10/08/2026
১৬ বছর আগের তাগিদ, আজ একটি অঙ্গীকার
সময়টা ছিল ২০১১ সালের প্রথমার্ধ।
রায়ের বাজার স্মৃতিসৌধ সংলগ্ন বেড়িবাঁধ, গাবতলী থেকে সদরঘাট যাওয়ার সংযোগ সড়ক। প্রতিদিন এই রাস্তা দিয়েই যাতায়াত করতাম। লালমাটিয়াস্থ একাডেমিয়া স্কুল থেকে ছেলেদের আনা-নেওয়ার সময় রাস্তার দুই পাশের দৃশ্যটি আমাকে প্রবলভাবে নাড়া দিত। পূর্ব পাশে ধূলায় ধূসরিত কিছু শিশুগাছ, মেহগনি আর রেইনট্রি। আর পশ্চিম পাশে কংক্রিটের স্তুপ। গাছ তো দূরের কথা, ঘাসও জন্মাত না সেখানে। চারপাশে শুধু ধূলা আর কংক্রিট।
ভেতরে একটা তাগিদ অনুভব করতে থাকলাম, কিছু একটা করা দরকার। সেই তাগিদ থেকেই কংক্রিটের ফাঁকে কয়েকটি কৃষ্ণচূড়া লাগিয়েছিলাম। কিন্তু পরিবেশটি কৃষ্ণচূড়ার বেড়ে ওঠার জন্য অনুকূল ছিল না। চারাগুলো মারা গেল। মন খারাপ করে ভাবছিলাম, তাহলে কী করা যায়?
এর কিছুদিন পর একদিন একাডেমিয়া স্কুলের কাছে, বর্তমান আল-মানার হাসপাতালের পাশে, বহু বছরের পুরোনো একটি বাড়ির কার্নিশে একটি বটের চারা মাথা উঁচু করে বেড়ে উঠতে দেখলাম। তখন মনে হলো, একটি পুরোনো বাড়ির কার্নিশে যদি একটি বট গাছ বেঁচে থাকতে পারে, তাহলে কংক্রিটের শহরেও নিশ্চয়ই কিছু গাছ বেঁচে থাকার পথ খুঁজে নেওয়া সম্ভব।
শুরু হলো আমার ছোট্ট অভিযান।
রাস্তার পাশে, বাড়ির দেয়ালে যেখানে বট, পাকুর কিংবা রাবার জাতীয় গাছের চারা দেখতে পেতাম, ছেলেদের দিয়ে সেগুলো সংগ্রহ করতাম। এমনকি এই কাজের জন্য আমার গাড়িতে সবসময় একটি ছুরি রাখতাম। বাসায় ফিরে পরিত্যক্ত মাটির পাত্র, তেলের বোতল, পানির বোতল, যা পাওয়া যেত, তাতেই চারাগুলো লাগিয়ে বারান্দায় পরিচর্যা করতাম।
একসময় চারার সংখ্যা প্রায় ৪০-এ দাঁড়াল। চারাগুলো একটু সবল হলে, সেই বছরের কুরবানীর ছুটিতে ঢাকা শহর যখন অনেকটাই ফাঁকা, আর সৌভাগ্যক্রমে ঝুম-বৃষ্টি, আমি আর আমার ছেলেরা মিলে বেড়িবাঁধের পশ্চিম পাশের কংক্রিটের লাইন ধরে চারাগুলো লাগিয়ে দিলাম। কোনও বড় আয়োজন ছিল না। ছিল না কোনও বিশেষ ব্যবস্থা। চারাগুলোকে শুধু একটি ডাল আর সুতলি দিয়ে বেঁধে দিয়েছিলাম।
ক্রমান্বয়ে তারা বেড়ে উঠলো। শাখা পত্র পল্লবে সুশোভিত হল। সেই বৃক্ষ হয়ে উঠলো ক্লান্ত পথচারীদের ছায়াদানকারী, সেই বৃক্ষের নিচে বসল রোদে পোড়া পথিক বা শ্রমিকের জিরিয়ে নেবার আসর, চায়ের টং দোকানের ব্যবসা, রিক্সার গ্যারেজ। যে জায়গাটি একসময় ছিল কংক্রিট আর ধূলার রাজত্ব, সেখানে তৈরি হলো জীবনের কিছুটা ছায়া।
কোনও ব্যক্তিগত লাভ বা খ্যাতির উদ্দেশ্য নিয়ে এ কাজটি করিনি। পৃথিবীর কাছে আমার অনেক ঋনের বোঝার একটু লাঘব করার প্রয়াস – এমন প্রত্যাশাও ছিলনা। ছিল সবুজায়নে কিছু কাজ করার ইচ্ছা, মানসিক প্রশান্তি লাভের আকাংক্ষা।
এরপর প্রতিবছর বর্ষায় সন্তানদের খাওয়া ফলের বীজ থেকে বাসায় চারা তৈরি করেছি। ঢাকার বিভিন্ন জায়গায়, ধানমন্ডি লেক, পূর্বাচলসহ নানা স্থানে সেগুলো লাগিয়েছি। সন্তানদের শুধু একটি কথাই বোঝাতে চেয়েছি।
তুমি যে ফলটি খাচ্ছো, তার বীজটি ফেলে না দিয়ে একটি গাছ হিসেবে পৃথিবীকে ফিরিয়ে দেওয়া তোমারও দায়িত্ব।
জানি না, তারা কতটুকু সেই বার্তা গ্রহণ করতে পেরেছে। তবে সেই ছোট ছোট কাজগুলো করতে করতে আমার নিজের মধ্যেই একটি উপলব্ধি আরও গভীর হয়েছে। একটি গাছ লাগানো শুধু একটি গাছ লাগানো নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরিবেশ, মানুষ, শহর এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি আমাদের দায়িত্ব।
আজ সেই ১৬ বছর আগে নিজের হাতে লাগানো গাছগুলোর প্রায় সবগুলোই রাস্তা প্রশস্তকরণের কারণে কাটা হচ্ছে।
নির্বাক হয়ে দেখছি।
একটি গাছ বড় হতে কত বছর সময় লাগে, তার ছায়ায় কত মানুষ দাঁড়ায়, কত মানুষ তার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে, এসব আমরা বুঝতে পারি হয়তো তখনই, যখন সেই গাছটি আর থাকে না।
রাস্তা প্রশস্ত করার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু এটাও মনে হচ্ছে, রাস্তা প্রশস্তকরণ কার্যক্রমে রাস্তার পাশে গাছ লাগাবার সুব্যাবস্থাও থাকা প্রয়োজন। তবে এই অভিজ্ঞতা আমাকে আরও একটি প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে।
শুধু গাছ লাগালেই কি হবে?
গাছকে বাঁচিয়ে রাখা, সঠিক জায়গায় সঠিক প্রজাতির গাছ লাগানো, পরিচর্যা করা, দীর্ঘমেয়াদে সবুজায়ন নিশ্চিত করা, এসবও তো সমান গুরুত্বপূর্ণ।
২০১৯ সাল থেকে সেই ব্যক্তিগত তাগিদটিকে আরও বড় পরিসরে, আরও পরিকল্পিত ও সংগঠিতভাবে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি inSights-এর মাধ্যমে।
কারণ আমি বিশ্বাস করি, ব্যক্তিগতভাবে কয়েকটি গাছ লাগানো দিয়ে যে যাত্রা শুরু করেছিলাম, সেটিকে এখন এমন একটি সম্মিলিত উদ্যোগে পরিণত করা দরকার, যেখানে আরও মানুষ যুক্ত হবেন, আরও জায়গায় গাছ লাগানো হবে, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, সেই গাছগুলো বেড়ে ওঠার সুযোগও পাবে।
এই পথচলায় আমরা ইতোমধ্যে বরিশাল, মাগুরা সদর, ঢাকার পূর্বাচলসহ বিভিন্ন স্থানে বৃক্ষরোপণের কাজ করেছি। সামনে আরও অনেক জায়গায় যাওয়ার পরিকল্পনা আছে।
এটি শুধু আমাদের কাজ নয়। এটি এমন একটি কাজ, যেখানে যে কেউ নিজের জায়গা থেকে যুক্ত হতে পারেন। একটি গাছ লাগিয়ে, একটি গাছের যত্ন নিয়ে, অন্য একজনকে উৎসাহিত করে, অথবা একটি সবুজ উদ্যোগের পাশে দাঁড়িয়ে।
১৬ বছর আগে যে ছোট্ট তাগিদ আমাকে কংক্রিটের ফাঁকে চারাগাছ লাগাতে উদ্বুদ্ধ করেছিল, আমার মধ্যে আজও সেই তাগিদ অনুভব করি। শুধু এখন সেই তাগিদ আর আমার একার নয়।
এবার আমাদের লক্ষ্য, inSights এর মাধ্যমে আরও সংগঠিতভাবে, আরও বড় পরিসরে, একটি সবুজ বাংলাদেশ গড়ে তোলা।
নিগার রহমান
সিইও, ইন্সাইটস