07/06/2026
সম্প্রতি বের হওয়া রিপোর্ট অনুযায়ী Abul Khair কোম্পানী বাংলাদেশের গুঁড়োদুধ ক্যাটাগরীতে ৩৮% শেয়ার নিয়ে শীর্ষস্থানে অবস্থান করছে বলে জানা যায় । যদিও ডেইরী ক্যাটাগরীতে আমি আর কাজ করি না, তারপরও দীর্ঘদিন এই সেক্টরে কাজ করেছি বলে আবুল খায়েরের এই শক্তিশালী অর্জনের খবর চোখে আসার পর নিজের অজান্তেই মাথার ভেতর কিছু বিশ্লেষন চলছে । কিভাবে এই অর্জন সম্ভব হলো, পেছনের স্ট্রাটেজী কি ছিল ইত্যাদি ইত্যাদি ।
FMCG, বিশেষত: ডেইরী সেক্টরে দীর্ঘদিন কাজ করার সুবাদে এই সেক্টরের নাড়ি-নক্ষত্র আমার মোটামুটি জানা । সেই আলোকেই আমার কাছে মনে হয় আবুল খায়েরের এই সাফল্যের পেছনে কাজ করেছে কয়েকটি বিষয় -
১) লং-টার্ম স্ট্রাটেজী: বাংলাদেশের কোম্পানীগুলোর মধ্যে আবুল খায়েরকে আমার কাছে মনে হয় সবসময়ই সবচেয়ে লম্বা সময়ের প্ল্যান করে খেলতে নামে । ধরুণ যখন তারা 'শাহ সিমেন্ট' ব্র্যান্ড নিয়ে সিমেন্ট সেক্টরে এলো, তখন টানা ১০-১২ বছর ব্র্যান্ড তৈরীর পেছনে কাজ করে গেছে । ঠিক সেভাবেই 'সিলন চা' নিয়েও তাদের টানা ব্র্যান্ড বিল্ডিং অ্যাক্টিভিটি চোখে পরার মত । ফলাফল স্বরুপ এই দুই সেক্টরেই আবুল খায়ের অন্যতম লিডিং পজিশনে আছে । মিল্ক সেক্টরেও তাঁরা ঠিক একইরকম লং-টার্ম স্ট্রাটেজী নিয়ে কাজ করেছে । টিভি-অনলাইন-প্রিন্ট-আউটডোর এই সবগুলো মিডিয়াতেই আবুল খায়েরের ব্র্যান্ড MARKS-এর উপস্থিতি চোখে পরার মত । ‘মার্কস অলরাউন্ডার’এর মত মিডিয়া রিয়েলিটি শো চালাচ্ছে প্রায় ১৫ বছর ধরে, Street activation ইত্যাদিও চালাচ্ছে টানা, যেগুলোর মাধ্যমে Target Audience এর সাথে Relevancy এবং Relationship জোরদার করেছে । আর MARKSএর Brand Promoter (BP) টিমকে তো দেশের সবচাইতে বড় In-shop activation team বলা যায় । আমার জানামতে প্রায় দেড় হাজার মানুষের এই টিম টানা বাজারে, দোকানে কাজ করে যাচ্ছে সেই প্রায় ১৫-২০ বছর ধরে Shoppers convertion করার জন্য । অর্থাৎ, Path-to-Purchase ফানেলের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ক্রেতাকে তারা নিজের কাছে ধরে রেখেছে ।
২) সময়াচিত ইনোভেশন: ভেজিটেবল ফ্যাট-ফিল মিল্কের দাপটে যখন MARKS-এর মার্কেট শেয়ার ভীষনভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হলো, তখন তারা ক্যাটাগরীতে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার জন্য ২০২০ সালের শেষ দিক থেকে তাঁদের আরেকটি ব্র্যান্ড ’STARSHIP’ কে দারুণ এক ইনোভেশনের মাধ্যমে সামনে নিয়ে এলো । ততদিন পর্যন্ত দুধের ফ্যাটের পরিমান ও ধরণের উপরে নির্ভর করে বাংলাদেশে মূলত: ৩ ধরণের গুঁড়োদুধ ছিল -
a) কমপক্ষে ২৬% প্রানীজ ফ্যাট দেয়া 'ফুলক্রিম মিল্ক পাউডার' বা FCMP.
b) ১.৫% এর চাইতে কম প্রাণীজ ফ্যাট থাকা 'স্কিমড মিল্ক পাউডার' বা SMP.
c) দুধের প্রানীজ ফ্যাটকে সরিয়ে সেখানে ভেজিটেবল ফ্যাট দিয়ে তৈরী করা 'ফ্যাট-ফিলড্ মিল্ক পাউডার' বা FFMP.
এই পরিস্থিতিতে আবুল খায়ের ২০২০ এর শেষে দারুণ একটা ইনোভেশন নিয়ে চলে এলো - 'পার্শ্বিয়াল স্কিমড মিল্ক পাউডার' (PSMP) । এটি কি ?
এটি হলো ১.৫% উপরে ২৬% এর নীচে যে কোনো পরিমান প্রাণীজ ফ্যাট সমৃদ্ধ মিল্ক পাউডার ! সাধারণত এই ক্যাটাগরীর গুঁড়োদুধে ১৪-২২% এর মধ্যে প্রানীজ ফ্যাট থাকে । এই নতুন ক্যাটাগরীর ইনোভেশন থেকে শুরু করে BSTI অ্যাপ্রুভাল পুরোটাই আবুল খায়েরের কৃতিত্ব, যার ফলে দেশের বাজারে সম্পূর্ণ নতুন কম্পোজিশনের একখানা নতুন গুঁড়োদুধ আসার সুযোগ তৈরী হয়, এবং এখন অনেকগুলো ব্র্যান্ডই এই 'পার্শ্বিয়াল স্কিমড মিল্ক পাউডার বা PSMP' বাজারজাত করছে, যেটি একদিকে যেমন গুঁড়োদুধের দাম ক্রেতাদের হাতের নাগালে রাখায় সাহায্য করছে, অন্যদিকে ভেজিটেবল ফ্যাটের দুধ খেতে চাননা এমন লোকও কম দামে প্রাণীজ ফ্যাট সমৃদ্ধ দুধ খেতে পারছেন ।
এই ইনোভেশনটা আবুল খায়ের প্রথম তাদের ‘STARSHIP ব্র্যান্ডে বাজারজাত করে ২০২১ সালে । দাম কম হওয়ার এবং বিশাল ট্রেড মার্জিন দেয়ায় স্টারশীপ বিদ্যুতের গতিতে বাজার দখল করে নেয় । ঐ সময়ের Household Pe*******on রিপোর্ট অনুযায়ী মাত্র ১৮ মাসে স্টারশীপ ব্র্যান্ডের হাউজহোল্ড শেয়ার মাত্র ১.৫% প্রায় ২০% এ চলে যায় ! ডেইরীতে কাজ করা আমার পুরো ক্যারিয়ারে আমি কোনো ব্র্যান্ডকে এমন বিদ্যুৎ গতিতে বাজার দখল করতে দেখিনি ! পারফেক্ট ইনোভেশন স্ট্রাটেজি যাকে বলে ।
৩) মাল্টিব্র্যান্ড স্ট্রাটেজী: Usergroup এবং Usage অনুযায়ী দেশের মিল্ক পাউডার ক্যাটাগরীতে অনেকগুলো সাব-ক্যাটাগরী আছে; যেমন - Child drinking, Culinary, Tea makig, Quality driven, Value driven ইত্যাদি ইত্যাদি । আবুল খায়ের এই প্রতিটি সাব-ক্যাটাগরীতে আলাদা আলাদা ব্র্যান্ড দিয়ে অপারেট করে, যেমন MARKS, STARSHIP, AMA, AURA । এমনকি এক মার্কসেরই অনেকগুলো আবার সাব-ব্র্যান্ড আছে বিভিন্ন কাস্টোমার সেগমেন্টের জন্য - Active School, Diabetic, Chocolate ইত্যাদি ইত্যাদি । এ কারণে এদের একটি ব্র্যান্ড কোনো সেগমেন্টে খারাপ করলেও অন্য সেগমেন্টের অন্য ব্র্যান্ড দিয়ে সেটিকে পুষিয়ে নেয় । যেমন - যখন MARKS সাফার করছিল তখন সেই বিজনেস STARSHIP দিয়ে তুলে নিয়েছে । সুতরাং, Overall Business সাইজে ইম্প্যাক্ট খুব কম আসে । এভাবে এরা বিভিন্ন ব্র্যান্ড দিয়ে বিভিন্ন সেগমেন্টে দারুণ মুন্সিয়ানার সাথে খেলা চালাতে থাকে ।
৪) শক্তিশালী ডিস্ট্রিবিউশন: বাংলাদেশের দুধের ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে আমার কাছে আবুল খায়েরের ডিস্ট্রিবিউশন সবচাইতে শক্তিশালী বলে মনে হয় । যদিও বাংলাদেশে এখন আর নির্ভরযোগ্য Retail Audit Data পাওয়া যায় না, তবে আমার পর্যবেক্ষণ বলে মিল্ক ক্যাটাগরীতে আবুল খায়েরের Numeric Distribution সাড়ে তিন লাখের কম হবে না । আর যদি Tea bunk গুলো ধরা হয় তবে ৬ লাখও ছাড়িয়ে যেতে পারে ! সেলস-মার্কেটিংয়ে কাজ করার সুবাদের বাংলাদেশের মোটামুটি সমস্ত আঁনাচে-কাঁনাচে আমার যাওয়া হয়েছে । সব জায়গাতেই আবুল খায়েরের কোনো না কোনো ব্র্যান্ড আমি দেখেছি - কাঁচাবাজার হোক, পাড়ার মুদির দোকান, কিংবা নদীর ধারের চা-সিগারেটের টংঘর । বাংলাদেশের FMCG বিজনেসের জন্য ডিস্ট্রিবিউশন শুধু গুরুত্বপূর্ণই নয়, বরং বলা চলে Do-or-Die ফ্যাক্টর । এই ফ্যাক্টরটিতে আবুল খায়ের অন্য সবার চাইতে নি:সন্দেহে অনেক অনেক গুণ আগানো ।
৫) দূরদর্শী এবং ঠান্ডা মাথার লিডারশীপ: আবুল খায়েরের লিডারশীপ আমার কাছে সবসময়ই গভীর দূরদর্শী এবং অত্যন্ত ঠান্ডামাথার বলে মনে হয় । এরা দক্ষ লোক নিয়ে টিম সাজায়, এবং তাঁদেরকে দক্ষতাকেও দারুণভাবে কাজে লাগায় । সত্যিকারের ভাল লোককে এরা দীর্ঘ সময় টিমে ধরে রাখে, নোংরা পলিটিক্স করে দূর করে দেয় না । সাথে সাথে এরা অন্য কোম্পানীকে ফলো না করে নিজেদের স্ট্রাটেজী অনুযায়ী আগায়, নিজেদের শক্তি ও দূর্বলতা অনুযায়ী প্ল্যান এক্সিকিউট করে । সুতরাং, অন্যদের তুলনায় এদের কৌশল থাকে অনেক গুছানো, দীর্ঘমেয়াদী এবং কার্যকর ।
সবকিছু মিলিয়ে আজকে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকার গুঁড়ো দুধের বিজনেসে আবুল খায়েরের যে সাফল্য সেটি কোনো হঠাৎ আসা ফ্লুক নয়, বরং দীর্ঘ দিনের সঠিক স্ট্র্যাটেজী, নিখুঁত এক্সিকিউশন, সঠিক মানুষের মেধার ব্যবহার আর দারুণ লিডার শীপের ফলাফল । তাই এক সময় আবুল খায়েরের তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে কাজ করলেও আজকে তাঁদের এই সাফল্যে একজন প্রফেশনাল হিসেবে আমি হাততালি দিতে কার্পন্য বোধ করছি না ।