ।
একইসঙ্গে ফরেনসিক রিপোর্ট, পোস্টমর্টেম রিপোর্ট, ভিসেরা রিপোর্ট বা ডিএনএ রিপোর্ট পেতেও বছরের পর বছর বিলম্ব ঘটে । কখনো কখনো একটি রিপোর্ট পেতে দুই থেকে তিন বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায় । ফলে বিচারকাজ শুরু হতেও দেরি হয়। এই দীর্ঘসূত্রতার কারণে পরে সাক্ষী পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
পাশাপাশি আমাদের দেশে সাক্ষীদের নিরাপত্তা ব্যবস্থাও অত্যন্ত দুর্বল। ফলে একটি মামলা শেষ হতে বছরের পর বছর সময় লেগে যায়। পরে সেই মামলা উচ্চ আদালতে গেলে বাদীকে আরও নানা ধরনের ভোগান্তির শিকার হতে হয় ।
আইন অনুযায়ী মামলার পেপারবুক প্রস্তুতসহ মামলার পরিচালনা ব্যয় রাষ্ট্রের বহন করার কথা। কিন্তু বাদীর অজ্ঞতা ও আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে এসব কাজ সম্পন্ন হয় না এবং ফাইলবন্দী হয়ে পড়ে থাকে । এ কারণেও সৃষ্টি হয় আরেক দফা দীর্ঘসূত্রতা।
এই অবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে হলে জরুরি ভিত্তিতে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে—
আমাদের সুপারিশসমূহ:
মামলার পর সাত দিনের মধ্যে সুরতহাল, পোস্টমর্টেম, ডিএনএ, ভিসেরা ও অন্যান্য সকল রিপোর্ট
সম্পন্ন করতে হবে।
নির্ধারিত সময়ে রিপোর্ট না হলে পাবলিক প্রসিকিউটর আদালতের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তা ও চিকিৎসকের কাছে লিখিত ব্যাখ্যা চাইবেন এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেবেন ।
পাবলিক প্রসিকিউটরকে সাক্ষীদের সঠিক সময়ে আদালতে হাজির নিশ্চিত করতে হবে।
সাক্ষীদের বারবার আদালত থেকে ফেরত পাঠানোর সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে।
বিচারকগণকে দীর্ঘ বিরতি না দিয়ে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে শুনানির তারিখ নির্ধারণ করতে হবে।
উচ্চ আদালতে পৌঁছানোর পর অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসকে এসব মামলাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা নিতে হবে ।
আজকের এই সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে আমরা রাষ্ট্র, সরকার, বিচার বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের প্রতি জোর দাবি জানাচ্ছি। শিশু ও নারী নির্যাতনের মামলাগুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করুন । বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধ করুন । অপরাধীদের কাছে স্পষ্ট বার্তা দিন—এই দেশে ধর্ষণ ও হত্যার পর কেউ পার পাবে না ।
পরিশেষে, উপস্থিত সকল সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীদের আবারও ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আপনাদের দায়িত্বশীল ভূমিকা ও নির্ভীক প্রতিবেদন সমাজে সচেতনতা সৃষ্টি করতে পারে এবং বিচার নিশ্চিতের আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করতে পারে ।
ধন্যবাদ সবাইকে।
এডভোকেট এলিনা খান
চেয়ারপার্সন, বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন