03/08/2024
আন্দোলনকারী ছাত্ররা চাইলে তাদের সাথে আলোচনায় বসতে চান, তাদের সাথে কথা বলতে চান, তাদের কথা শুনতে চান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বলেছেন, তারা যখনই আসতে চায়, গণভবনের দরজা তাদের জন্য খোলা। তিনি আর কোনো সংঘাত চান না।
"দাম্ভিকতা" বাদ দিয়ে সহানুভূতি মন নিয়ে যদি শুরুতেই সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের সাথে কথা বলত বর্তমান সরকার, তাহলে রাস্তায় সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে হত না, পুষা ছাত্রলীগ / পুলিশ/ র্যাব / বিজিবি দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য ময়দানে নামাতে হত না, কারফিউ জারি করতে হত না, সারাদেশে ইন্টারনেট বন্ধ করতে হত না, ফেসবুক বন্ধ করতে হত না, আইসিটি প্রতিমন্ত্রীকে বারবার নিজেরই বক্তব্য পরিবর্তন করতে হত না, এইচএসসি পরীক্ষার মত জাতীয় ১২টা পরীক্ষা স্থগিত করতে হত না! সব স্কুল / কলেজ / বিশ্ববিদ্যালয় / প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ রাখতে হত না, শত শত মিথ্যা মামলা জারি করতে হত না, প্রায় নয় হাজার মানুষকে গ্রেফতার করতে হত না, দেশের সম্পদের এতো বড় ক্ষয়ক্ষতি হত না, জীবন বড় না রাষ্ট্রীয় সম্পদ বড় সেই প্রশ্ন উঠত না, আন্দোলনকারীদের মধ্যে থেকে আবু সাঈদ, মুগ্ধ, ফাইয়াজ, নাহিদ, হাসনাত, আসিফ, সারজিসদের মত আরো অনেক জানা, অজানা অসম সাহসী বীরদের কে হত্যা করতে হত না, ভাইরাল সেই পুষা ছাত্রলীগ ছেলের নেতা প্রবল ক্ষমতাসীন ছাত্রলীগের সভাপতিকে অজ্ঞাতবাসে চলে যেতে হত না, জুনায়েদ আহমেদ পুলক সাহেবকে পাঠিয়ে ছাত্রদের সাথে সম্পর্ক পুনরস্পথাপন করাতে হত না, আমাদের কেও এই রক্তাক্ত বাংলাদেশ দেখতে হত না।
আগে কেন এই সমঝথা করা হয় নাই? কারণ, “দাম্ভিকথা”, আরেকটু ডিটেলে এ গেলে “ডিক্টেটরশিপ”। Autocracy অথবা ডিক্টেটরশিপ মনোভাবের পরিচয় দেওয়া। নিজের মতের সাথে না মিল্লে যে কাউকেই শত্রুজ্ঞান করে বসা, বিনয়ী না হওয়া, এক কথায় গণতন্ত্রকে গলা টিপে মেরে ফেলা!
এই গলাটিপা গণতন্ত্রকে বাচাতে হলে এখন দরকার “পরিবর্তনের”। যে পরিবর্তনের নিশান হাতে নিয়েছে নতুন প্রজন্ম। যে প্রজন্ম রিল বানাতে জানে,টিকটক ভিডিও বানাতে জানে, কিন্তু কখনো হারতে জানে না, মিথ্যা আশ্বাসে ময়দান ছেড়ে যেতে জানে না।
এখনো আমরা যে উত্তরগুলো পাইনিঃ
১। রাতারাতি কিভাবে কোর্ট এর রায় চলে এলো, একদিনের মাথায়, বিচার বিভাগ কি স্বাধীন?
২। জামায়াতে ইসলামিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে সরকার। আগে কেন নিষিদ্ধ করেনি? আগে দরকার পড়েনি। এতদিনে মনে হল জামাত কে নিষিদ্ধ করা দরকার?
৩। জামায়াতে ইসলামিকে নিষিদ্ধ করা হল, ছাত্র রাজনীতিকে এখনো জিইয়ে রাখতে হবে? তাদের কে ব্যাবহার করা যাবে নিজের দলের স্বার্থে, যে কোনও প্রয়োজনে, এই জন্য? এই কারণেই কি এখনও ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হচ্ছে না?
৩। যখনই মনে হল, দেশের সাথে বহির্বিশ্বের সম্পক বিচ্ছিন্ন করে নিতে হবে?
ভারতীয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠি একটা দারুণ কথা বলেছিলো - 'বিকল্প নাই' ন্যারেটিভের প্রসঙ্গে। তিনি বলেছিলেন, ধরুন আপনি একটি বাসে চড়ে কোথাও যাচ্ছেন। বাসটায় আগুন লাগলো। তখন বিকল্প বাস আছে কিনা সেটা না খুঁজে আপনার প্রথম কাজ হবে সেই বাস থেকে নামা। কোনও দল যদি গণতন্ত্রকে ধ্বংস করার চেষ্টা করে, তাহলে সে যে দলই হউক, তাদের বিরুদ্ধেও সমানভাবে সোচ্চার হতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বার্থ হলে কি রাষ্ট্রপতি অথবা সেনাবাহিনী ক্ষমতা গ্রহণ করেন না?
সবচেয়ে বড় কথা, এখন পুরো দুই প্রজন্মের ভেতর এই যে নষ্ট রাজনীতি আর রাজনীতিকদের জন্য এক বুক ভর্তি ঘৃণা আর তাচ্ছিল্য তৈরী হয়ে গেছে যা থেকে নিষ্কৃতি পেতে, এর আমূল পরিবর্তন নতুনরাই করে নিবে, সময়ের প্রয়োজনেই তারা করে নিবে।
আমরা যদি সমাজে পুঞ্জীভূত ক্ষোভের উৎস বর্তমান ক্ষমতাবান শ্রেণিগুলোর (অসৎ ব্যবসায়ী, অসৎ রাজনীতিবিদ ও অসৎ আমলার ত্রিভুজ ক্ষমতাকাঠামো) দ্বারা গঠিত শাসকশ্রেণির দুই অংশের মধ্যে ক্ষমতায় থাকা এবং ক্ষমতা দখলের লড়াই থেকে সমাজকে বাঁচাতে চাই, তাহলে নতুন বিকল্প সামাজিক শক্তির উত্থান ঘটাতে হবে। এটি সমাজের ভেতর থেকেই এবং রাজনৈতিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই হতে হবে।
তাই সরকারকে এ মুহূর্তে সবার আগে উন্মুক্ত যুক্তি-তর্ক-আলোচনা-পর্যালোচনা-ভিন্নমত, সরকারপ্রধানের প্রশংসা-সমালোচনা ইত্যাদির সুযোগ দিতে হবে। এসবের মাধ্যমে সত্য উদ্ঘাটনের স্বাধীনতা দিতে হবে। সন্ত্রাস-সহিংসতা, বলপ্রয়োগ, জবাবদিহিহীন হস্তক্ষেপের সংস্কৃতি, তথ্য গোপন ও মিথ্যা প্রচার থেকে আমাদের সব পক্ষকেই বের হয়ে আসতে হবে।
কোটা আন্দোলন আমাদের দেখিয়েছে, কীভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেই সংগ্রামের মাধ্যমে সর্বজনের কর্তৃত্ব ফিরিয়ে আনতে হয় এবং কীভাবে মেধা ও যোগ্যতাবিহীন বলপ্রয়োগকে ঠেকাতে হয়। আর সেটা এবার ঘটেছে বেশির ভাগ অরাজনৈতিক সাধারণ ছাত্রদের ঐক্যবদ্ধ উত্থানের মাধ্যমে। এই পথ ধরেই আগামী দিনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় নতুন সৎ-যোগ্য-মেধাবীদের নেতৃত্ব ফিরে আসতে পারে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় এ রকমটা হলে পরে দেশের মধ্যেও সঠিক ও সুস্থ রাজনৈতিক একটি শক্তিকে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে। এভাবে সর্বস্তরে গণতান্ত্রিক পরিবেশ টেকসই করার সুযোগ তৈরি হবে। লীগ/বিএনপি/জাপা/জামাত কোন দলই নিজেদের স্বার্থের বাইরে কাজ করতে দেখি না। এদেরকে এই স্বার্থান্বেষী মনোভাব কে প্রত্যাখ্যান করে বাংলাদেশে নতুন প্রজন্মের এক নতুন রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তুলতে হবে।
আরেকটি কথা, শুধু জামায়াতে ইসলামিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করলে কি হবে? ধর্মভিত্তিক সকল রাজনীতি কি বাতিল করতে হবে না? রাষ্ট্রধর্মও কি বাতিল করতে হবে না? একটি আরেকটির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। যে সমস্যা থেকে বাঁচতে একটিকে বাতিল করা হচ্ছে, সেই সমস্যা তৈরি করতে আরেকটিকে পোষার তো কোনও যুক্তি নেই। রাষ্ট্রধর্মের কারণে সাম্প্রদায়িকতা, বৈষম্যমূলক ধর্মীয় আইন, রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার ইত্যাদি কি বৈধ হয়ে ওঠে না?
রিপন দে
অগাস্ট ৪, ২০২৪